গতকাল এই ঘটনার পরে আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা!সময় সন্ধ্যা ৭:৪৫-৮টা হবে।
আমার গ্রাম থেকে বটতলী তে যাচ্ছিলাম! যেতে যেতে হঠাৎ রাস্তায় দেখি সেনাবাহিনীর গাড়ি আর আমাকে দেখে সাথে সাথে রাস্তা ব্লক আর এমন সিশুয়েশন তৈরি হলো যেন আমি বিরাত এক পলাতক আসামি ।
গাড়ী থেকে সবাই আমার দিকে বন্দুক রেডি,, একজন বলতেছে একদম নড়বেন না। আমিও
আমার মত নিজ জায়গায় সাথে বাইক এ ব্রেক করেছি এবং থামিয়েছি। জায়গা বরাবর
বাইক থামাকে না পারলে হয়তো অনেক কিছু হয়ে যেতো নিমিষেই,, সেখানেই শেষ নয়!
সাথে সাথে আমাকে বাইক থেকে নামানো হলো, এরপর তাদের থেকে একজন সেনাবাহিনী
সে যদিও আমাকে চিনে, এবং আরো একজন তাদের সাথে থাকা এক লোক যদিও তার কাছে
ইউনিফর্ম তা খেয়াল করতে পারিনি,দূরে থাকায়, আর অন্ধকারে মুখ ও ডাকা মনে
হয়েছিলো,, এরপর তাকে জিজ্ঞেস করা হলো সে আমাকে চিনে কিনা,, সেও বললো সে
আমাকে চিনে,,, আর আমাকে কারোর না চেনার কোনো উপায় নাই,,কারণ প্রতিদিন
রোয়াংছড়ি বাজার ৪-৫বার চক্কর দি,, তারপরেও আমার সাথে শুরু হলো অনেক
কাহিনী,, আমার পুরো শরীর অনেকবার চেক করলো,, এরপর বাইকের পাতগুলা খুলতে
বলা হলো,, আমি যেটা খুলা যায় সেটা খুলে দেখালাম,,, এরপরে যেগুলো খুলা
যায়না সেগুলো ও খুলতে বলা হলো অকথ্য ভাষায়,যাতে আমি রেগে যায়,, তারপর ও আমি
সুন্দরভাবে বললাম যে ওগুলো খুলা যায়না,, সেগুলো খুলতে হলে গেরেজে যেতে
হবে। এরপর চেকিং, সবকিছু বাদদিয়ে, আমাকে ইন্টার্ভিউ নেওয়া শুরু হলো,, কোথায়
আমার বাড়ি, কোথায় থেকে আসতেছি কোথায় যাচ্ছি ইত্যাদি,,। আমি সব উত্তর
দিলাম,, এরপর আবার আমার পাড়ার অনেকজনের নাম জিজ্ঞেস করা হলো, তারা সবাই
আমার রিলেটিভ এবং আমার কাছে তাদের নাম্বার ছিলো সেগুলো বললাম,, তারপরেও
আমার রেখায় নাই,, ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিলো না আমায়,, এরপর তাদের কাছে কল আছে এবং
অন্যদিক তাদের ডাকা হয়,, তাই চলে গেলো,আর আমাকে যেতে দেওয়া হলো।
আজকাল আমি নিজ বাড়ির আঙিনার সামনে ও নিরাপদ নয়, ছবিতে থাকা এই (৩০) মহিলা
টি আমার মত করে সেও জুমে কাজ করতে গেছিলো,, কাজ শেষে সন্ধায় বাড়িতে ফেরার
পথে রাস্তায় জলপাই রঙের সেই দানবদের হাতে তার (০৫)বছরের ছেলে সহ গুলিবিদ্ধ
হয়। এবং হসপিটালে নেওয়ার পথে মারা যায় সে।
আজকে স্বাধীন এই
বাংলাদেশে আমরা কতটুকু স্বাধীন? আজকে একজন কাল একজন আর পরশু একজন করে আর কত
নিরীহ মানুষদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালাবেন? আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও
প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং সুস্থ তদন্তের জোর দাবী জানাচ্ছি।
বিগত ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন ২০২০) পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকদের মতো দমন-পীড়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের তৎপরতা জোরদার করেছে। ফলে ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ একপ্রকার রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। পূর্বের সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও জুম্ম জনগণের জাতীয় পরিচিতি একেবারে বিলুপ্ত করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম সামরিকায়ন জোরদার করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা, সর্বোপরি পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম নির্বিঘেœ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে আন্দোলনরত জুম্মদেরকে ক্রিমিলাইজেশনের অংশ হিসেবে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিগত ছয় মাসে সেনাবাহিনী, বিজিবি, গোয়েন্দা বাহিনী ও পুলিশ কর্তৃক ৭২টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এই ৭২টি ঘটনায় ২ জনকে বিচার বহির্ভূত হত্যা, ২৭ জনকে অবৈধ গ্রেফতার, ৮ জনকে সাময়িক আটক, ২২ জনকে শারীরিক নির্যাতন ও হয়রানি, ৫৩টি বাড়ি তল্লাসী, ৩টি নতুন ক্যাম্প স্থাপন, সেনাবাহিনীর উন্নয়নে ১৬৭ পরিবার ক্ষতির মুখে ও ২টি জায়গায় ফাঁকা গুলি বর্ষণ করা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে জানুয়ারি-জুন ২০২০-এর মধ্যে সেনাবাহিনী রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন স্থানে সংস্কারপন্থী ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির কর্মকান্ড বিস্তারে প্রত্যক্ষ ও উলঙ্গভাবে সহায়তা প্রদান করেছে। বিগত ছয় মাসে সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় সংস্কারপন্থী, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), এএলপি ও তথাকথিত মগ পার্টি কর্তৃক ৫৯টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এই ৫৯টি ঘটনায় ১৩ জনকে হত্যা, ২৭ জনকে অপহরণ ও তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায়, ১০ জনকে মারধর ও হয়রানি, ৬ জনকে হুমকি প্রদান, এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির জন্য ৩টি জায়গায় ফাঁকা গুলি বর্ষণ, ১৬ জনের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা দায়ের, এএলপি/মগ পার্টি কর্তৃক ১২টি বাড়ি অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
প্রাণঘাতি কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যেও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও বহিরাগত ভূমিদস্যু কর্তৃক ভূমি জবরদখল, জুম্ম গ্রামবাসীদের নানাভাবে হয়রানি ও উচ্ছেদ করে অবাধে চলছে। বিগত ছয় মাসে মুসলিম সেটেলার কর্তৃক ২৩ ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে। এই ২৩টি ঘটনায় ৪ জন জুম্ম নারী ও শিশুর উপর সহিংসতা, জুম্মদের উপর ২টি সাম্প্রদায়িক হামলা, ভূমি জবরদখল কিংবা বেদখলের চেষ্টায় ৮১৮ পরিবার ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখী, জুম্ম গ্রামবাসীদের ৩,০২১ একর জায়গা জবরদখল, ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে জুম্মদের বিরুদ্ধে ২টি মামলা দায়ের ও ২ জনকে গ্রেফতার এবং প্রায় ৫,০০০ একর রাবার বাগান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার শরণার্থী ক্যাম্প পালিয়ে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা বান্দবানে অনপ্রবেশ করেছে। নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় রোহিঙ্গা জঙ্গীগোষ্ঠী অবৈধভাবে ইয়াবাসহ মাদক দ্রব্য ও স্বর্ণ ব্যবসা চালাচ্ছে।
সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীর উদ্যোগে গত ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ মুসলিম সেটেলার, উগ্র জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সকল সংগঠনগুলোর বিলুপ্ত করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ’ নামে একক সংগঠন গঠন করে দেয়া হয় এবং তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিরোধী তৎপরতা, ভূমি বেদখল, সাম্প্রদায়িক হামলা, নারীর উপর সহিংসতা, বহিরাগত মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ও বসতিস্থাপন, গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণ ইত্যাদি তৎপরতায় উস্কে দেয়া হচ্ছে। গঠিত হওয়ার পর পরই পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের উদ্যোগে ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ রাঙ্গামাটিতে এবং গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বান্দরবানে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সভা ঘেরাও করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে মৌলবাদী ও জুম্ম বিদ্বেষী কিছু ইসলামী গোষ্ঠী কর্তৃক সুপরিকল্পিতভাবে আদিবাসীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হচ্ছে। এধরনের পরিকল্পনা বা কার্যক্রম অনেক আগে থেকে শুরু হলেও সাম্প্রতিককালে এর তৎপরতা অনেক জোরদার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষত কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরপরই বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলিকদম উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের এ ধরনের ধর্মান্তরিতকরণের ব্যাপক কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে। যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্মতি ও সহযোগিতা রয়েছে বলে স্বীকার করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের ছাঃলাওয়া পাড়ায় (শীলবান্ধা পাড়া) ৫ মারমা পরিবারের ২৭ জনকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। এছাড়া বান্দরবান পৌরসভা, আলিকদম, রোয়াংছড়ি, লামাসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টির অধিক মুসলিম পাড়া বা বসতিতে প্রায় শতাধিক ধর্মান্তরিত উপজাতি পরিবারের বসবাস রয়েছে।
বিগত ছয় মাসে তিন পার্বত্য জেলায় হামের শিকার হয়ে ১০ শিশুর মৃত্যু এবং আরো কমপক্ষে ৩৫০ জন হামে আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। ব্যাপকভাবে হামে আক্রান্তের ঘটনার মধ্য দিয়ে পাহাড়ের দুর্গম এলাকার আদিবাসী জুম্মদের নাগরিক সুবিধা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে চট্টগ্রাম, ঢাকা, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মজীবী হাজার হাজার জুম্ম চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব কর্মজীবী জুম্ম যুবক-যুবতীরা এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে স্ব স্ব ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় যানবাহনের চরম ভোগান্তি ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলার সাথে তিন পার্বত্য জেলা সীমানায় সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবর্ণনীয় হয়রানি ও নির্যাতনে তাদের পড়তে হয়েছে।
বলাবাহুল্য, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি অনেকটা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-পূর্ব অবস্থার মতো অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়েছে। বিগত ২২ বছরের অধিক সময়ে পার্বত্য সমস্যার কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়া তো দূরের কথা, সমস্যা আরও জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে সরকার পূর্ববর্তী শাসকদের মতো দমন-পীড়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে সরকার তথা রাষ্ট্রযন্ত্র জুম্মদের অধিকার আদায়ের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে গলাটিপে স্তব্ধ করা, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার জুম্ম কণ্ঠস্বরকে চিরতরে রুদ্ধ করা, জুম্মদের চিরায়ত ভূমি জবরদখল ও উচ্ছেদসহ জুম্মদেরকে জাতিগতভাবে নির্মূল করা এবং অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করা ইত্যাদি কার্যক্রম নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করে চলেছে।
………………………………………………………………
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগ কর্তৃক সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, কল্যাণপুর, রাঙ্গামাটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ থেকে ৬ জুলাই ২০২০ প্রকাশিত ও প্রচারিত।
‘‘পাখির স্বভাব পাখির মতো উড়বে বলে বন
পাহাড়ে উড়ে ঘুরে গাইবে বলে লাল
সে মাটির গন্ধ বুকে পুষবে বলে সবুজ
মায়ার বাঁধন অটুট রাখবে বলে শাল
বৃক্ষের মতোন সিনা টান করে সে মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে।’’
পীরেন স্নালকে নিয়ে গানের
দল মাদলের গাওয়া এই গানে ফুটে উঠেছে স্বাধীন সংগ্রামী চেতনা তথা তাঁর মহান আত্নবলিদানের
কথা। কে এই পীরেন স্নাল? কি তার অবদান? কেন তাকে আত্নবলিদান দিতে হল? জাতিসত্তার অস্তিত্ব
রক্ষা, আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইকে শাণিত করতে এইসব নতুন করে ভাবতে হবে।
পীরেন স্নাল। মধুপুরের রাজনৈতিক
ইতিহাসে বিপ্লবী এক নাম। আজকের ইকো-পার্কহীন মধুপুর গড়ায় যার অবদান অসামান্য। তাঁর
অবদানকে স্বীকার করেই মধুপুরের অধিকার রক্ষার আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর গারো, কোচ, বর্মণ, মান্দাই জাতিসত্তার আদি বসতি।
মান্দিরা মধুপুরকে ভালবেসে নাম দিয়েছে হা.বিমা। হা. অর্থ মাটি আর বিমা
স্ত্রী বাচক (মা) অর্থে ব্যবহৃত। প্রিয় মধুপুরকে নিয়ে তাবেদার
শাসকগোষ্ঠীর তথাকথিত উন্নয়নী প্রকল্প পরিকল্পনা আজকের নয়, অতি পুরনো।
পুরনো সেই মহাপরিকল্পনা ‘ইকো-পার্ক’ আকারে গড় হাজির হয় ২০০৩/০৪ সালে চার
দলীয় জোট সরকারের আমলে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, ইকো-পার্ক মধুপুর
জাতীয় উদ্যান প্রকল্পের আওতায় ৯৭.৩ মিলিয়ন টাকার বিল পাস হয় পূর্ববর্তী
আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে। যা বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার
ক্ষমতায় আরোহনের পর গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়। ইকো-পার্ক
প্রকল্প বাস্তবায়নের বেলায় সরকারি তরফ থেকে প্রচারণা চালিয়ে বলা হয়,
‘জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও বিলুপ্ত উদ্ভিদ প্রজাতি, পশু-পাখি ও বন্য প্রাণীর
নিরাপদ আবাসস্থল নির্মাণে তৈরি করা হচ্ছে ইকো-পার্ক।’ প্রকৃতপক্ষে এটা যে
শাসকগোষ্ঠীর মিষ্টি বুলি প্রকৃতিপ্রেমী বনবাসী তা বুঝে ফেলে। যার ফলে জীবন
দিয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করে। প্রতি ৩রা জানুয়ারী শহীদ পীরেন স্নালের খিম্মায় সর্বস্তরের মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। ছবি : জনজাতির কন্ঠ
মধুপুর জাতীয় উদ্যান প্রকল্পে কী ছিল? যা বনবাসী মানুষ কখনোই চায়নি!
এক নজরে দেখলে দেখা যাবে, মধুপুর গড়ের প্রায় ৩ হাজার একর বনভূমি ঘিরে ৭
ফুট উচ্চতার ৬১ হাজার ফুট ইটের দেয়াল এবং ভেতরে ১০টি পিকনিক স্পট, ২টি
ওয়াচ টাওয়ার, ২টি কালভার্ট, ৩টি কটেজ, জলাধারসহ ৯টি লেক, ৬টি রেস্ট হাউজ,
৬টি রাস্তা নির্মাণ, বন কর্মীদের জন্য ৬টি ব্যারাকের কাজ স্থানীয়দের
অমতেই নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৩ সালের ৩রা জানুয়ারী জালাবাদা,
সাধুপাড়া, বেদুরিয়া, কাকড়াগুনি, গায়রা গ্রাম গুলোতে দেয়াল নির্মাণের
জন্য বনকর্মীদের জরিপ কাজ শুরু করার আগ পর্যন্ত আদিবাসীরা কিছুই জানতো না
অথচ নিয়মানুসারে বনবাসীদের আগামা জানার অধিকার আইন স্বীকৃত। আইনের
তোয়াক্কা না করে স্বৈরাচারী কায়দায় জানুয়ারির মাঝামাঝিতে মুক্তাগাছা
থানার বিজয়পুর ও সাতারিয়া এলাকায় স্থানীয় মান্দি জনগোষ্ঠীর তীব্র
প্রতিবাদের মুখে প্রথম দেয়াল নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
বনবিভাগের এই দেয়াল স্থানীয় আদিবাসী মানুষের স্বাভাবিক জীবনে কত
ভয়াবহ দুর্বিষহ পরিনাম ডেকে আনবে তা বনবাসী মানুষ আঁচ করতে সক্ষম হন।
আদিবাসীরা সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে দাবি সমূহ সরকার
সমীপে তুলে ধরার তদবির চালায়। আন্দোলনের চাপে তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী
শাহজাহান সিরাজ ২০০৩ সালের ৪ জুলাই দোখলায় আদিবাসী নেতৃবৃন্দের সাথে
বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠক কোন ফলাফল বয়ে আনেনি। বরং ষড়যন্ত্র প্রক্রিয়ায়
আন্দোলনকারীদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়। সেই বিভেদ রেখা টেনে সংখ্যাগুরু
আন্দোলনকারী সংগ্রাম অব্যাহত রাখে।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৩ ডিসেম্বর গায়রায় অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে ৩
জানুয়ারি ২০০৪ সালে ইকোপার্ক বিরোধী মিছিলের ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণার
প্রেক্ষিতে, ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি গায়রা গ্রামে সাধুপাড়া,
কাঁকড়াগুনি, জয়নাগাছা, জালাবাদা, বিজয়পুর, সাতারিয়া’সহ আশেপাশের গ্রাম
থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ নিজেদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে সমবেত হন।
গারোদের রণধ্বণি খাঁ সাংমা, খাঁ মারাক ধ্বণিতে মূহুর্তেই ধ্বণিত হয়ে উঠে
পুরো শালবন।
এদিকে সমাবেশ ও মিছিলের খবর
পেয়ে সকাল থেকেই সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও অস্ত্রধারী বনরক্ষী
এমনকি ঠিকাদারের ভাড়াটে লোকদেরও মোতায়েন করা হয়। সমাবেশ শেষে দুপুর বারোটার দিকে শুরু
হয় বিক্ষোভ মিছিল। মিছিলটি কিছুদূর অগ্রসর হতেই পুলিশ ও বনরক্ষী নির্বিচারে আন্দোলনকারীদের
উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। গুলিতে ঘটনা স্থলেই নিহত হন জয়নাগাছা গ্রামের বিশ বছরের তরুণ
পীরেন স্নাল। বেপরোয়া বর্ষিত গুলিতে মারাত্নক আহত হন রবীন সাংমা, উৎপল নকরেক, পঞ্চরাজ
ঘাগ্রা, এপ্রিল সাংমা, রহিলা সিমসাং, শ্যামল সাংমা, রিতা নকরেক সহ প্রায় ২৫ জন আদিবাসী
নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর।
এই ঘটনার পর আদিবাসীরা বিক্ষোভে
ফেটে পড়েন। মাসব্যাপী চলে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ। বন বিভাগ চুপটি মেরে বসে থাকেনি।
৪ জানুয়ারি রাতেই নিহত পীরেন স্নাল ও গুলিতে আহত উৎপল নকরেক, জর্জ নকরেক, শ্যামল সাংমা,
মৃদুল সাংমা, হ্যারিসন সাংমা, বিনিয়ান নকরেক’সহ প্রায় ছয়শত জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মধুপুর
থানার দারোগা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। একটি পরিসংখ্যান বলে, শুধুমাত্র জুন ২০০৩
থেকে জুলাই ২০০৪ পর্যন্ত সময়কালেই আদিবাসী নেতৃবৃন্দসহ নিরীহ অনেকের নামে বনবিভাগ মামলা
দায়ের করে মোট একুশটি। এই একুশটি মামলার সবকটিতেই অজয় মৃ, প্রশান্ত মানখিন, পঞ্চরাজ
ঘাগ্রা, মালতি নকরেক, স্বপন নকরেক, নেরি দালবত, মাইকেল নকরেক, নিহত চলেশ রিছিলের নামও
আছে।
পীরেন স্নালের আত্ম বলিদানে ইকো-পার্ক নির্মাণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়।
কিন্তু ইকো-পার্কের প্রেতাত্মা এখনো মধুপুর ছাড়েনি। এখনো সামাজিক বনায়ন,
ইকো-ট্যুরিজম প্রভৃতির আলখেল্লা পড়ে ইকো-পার্কের প্রেতাত্মা হাজির হয়।
এসব ঈগল চোখে দৃষ্টিগোচর হয়।
৩রা জানুয়ারী, পীরেন স্নালের আত্মহুতি দিবস। অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে বীর গতিপ্রাপ্ত পীরেন স্নালের প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ অভিবাদন। উন্নয়ন
ডি. শিরা, তরুণ লেখক।