চাঙমা প্রবাদ— “ঝার বাজ্যেই হরিং ধাবানা”—এর অর্থ, ছোট্ট বিষয়ে বড়সড় কাজ সাধন করা। সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতায় এই প্রবাদটির প্রাসঙ্গিকতা ভয়াবহভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবাধিকারকর্মী ও চাকমা সার্কেলের উপদেষ্টা রাণী ইয়েন ইয়েনকে দেওয়া একটি তথাকথিত “সতর্কপত্র” তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী কোনো নির্দিষ্ট আইন উল্লেখ না করেই “আইন মেনে চলার” নির্দেশ দিয়ে যে নোটিশ প্রদান করেছেন, তা প্রশাসনিক শালীনতার পরিপন্থী এবং স্পষ্টতই ক্ষমতার অপব্যবহার। এই নোটিশের মাধ্যমে একজন নাগরিককে ভীত করা হয়েছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কী অপরাধ, কোন আইনে, কীভাবে—তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
এই বিষয়ে প্রথম আলো (আজ প্রতিবেদন)-কে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী নূর খান যথার্থভাবেই মন্তব্য করেছেন যে, এই চিঠি মানুষের কণ্ঠরোধের একটি পরোক্ষ প্রচেষ্টা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অতীতেও এ ধরনের দমনমূলক চর্চা চালু ছিল। তাঁর ভাষায়, “আমরা ক্রমান্বয়ে পূর্বের দিকেই ফিরে যাচ্ছি”—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—রাণী ইয়েন ইয়েন তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নোটিশের লিখিত জবাব পাঠালেও প্রশাসন দাবি করেছে যে তারা সেটি পায়নি। অথচ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ই–মেইলের মাধ্যমে জবাব পাঠানো হয়েছে এবং নোটিশটি “অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ ও ভিত্তিহীন অভিযোগে ভরা”, যা কার্যত মানহানির শামিল।
তিনি যথার্থভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন—একটি দমনমূলক সময় থেকে বেরিয়ে আসার কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন কেন আবার ভয়ভীতি প্রদর্শনমূলক অস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে?
রাঙামাটি জেলা প্রশাসন যেখানে রাণী ইয়েন ইয়েনকে “ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর” অভিযোগে নোটিশ দিচ্ছে, সেখানে একই অভিযোগকে কেন্দ্র করে অগাস্টিনা চাকমা ও চঞ্চনা চাকমার বিরুদ্ধে ঢাকা ও তিন পার্বত্য জেলায় সেটেলার বাঙালিদের বিক্ষোভ মিছিল রাষ্ট্রের নীরবতায় আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত একটি বিক্ষোভে সাম্প্রদায়িক ও হত্যার হুমকিমূলক স্লোগান— “একটা একটা সন্তু ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”—উচ্চারিত হওয়া কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হলো, বাকস্বাধীনতার অভিযোগে একজন আদিবাসী নারী মানবাধিকারকর্মী নোটিশ পান, অথচ প্রকাশ্য হত্যার হুমকি দেওয়া উগ্র গোষ্ঠীগুলো নির্বিঘ্নে রাস্তায় নামে—এ কেমন ন্যায়বিচার?
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল চেতনা ছিল বাকস্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে উগ্রপন্থী ও মৌলবাদী অপশক্তির তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। রাণী ইয়েন ইয়েনকে দেওয়া নোটিশ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়—এই অপশক্তিগুলোর চাপ রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এটি শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক কণ্ঠরোধের একটি কৌশল হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বৈশিষ্ট্যই ছিল এই অঞ্চলকে জুম্ম অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কিন্তু আজ সেই চুক্তির চেতনাকে উপেক্ষা করে উগ্রবাদী ও মৌলবাদী শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জুম্ম জনগণের বাকস্বাধীনতা ও ন্যূনতম মৌলিক অধিকার হরণ করা হলে, এই অঞ্চল অনিবার্যভাবেই অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হবে।
বস্তুতপক্ষে, এই ধরনের নোটিশ ও দমনমূলক আচরণ মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দেখানোর শামিল নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—প্রতিটি নাগরিককে তার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়। সরকারকে অবশ্যই এই পথ থেকে সরে আসতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের যে আশঙ্কাজনক ধারা তৈরি হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অন্যথায়, “ঝার বাজ্যেই হরিং ধাবানা”—এই প্রবাদটি কেবল কথায় নয়, বাস্তব ইতিহাসের নির্মম সত্য হয়ে উঠবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন