বুধবার, ২০ মে, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির সংগ্রাম- ইনজেব চাঙমা

 

একটি সভ্য সমাজের শ্রেষ্ঠতম মানদণ্ড হলো তার পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও নিঃস্বার্থ পরোপকারিতা। বর্তমান সময়ে একঝাঁক তরুণের নিঃস্বার্থ কর্মকাণ্ডে সেই সভ্যতারই প্রতিফলন ঘটছে। কারও পারিবারিক অসুস্থতায় রক্তের জোগান দেওয়া, অর্থসংকটে পড়া শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া, কিংবা অগ্নিকাণ্ডে গৃহহীন পরিবারের মাথার ওপর নতুন ছাদ তৈরি করে দেওয়া—এই সবকিছুই এক পরম মানবিক সংস্কৃতির অংশ। আশার কথা হলো, এই পরার্থপরতা কোনো ধার করা সংস্কৃতি নয়; এটি আবহমান কাল ধরে আমাদের চাকমা সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্যের মধ্যেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বাহ্যিক সমাজ ও সংস্কৃতির এত অগ্রগতির পরও, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমরা কি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পেরেছি? গভীর অবলোকন বলে, বাহ্যিক আধুনিকতার আড়ালে আজও আমরা সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি রয়ে গেছি।
 
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, একসময় সামন্ততান্ত্রিক সমাজে সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ছিল এক দুর্লভ অধিকার। তৎকালীন দেওয়ানদের অন্ধ অনুকম্পা ও অনুমতি ছাড়া সাধারণ ঘরের সন্তানের শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। শিক্ষার আলোকে প্রদীপ না ভেবে, নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হুমকিস্বরূপ মনে করা হতো। কিন্তু সময় স্থবির থাকে না। কৃষ্ণকিশোর চাকমার মতো দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের আন্তরিক সহযোগিতা এবং পরবর্তীকালে এম এন লারমা ও সন্তু লারমার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে জুম্ম সমাজ এক যুগান্তকারী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। তাঁদের আলোকেই আজ চাঙমা সমাজের অগণিত মানুষ দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষায় দীক্ষিত হয়েছে, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং বিশ্বমঞ্চে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

চাকমা তথা জুম্ম জাতির এই আত্মপ্রকাশের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসক থেকে শুরু করে পরবর্তী শাসকরাও কখনোই চায়নি এই জুম্ম জনতা স্বাধিকার ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকুক। ফলে ব্রিটিশ আমলে চাকমা রাজ্যকে তিন ভাগে বিভক্ত করে এর শক্তিকে খর্ব করার চেষ্টা করা হয়। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে লাখো চাকমা মানুষকে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে এক নির্মম বাস্তুচ্যুত শরণার্থীতে পরিণত করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি; লাখ লাখ বাঙালি পুনর্বাসনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনমিতি পরিবর্তন করে জুম্মদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার এক দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্ত চলমান রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তিও বাস্তবায়ন না হওয়াতে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান পুরোপুরি দিতে পারেনি।
 
আজ বরগাঙের পানি বহুদূর গড়িয়েছে, সমাজ আধুনিক হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, কাঠামোগত সামন্তবাদ বিলুপ্ত হলেও আমাদের মনস্তত্ত্ব থেকে ‘সামন্ত চিন্তা’ দূর হয়নি। বর্তমানের তথাকথিত জনপ্রতিনিধি বা সমাজপতিদের আচরণে সেই পুরোনো দেওয়ানি মানসিকতার কুৎসিত প্রতিফলন প্রায়শই দৃশ্যমান হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়:
•কোনো ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের মতাদর্শের সাথে সাধারণ মানুষের চিন্তা না মিললে, তাকে প্রাপ্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
•কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের ব্যানারে সমাজপতির নাম সামান্য নিচে থাকলে বা বাদ পড়লে, তিনি অহংবোধে আঘাত পেয়ে হুমকি দিতে দ্বিধাবোধ করেন না।
 
শাসক নেই, রাজা-জমিদারের আইনি শাসন নেই, অথচ একশ্রেণীর সুবিধাবাদী মানুষ সমাজকে এখনো নিজেদের ব্যক্তিগত সামন্ততান্ত্রিক তালুক মনে করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারেরই চরম মূল্য চকাচ্ছে আজকের আর্তনাদমুখর পার্বত্য চট্টগ্রাম।
 
এই ঘোর অমাবস্যার মধ্যেও আশার আলো জ্বেলে রেখেছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। যে তরুণরা আজ রাজনীতি বা ক্ষমতার লোভের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, তারাই আমাদের প্রকৃত মুক্তিদূত। সমাজের রক্তচক্ষু, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এবং তথাকথিত সমাজপতিদের অহংকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই নিবেদিতপ্রাণ তরুণরাই ভাঙবে নব্য-সামন্তবাদের এই অদৃশ্য দেয়াল।
 
সামন্তবাদ কেবল কোনো শাসনব্যবস্থা নয়, এটি একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। যতদিন না আমরা অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানাতে পারছি, যতদিন না ক্ষমতার লোভের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে স্থান দিতে পারছি, ততদিন বাহ্যিক আধুনিকতা অর্থহীন। তবে তারুণ্যের এই নিঃস্বার্থ পদচারণাই বলে দেয়—দিনবদল আসন্ন। এই নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং সামন্তবাদের অন্ধকার কাটিয়ে এক মুক্ত, সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজে পদার্পণ করবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পার্বত্য চট্টগ্রামের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির সংগ্রাম- ইনজেব চাঙমা

  একটি সভ্য সমাজের শ্রেষ্ঠতম মানদণ্ড হলো তার পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও নিঃস্বার্থ পরোপকারিতা। বর্তমান সময়ে একঝাঁক তরুণের নিঃস্বার্থ কর্মকাণ্ডে স...