শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬

বর্ণমালার নামে আত্মপ্রবঞ্চনা: জুম্ম রাজনীতির ব্যর্থতার নগ্ন সত্য- ইনজেব চাঙমা

চাঙমা পত্রিকা “হিলর পচ্জন”
জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ যে গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে—তা বোঝার জন্য বিশেষ কোনো দূরদর্শিতা প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু নিজের দিকে সৎভাবে তাকানোর সাহস। আজ জুম্ম সমাজ গর্ব করতে ভালোবাসে। বুক ফুলিয়ে বলে— “আমাদের বর্ণমালা আছে, আমাদের সংস্কৃতি আছে, আমাদের ঐতিহ্য আছে।” কিন্তু এই উচ্চকণ্ঠ গর্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতা।

প্রশ্ন একটাই—এই বর্ণমালার বাস্তব মালিক কারা? সমাজের কতজন মানুষ তা পড়তে, লিখতে কিংবা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করতে পারেন? যদি সংখ্যাটা নগণ্য হয়, তবে এই গর্ব আসলে কিসের? এটি কি আত্মপরিচয়ের প্রকাশ, নাকি আত্মপ্রবঞ্চনার রাজনীতি?

ভাষা ও বর্ণমালা কোনো অলংকার নয়, যা শ্লোগানে ঝুলিয়ে রাখা যায়। এগুলো ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। যে জাতি নিজের ভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, নিজের বর্ণমালাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না—সে জাতি মূলত ক্ষমতাহীন। জুম্ম সমাজ আজ সেই ক্ষমতাহীনতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে।


সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা হলো—মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা। এটি কোনো সাংস্কৃতিক দুর্বলতা নয়, এটি সরাসরি রাজনৈতিক অক্ষমতা। নেতৃত্ব, সংগঠন ও আন্দোলনের ব্যর্থতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়ে গেল, কিন্তু শিশুদের জন্য নিজেদের ভাষায় পাঠ্যবই, শিক্ষক, পাঠক্রম গড়ে তোলার মতো ন্যূনতম রাজনৈতিক চাপও সৃষ্টি করা গেল না। অথচ মঞ্চে উঠে সংস্কৃতির কথা বলতে আমরা ক্লান্ত হই না।

আজ জুম্ম শিশু অন্য ভাষায় স্বপ্ন দেখতে শেখে, অন্য বর্ণমালায় নিজের নাম লিখতে শেখে। রাষ্ট্র তাকে সেই ভাষাই শেখাচ্ছে—যা তার নয়। আর আমরা নির্বিকার দর্শকের মতো তাকিয়ে থাকি। পরে আবার সভা-সেমিনারে দাঁড়িয়ে বলি— “আমাদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে।” ভাষা হারায় না; ভাষাকে হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়।


এখানে দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়—জুম্ম রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও। যারা বছরের পর বছর অধিকার রাজনীতির কথা বলে, তারা কি একবারও ভাষা ও বর্ণমালাকে আন্দোলনের কেন্দ্রে এনেছে? নাকি এটি শুধু আবেগি বক্তৃতার উপকরণ হয়েই থেকে গেছে? সংস্কৃতি রক্ষা যদি কেবল উৎসব আর পোস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা রাজনীতি নয়—তা লোকদেখানো নাটক।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই আত্মপ্রবঞ্চনাকেই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা তাদের শিখাচ্ছি গর্ব করতে, কিন্তু শিখাচ্ছি না লড়তে। শিখাচ্ছি অতীত স্মরণ করতে, কিন্তু শিখাচ্ছি না বর্তমান বদলাতে।


সোজা কথা—যে সমাজ নিজের বর্ণমালাকে শিক্ষার ভাষা করতে পারে না, সে সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবেই। গর্ব দিয়ে সেই অন্ধকার ঢেকে রাখা যায় না। এখন সময় এসেছে কঠিন প্রশ্ন তোলার—আমরা কি সত্যিই আমাদের বর্ণমালা চাই, নাকি শুধু তার নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও সামাজিক দায় এড়াতে চাই?

এই প্রশ্নের উত্তর না বদলালে, জুম্ম ভবিষ্যৎ বদলাবে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বর্ণমালার নামে আত্মপ্রবঞ্চনা: জুম্ম রাজনীতির ব্যর্থতার নগ্ন সত্য- ইনজেব চাঙমা

চাঙমা পত্রিকা “হিলর পচ্জন” জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ যে গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে—তা বোঝার জন্য বিশেষ কোনো দূরদর্শিতা প্রয়োজন নেই। প্রয়ো...