সমাজবিভাজন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা সমাজের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে—এই বিভাজনের দায় কার? রাষ্ট্র, রাজনীতি, নাকি সমাজের ভেতরকার নেতৃত্ব? বৌদ্ধধর্ম বা শাস্ত্রীয় বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য না থাকলেও একজন সচেতন ও দায়বদ্ধ সমাজিক মানুষ হিসেবে এই সত্যের অনুসন্ধান করা আজ সময়ের দাবি। চাঙমা সমাজের ধর্মীয় ইতিহাস ও ভিক্ষুসমাজের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে এই বিভাজনের শিকড় খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
চাঙমা সমাজে ধর্মীয় বিবর্তনের সূচনা হয় রাণী কালিন্দীর শাসনামলে। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে হীনযান মতবাদের ভান্তেদের আবির্ভাব ঘটে, যার আগে এই অঞ্চলে মূলত মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল। এই পরিবর্তনটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক মতাদর্শের বদল ছিল না, বরং এর সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত চাঙমা সমাজের ধর্মীয় কার্যক্রম মূলত 'লুরী' সম্প্রদায়ের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রিয়রত্ন ভিক্ষুর আবির্ভাব চাঙমা সমাজে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তিনি কেবল ধর্মীয় সাধনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং স্বধর্মের উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার এবং দরিদ্র ও অবহেলিত শিশুদের জন্য জ্ঞানার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে এক নতুন জাগরণের সূচনা করেন। তাঁর হাত ধরে একটি শক্তিশালী ভিক্ষু সংঘ গড়ে ওঠে, যারা নৈতিকতা ও শিক্ষার আলো সমাজের তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেয়। এই সময়ে ধর্ম কেবল পূজা-পার্বণে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সমাজ সংস্কারের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
পরবর্তীকালে বনভান্তের আবির্ভাবে বৌদ্ধধর্মীয় চেতনা আরও বিস্তৃত হয়। তাঁর ধ্যান-সাধনা, কঠোর জীবনাচার এবং ত্যাগের আদর্শ অগণিত মানুষকে আকৃষ্ট করে। তবে এই জাগরণের সমান্তরালেই শুরু হয় এক গভীর দ্বন্দ্বের অধ্যায়। একদিকে যেমন আধ্যাত্মিকতার প্রসার ঘটে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর বিভাজনের বীজ রোপিত হতে থাকে।
ধীরে ধীরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদর্শনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এর বাস্তব উদাহরণ দেখা যায় নাম পরিবর্তনের রাজনীতির মধ্য দিয়ে। পানছড়ি পথের ‘দেওয়ান পাড়া বৌদ্ধ বিহার’ রূপান্তরিত হয় ‘দেওয়ান পাড়া বন বিহার’-এ। একইভাবে ‘রাঙ্গাপানিছড়া বৌদ্ধবিহার’ (বাবুছড়া যাওয়ার পথে) হয়ে যায় ‘রাঙ্গাপানিছড়া বন বিহার’। বনভান্তের জীবদ্দশায় শৃঙ্খলা বজায় থাকলেও তাঁর প্রয়াণের পর শুরু হয় চরম নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের লড়াই। "প্রধান শিষ্য কে হবেন?" কিংবা "কার কর্তৃত্বে বিহার চলবে?"—এই প্রশ্নে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর ঘ্যাংঘর নিয়ে যে বিভাজনের কাহিনি আজ প্রচলিত, তা সমাজের ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছে।
সমাজ বিভাজনের এই করুণ পরিণতির দায় থেকে তথাকথিত সাধক, সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুসমাজ সম্পূর্ণ মুক্ত নন। যখন আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ত্যাগের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার লড়াই বা দখলদারির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাঁরাই হয়ে ওঠেন বিভাজনের প্রধান কারিগর। চাঙমা সমাজের বর্তমান বিভক্ত বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আজ কঠোর আত্মসমালোচনার প্রয়োজন। ধর্ম যদি সত্যিই মুক্তির পথ হয়, তবে তার বাহকদের হতে হবে ঐক্যের প্রতীক। অন্যথায়, আধ্যাত্মিকতার মুখোশে সমাজ ভাঙার এই ঐতিহাসিক দায় তাঁদের কাঁধেই বর্তাবে।
ছবি: সংগৃহীত

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন