লেখায় সাংবাদিক ও লেখক রাজিব নূর চাকমা জাতির ভাষা ও বর্ণমালার করুণ বাস্তবতাকে গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন। একটি জাতির গর্ব, তার ইতিহাস, সমৃদ্ধ ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে নিজস্ব বর্ণমালা। অথচ কালের পরিক্রমায় সেই বর্ণমালাই আজ চাকমা জাতির জন্য হয়ে উঠেছে দুঃখিনী।
রাজিব নূর তাঁর লেখায় একাদশ শ্রেণির ছাত্রী এন্তি চাকমার সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। চাকমা ভাষায় কথা বলতে পারলেও নিজের ভাষার বর্ণমালা লিখতে না পারায় এন্তির লজ্জা যেন একটি প্রজন্মের নীরব আত্মস্বীকার। বরকল থেকে রাঙামাটিতে পড়তে আসা এন্তির গল্প কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি একটি জাতিগত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
২০১৫ সালের ১৪ থেকে ২৩ জানুয়ারি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—ঘুরে শতাধিক শিক্ষিত চাকমা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চাকমা সমাজের সর্বজনমান্য অনন্তবিহারী খীসা, জনসংহতি সমিতির এমএন লারমা গ্রুপের প্রধান সুধাসিন্ধু খীসা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান, জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গলকুমার চাকমা, জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিলের সভাপতি মিহির বরণ চাকমা, সহ-সাধারণ সম্পাদক গঙ্গামানিক চাকমা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তুষারশুভ্র তালুকদার, মোনঘর শিশুসদনের শিক্ষক ও লেখক মৃত্তিকা চাকমা, সাংবাদিক-লেখক হরিকিশোর চাকমা, সাংবাদিক বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, আদিবাসী বিষয়ক গবেষক তন্দ্রা চাকমা, আদিবাসী নেতা দীপায়ন খীসা, শিল্পী কালায়ন চাকমা এবং ইউপিডিএফের সংগঠক রিকু চাকমা।
এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বেদনাদায়ক তথ্য ছিল—নিজের নাম মাতৃভাষার বর্ণমালায় লিখতে পারলেন মাত্র দু’জন। তাঁদের একজন মৃত্তিকা চাকমা, অন্যজন রিকু চাকমা। অনন্তবিহারী খীসা, সুধাসিন্ধু খীসা ও গৌতম দেওয়ান স্বীকার করেন—ছোটবেলায় বর্ণমালা শিখলেও এখন তা আর ব্যবহারযোগ্য নয়।
এই সংকট নতুন নয়; এর ইতিহাস দীর্ঘ। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬১–৬২ সালে চন্দ্রঘোণা বোর্ডিং স্কুলে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চাকমা ও মারমা ভাষা চালু হয়েছিল। পরে ১৯৩৭–৩৮ সালে মিলান সাহেব রাঙামাটিতে এবং ১৯৫৯ সালে নোয়ারাম চাকমা রচিত “চাকমার পত্থম শিক্ষা” গ্রন্থটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু সামন্ত সমাজব্যবস্থার বাস্তবতায় মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা তখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৭ সালে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যবই ছাপা হলেও তা কার্যকরভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় আলো দেখেনি। আশার আলো আবারও অমাবস্যায় ঢাকা পড়ে যায়।
এই দুঃখ যদি বর্তমান প্রজন্ম উপলব্ধি না করে, তবে চাকমা ভাষা ও বর্ণমালার স্থান খুব শিগগিরই জীবন্ত সমাজ থেকে সরে গিয়ে জাদুঘরে সীমাবদ্ধ হবে। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ চীনা, জাপানি কিংবা ইংরেজি শেখে—এটা বাস্তব। কিন্তু প্রয়োজন কেবল অর্থনৈতিক নয়; সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জাতিগত আত্মপরিচয়ের শিকড়ে পৌঁছানো। আর তার প্রথম শর্ত নিজের ভাষা ও বর্ণমালার জ্ঞান অর্জন।
তবু আশার কথা আছে। আজ প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয়। একসময় কঠিন হলেও চাকমা বর্ণমালা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সহজলভ্য। তাই বিশ্বাস করা যায়—বর্তমান প্রজন্ম আত্মনিয়োগ করলে এই দুঃখিনী বর্ণমালাকে রাহুদশা থেকে মুক্ত করা সম্ভব। ভাষা বাঁচলে জাতি বাঁচে, আর বর্ণমালা বাঁচলেই ভাষার সত্যিকারের মুক্তি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন