বাংলাদেশের আদিবাসী সাহিত্য ও নাট্যধারায় মৃত্তিকা চাকমা এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি কবি, নাট্যকার, অনুবাদক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও নাট্যআন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে নিরলস অবদান রেখে চলেছেন। বিশেষত চাকমা ভাষায় আধুনিক নাট্যসাহিত্যের বিকাশ, লোকঐতিহ্যকে নাট্যরূপ প্রদান, শিক্ষা, পরিবেশ, জাতিসত্তা, সামাজিক পরিবর্তন ও মানবিক মূল্যবোধকে নাটকের বিষয়বস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সাংগঠনিক নাট্যচর্চার প্রসারে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাট্যসাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
মৃত্তিকা চাকমা ১৯৫৮ সালের ১২ জানুয়ারি রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গা মৌজার মুগছড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি পাহাড়ি সমাজের লোকসংস্কৃতি, মৌখিক ঐতিহ্য, জুমজীবন ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন। পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টিতে এই অভিজ্ঞতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
তিনি লোগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যয়ন করে ১৯৮৪ সালে বি.এ. (সম্মান) এবং এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৫ সাল থেকে তিনি রাঙামাটির মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক চেতনাবোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে কাজ করে চলেছেন।
মৃত্তিকা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংগঠন জুম ইসথেটিক কাউন্সিল (জাক)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও নীতিনির্ধারকদের একজন। জাকের মাধ্যমে চাকমা নাটক, লোকসাহিত্য, সংগীত ও শিল্পচর্চাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া তিনি আদিবাসী কবিতা পরিষদ, হিল চাদিগাং থিয়েটারসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর সাংগঠনিক নেতৃত্ব পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক নাট্যচর্চাকে সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদান করেছে।
মৃত্তিকা চাকমার সাহিত্যসাধনার প্রধান ক্ষেত্র নাটক। তাঁর নাটকে পাহাড়ি সমাজের জীবনসংগ্রাম, জুমচাষ, লোকবিশ্বাস, ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, নারীজীবন, সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশ সংকট এবং মানবিক মূল্যবোধ শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি লোকঐতিহ্য ও আধুনিক নাট্যরীতির সৃজনশীল সমন্বয়ের মাধ্যমে চাকমা নাটককে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারায় উন্নীত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাঁর নাট্যচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক পরিচয়, মানবিক মুক্তি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শিল্পের রূপান্তরমূলক শক্তি। লোককথা, কিংবদন্তি, ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতাকে তিনি নাট্যভাষায় এমনভাবে রূপ দিয়েছেন, যা চাকমা নাট্যসাহিত্যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
প্রকাশিত নাট্যগ্রন্থ
মৃত্তিকা চাকমার উল্লেখযোগ্য নাট্কসমূহ—
দেবঙসি আহধর কালা ছাবা (১৯৮৯)
গোঝেন (১৯৯০)
মহেন্দ্রর বনবাঝ (১৯৯২)
একজুর মান্নেক (১৯৯৩)
জোঘ্য (১৯৯৯)
হককানির ধনপানা (২০০১)
একাত্তর তরুণী (২০০২)
ভূত
থবাক (২০০৫)
বান (২০০৮)
কর্মফল (২০১২)
নির্বাচিত নাটক (বাংলা একাডেমি, ২০২৬)
মঞ্চনাটক ও নাটিকা
তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক ও নাটিকার মধ্যে রয়েছে—
মোনফুল, উদোশিঙর খানা গুদি, তুলোপুধি বাবর মাধা ধনা, গুণমনে স্কুলত যেব, নেতার চবাত, থগ, জামেই মারা, কুন্ডলী বালার অর্হত, আভা, শান্তি দেবী জদন হলা, আঙস্যা সদগ, জামুরো, শিদোলো তাবা দি' বিনি ভাত, পার্বতী মা, চন্ডি চরনার খানাগুলি, কাবাহুল, ছি মোকে লাদি ভাত, নিজ অহরখ শিখিবং এবং তানজাং।
চাকমা ভাষাভাষী পাঠকদের বিশ্বনাট্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে মৃত্তিকা চাকমা গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদকর্ম সম্পাদন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ—
গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের ইডিপাস (১৯৮৪)
জাপানি নাট্যকার ইয়ামামতো ইউজোর নাটক অবলম্বনে একশ বস্তা চোল (২০১৮)
কাব্যগ্রন্থ
বাংলা ভাষায় এখনো পাহাড় কাঁদে (২০০২), চাকমা ভাষায়- দিকবন সেরেত্তুন (১৯৯৫), মেঘ সেরে মোনো চুক (২০১১)।
হাজার বছরের বাংলা কবিতা (অনুবাদ, মোনঘর, ২০২৬)
এছাড়া তাঁর বাংলা নাটক শান্তির সন্ধানে বিশেষভাবে সমাদৃত।
মৃত্তিকা চাকমার সাহিত্যচিন্তার মূলভিত্তি হলো জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, মানবিক মুক্তি এবং শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাঁর নাটকে একদিকে যেমন লোকঐতিহ্য, পুরাণ, লোককথা ও কিংবদন্তির পুনর্নির্মাণ ঘটেছে, অন্যদিকে সমকালীন সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক সংকট, পরিবেশবিনাশ, নারী-অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধও শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে তাঁর নাটক কেবল শিল্পসৃষ্টি নয়, বরং সমাজ-ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত।
পুরস্কার ও সম্মাননা-
সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
তোলবিচ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১)
জাতীয় সাহিত্য পরিষদ সাহিত্য সম্মাননা, ঢাকা (২০০৩)
জাপান–বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম সাহিত্য সম্মাননা পদক (২০০৮)
স্বাধীনতা সংসদ সম্মাননা, ঢাকা (২০১০)
আন্তর্জাতিক জলঙ্গী কবিতা উৎসব সম্মাননা, নদীয়া, ভারত (২০১০)
দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির জন্য কবিতা সম্মাননা, নেপাল (২০১৩)
রাঙামাটি শিল্পকলা একাডেমি নাট্যসাহিত্য পুরস্কার (২০১৩)
মুনীর চৌধুরী পদক (২০১৪)
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০২৩)
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পরবর্তীকালে তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো হিসেবেও নির্বাচিত হন।
মৃত্তিকা চাকমা কেবল একজন নাট্যকার নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাতা। চাকমা ভাষায় আধুনিক নাট্যধারার বিকাশ, বিশ্বনাট্যের অনুবাদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠন এবং নতুন প্রজন্মকে সাহিত্য-নাট্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর সাহিত্যকর্ম আদিবাসী সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনবোধকে জাতীয় সাহিত্যভাণ্ডারে সমৃদ্ধ করেছে। এ কারণে তিনি সমকালীন চাকমা সাহিত্য এবং বাংলাদেশের আদিবাসী নাট্যধারার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত।
তথ্যসূত্র
১. বাংলা উইকিপিডিয়া, “মৃত্তিকা চাকমা”।
২. রাণ্যাফুল (কবিতাগ্রন্থ)।
৩. বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন