সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

পাহাড়ি রাজনীতির বাঁক বদল: দীপেন দেওয়ানের মন্ত্রিত্ব ও সমকালীন সংকট- ইনজেব চাঙমা


পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ বরাবরই জটিল ও বহুমাত্রিক। এই সমীকরণের সাম্প্রতিকতম অধ্যায়ে যুক্ত হয়েছে এক নতুন নাটকীয়তা। রাঙামাটি (২৯৯) আসনের বিপুল ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের গুঞ্জন এখন চায়ের কাপ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে তুমুল ঝড় তুলেছে। আপাতদৃষ্টিতে একে ‘শারীরিক অসুস্থতাজনিত’ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক চাপ, আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বেশ সুদৃঢ়। তাঁর পিতা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টা। পারিবারিক এই রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় দীপেন দেওয়ান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
নির্বাচনী ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব। রাঙামাটির ২১৩টি কেন্দ্রে তিনি মোট ২ লাখ ৫৯ হাজার ৯৮০ ভোট পেয়ে এক ঐতিহাসিক জয় সুনিশ্চিত করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমার (ফুটবল প্রতীক) প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র ৩০ হাজার ৯৯২। এই বিশাল ব্যবধানের জনরায় তাঁকে পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ফলশ্রুতিতে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী চাবিকাঠি লাভ করেন।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর দীপেন দেওয়ান পাহাড়ের শান্তি ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেন। ৯ এপ্রিল ২০২৬-এর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবংপার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের ‘সুখবরের’ আভাস দেন।
একই সাথে তিনি পাহাড়ের প্রধান সামাজিক উৎসবের নামকরণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত সম্মিলিত রূপ ‘বৈসাবি’ (বৈসু-সাংগ্রাই-বিজু)-র সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই নামটিতে কেবল তিনটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব স্পষ্ট ছিল। পাহাড়ের বাকি জাতিসত্তাগুলোর অধিকার ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে তিনি ১১টি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে বিজু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু, চাংলান ও চাংক্রান নামে আলাদাভাবে উৎসব উদযাপনের ঘোষণা দেন। এটি ছিল পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদাদানের একটি ঐতিহাসিক প্রয়াস।
২১ মে ২০২৬ তারিখে ‘প্রথম আলো’ ও ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পাহাড়ের টেকসই উন্নয়নের এক বাস্তবমুখী রূপরেখা তুলে ধরেন। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোকে এড়িয়ে পাহাড়ে কোনো প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিষদগুলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মডেল। দীপেন দেওয়ান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই চুক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন, যা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।
১ জুন ২০২৬-এর নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো যখন মন্ত্রীর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানায়, তখন ‘অসুস্থতা’কে সামনে আনা হলেও বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এর গভীরে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক পরিষদকে শক্তিশালী করার মতো মন্ত্রীর কিছু অবস্থান পাহাড়ের কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল ও চুক্তি-বিরোধীদের তীব্র অসন্তোষের কারণ হতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও চুক্তি-বিরোধী পক্ষগুলোর ভূমিকা সব সময়ই একটি সংবেদনশীল আলোচনার বিষয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে যে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে, তার চাপ হয়তো এই জননন্দিত মন্ত্রীর কাঁধে এসে পড়েছে। চুক্তি-বিরোধীদের অদৃশ্য চাপ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেই হয়তো বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সরে দাঁড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন ব্যক্তির সরে যাওয়া নয়, বরং তা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রযাত্রায় এক বড় ধাক্কা হতে পারে। বন্দুকের গর্জন, গুম আর হত্যাকাণ্ডের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়া পাহাড়ি জনপদে যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল, তা যেন এই রাজনৈতিক পালাবদলে থমকে না যায়। পাহাড়ের ১১টি জুম্ম জাতির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি রক্ষা এবং আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের যে স্বপ্ন দীপেন দেওয়ান দেখিয়েছেন, তা টিকিয়ে রাখাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পাহাড়ি রাজনীতির বাঁক বদল: দীপেন দেওয়ানের মন্ত্রিত্ব ও সমকালীন সংকট- ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ বরাবরই জটিল ও বহুমাত্রিক। এই সমীকরণের সাম্প্রতিকতম অধ্যায়ে যুক্ত হয়েছে এক নতুন নাটকীয়তা। র...