বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিন: দুই দশকের সাহিত্যিক মানচিত্র (১৯৭২–১৯৯১)- ইনজেব চাঙমা


‘লিটল ম্যাগাজিন’—এই শব্দবন্ধটির কোনো যুৎসই বাংলা প্রতিশব্দ আজও স্থির হয়নি। একে ‘ক্ষুদে সাহিত্যপত্র’ বলা গেলেও, তাতে এর বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি, বিদ্রোহী মনন ও সৃজনশীল দায়বদ্ধতার সম্পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে না। বাংলা সাহিত্যের পরিসরে ‘লিটল ম্যাগাজিন’ আজ চেয়ার–টেবিলের মতোই পরিচিত ও স্বীকৃত এক সাংস্কৃতিক পরিভাষা। প্রাবন্ধিক আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়, লিটল ম্যাগাজিন হলো সেই অপ্রতিষ্ঠানিক, অ-ব্যবসায়িক এবং প্রতিবাদী চেতনা-উদ্ভূত প্রকাশনা, যা মূলধারার সাহিত্যচর্চার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও মননের চারপাশে আবর্তিত হয়।

বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক যে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার ঢেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে লাগে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই। ১৯৭২ সাল থেকে এই অঞ্চলে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের প্রথম সুস্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়। দুর্গম ভৌগোলিক বাস্তবতা, প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যপত্রিকার অনুপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক অবহেলার মধ্যেই পার্বত্য জনপদের তরুণরা তাদের সৃজনশীল অভিব্যক্তির আশ্রয় খুঁজে নেয় এই ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশনাগুলোতে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সদ্য গড়ে ওঠা শিক্ষক সমাজ এবং সচেতন তরুণদের হাত ধরেই এখানে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গতানুগতিকতার বাইরে নতুন কিছু করার তাড়না থেকেই জন্ম নেয় এসব সাহিত্যপত্র।

গবেষণালব্ধ তথ্যানুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ১৯৯১—এই দুই দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা থেকে মোট ২৮৯টি লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্য সংকলনের সন্ধান পাওয়া যায়। বিষয়বস্তু ও প্রকাশক সংগঠনের প্রকৃতি অনুযায়ী এই বিপুল প্রকাশনাধারাকে সাতটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে প্রকাশিত হয় ৭৮টি সংকলন; ক্রীড়া, সামাজিক ও কল্যাণমূলক সংগঠন থেকে ৫৬টি; রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন থেকে ৩৫টি; বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৮টি; শিশু ও কিশোর সংগঠন থেকে ১৩টি; এবং অন্যান্য ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত হয় মোট ৬৯টি সংকলন। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিস্তারই প্রমাণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্যচর্চা কতটা প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক ছিল।

এই আন্দোলনে কয়েকটি সংগঠনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত জুভাপ্রদের উদ্যোগে সন দেওয়ান সম্পাদিত ‘বিজু’ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। প্রকল্পনা সাহিত্যাঙ্গন সর্বাধিক আটাশটি প্রকাশনা বের করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে; শাহরীয়ার রুমী সম্পাদিত ‘রৌদ্রদগ্ধের গান’ এবং নন্দলাল শর্মা সম্পাদিত ‘প্রথম আশার রশ্মি’ এই ধারার স্মরণীয় সংকলন। জুম পাহাড়ের ঐতিহ্য, জীবনবোধ ও সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্র করে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল (জাক) এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করে। অপরদিকে, ১৯৮৮ সালে গঠিত বান্দরবান সাহিত্যাঙ্গন ‘রক্তাক্ত একুশে’ ও ‘অরণ্য কমল’-এর মতো মানসম্পন্ন সংকলনের মাধ্যমে এই আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিনগুলো কেবল কবিতার খাতা বা সৃজনশীল পরীক্ষাগার ছিল না; এগুলোর ভেতর গভীরভাবে উপস্থিত ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা ও প্রতিবাদী চেতনা। বিঝু, বিহু, বিষু, সাংগ্রাই ও বৈসুকের মতো আঞ্চলিক উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত বহু সংকলন পাহাড়ি জনজীবনের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরে। ‘সপ্তবর্ণ’, ‘রেঁনেসা’, ‘পাজন’-এর মতো সংকলনে এই উৎসবচেতনার শিল্পিত প্রতিফলন দেখা যায়। আবার ‘পাহাড়িকা গুঞ্জন’ বা ‘পাহাড়ী’-র মতো সংকলনে উঠে আসে জাতিসত্তা, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং পাহাড়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ। একুশে ফেব্রুয়ারি ও বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত সংকলনগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তরুণদের সংগ্রামী মনন ও প্রতিবাদী স্বর।

তবে এই আন্দোলনের পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। প্রধান অন্তরায় ছিল অর্থনৈতিক সংকট। উদ্যোক্তারা ছাত্রজীবন শেষ করার পর বাস্তব জীবনের চাপে পড়ে অনেক সময় সংগঠন ধরে রাখতে পারেননি। ফলে বহু লিটল ম্যাগাজিন দীর্ঘজীবী হয়নি। মুদ্রণ ব্যয় কমাতে সাইক্লোস্টাইল বা ফটোস্ট্যাটে ছাপিয়ে নামমাত্র মূল্যে প্রকাশ ছিল সাধারণ ঘটনা। যথাযথ সংরক্ষণের অভাব, সম্পাদকের নাম বা প্রকাশকাল অনুল্লেখিত থাকার কারণে আজ গবেষকদের কাছে বহু মূল্যবান তথ্য দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।

তবু এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলা সাহিত্যচর্চার বিকাশে লিটল ম্যাগাজিনগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। আজকের বহু প্রতিষ্ঠিত পাহাড়ি কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের সাহিত্যযাত্রার প্রথম পাঠশালা ছিল এই ক্ষুদ্র সাহিত্যপত্রগুলো। ১৯৭২ থেকে ১৯৯১—এই দুই দশকের লিটল ম্যাগাজিনসমূহ পার্বত্য জনপদের সাহিত্যিক জাগরণ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও সৃজনশীল প্রতিরোধের এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।


তথ্যসূত্র:
নন্দলাল শর্মা, পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিন: দুই দশকের সাহিত্যিক মানচিত্র (১৯৭২–১৯৯১)- ইনজেব চাঙমা

‘লিটল ম্যাগাজিন’—এই শব্দবন্ধটির কোনো যুৎসই বাংলা প্রতিশব্দ আজও স্থির হয়নি। একে ‘ক্ষুদে সাহিত্যপত্র’ বলা গেলেও, তাতে এর বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি, ...