শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০২৪

সবাই বাঙালি : বিদ্রোহের সূচনা


আমরা বাঙালি না বাংলাদেশি?

জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায়, তখনই এই বিতর্কের সঙ্গে মানুষ পরিচিত হলেন। বাম এবং আওয়ামী বুদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদরা যুক্তি-ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চাইলেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মধ্যে যারা বসবাস করেন তারা সবাই বাঙালি। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদরা বোঝালেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মধ্যে বাঙালি ছাড়া অন্যরাও বাস করেন। তারা সবাই বাঙালি নয়। জাতি হিসেবে আমরা সবাই বাংলাদেশি। অনেকে আবার এই বিতর্কটিকে গুরুত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের যুক্তি আমরা যেমন বাঙালি, তেমনি বাংলাদেশিও।

'আমরা বাঙালি না বাংলাদেশি- নিয়ে দেশ জুড়ে একটা বিতর্ক চলছে। ১৯৭৫ সালের আগে বিতর্কের কোনো সম্ভাবনা কিন্তু দেখা যায় নি' (ডঃ আনিসুজ্জামান: বাংলাদেশ, বাঙালি বাংলাদেশি)

ডঃ আনিসুজ্জামান ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা 'সুন্দরম'- এই কথা লিখেছিলেন ১৯৯১ সালে। তার লেখা থেকেও প্রমাণ হয় যে, জিয়াউর রহমানের সময়েই এই বিতর্কের উদ্ভব। বাঙালি-বাংলাদেশি বিতর্কের

সূত্রপাত যে, জিয়াউর রহমানের সময়েই প্রথম নয়, এরও অনেক আগে থেকে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে- সেই ইতিহাস খুব বেশি মানুষ জানেন না। মানুষ বলতে যদি এখানে সাধারণ জনসাধারণের কথা বলি, তাহলে তারা নাই জানতে পারেন, এটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু ডঃ আনিসুজ্জামানের মতো বুদ্ধিজীবী এটা জানেন না, সেটা কী করে সম্ভব, কতটা বিশ্বাসযোগ্য? তবে ডঃ আনিসুজ্জামানের লেখা থেকে একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, হয় তিনি জানতেন না বা জানেন না, অথবা সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন বিষয়টি।

বাঙালি-বাংলাদেশি বিতর্কের বিষয়টি জোরালোভাবে প্রথম সামনে চলে আসে ১৯৭২ সালে। ইতিহাস তাই বলে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন যে গণপরিষদ সদস্যরা, তাদের নিয়েই বসেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন। খসরা সংবিধান উত্থাপন করা হয়েছিল গণপরিষদের অধিবেশনে। গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ত্রয়োদশ বৈঠক থেকেই বাঙালি-বাংলাদেশি বিতর্কের সূচনা। মূলত এই বিতর্কের। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে। পাহাড়ি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, সূর্য জাতীয়তাবাদের জনক পার্বত্য চট্টগ্রাম-১ আসনের গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাঙালি-বাংলাদেশি বিতর্কে অনির্দিষ্টকালের জন্য 'ওয়াক আউট' করেন। শুরু হয়তুমুল বিতর্ক।

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গণপরিষদের এই বৈঠকে ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য আঃ রাজ্জাক ভূইয়া সূচনা করেন এই বিতর্কের। আঃ রাজ্জাক ভূইয়া বলেন,

'মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমি প্রস্তাব করছি যে, "সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক:

"৬। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে; বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।" (গণপরিষদ বিতর্ক: ১৯৭২)

গণপরিষদের এই বৈঠকের স্পিকার ছিলেন জনাব মুহম্মদুল্লাহ। রাজ্জাক ভূইয়ার প্রস্তাবের ওপর বক্তৃতা রাখতে গিয়ে সেই সময়ের তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা, আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলী এবং সংবিধান প্রণয়ন মন্ত্রী ডঃ কামাল হোসেন বলেন,

'মাননীয় স্পিকার সাহেব, এই সংশোধনী আমি গ্রহণযোগ্য মনে করি এবং এটা গ্রহণকরা যেতে পারে।'

এরপর এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। বাংলাদেশ গণপরিষদের সেই বিতর্কের অংশটুকু হুবহু তুলে দেয়া হলো।

শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (পি.ই.-২৯৯: পার্বত্য চট্টগ্রাম-১): মাননীয় স্পিকার সাহেব, জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূইয়া সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন যে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ 'বাঙালি' বলে পরিচিত হবেন।

মাননীয় স্পিকার সাহেব, এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হল, সংবিধান বিলে আছে, "বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।" এর সঙ্গে সুস্পষ্ট করে বাংলাদেশের নাগরিকগণকে 'বাঙালি' বলে পরিচিত করবার জন্য জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে যে, বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যে সংজ্ঞা, তাতে করে ভালভাবে

বিবেচনা করে তা যথোপযুক্তভাবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করি।


আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে আমরা লেখাপড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। সবদিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ- কেউ বলেন নাই, আমি বাঙালি।

আমার সদস্য-সদস্যা ভাই-বোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না, আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায় জনাব স্পিকার: আপনি কি বাঙালি হতে চান না?

শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা : মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনও বলা হয় নাই। আমরা কোনো দিনই নিজেদেরকে বাঙালি বলে মনে করি নাই। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশো পাস হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।

জনাব স্পিকার: আপনি বসুন। Please resume your seat. (গণপরিষদ বিতর্ক: ১৯৭২)

স্পিকার মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বসিয়ে দিলেন। বক্তব্য শেষ করতে দিলেন না। এরপর এই বিতর্কে অংশ নিলেন সিলেট-২ আসনের গণপরিষদ সদস্য সেই সময়ের ন্যাপ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: মাননীয় স্পিকার সাহেব, এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হল, জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূইয়া সাহেব যে সংশোধনী এনেছেন, তাতে মনে এ প্রশ্ন জাগে যে, বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়া ভারতের কেউ বাস করছে। আমি শুধু বলতে চাই যে, বাঙালি বলতে এইটুকু বোঝায় যে, যারা বাংলা ভাষা বলে তাদেরকে আমরা বাঙালি বলি।

জনাব স্পিকার: Please resume your seat, আপনি বসুন, আপনি বসুন। (গণপরিষদ বিতর্ক: ১৯৭২)

স্পিকার সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে একইভাবে বসিয়ে দিয়ে 'হ্যাঁ' 'না' ভোটে পাস করিয়ে নিলেন প্রস্তাবটি। এই গণপরিষদে তিন জন ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্য। ফলে খুব সহজে পাস হয়ে যায় আইনটি। মর্মাহত হন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। তিনি তার মনের ক্ষোভ গোপন রাখেন না। প্রকাশ করেন সেই বৈঠকেই। শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা: মাননীয় স্পিকার, আমাদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে খর্ব করে এই ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধিত আকারে গৃহীত হল। আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং প্রতিবাদস্বরূপ আমি অনিদিষ্ট সময়ের জন্য গণপরিষদের বৈঠক বর্জন করছি। [অতঃপর মাননীয় সদস্য পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান।। (গণপরিষদ বিতর্ক: ১৯৭২)


'ওয়াক আউট' করে চলে যান মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিদ্রোহী হয়ে ওঠার ইতিহাস মূলত এখান থেকেই শুরু। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা 'ওয়াক আউট' করে চলে যাওয়ার পরেও গণপরিষদের বিতর্ক চলে। সেই বিতর্কে অংশ নেন অনেকেই।

সেই সময়ের জাহাজ, অভ্যন্তরীণ জলযান ও বিমান মন্ত্রী জেনারেল মহম্মদ আতাউল গনীওসমানী একটি প্রস্তাব আনেন। জেনারেল মহম্মদ আতাউল গনী ওসমানী পি.এস.সি. (জাহাজ, অভ্যন্তরীণ জলযান ও বিমান মন্ত্রী): জনাব স্পিকার সাহেব, আমি প্রস্তাব করছি যে,

"৯ অনুচ্ছেদের হাশিয়ায় অবস্থিত "জাতীয় ঐক্য শব্দাবলীর পরিবর্তে "জাতীয়তাবাদ" শব্দটি সন্নিবেশ করা হোক।"

আমি আরও প্রস্তাব করছি যে, "৯ অনুচ্ছেদটির পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক:

"৯। ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তা বিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সঙ্কল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। (গণপরিষদ বিতর্ক: ১৯৭২)

এরপর জেনারেল ওসমানী বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে দীর্ঘ এক আবেগময় বক্তব্য রাখেন।

... আমাদের জাতীয় চেতনার সূচনা হয়েছে কতকগুলো বাস্তব অবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে। পরিচয় যত ঘনিষ্ঠ হয়েছে, এই চেতনা ততই পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। সর্বশেষে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের

মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়েছে এবং বহু রক্তের বিনিময়ে আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি দৃঢ়তা লাভ করেছে।

জনাব স্পিকার সাহেব, ব্যক্তিগতভাবে এই চেতনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ১৯৫১ সালে। তখন আমি পাঞ্জাব রেজিমেন্ট থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটেলিয়নের অধিনায়করূপে বদলি হয়ে আসি। শুধু বাঙালিদের নিয়ে গঠিত ইতিহাসের এই সর্ব প্রথম নিয়মিত ইনফ্যানট্রি রেজিমেন্টের তখন শৈশব-অবস্থা। আমি প্রথম বাঙালি লেফটেন্যান্ট-কর্নেল এই পল্টনে অধিনায়ক হিসেবে যোগ দিই।

সৈন্যরা সেদিন আনন্দ আর গর্বের সঙ্গে বলাবলি করেছিল, 'আমরা বাঙালি, বাঙালি এসেছে আমাদের অধিনায়ক হয়ে।'

তাদের সেই আনন্দধ্বনি আজও আমার কানে বাজছে। সেইদিন তাদের সেই আনন্দোল্লাসের মধ্যে আমি উপলব্ধি করেছিলাম আমার সত্যিকার পরিচয়। আমি জেনেছিলাম, আমি কে, কী আমার জাতীয়তা, আমি কাদের মধ্যে জন্মলাভ করেছি, কারা আমার আপনজন...।' (গণপরিষদ বিতর্ক: ১৯৭২)

ওসমানীর এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় তিনি যতটা আনন্দিত হয়েছিলেন, প্রায় সব বাঙালিইহয়ত ততটাই আনন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু আনন্দিত হতে পারেননি পাহড়িরা।

ওসমানীর এই বক্তব্যের পর স্পিকার প্রস্তাব আকারে সংসদের সামনে তুলে ধরেন বিষয়টি। তারপর এই প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য রাখেন ডঃ কামাল হোসেন।

জনাব স্পিকার: ...ডঃ কামাল হোসেন, আপনি কি এই প্রস্তাব সমর্থন করেন?

ডঃ কামাল হোসেন: মাননীয় স্পিকার সাহেব, জাতীয়তাবাদ আমাদের রাষ্ট্রের একটা মূলনীতি এবং তারই সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে এই সংশোধনীর মধ্যে। কাজেই আমি মনে করি এই সংশোধনী গ্রহণ করা উচিত।

সেই সময়ের শিল্পমন্ত্রী ও গণপরিষদের উপনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তিনি তার বক্তবে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার পরিষদ ত্যাগ করার অযৌক্তিকতার কথা তুলে ধরেন। তুলে ধরেন সবাই যে বাঙালি- তার সপক্ষে যুক্তি।

* সৈয়দ নজরুল ইসলাম (শিল্প মন্ত্রী; পরিষদের উপ-নেতা): মাননীয় স্পিকার সাহেব, এই পরিষদের সামনে এই সংশোধনী গ্রহণযোগ্য কিনা এবং গ্রহণ করা হবে কিনা, সে প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য বলার প্রয়োজন হত না যদি না আজকে এমন একটা ঘটনা ঘটত, যার জন্য কিছু বলার প্রয়োজন আছে। যেখানে মাননীয় আইনমন্ত্রী এই সংশোধনী গ্রহণ করেছেন, সেজন্য আমি আশা করি মাননীয় সদস্য জেনারেল ওসমানীর প্রস্তাবটি গৃহীত হবে।

কিন্তু আমি পরিষদের তরফ থেকে দাঁড়িয়েছি। কারণ, আমাদের একজন মাননীয় সদস্য বাবু শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আজকে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই পরিষদ ত্যাগ করে চলে গেছেন। এর চেয়ে মর্মান্তিক, এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা এই পরিষদে আর ঘটে নাই। যেহেতু এর উপলক্ষ এই প্রস্তাবের সারমর্ম, সেইহেতু আমি এই প্রস্তাবের ওপর দু-একটা কথা বলতে চাই।

যে সংশোধনীর ওপর তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেছেন, সেটা গৃহীত হয়েছে। অতএব, তার ওপর আমার কোনো বক্তব্য পেশ করার অবকাশ নাই। আমরা জাতি হিসাবে বাঙালি। তার সঙ্গে জেনারেল ওসমানী সাহেবের সংশোধনীর একটা ভাবগত মিল আছে বলে আমি মাননীয় সদস্য বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যাঁদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁরা যাতে ভুল না করেন, সেজন্য দাঁড়িয়েছি।

বাঙালি হিসাবে পরিচয় দিতে রাজি না হয়ে বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেন। আমরা শুধু পরিষদ সদস্যবৃন্দই নই- আমি মনে করি, সারা বাঙালি জাতি এতে মর্মাহত হয়েছে। আমি এটা না বললে পাছে ভুল বোঝাবুঝি হয়, সেজন্য আমি দাঁড়িয়েছি।

সেজন্য বলতে চাই, তিনি যাঁদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁদের প্রস্তাব উত্থাপন না করে, বাঙালি পরিচয়ের প্রতিবাদে যাঁদের নাম করে এই পরিষদ কক্ষ পরিত্যাগ করে চলে গেছেন, তাঁরা বাঙালি জাতির অঙ্গ। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ৫ লক্ষ উপজাতি রয়েছে, তাঁরা বাঙালি। তাঁরা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অঙ্গ বলে আমরা মনে করি।

বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি বাংলা বলতে দ্বিধাবোধ করেন না। এ কথা স্বীকার করার পরেও কেন তিনি চলে গেলেন, তা যদি তিনি বলতেন, তাহলে আমি এই পরিষদে তার জবাব দিতে পারতাম। তাঁর অনুপস্থিতিতে বলছি বলে এ কথা আমাকে বলতে হচ্ছে।

ঐ পার্বত্য চট্টগ্রামে যারা অধিবাসী, তারা এই স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই অঙ্গ। বিশেষ করে কালকে আমাদের আইনমন্ত্রী বলেছেন যে, তাঁদের প্রতি দীর্ঘকাল যাবৎ তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের সংসদীয় আইনের আওতা এবং বাইরের সভ্য জগতের আইনের

আওতার বাইরে রেখে বিচ্ছিন্ন মনোভাবের সুযোগ বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীরা দিয়েছিলো। আমরা তা চাই না, আমরা চাই পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিকরা সারা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকের সমমর্যাদা সম্পন্ন হবে। তা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৫ লক্ষ অধিবাসী বাঙালি জাতির গর্ব হিসাবে থাকবে। শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনুন্নত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম। যদি কেউ মনে করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের যে অনুন্নত অবস্থা, তার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বাংলার অন্যান্য এলাকা অধিক অনুন্নত তাহলে তাঁর স্মরণ রাখা উচিত যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম দরিদ্র দেশ এবং বাংলাদেশে শিক্ষার হার কম। যে দেশের শিক্ষার হার কম, যে দেশ স্বভাবতই অনুন্নত হয়ে থাকে। এই অনুন্নতিই সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। ত্রিশ লক্ষ বাঙালি প্রাণ দিয়েছে সেই অধিকারের সংগ্রামে এবং সেই সংগ্রামের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যে একাত্মতা অনুভব করে নাই, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি, বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আজকে যে উদ্দেশ্যে পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেছেন, তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের জন্য তিনি সেটা করতে পারেন নাই- যদিও তিনি গর্ব করে বলে থাকেন, আমি বাঙালি। আমি বলব, যাদের ভোটে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের সহযোগিতা থেকে এ হাউসবঞ্চিত হয়েছে।

আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের উদ্দেশে বলতে চাই, তাদের জন্য সংবিধানে যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তাতে তাদের প্রতিটি লোকের ধর্ম, নিজস্ব আচারের যথেষ্ট সুযোগ থাকবে। সামগ্রিকভাবে আমরা বাঙালি জাতি এবং বাঙালি জাতি হিসাবে

আমরা হচ্ছি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্যবদ্ধ শক্তি- যার বলে আমরা বাঙালি জাতি প্রতিষ্ঠা করেছি।

আমি আশা করি, এই ঐক্য, এই জাতীয়দাবাদ বিনষ্ট করার জন্য কেউ প্রচেষ্টা চালাবেন না। যদি চালান, তাহলে সারা জাতির অন্তরে ব্যথা দেওয়া হবে। এবং ব্যথা দিয়ে কেউ হয়তো দেশের অমঙ্গলের চেষ্টা করতে পারবেন। এতে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই আসতে পারে না।

বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এখন যেখানেই থাকুন না কেন, আমি তাঁকে আপনার মাধ্যমে আশ্বাস দিতে পারি, তাঁর বক্তব্য পেশ করার, তাঁর সংশোধনী দেওয়ার, সব কিছুর বলার অধিকার আছে। কিন্তু 'বাঙালি' বলে পরিচয় দেওয়ার প্রতিবাদে তিনি যদি কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান, তাহলে তিনি শুধু এই পরিষদেরই নয়- তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের মধ্যে একটা জাতি সম্বন্ধে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করবেন এবং সমগ্র বাঙালি জাতির মনে ব্যথা দেবেন। সেজন্যই আমি দাঁড়িয়েছি।

তাঁর কাছে আমার অনুরোধ, তিনি পরিষদে এসে তাঁর দায়িত্ব পালন করুন। পরিষদে এসে এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহান প্রস্তাবকে সফল করে তুলুন। আমি আশা করব যে, বাঙালি হিসাবে তিনি তাঁর নিজস্ব অঞ্চল ও নিজের পরিচয় দেয়ার সুযোগ গ্রহণ করবেন।

এই বলেই আমি শেষ করছি। (গণপরিষদ বিতর্ক: ১৯৭২)

সৈয়দ নজরুল ইসলামের এই দীর্ঘ বক্তব্যের পর স্পিকার প্রস্তাবটি তুলে ধরেন। 'হ্যাঁ' 'না' ভোটে পাস হয়ে প্রস্তাবটি বিল হিসেবে স্থান করে নিল সংবিধানে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণপরিষদের এই বৈঠকে পাস হওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদের সপক্ষে হাজারো যুক্তি দাঁড় করানো যাবে। '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই হয়েছিল বিষয়েও হয়ত কোনো ভুল নেই। কিন্তু পাহাড়িরা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাদের বাস, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীতে যারা বিভক্ত, তারা সহজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি, এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ- তাদের কাছে মনে হয়েছিল, এই বিলের মাধ্যমে তাদের জাতিগত কৃষ্টি-সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে গেল। চরম মর্মাহত হলেন তারা। কারণ পাহাড়িরা বাঙালি বলতে 'বাঙালি মুসলমান' বুঝতো। তাদেরকেও 'বাঙালি মুসলমান' হতে হবে- এমন একটি মানসিকতাও হয়ত তাদের ভেতরে কাজ করেছিল। তাদের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ফিরে গেলেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। সংগঠিত করতে শুরু করলেন পাহ- াড়িদের। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী হয়ে উঠল একটি জনগোষ্ঠী। যার নেতৃত্বে ছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা। আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রক্রিয়া, তারা বাংলাদেশ স্বাধীনের আগে থেকেই শুরু করেছিলেন। তবে এই সময়ে এসে তারা বুঝতে পারেন সহজ পথে, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তাদের দাবি, অধিকার আদায় হবে না।

যদিও গণপরিষদের এই অধিবেশনের আগে থেকেই পাহাড়িরা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের দাবির বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি চারুবিকাশ চাকমার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল তাদের দাবি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে আসেন।

'বঙ্গবন্ধু তাদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, সরকারি চাকরিতে উপজাতীয়দের নায্য অংশপ্রদান করা হবে। উপজাতীয়দের ঐতিহ্য কৃষ্টি পুরোপুরিভাবে সংরক্ষণ করা হবে। উপজাতীয়রা

 তাদের ভূমির অধিকার পূর্বের মতোই ভোগ করতে পারবেন।' (জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ)

আরেক দল পাহাড়ি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন মং রাজা মং প্রু সাইন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, কে কে রায়, বিনীতা রায়, সুবিমল দেওয়ান জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা ছিলেন এই প্রতিনিধি দলে। বঙ্গবন্ধু তাদের সঙ্গে দেখা করেননি। দেখা না পেয়ে চার দফা দাবিনামা রেখে হতাশ হয়ে তারা ফিরে যান পার্বত্য চট্টগ্রামে। পূর্বে দেয়া বঙ্গবন্ধুর আশ্বাসের ওপর তারা আস্থা রাখতে পারেননি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর সূচনাতেই পাহাড়িরা তাদের অধিকার পেতে চাইছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকারের আচরণে তারা হচ্ছিলেন মর্মাহত। তারপরও হাল ছাড়লেন না। সেই সময় বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজ চলছিল। পাহাড়ি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল সেই চার দফা দাবিনামার সঙ্গে আরো কিছু দাবি সংযোজন করে পেশ করলেন খসড়া সংবিধান প্রণেতাদের কাছে। সেই দাবিগুলোর মধ্যে ছিল:

. পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং এর একটি নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।

. পার্বত্য আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্যে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ন্যায় অনুরূপ সংবিধি ব্যবস্থা সংবিধানে থাকবে।

. পার্বত্য আদিবাসী রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ করা হবে।

. পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কোনো শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয় এরূপ সংবিধি ব্যবস্থা সংবিধানে থাকতে হবে।

(জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা : ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ)

দাবির তালিকায় আরো কিছু বিষয় ছিল। তবে প্রধান এগুলোই। খসড়া সংবিধান প্রণেতারা দাবির কোনো বিষয়ই তাদের আমলে আনেননি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা দাবিগুলো নিয়ে দেখা করেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। কিন্তু এই দাবিগুলোকে বঙ্গবন্ধুও কোনো পাত্তাই দিলেন না। তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে ধমক দিয়ে বলেন, 'যা তোরা বাঙালি হইয়া যা'

এই কথা বলতে বলতে বঙ্গবন্ধু উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তুড়ি মারতে মারতে বঙ্গবন্ধু, এক লাখ, দুই লাখ, ... দশ লাখ পর্যন্ত গুনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বলেন, 'প্রয়োজনে দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দেব। তোরা সংখ্যায় পাঁচ লাখ। প্রয়োজনে এর দ্বিগুণ বাঙালি ঢুকিয়ে দেব পার্বত্য চট্টগ্রামে। তখন কী করবি?'

(লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সন্তু লারমা)

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দাবিগুলো বিশ্লেষণ করলে হয়ত এমন কিছু বিষয় পাওয়া যাবে যেগুলো বঙ্গবন্ধু সরকারে পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তাই বঙ্গবন্ধুর সরকারকে দাবি না মানার বিষয়টি নিয়ে হয়ত খুব বেশি দোষ দেয়া যাবে না। কিন্তু আচরণ? যে আচরণ করা হলো পাহাড়িদের সঙ্গে, এর ব্যাখ্যা কী? হুমকি তো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। 'বাঙালি হয়ে যা' বা 'বাঙালি ঢুকিয়ে দেয়া'-এগুলো কোন গণতন্ত্রের ভাষা? বঙ্গবন্ধু কেন বুঝতে পারলেন না, হুমকি দিয়ে পাকিস্তান তাকে, তার বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি, তিনি কীভাবে অন্য একটি নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে 'ধমক'

দিয়ে দাবিয়ে রাখবেন? ধমক দিয়ে দাবিয়ে যে রাখা যায় না, বঙ্গবন্ধু নিজেই ছিলেন তার বড় প্রমাণ। তারপরও তিনি এই ভুল প্রক্রিয়াটিতে এগিয়েছিলেন। যার খেসারত বাংলাদেশকে দিতে হচ্ছে এখনো। জেনারেল জিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের ওপর নির্যাতন করেছেন অমানবিকভাবে। তার সময়েই জ্বালাও-পোড়াও হত্যা ধর্ষণ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এই কর্মটি করেছে সেনাবাহিনী। সমতল ভূমি থেকে বাঙালিদের নিয়ে গিয়ে দখল করিয়েছে পাহাড়িদের জায়গা- জমি। সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে, তারপর আর ফিরে আসেনি-এমন পাহাড়ি নারী-পুরুষ-যুবকের সংখ্যা অসংখ্য। এরমধ্যে পাহাড়ি মেয়ের সংখ্যাই ছিল বেশি।

জেনারেল এরশাদ শান্তিবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার পূর্বসূরি জিয়াউর রহমানের প্রক্রিয়াটি অব্যাহতই রেখেছিলেন। এরপর খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে আলোচনা অব্যাহত থেকেছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর নির্যাতন কমেনি পাহাড়িদের ওপর। কল্পনা চাকমারা তখনো হারিয়ে গেছেন। এরপর শেখ হাসিনার সময়ে এসে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু চুক্তির আগে সেনাবাহিনীর তৎপরতা অব্যাহতই ছিল, পাহাড়িদের মতে এখনো আছে। জিয়া-এরশাদ-খালেদা, যার যত দোষই থাকুক না কেন, বঙ্গবন্ধুর কিছু কথা এবং আচারণই যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিদ্রোহের নিয়ামক ছিল, একথা কোনো অবস্থাতেই অস্বীকার করা যাবে না।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা একজন আধুনিক শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। ছিলেন শিক্ষক আইনবিদ। এই আধুনিক মানুষটি সংবিধানে চেয়েছিলেন ১৯০০ সালের বিধান, 'রাজা' দপ্তর। বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক আছে। বিতর্ক থাকবে। আলোচনার বিষয় সেটা নয়। এখানে আলোচনার বিষয় পাহাড়িদের সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের আচরণ। পাহাড়িদের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারত, কোনটা মানা যায় আর কোনটা মানা যায় না সেটা

নিয়ে হতে পারত বিতর্ক। কিন্তু এসবের কিছুই না করে তাদের বলে দেয়া হলো 'বাঙালি হয়ে যা'

একজন চাকমা বা মারমা কীভাবে বাঙালি হয়ে যাবে?

আমাদের বুদ্ধিজীবীরা বাঙালি-বাংলাদেশি, জাতীয়তাবাদের ওপর প্রবন্ধ লিখে কমপক্ষে কয়েকটন কাগজ নষ্ট করেছেন। নিজেদের স্বার্থে, কেউ আওয়ামী লীগের কেউ বিএনপি' থেকে, সুযোগ সুবিধা নেয়ার জন্যে অনাবশ্যক বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন। উপজাতীয় বা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা ছাড়া যারা আওয়ামী লীগ করে তারাও যেমন বাঙালি, বিএনপি যারা করে তারাও যে বাঙালি এই বিষয়টি আমাদের কোনো বুদ্ধিজীবীই সহজ-সরলভাবে পরিস্কার করেননি। তারা নৃতাত্ত্বিক বিষয়গুলো টেনে এনে যতটা পারা যায় জটিল করেছেন। একটি সহজ বিষয়কে জটিল করে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কোনো জুরি নেই। একজন চাকমা বা মারমা কীভাবে বাঙালি হবেন, এই নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তারা দেন না, বা দিতে পারেন না। বাঙলি-বাংলাদেশি বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন দেশের একটি অঞ্চলের মানুষ বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন, আর আমাদের বুদ্ধিজীবীরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমালেন। তারা এই বিদ্রোহী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মনোভাব কোনোদিন বুঝলেন না, বুঝতে চেষ্টা করলেন না। স্বাধীনতার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে সেনাশাসন। এই সেনা শাসকরা কিছুদিন পরপর তাদের হেলিকপ্টারে করে 'ছাপোষা' কিছু বুদ্ধিজীবীকে (যার মধ্যে সাংবাদিকও আছেন) নিয়ে যেতেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। হেলিকপ্টার থেকে দেখাতেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য। দেখে মুগ্ধ হতেন বুদ্ধিজীবীরা। সেনাবাহিনীর আপ্যায়ন তাদের আরো মুগ্ধ করতো। তারপর 'ঘুরে এলাম' বা 'ফিরে এলাম' বিষয়ক কিছু কলাম লিখতেন পত্রিকায়। মানুষ

 যেহেতু জানতেন না সেখানে কী ঘটছে, তাই বুদ্ধিজীবীদের কথাই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তারা যা দেখে আসতেন, তা যে লিখতেন না-সেটা এখন পরিষ্কার হচ্ছে মানুষের কাছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল 'উত্তপ্ত', বুদ্ধিজীবীরা ফিরে এসে লিখতেন 'শান্ত' তারা সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন, কিন্তু সেনাবাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নের কথা জানাতেন না দেশবাসীকে। প্রতিনিয়ত সেনাসদস্যরা যে নিহত হচ্ছেন সেটাও তাদের লেখায় থাকতো না। বাংলাদেশে ভারতীয় বিদ্রোহীদের অবস্থানের বিষয়টিও অনুপস্থিত থাকতো তাদের লেখায়। এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা হেলিকপ্টারে ঘুরতে পেরেই খুশি। বাঙালি জাতি পদে পদে সংগ্রাম করে স্বাধীন হয়েছে। যখনি তার জাতিগত অস্তিত্বের বিরুদ্ধে হুমকি এসেছে, গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ। অধিকার আদায় করেছে রক্ত দিয়ে। তাই অন্যের অধিকার, আত্মসম্মানবোধ, সংস্কৃতি-কৃষ্টির প্রতি বাঙালির অন্যরকম একটা সহানুভূতি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা ছিলেন, তাদের আচরণ ছিল কিছু কিছু ক্ষেত্রে (বিশেষ করে পাহাড়িদের ক্ষেত্রে) পাকিস্তানিদের মতো। স্বাধীনের আগে পাকিস্তানিরা যেমন আচরণ করতো বাঙালিদের সঙ্গে, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারও পাহাড়িদের সঙ্গে তেমন আচরণই করেছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অবশ্যই বাংলাদেশের অংশ। এবং দেশের এই অংশে বাঙালিরা অবাধে যাতায়াত করবেন নিয়ে কোনো সংশয় থাকতে পারে না। তারপরও স্বাধীনতার পর এই অঞ্চলে বাঙালিদের অবাধে যাতায়াতের ব্যাপারে পাহাড়িরা প্রশ্ন তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মতো রাষ্ট্রনায়ক সেই সমস্যা সমাধান করতে পারতেন অন্যভাবে, দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে নয়। বঙ্গবন্ধুর এই হুমকিতে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী। তাদের এই বিক্ষুব্ধ মনের পরিচয় পাওয়া গেল ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুটি আসনেই পরাজিত হলো আওয়ামী

লীগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম- আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। যোগ দিলেন জাতীয় সংসদে। ১৯৭৩ সালের সংসদে দাঁড়িয়ে আবেগময় ভাষণ দিলেন তিনি:

... যে অঞ্চল থেকে আমি এসেছি, সে অঞ্চল বাংলাদেশের একটা পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। আপনারা বিশ্বাস করতে পারবেন না যে, আমাদের ওখানে এখনো আদিম যুগের মানুষ রয়েছে।... সেই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য এই বাজেটে তেমন কোনো অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি।... পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি পিছনে পড়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের স্বাভাবিক যে উন্নতি, তা ব্যাহত হবে।... দুঃখের ব্যাপার, বর্তমান যুগের শিক্ষা কিংবা উন্নতির কোনো আলোই আমরা আজও পাইনি। মাননীয় স্পিকার সাহেব, ব্রিটিশের সময়ে এবং পাকিস্তানের আমলে আমাদেরকে চিড়িয়াখানার জীবের মত করে রাখা হয়েছিল।' (সংসদ বিতর্ক: ২৩ জুন ১৯৭৩)

স্বাধীন বাংলাদেশের বাজেটে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য কোনো খাত রাখা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়িরা এতে চরম হতাশ বিরক্ত হয়। পাহাড়িরা দেখে পাকিস্তান আমলের মতো বাংলাদেশ আমলেও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। ভেতরে ভেতরে তো তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছিলই, বাজেটে কোনো অর্থ বরাদ্দ না রাখায়- সংগ্রামের সংকল্প আরো দৃঢ় হলো।

১৯৭৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই বাঙালি ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকির বাস্তবায়ন শুরু করলেন জিয়াউর রহমান। হাজার হাজার বাঙালিকে নিয়ে বসালেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই বাঙালিদের দখল করিয়ে দেয়া হলো পাহাড়িদের জায়গা-জমি-বাড়ি।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধন করলেন। বাঙালি নয় বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেয়ার ব্যবস্থা করলেন বাংলাদেশের নাগরিকদের। জেনারেল জিয়ার আবার নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতেই অনীহা ছিল। আসলে আওয়ামী লীগের বিপরীতে কিছু একটা দাঁড় করানোই ছিল জেনারেল জিয়ার উদ্দেশ্য। জিয়াউর রহমানের এই কার্যক্রম পাহাড়িদের- মনে কোনো প্রতিক্রিয়া ফেলল না। এটা যে সামরিক সরকারের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার চক্রান্তেরই একটি অংশ সেটা বুঝতে ভুল হলো না পাহাড়িদের। আর এতদিনে এই বিতর্কের বিষয়ের স্থানে পাহাড়িদের মনে স্থান পেয়েছে স্বাধীন 'জুমল্যান্ডের' স্বপ্ন।

এই অধ্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশ আমলে পাহাড়িদের সশস্ত্র সংগ্রামের পটভূমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে, পাকিস্তান আমল বা ব্রিটিশ আমলেও তারা ছিল চরম নির্যাতনের শিকার।

[শান্তিবাহিনী গেরিলা জীবন বই থেকে নেওয়া]

বুধবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৪

কেন আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসন?


