পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তিম ও সবুজ শৈলশ্রেণির বুক চিরে যে জীবনধারা প্রবহমান, তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সংবেদনশীল রূপকার কেভি দেবাশীষ চাঙমা। সমকালীন চাঙমা সাহিত্যের অঙ্গনে তিনি কেবল একজন স্রষ্টা নন, বরং এক আলোকবর্তিকা—যিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সম্পাদক ও সংগঠক। জুম্ম জনগোষ্ঠীর শতাব্দীর প্রাচীন ইতিহাস, আদিভিটা হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ, শরণার্থী জীবনের অনিশ্চয়তা, জুমচাষের আদিম ও কঠোর সংগ্রাম, জাতিসত্তার অস্তিত্বের সংকট এবং পার্বত্য অঞ্চলের জটিল সামাজিক-political বাস্তবতা তাঁর লেখনীর প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি ব্যক্তিক যন্ত্রণাকে সামষ্টিক ইতিহাসের ক্যানভাসে এমন এক গভীর মানবিক বোধে উন্নীত করেছেন, যা তাঁর সৃষ্টিকে দিয়েছে কালজয়ী শিল্পরূপ।
১৯৭৬ সালের ২৮ মে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলার রাঙাপানিছড়া গ্রামের এক শান্তিময় সকালে এই শব্দশিল্পীর জন্ম। পিতা সরেন্দ্র লাল চাকমা এবং মাতা বিজয়মুখী চাঙমার স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা সাত ভাই-বোনের পরিবারে তিনি ষষ্ঠ সন্তান। ২০১১ সালে তিনি তুষিতা চাকমার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন এবং তাঁদের যৌথ জীবনের আঙিনা আলো করে আসে কন্যাসন্তান 'অঝরা চাঙমা'। বর্তমানে তিনি খাগড়াছড়ির দিঘীনালা বনবিহার পাড়ার নিভৃত আশ্রয়ে থেকে তাঁর সাহিত্যসাধনা ও সাংগঠনিক কাজ নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একবার পরম ব্যাকুলতায় চাঙমা ভাষায় একটি নিরেট, শক্তিশালী উপন্যাস রচনার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। ইতিহাসের সেই অমোঘ আহ্বান যেন ধ্বনিত হয়েছিল কেভি দেবাশীষ চাঙমার অন্তরে। ২০০২ সালে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী থেকে নিঃসৃত হয় যুগান্তকারী উপন্যাস ‘কোচপানা দুঘ’। এই একটিমাত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি চাঙমা কথাসাহিত্যের বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। মাতৃভাষায় দীর্ঘ আখ্যান রচনার যে স্পর্ধা ও শৈল্পিক ধী তিনি দেখিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক আলোকোজ্জ্বল পথ তৈরি করেছে।
তিনি শুধু নিভৃত প্রকোষ্ঠের সাধক নন, বরং সংস্কৃতির মাঠপর্যায়ের এক অতন্দ্র প্রহরী। আদিবাসী সাহিত্য-সংস্কৃতির চারাগাছটিকে মহীরূহে পরিণত করতে এবং নতুন প্রজন্মের মগজে পাঠাভ্যাসের বীজ বুনে দিতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ আদিবাসী কবি পরিষদ (সভাপতি), চাঙমা সাহিত্য বাহ্ (সভাপতি), থিংকার্স লাইব্রেরি (সভাপতি) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক ফোরামে।
কেভি দেবাশীষ চাঙমার সৃজনশীলতার আকাশ অত্যন্ত সুবিস্তৃত। তাঁর কবিতা ও উপন্যাসের পরতে পরতে মিশে আছে পাহাড়ি জীবনের ঘাম, রক্ত ও স্বপ্নের ঘ্রাণ। তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত সাহিত্যের খতিয়ান নিচে বিন্যস্ত হলো:
১. কোচপানা দুঘ (উপন্যাস, ২০০২) — চাঙমা কথাসাহিত্যের মাইলফলক। ২. তুই এবে (২০০৩) ৩. ব্যর্থ জীবনের কষ্টের কাহিনি (২০০৪) ৪. এক ফোঁটা চোখের পানি (২০০৫) ৫. অধিকার (২০০৭) ৬. সুখে থেচ (২০০৭) ৭. বেল্যামাধান (২০০৮) ৮. মুই মত্যেই বা আমি আমার (২০১৩) ৯. আওচ/ইচ্ছা (২০১৭) ১০. আঝা পুরেবং (২০১৮) ১১. কেচ্ছে ফুল/কাশফুল (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৯), ১২. ফিরে পেতে চাই (২০২৫)।
সম্পাদক হিসেবে তিনি সবসময়ই চেয়েছেন সমকালের কণ্ঠস্বরকে ধরে রাখতে। তাঁর সুনিপুণ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে: ধল পহ্’র (ম্যাগাজিন, ২০০৪), ফুদন্দি ফুল তুম্বাজ (সাহিত্যপত্রিকা, ২০১৬), সম্বোধি (২০১৮), পার্বত্য জ্যোতি (ভদন্ত মণিপাল ভান্তের মহাস্থবির বরণ স্মারকগ্রন্থ, ২০২৫)ও সংঘরাজ দেবতিষ্য লুরি স্মারকগ্রন্থ (২০২৫)।
প্রকাশের আলো না দেখলেও তাঁর টেবিল আলো করে আছে ‘জুম্ম দেচ’-সহ বেশ কিছু অসামান্য ছোটগল্প ও কবিতা পাণ্ডুলিপি, যা জুম্ম জীবনের যাপিত চালচিত্রকে আরও নিবিড়ভাবে ধারণ করে আছে।
কেভি দেবাশীষ চাঙমা কেবল একজন লেখক নন, তিনি চাঙমা ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয় রক্ষার এক অবিনাশী সুর। তাঁর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পঙক্তি জুম্ম মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্নকে ধারণ করে। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝরনার মতোই তাঁর সাহিত্যধারা বহমান, যা সমকালীন চাঙমা সাহিত্যকে বিশ্বমানের উচ্চতায় আসীন করতে প্রতিনিয়ত প্রাণরস জুগিয়ে চলেছে।
লেখা: ১৫ জুলাই ২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন