শনিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৪

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন

 পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মসূচীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার জন্য জরুরি আহ্বান সংবাদ সম্মেলন ২৪.

আগষ্ট শনিবার, সকাল ১১টা

সাগর রুনি মিলনায়তন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সেগুনবাগিচা, ঢাকা।


প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ সুধীবৃন্দ, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের পক্ষ থেকে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় যারা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি আন্তরিকভাবে আমাদের সমবেদনা গভীর শোক প্রকাশ করছি। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগ সন্ধিক্ষণ হিসাবে বিবেচিত হবে, যা ইতোমধ্যে ন্যায়বিচার, শান্তি এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য নতুন করে আশা তৈরি করেছে। আমরা বিশ্বাস করি যে এই অনন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের দেশমাতৃকাকে গণতান্ত্রিক নীতি মানবাধিকারের ভিত্তিতে সরকার রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত করবে।

নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নতুন সরকারের অভিযাত্রায় আমরা ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি। ২৬ বছর ধরে এই চুক্তির মূল উপাদানগুলি অনেকাংশে অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসি জনগণ এবং সারাদেশের নাগরিকদের এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ যথাযথ বাস্তবায়ন শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি স্থিতিশীলতার জন্যই নয়, বাংলাদেশের সকল আদিবাসীদের মর্যাদা অধিকার সমুন্নত রাখা এবং একই সাথে দেশের জাতীয় ঐক্যের জন্য অপরিহার্য।

এক বছরের অধিক সময় ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন দেশবাসীকে সাথে নিয়ে অক্লান্তভাবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলেছে। পাহাড়ি জনগণ এবং বৃহত্তর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর কন্ঠস্বর যাতে একই সাথে উচ্চস্বরে এবং স্পষ্টভাবে শোনা যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাজ করেছি। আমাদের আন্দোলন গতানুগতিক সীমানা অতিক্রম করে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সারাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ছাত্র-যুব মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করেছে।

লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারকে আমারা নিম্নোক্ত দফা দাবির বিষয়ে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি:

. চুক্তি বাস্তবায়নে একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা: চুক্তিটিকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থাসহ একটি সুস্পষ্ট কার্যকরী পরিকল্পনা প্রণয়ন করার জন্য আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অনুরোধ করছি।

. পার্বত্য চট্টগ্রাম সামরিক তত্ত্বাবধান বন্ধ: পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহত সামরিক তত্ত্বাবধান এই অঞ্চলের শান্তি, অগ্রগতি উন্নয়নকে বাঁধাগ্রস্থ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সামরিক তৎপরতা এই অঞ্চলে চলমান সহিংসতার উৎস। আমরা অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহারপূর্বক সামরিক তত্ত্বাবধান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানাই এবং এই অঞ্চলটিকে চুক্তির বিধানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার শাসন কাঠামো বিকাশের ব্যাবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করছি।

. আঞ্চলিক জেলা পরিষদের ক্ষমতায়ন: গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা এবং পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য চাহিদা মোকাবেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিনটি জেলা পরিষদকে অবশ্যই চুক্তি অনুসারে যথাযথ ক্ষমতা প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করুন।

. ভূমি অধিকার এবং পুনর্বাসন: পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি স্থিতিশীলতার জন্য ভূমি অধিকারের বিষয়টি অন্যতম সমস্যা। আমরা ভারত থেকে আগত পাহাড়ী শরণার্থী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করার আহবান জানাই।

. অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি উন্নয়ন: পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে অবশ্যই দেশের মূলধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির জন্য এই অঞ্চলের অনন্য সাংস্কৃতিক পরিবেশগত ঐতিহ্যকে সম্মানপূর্বক টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহন করা আবশ্যক।

. সমতলের আদিবাসীদের জন্য প্রতিনিধিত্বশীল শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ:  আমরা সমতল ভূমির জেলাগুলির প্রচলিত। সকল স্থানীয় সরকারে আদিবাসীদের জন্য বিশেষ আসন সংরক্ষণ এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার জোর আহবান জানাই।

. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা: সমতলের আদিবাসীদের জীবন, জমি এবং জীবিকা সংক্রান্ত তাদের নির্দিষ্ট চাহিদা এবং চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলায় অবিলম্বে একটি পৃথক ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

এই দাবিসমূহের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শুরু করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মসূচীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার জন্য আমরা সরকারের কাছে নিম্নোক্ত ৫টি বিষয় অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।

. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটির পুনর্গঠন। বর্তমান কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে চুক্তি অনুযায়ী এই কমিটি পুনর্গঠনের জন্য অনুরোধ করছি। পুনর্গঠিত কমিটি সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং চুক্তির বিধানগুলির আলোকে চুক্তি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি।

. পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সক্রিয় করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে অমীমাংসিত ভূমি বিরোধ পাহাড়ীদের জন্য দুর্দশা বাস্তুচ্যুতির কারণ হয়েছে। আমরা এই কমিশনকে অবিলম্বে সক্রিয় করার জোর দাবি জানাই এবং যতদ্রুত সম্ভব কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ণ করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

. আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সংলাপ: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে অবিলম্বে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করার জন্য জোর আহ্বান জানাই। এই সংলাপের উদ্দেশ্য হবে চলমান সমস্যাগুলির সমাধান, পার্বত্য চুক্তির বিধানগুলির সাথে আঞ্চলিক পরিষদের প্রচেষ্টাকে সমন্বয় করা এবং স্থানীয় শাসনে পরিষদের ভূমিকা নিশ্চিত করা। আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক সহযোগিতা শ্রদ্ধার মনোভাব গড়ে তোলার মাধ্যমে, আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সংলাপ চুক্তি বাস্তবায়নে অর্থপূর্ণ অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করবে।

. পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্ঠা পরিষদের পুর্নগঠন। আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সংলাপের আলোকে, চুক্তির বিধান অনুসারে অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পরিষদের পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

. সমতল ভূমির আদিবাসীদের রক্ষায় উদ্যেগ গ্রহণ। সমতল ভূমিতে আদিবাসীরা তাদের ভূমির অধিকার এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রক্ষার হুমকিসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমরা অন্তর্বতীকালীন সরকারকে এই জাতিসমূহের সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য একটি কমিশন গঠনের আহবান জানাই। এই কমিশন সমতলের আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং তাদের উন্নয়ন কল্যাণের জন্য কাজ করবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এবং বাংলাদেশের সকল আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার জন্য অবিলম্বে উল্লেখিত পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা অপরিহার্য। আমরা বিশ্বাস করি যে, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই পদক্ষেপগুলি অগ্রাধিকার তালিকায় রেখে দ্রুততার সাথে নিষ্পত্তি করে শান্তি, ন্যায়বিচার সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সূচনা করতে পারে। এই লক্ষ্য অর্জনে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন সরকার অনান্য সকল অংশীজনদের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আমাদের প্রিয় দেশমাতৃকার ইতিহাসের এই নতুন সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

ধন্যবাদান্তে

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন

যোগাযোগ: ২৩/২৫, সালমা গার্ডেন, শেখেরটেক-, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল: ০১৯২৪৫৫৫৭৭৩

 

রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৪

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসনের অবসান চাই: Binota M Dhamai

"একটা জায়গায় একজন লিখেছেন: "বমরা প্রায় অর্ধেক দেশ ছেড়েছে। ডিসেম্বর নাগাদ মনে হয় বম পার্বত্য চট্টগ্রামে খুব বেশি পাওয়া যাবে না। থাকলে জেলা ও উপজেলা শহরে দু-এক পরিবার থাকবে। অধিকারের ললিপপ দেখিয়ে অপরাধীকরণ করে এখন অপরাধী ধরার অভিযান চলছে। বমরা পুরোটাই তথাকথিত কাউন্টার ইন্সারজেন্সি পলিটিক্সের শিকার।" বৈষম্যের বেড়াজাল কাকে বলে, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে সংক্ষেপে এখানে একটু যোগ করি। পার্বত্য চট্টগ্রামে যা এখনো চলমান - চুক্তির আগে এবং পরে - যে নামেই ডাকুক না কেন, অপারেশন দাবানল বা অপারেশন উত্তরণ, সেটা হলো তাত্ত্বিকভাবে কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি স্ট্রাটেজি। এই পলিসি ব্রিটিশরা এশিয়া অঞ্চলে মালয়েশিয়াতে সরাসরি প্রয়োগ করেছিল এবং সেই একই ব্যবহারিক দিক আমাদের দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর প্রয়োগ করছে। এই তাত্ত্বিক দিকে কয়েকটি বিষয় বিদ্যমান, প্রথমতঃ loyal population তৈরী করা। সেটা দুইভাবে করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। একটি হলো transmigration - বাইরে থেকে এনে বাঙালিদের পূর্ণবাসন করে জনমিতি বদলে দেওয়া, এবং সেটা করে ফেলেছে। আরো একটি হলো ভাগ করো শাসন করো যেখানে আমাদের পাহাড়ের আদিবাসীদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, যেটা আমরা দেখেছি ১৯৮৯ সালে স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনে এবং ১৯৯৭ চুক্তি পরবর্তীতে। দ্বিতীয়তঃ হার্ট এন্ড মাইন্ড কর্মসূচি, সেটি মূলত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়ন যা সেনা কতৃত্বে চলে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো কোটি কোটি টাকার ব্যয় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে কোনো প্রকার অডিট ছাড়াই ব্যয় হয়। বহিরাগত বাঙালিদের যে রেশন এবং পূর্ণবাসন করা হয় সেই টাকা ও এই কোটি টাকার লেনদেন। উনারা পলিটিকাল কাজও করে থাকেন এই যেমন হেডম্যান কারবারি সম্মেলন। আবার বহিরাগত বাঙালিদেরকে আমাদের পাহাড়ি আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হামলাসহ বিভিন্ন অপকর্মে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয়তঃ কম্যান্ড এন্ড কন্ট্রোল - প্রশাসনের সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সেনাদের নিয়ন্ত্রণে চলবে। পুলিশ এবং বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষমতা সীমিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে আজ স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা সেটাই দেখি। একটা সাধারণ দেওয়াল লিখন বা সেখানে কি লিখবো না লিখবো, তার জন্যে সেনাবাহিনীর অনুমতি নিতে হয়। বাংলাদেশের আমার মানবাধিকার সেই কণ্ঠরোধের, নিপীড়ন নির্যাতনের বেড়াজালে, এই বৈষম্য পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ বহমান। আজকে এইখানে রাখলাম।"

শুক্রবার, ৯ আগস্ট, ২০২৪

পাহাড়ের আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ: হিল ভয়েসের ন্যারেটিভে শেখ হাসিনা সরকারের সময়কাল (২০২০-২০২৪): ড. অনুরাগ চাকমা

দেশে-দেশে আজ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপিত হবে। যাদেরকে ঘিরে আমাদের বাংলাদেশেও এই বিশেষ দিবসটি বহু বছর ধরে উদযাপিত হয়ে আসছিল, তাদের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কটা কেমন ছিল, আছে এবং থাকবে, দেশের এই কঠিন সময়ে সেটা অনেকের মত আমাকেও ভাবিয়ে তুলেছে। তবে শুরুতে বলতে চাই, অতীত সরকারের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক পলিসি, পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ অনেক বিষয় নিয়ে অনেক লেখা লিখেছিলাম। আমার সেসব অনেক লেখা IPNEWS সহ অনেক জায়গায় ছাপানো হয়েছিল। কিন্তু, আজকের আলোচনাটা হিল ভয়েসের ন্যারেটিভসগুলোর মধ্যে রাখতে চাই এবং দেখাতে চাই, সদ্য বিদায়ী শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে (২০২০ থেকে ২০২৪ এপ্রিল পর্যন্ত) পাহাড়ের আদিবাসী জনগণের সাথে রাষ্ট্র কেমন আচরণ করেছে। তবে এটাও যুক্ত করতে চাই, শুধু শেখ হাসিনার আমলে নয়, অতীতের সব সরকারের সময়ে পাহাড়ের আদিবাসীরা নির্যাতিত হয়ে এসেছে। ১৯৭১ সাল থেকে আমরা সবসময় পরাধীন থেকে গেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বাদ আমরা কোনোদিন উপভোগ করতে পারিনি।
উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারিতে হিল ভয়েসের ফেসবুক পেইজটি যাত্রা শুরু করে। তখন থেকে এযাবৎ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণের মানবাধিকার লঙ্ঘন, আদিবাসী নারীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন এবং বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত প্রায় ২,৮৫৪টি পোস্ট করা হয়। এসব পোস্টগুলোর থিম্যাটিক ক্লাস্টারগুলো বের করার জন্য আমি GloVe (Global Vectors for Word Representation) অ্যালগরিদম ব্যবহার করেছি, যা শব্দগুলির ভেক্টর প্রতিনিধিত্ব তৈরি করে এবং Uniform Manifold Approximation and Projection (UMAP) এর মাধ্যমে সেগুলিকে 2D স্পেসে প্রদর্শন করেছে। সংযুক্ত প্লটটিতে দেখুন ২০২০ থেকে ২০২৪ এপ্রিল পর্যন্ত পাহাড়ে আদিবাসীদের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কটা কেমন ছিল? নিচে শুধুমাত্র আমি কিছু থিম্যাটিক ক্লাস্টার নিয়ে আলোচনাটা সীমিত রেখে দিলাম।
• মন এবং সহিংসতা ( (UMAP1: 3.9-4.0, UMAP2: -0.4 থেকে -1.2 পর্যন্ত): এই ক্লাস্টারটিতে “arrested,” “murdered,” “raided,” এবং “tortured” এর মতো শব্দগুলি পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান রাষ্ট্রয় নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকে প্রতিফলিত করেছে। প্রত্যাশা থাকবে, এই সরকার সেটা বন্ধ করবে।
* বাস্তুচ্যুতি এবং পুনর্বাসন ( UMAP1: 4.0-4.4, UMAP2: -1.2 থেকে 0.4 পর্যন্ত): এই অংশে “evicted,” “displaced,” “relocated,” এবং “resettlement” এর মতো শব্দগুলি রয়েছে, যা আদিবাসী জনগণের ভূমি এবং ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসনের ঘটনার উপর ফোকাস করেছে। এই সরকারকে এই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে হবে।
* শান্তি আলোচনা এবং সমঝোতা ( UMAP1: 4.3-4.5, UMAP2: 0.8 থেকে1.2 পর্যন্ত): এই ক্লাস্টারটিতে “peace,” “agreement,” “negotiation,” এবং “implementation” এর মতো শব্দগুলি নির্দেশ করে, আদিবাসী জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং সংঘাত নিরসনে সম্পূর্ণভাবে পার্বত্য চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
* প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ (UMAP1: 3.9-4.2, UMAP2: -0.4 থেকে 0.6 পর্যন্ত): এই অংশে “protest,” “resistance,” “struggle,” এবং “movement” এর মতো শব্দগুলি আদিবাসী জনগণের বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতিরোধ, প্রতিবাদ এবং আন্দোলনকে প্রতিফলিত করেছে।
* যৌন সহিংসতা ( UMAP1: 3.8-4.0, UMAP2: -1.0 থেকে -1.5 পর্যন্ত): এই ক্লাস্টারটিতে “raped,” “sexually,” “violated,” এবং “assaulted” এর মতো শব্দগুলি আদিবাসী নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা এবং তার যে প্রভাব সেটাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই সরকারের যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
* কেন্দ্রীয় থিম ( UMAP1: 4.0-4.3, UMAP2: -0.2 থেকে 0.8 পর্যন্ত): এই ক্লাস্টারটিতে “authority,” “rights,” “law,” এবং “recommendations” এর মতো শব্দগুলি প্রধানত আদিবাসীদের জন্য আইনি এবং প্রশাসনিক সুরক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জানি না, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজ, প্রফেসর ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এবং ভবিষ্যতে দেশে যেসব দল ক্ষমতায় আসবে তাদের সাথে আদিবাসীদের সম্পর্কটা কেমন হবে? যদি তারা সত্যিকার অর্থে একটি “সবার জন্য বৈষম্যমুক্ত কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা” গড়তে চায়, তাহলে তারা এসব থিম্যাটিক ক্লাস্টারগুলোকে বিবেচনায় নিতে পারে। দেশে সব সরকারের সময়ে পাহাড়ে নিপীড়িত-নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে বলব, “অধিকার দিয়ে পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কেউ ছোট হয়ে যায়নি”।
সবাইকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের শুভেচ্ছা।
ড. অনুরাগ চাকমা, রিসার্চ ফেলো, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

মেগা প্রকল্প নয়, আগে ন্যায্যতা- ইনজেব চাঙমা

  গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের...