রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা ত্রিশটি দীপশিখা (নলবনিয়ার চাকমা তরুণদের উচ্চশিক্ষা জয়ের মহাকাব্য) - ইনজেব চাঙমা

 

যে জাতির ভিটে কেড়েছে কাপ্তাইয়ের নীল সলিল, যে জাতির স্বপ্ন পিষেছে সেটেলার পুনর্বাসনের লৌহচাকা—সেই চাকমা জাতির ললাটে বিধাতা বুঝি হীরকের কলমে লিখে দিয়েছেন একটিমাত্র শব্দ: ‘মেধা’। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—শাসকের রং বদলায়, বদলায় না পাহাড়কে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা। তবু পাহাড় নত হয় না। বরং শতাব্দীর শোষণ ডিঙিয়ে সে আকাশ ছোঁয় আপন শিরদাঁড়ার জোরে।
বাঘাইছড়ির অরণ্যচারী পথের শেষে ঘুমিয়ে আছে নলবনিয়া—একটি গ্রাম, না-কি একখণ্ড কবিতা? চারপাশে ধ্যানমগ্ন গিরিশ্রেণি, বুকের ওপর দিয়ে বয়ে চলে কাজালং স্রোতস্বিনী। এখানে ভোর হয় জুমের ধোঁয়ায়, সন্ধ্যা নামে কৃষকের কপালের ঘামে। বর্ষায় পথ ডোবে কর্দমাক্ত দীর্ঘশ্বাসে, শীতে হিম ঝরে টিনের চালে। কলেজ নেই, লাইব্রেরি নেই, আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশি।
তবু এই গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলে অন্য এক প্রদীপ—অক্ষরের প্রদীপ, স্বপ্নের প্রদীপ।
দুঃসময়ের মেঘে ঢাকা পার্বত্যের আকাশে হঠাৎই বেজে উঠল বাঁশি। ফেসবুকের পাতায় ভেসে এলো খবর , নলবনিয়ার ত্রিশটি ছেলেমেয়ে এবার দেশের নয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহদ্বার পেরিয়েছে (১২ জুলাই ২০২৬ খ্রি. বরিবার)। কেউ শুনবে রোগীর হৃদস্পন্দন, কেউ গড়বে সেতু, কেউ লিখবে কোড, কেউবা লিখবে জাতির না-বলা ইতিহাস।
ভাবো একবার—যে গ্রামে কলেজে যেতে পাড়ি দিতে হয় কাজালং নদী, সেই গ্রামের সন্তানেরা আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে পা রাখবে। এ কেবল ভর্তি নয়, এ এক নীরব বিপ্লব। এ কেবল সংখ্যা নয়, এ এক মহাকালের প্রতিশোধ।
এই অগ্ন্যুৎসবের সলতে কারা?
জুমের ধান বেচে যে মা ছেলের ফর্ম ফিলাপের টাকা জোগায়, সেই মা।
যে বাবা খালি পেটে লাঙল ঠেলে মেয়ের কোচিং ফি পাঠায়, সেই বাবা।
যে দাদা শহর থেকে ফিরে হ্যারিকেনের আলোয় অঙ্ক কষায়, সেই দাদা।
আর পুরো নলবনিয়া—যারা একবাক্যে উচ্চারণ করেছে, “আমরা হারব না”।
এখানে দারিদ্র্য অভিশাপ নয়, দীক্ষা। বঞ্চনা কান্না নয়, কণ্ঠ।
আমরা চাই, নলবনিয়ার এই দীপাবলি হোক পার্বত্যের দাবানল। প্রতিটি জুমঘর থেকে উঠে আসুক পাবলিকিয়ান, প্রতিটি মাচাং ঘর হোক পাঠশালা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বমসহ সকল জাতিসত্ত্বা—সব পরিচয় মিলে যাক একটিই পরিচয়ে: ‘শিক্ষিত পাহাড়’।
কারণ কলমের কালি দিয়েই শুকাতে হয় কাপ্তাইয়ের জল, ডিগ্রির সনদ দিয়েই রুখতে হয় উচ্ছেদের বুলডোজার।
হে রাষ্ট্র, নলবনিয়াকে ‘আদর্শ শিক্ষা গ্রাম’ ঘোষণা করো। এখানে কলেজ দাও, পাঠাগার দাও, ইন্টারনেট দাও। এই ত্রিশটি প্রদীপের জন্য বৃত্তি দাও, গবেষণার বৃত্ত দাও, ফিরে এসে যেন মাটির ঋণ শোধ করতে পারে তার কর্মসংস্থান দাও।
উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের সেতু নয়, উন্নয়ন মানে সম্ভাবনার সাঁকো বাঁধা।
আমাদের সাধ, এই তরুণেরা কেবল চাকরির বাজারে সনদ বেচবে না। তারা হবে জাতির কণ্ঠস্বর।
কেউ লিখবে নতুন ‘রাধামন ধনপুদি পালা ও বারমাস ’, কেউ সুর দেবে বিঝুর গানে বিশ্বমাতানোর মতো মূর্ছনা, কেউ আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়িয়ে বলবে পাহাড়ের অধিকারের কথা, কেউ জুমের মাটিতে ফলাবে খরাসহিষ্ণু ধান।
তারা প্রমাণ করুক—শিক্ষা মানে শেকড় কাটা নয়, শেকড়কে আকাশে মেলে ধরা।
নলবনিয়ার ত্রিশটি দীপশিখা আজ ত্রিশটি ধ্রুবতারা। এই তারার আলোয় পথ দেখুক পার্বত্যের প্রতিটি শিশু। তাদের ছবি, নাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছড়িয়ে দাও পাহাড় থেকে সমতলে। কারণ একটি ছবি হাজারো ঘুমন্ত চোখে স্বপ্ন বুনে দিতে পারে।
জেগে ওঠো, পাহাড়। জেগে ওঠো, বাংলাদেশ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা ত্রিশটি দীপশিখা (নলবনিয়ার চাকমা তরুণদের উচ্চশিক্ষা জয়ের মহাকাব্য) - ইনজেব চাঙমা

  যে জাতির ভিটে কেড়েছে কাপ্তাইয়ের নীল সলিল, যে জাতির স্বপ্ন পিষেছে সেটেলার পুনর্বাসনের লৌহচাকা—সেই চাকমা জাতির ললাটে বিধাতা বুঝি হীরকের কলমে...