বাংলাদেশ খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির
নিকট
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের শাসনতান্ত্রিক অধিকার দাবীর-
আবেদন পত্র
গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভাবী শাসনতন্ত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনতান্ত্রিক অধিকার যাতে গৃহীত হয় তজ্জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি প্রতিনিধিদল গতই ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ ইংরেজী তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিকট একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ এই স্মারকলিপিখানি মনে প্রাণে সমর্থন করি এবং গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভাবী শাসনতন্ত্রে "নবজীবনের" প্রতীক্ষায় রয়েছি। স্মারকলিপিতে নিম্নলিখিত "চারিটি বিষয়" উত্থাপন করা হয়েছে:-
১। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল হবে এবং ইহার একটি নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
২। উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য "১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির" ন্যায় অনুরূপ সংবিধি ব্যাবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে।
৩। উপজাতীয় রাজাগণের দফতর সংরক্ষণ করা হবে।
৪। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কোন শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয়, এরূপ সংবিধি ব্যাবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে।
স্মারকলিপিতে বর্ণিত "চারিটি বিষয়" যে আমাদের ন্যায় সঙ্গত দাবী, তজ্জন্য আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। এক কথায় বলতে গেলে "চারিটি বিষয়" হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জাতীয় অস্তিত্বের চাবিকাঠি। নিজস্ব আইন পরিষদ সহ একটি স্বায়ত্ত্ব শাসিত অঞ্চলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পরিণত করার জন্য আমরা আমাদের দাবী উত্থাপন করেছি। বছরকে বছর ধরে ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ আমলের দিন থেকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ধ্বংসের দিন পর্যন্ত আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীরা খুবই দুর্বিসহ জীবন যাপন করেছি; যার ফলে আমাদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেছে এবং আমাদের জাতীয় উন্নতি ব্যাহত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামএকটি পৃথক শাসিত অঞ্চল (Excluded Area)। কিন্তু ভাগ্যের এমন নির্মম পরিহাস যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশে "উপজাতীয় জনগণের আবাসভূমি" হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল তথাপি বাস্তবে ইহা মিথ্যা এবং প্রহসন ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।
বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামরে একটি পৃথক শাসিত অঞ্চলরূপে রাখার জন্য শাসনের সুবিধার্থে আইন প্রয়োগের জন্য ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার "১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি" ঘোষণা করেন। এই শাসনবিধি পুরোপুরি ত্রুটি পূর্ণ। এই শাসন বিধি একটি অগণতান্ত্রিক শাসনবিধি। এই শাসনবিধিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রতিনিধিদের কোন বিধি ব্যাবস্থা গৃহীত হয়নি। বাংলাদেশের গর্ভপরের হাতে সকল ক্ষমতা ন্যাস্ত করা হয়েছে এই শাসনবিধি দ্বারা। গর্ভণর খুবই ক্ষমতাশালী। তিনি যেকোন সময়ে যখন মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সুশাসন ও শান্তির পক্ষে ইহা প্রয়োজন, উপযোগী এবং উপযুক্ত, তখন তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে আইন প্রয়োগ করেন, নতুন রুলস ও রেগুলেশন প্রনয়ণ করেন। তিনি এতই শক্তিশালী যে স্বেচ্চারমূলকভাবে তিনি অনেক কিছু করতে পারেন। তিনি কোনও আইন পরিষদের নিকট জবাবদেহি হতে বাধ্য নন। গর্ভপর হলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন পরিষদ। গর্ভণর আইন প্রনয়ণ করেন এবং তার জেলা প্রশাসন ইহা কার্যকরী করেন। ফলে পৃথক শাসিত অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন ব্যাবস্থা অর্থহীন হয়ে পড়ে। সর্বক্ষেত্রে আগের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ পিছিয়ে পড়ে থাকলো।
ব্রিটিশ সরকার আমাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের হতভাগ্য জনগণকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিবার জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি অদ্ভুত অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবর্তন করে। জনগণ গর্ভণর ও তার প্রশাসনের দয়ার উপর নির্ভর করে বাস করতে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে বঞ্চিত করে ব্রিটিশ সরকার বাইরের মানুষকে প্রশাসন বিভাগে নিয়োগ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন কার্য চালিয়ে যাবার ব্যাবস্থা করে এবং এইভাবে কালক্রমে বহিরাগতদের প্রভাব জেলা প্রশাসনে প্রাধান্য লাভ করে। ব্যাবসা-বানিজ্যের কেন্দ্র অর্থাৎ বাজার, নদী বন্দর প্রভৃতি সমস্ত ব্যবসায়ী কেন্দ্র সমূহ বহিরাগতদের হাতে চলে যায়। এই রূপে রাজনৈতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ জেলা প্রশাসন থেকে চ্যুত হয় এবং দুরে সরে পড়ে থাকতে বাধ্য হয়, অর্থনৈতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ বহিরাগত ব্যবসায়ীদের শোষণের শিকারে পরিণত হয়। ব্রিটিশ সরকারের ন্যায় পাকিস্তান সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রামের হতভাগ্য জনগণকে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে আসেনি। বরং পক্ষান্তরে স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসিত অঞ্চলের সত্বাকে চিরতরে লুপ্ত করে দিবার পথ প্রশস্ত করে দেয়। অন্যায় অবিচার সমগ্র জেলায় চরম নৈরাশ্য ও ভীতির রাজত্ব সৃষ্টি করে। কাপ্তাই বাঁধের ফলে ৯৯ হাজার ৯ শত ৭৭ জন মানুষ ১৯৬০ সালে গৃহহারা, জমিহারা হয়ে যায়। সরকার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও উপযুক্ত পূর্ণবাসনের কোন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত করেনি। স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মতামত যাচাই না করে ১৯৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসিত অঞ্চলের সত্বাকে চিরতরে ঘুচিয়ে দিবার জন্য পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একটি শাসনতান্ত্রিক সংশোধনী প্রস্তাব পাশ করিয়ে নেয়। স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারের অগণতান্ত্রিক এবং নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ প্রতিবাদ করতে পারেনি। সুতরাং শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হয়ে জন্মভূমি চিরতরে ত্যাগ করে প্রায় পঞ্চাশ হাজার নরনারী ১৯৬৪ সালে ভারতে আশ্রয় পাবার আশায় সীমান্ত পাড়ি দেয়।
বেআইনী অনুপ্রবেশ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনসংখ্যা ছিল ৯৪.৪৭% অমুসলমান ২.৫৯% এবং মুসলমান ২.৯৪%। মুসলমান ও অমুসলমান জনসংখ্যার কিছু অংশ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিম বাসিন্দা আর বাদবাকী অংশ ছিল বাইরে থেকে আগত ব্যবসায়ী ও সরকারী কর্মচারীবৃন্দ। কিন্তু গত চব্বিশ বছরে বহিরাগতদের সংখ্যা অসম্ভব রকমভাবে বেড়ে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ বারবার পাকিস্তান সরকারকে এই বেআইনী অনুপ্রবেশ বন্ধ করে দিবার জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করে। বহিরাগতদের দ্বারা বেআইনী জমি বন্দোবস্তী ও বেআইনী জমি বেদখল তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। "১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি" অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনও রকমের বন্দোবস্তী বহিরাগতদের জন্য নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গর্ভণর এবং তার জেলা প্রশাসন এই শাসনবিধিকে কার্যকরী করেনি। পক্ষান্তরে গর্ভণর ও তার জেলা প্রশাসক বহিরাগতদেরকে বেআইনী জমি বন্দোবস্তী ও বেআইনী জমি বেদখলের পথ নীরবে প্রশস্থ করেছে। "১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি" বেআইনী অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারেনি, পারেনি বেআইনী জমি বন্দোবস্তী ও বেআইনী জমি বেদখল বন্ধ করে দিতে। এই শাসনবিধি অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসিত অঞ্চলের স্বত্বা জনগণের মুগ যুগ ধরে পিছিয়ে পড়ে থাকার অবস্থার কোন পরিবর্তন এনে দিতে পারেনি। কালক্রমে এই পৃথক শাসিত অঞ্চলের স্বত্বা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের নিকট অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।
জনগণের অধিকার সংরক্ষণের ব্যপারে পৃথক শাসিত অঞ্চলের সত্বা যথেষ্ট নয়। ইহা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জাতীয় অস্তিত্বের নিরাপত্তাবোধ এনে দিতে পারেনি। গণতান্ত্রিকশাসন ব্যবস্থা ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ করা যাবেনা। এই জন্যই আমরা "চারিটি বিষয়" উত্থাপন করে নিজস্ব আইন পরিষদ সম্বলিত একটি আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসনের দাবী তুলে ধরেছি। সুতরাং-
ক) আমরা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সত্ত্বেও পৃথক অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পেতে চাই।
খ) আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অধিকার থাকবে, এরকম শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন চাই।
গ) আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষিত হবে এমন শাসন ব্যবস্থা আমরা পেতে চাই।
ঘ) আমাদের জমি স্বত্বা জুম চাষের জমি ও কর্ষণযোগ্য সমতল জমির স্বত্বা সংরক্ষিত হয় এমন শাসন ব্যবস্থা আমরা পেতে চাই।
ঙ) বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে যেন কোন বসতি স্থাপন করতে না পারে তজ্জন্য শাসনতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার প্রবর্তন চাই।
আমাদের দাবী ন্যায় সঙ্গত দাবী। বছরকে বছর ধরে ইহা একটি অবহেলিত শাসিত অঞ্চল ছিল। এখন আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পার্বত্য চট্টগ্রামকে গণতান্ত্রিক পৃথক শাসিত অঞ্চল অর্থাৎ আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসিত অঞ্চলে বাস্তবে পেতে চাই। ভারত তার বিভিন্ন জাতিসমূহের সমস্যাসমূহ সমাধান করেছেন। ভারতের জাতিসমূহ-বড় বা ছোট সকলে শাসনতান্ত্রিক অধিকার পাচ্ছে । ভারতের জাতি সমূহ ক্রমান্বয়ে ইউনিয়ন টেরিটরি এবং রাজ্য পর্যায়ের মর্যাদার অধিকারী হতে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নও তার জাতি সমূহের সমস্যার সমাধান করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সকল জাতি সমূহকে শাসনতান্ত্রিক মর্যাদা দিয়েছে এবং গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে ইউনিয়ন রিপাবলিক, স্বশাসিত রিপাবলিক, স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল ও জাতীয় অঞ্চলে বিভক্ত করে জাতি সমূহের সমস্যার সমাধান করেছে। পাকিস্তান সরকার আমাদিগকে নির্মমভাবে নিপীড়ন করেছে। গত চব্বিশ বছর আমরা সকল মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা অর্থাৎ প্রত্যেক বিষয়ে আমরা আগের মতো পিছিয়ে পড়ে রয়েছি। এখনও আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার মানুষ অর্ধ নগ্ন পরিবেশে বাস করছে, এখনও হাজার হাজার মানুষ আদিম যুগের পরিবেশে বাস করছে। এখন নিপীড়নকারী, স্বৈরচারী পাকিস্তান সরকারের দিন আর নেই। আমরা স্বৈরচারী মানুষ আদিম যুগের পরিবেশে বাস করছে। এখন নিপীড়নকারী, স্বৈরচারী পাকিস্তান সরকারের দিন আর নেই। আমরা স্বৈরচারী পাকিস্তান সরকারের সর্বরকমের নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়েছি। আমাদের বাংলাদেশ এখন মুক্ত। উপনিবেশিক শাসনের জোয়াল ভেঙে গেছে। এখন আমাদের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ চারিটি মূলনীতি-গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে উর্দ্ধে তুলেধরে উজ্জল ভবিষ্যত নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণও বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের ভাই বোনদের সাথে একযোগে এগিয়ে যেতে চাই। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ মনে করে এবং বিশ্বাস করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের যুগযুগান্তের অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ভুলে দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জাতীয় অস্তিত্বের সংরক্ষণের অধিকার দেবেন।
জয় বাংলা।


                                                                                                            মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা
তারিখ-রাঙ্গামাটি,                                                              গণ পরিষদ সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
২৪শে এপ্রিল, ১৯৭২ সন।                                                                                এবং
                                                                                                                  আহ্বাবায়ক,
                                                                                            পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি।

সংগৃহীত

মেগা প্রকল্প নয়, আগে ন্যায্যতা- ইনজেব চাঙমা

  গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের...