![]() |
| কবি লালন কান্তি চাঙমা |
কবি লালন কান্তি চাঙমা ১৯৬৯ সালের ১১ জুন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার প্রত্যন্ত ও সবুজ-শ্যামল তারাবন্যা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রয়াত সুরেন্দ্রলাল চাকমা এবং মাতা প্রয়াত বিরাজ মুখী চাকমা। পাহাড়ের কোলেই তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশবে প্রকৃতির উদারতা যেমন তাঁর মনকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনই সেই সময়কার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও প্রান্তিক মানুষের নিত্যদিনের জীবনসংগ্রাম তাঁর অবোধ মননে গভীর রেখাপাত করে। এই শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিকতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য, সমাজভাবনা এবং সাংস্কৃতিক কর্মের মূল ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিল।
দীঘিনালার বোয়ালখালী অনাথ আশ্রম ও ঐতিহ্যবাহী ‘মোনঘর’-এর স্নেহছায়ায় লালন কান্তি চাকমার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হয়। পাহাড়ি জীবনের শেকড় থেকে উঠে এসে উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। সেখান থেকে তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএসএস (সম্মান) ও এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয়, সামাজিক কাঠামো ও মানবিক মূল্যবোধের মৌলিক প্রশ্নগুলো তাঁর বৌদ্ধিক চর্চাকে শাণিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জীবনই তাঁকে একজন প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে লালন কান্তি চাকমা প্রথমে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘আইডিএফ’-এ প্রায় দুই বছর উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কাজের চেয়ে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি অর্থাৎ শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল। ফলে, তিনি শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। বর্তমানে তিনি কাচলং সরকারি কলেজে অধ্যাপনারত। তাঁর কাছে শিক্ষকতা কেবল নিয়মতান্ত্রিক পাঠদান বা জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, যুক্তিবাদ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সংস্কৃতিচর্চার বীজ বপনের এক পরম ব্রত।
কবি লালন কান্তি চাঙমা একজন খাঁটি মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল ভাবুক। তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন এক সমাজের, যা হবে শ্রেণিবৈষম্যহীন, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক মূল্যবোধে সিক্ত। অসাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও যুক্তিনির্ভর জীবনদৃষ্টির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকার আত্মজীবনী 'আমি এক যাযাবর' তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী এবং জীবনের অন্যতম প্রধান প্রেরণার উৎস।
কেবল চিন্তার জগতেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মাঠেও তিনি সমান সক্রিয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আরাঙ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া, পাহাড়ি অঞ্চলের তরুণ ও প্রবীণ লেখকদের মিলনমেলা ‘চাকমা সাহিত্য বাহ্’ বর্তমানে চাঙমা সাহিত্য একাডেমি-এর উপদেষ্টা সদস্য হিসেবে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
কবি লালন কান্তি চাঙমার সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছিল ছাত্রজীবনের দেয়ালিকা, সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকার পাতা থেকে। কবিতা তাঁর আত্মপ্রকাশের প্রিয় মাধ্যম হলেও প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, শিক্ষাবিষয়ক রচনা ও সম্পাদনায় তিনি সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর মৌলিক লেখায় বারবার ঘুরেফিরে আসে শিক্ষা, মানবতা, নৈতিকতা, পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবনসংগ্রাম, কৃষ্টি ও ইতিহাস-সচেতনতা।
তাঁর সাহিত্য ও সম্পাদনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বৌদ্ধধর্মীয় স্মারকগ্রন্থ ও সমাজসংস্কারকদের জীবন আখ্যান, যা ইতিহাসের অমূল্য দলিল। তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থ
• মেয়্যে রেগা (কাব্যগ্রন্থ) – বিঝু, ২০১৯
• আমার প্রিয় শিক্ষকের একাল সেকাল – নভেম্বর, ২০২১
সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ
• কর্মবীর (ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের-এর ৮১তম শুভ জন্মজয়ন্তী স্মারক) – ৫ অক্টোবর ২০১৮
• জন্মস্মারক (উপ-সংঘরাজ ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের-এর ৮২তম শুভ জন্মজয়ন্তী) – ১১ অক্টোবর ২০১৯
• আত্মদীপ (তিলোকানন্দ ভান্তের স্মারক গ্রন্থ)
• প্রদীপ্ত মশাল (১ম খণ্ড) (তিলোকানন্দ ভান্তের স্মারক গ্রন্থ)
• প্রদীপ্ত মশাল (২য় খণ্ড) (৪র্থ সংঘরাজ ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের-এর ৮৪তম জন্মস্মারক সংকলন) – ডিসেম্বর ২০২১
• শ্রদ্ধাস্মারক (প্রয়াত উপালি মহাস্থবির এর শেষকৃত্যানুষ্ঠান বাস্তবায়ন কমিটির বিশেষ প্রকাশনা) – ২০২২
• তরুছায়া (দিমোনঘরীয়ান্স এর ২৫ বছর পূর্তি বিশেষ প্রকাশনা) – ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
• তিলোকানন্দ (সাদা মনের মানুষ) – ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
কবি লালন কান্তি চাঙমার সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম ও সম্পাদনা শিল্পের মূল সুর হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ঐতিহ্য, শিক্ষা, সমাজসংস্কার এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে মহাকালের বুকে ধরে রাখা। তিনি বর্তমান পার্বত্য অঞ্চলের জ্ঞানচর্চার এক অন্যতম বাতিঘর। শিক্ষা, প্রগতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় এক আদর্শ। পাহাড়ের বুক থেকে উঠে আসা এই মনীষা তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে দেশ ও জাতির মনন গঠনে আজীবন অবদান রেখে চলবেন, এটাই প্রত্যাশা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন