রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

অমর কান্তি চাকমার রক্তে লেখা এক ইতিহাস - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস শুধু পাহাড়, ঝরনা আর সবুজের গল্প নয়। এই মাটির প্রতিটি ইঞ্চিতে মিশে আছে হাজারো অমর কান্তির স্বপ্নভঙ্গের রক্ত। দিঘীনালার বাঘাইছড়ার নোয়া পাড়া গ্রামের দিনমজুর অমর কান্তি চাকমার জীবন সেই ইতিহাসেরই এক নিষ্ঠুর দলিল। যার শ্রমে দু-বেলা ভাত জুটত, যার চোখে ছিল সন্তানের মুখ দেখে দুঃখ ভোলার স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন ১৫ জুন ১৯৯২ সালে সেনাবাহিনীর বেয়নেটে খুন হয়।

অমর কান্তি চাকমা ছিলেন পেশায় দিনমজুর। দিন আনেন দিন খান — যে দিন কাজ নেই, সে দিন চুলাও জ্বলে না। তবুও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার ছিল অপেক্ষার। অপেক্ষা এক নতুন প্রাণের, এক নতুন ভোরের। বছরের পর বছর আর্থিক টানাপোড়েন সয়েও তারা বিশ্বাস করত, সন্তানের মুখ দেখলে সব কষ্ট মুছে যাবে। ১৫ জুন ১৯৯২, সেই প্রতীক্ষিত দিনটি এল। ভোর থেকে স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু। যন্ত্রণার মধ্যেও দুজনের চোখে আনন্দ — আজই তাদের কোল জুড়ে আসবে ফুটফুটে শিশু।

সকাল আটটা। নোয়া পাড়ার অদূরে শান্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। একজন সেনা সদস্য আহত হয় — এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকায় আতঙ্ক নেমে আসে। পার্বত্য এলাকার মানুষ জানে, সংঘর্ষের পর কী হয়। প্রতিশোধের নামে গ্রামের পর গ্রাম জ্বলে, নিরীহ মানুষের রক্তে মাটি ভেজে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সবাই যে যেদিকে পারে পালায়। কিন্তু অমর কান্তি পালাতে পারেননি। প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীকে ফেলে কোন স্বামী পালায়? তাই তিনি অদৃষ্টের উপর ভরসা করে স্ত্রীর হাত ধরে বসে থাকেন, মিথ্যা সান্ত্বনা দেন — “ভয় নেই, কিছু হবে না”।

ঠিক তখনই বাবু ছড়া জোনের তৎকালীন জোন কমান্ডার লে. কর্নেল শাহার উদ্দীনের নেতৃত্বে একদল সেনা সদস্য নোয়া পাড়ায় ঢোকে। অসহায় অমর কান্তির উপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীর চোখের সামনে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যে ঘরে কিছুক্ষণ পর নতুন প্রাণের কান্না শোনার কথা, সে ঘর ভরে যায় রক্তের গন্ধে। স্বামীর নিথর দেহের পাশে শুয়ে থাকা সেই মা না পারলেন চিৎকার করতে, না পারলেন বাধা দিতে। তার গর্ভের শিশুটি পৃথিবীতে এল পিতার রক্তে ভেজা মাটিতে পা রেখে।

সেই দিন যে শিশুটি জন্ম নিল, তার কাছে বিধবা মা কী জবাব দেবে? পিতার রক্তের দাগ কি সে মুছতে পারবে? ইতিহাস বলে — না, পারবে না। কারণ এই রক্ত শুধু অমর কান্তির নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজারো শিশু জন্ম নিয়েছে বাবার লাশের পাশে, মায়ের চোখের জলে। এই রক্ত তাদের পরিচয়, তাদের দায়। এই দায় ব্যক্তিগত প্রতিশোধের নয়, এটি ঐতিহাসিক দায় — অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দায়। যে কালো হাত পাহাড়ের মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়, সেই হাত ভেঙে দেওয়ার দায়। হারিয়ে যাওয়া অধিকারের সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনার দায়।

অমর কান্তি চাকমা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন একটি প্রশ্ন। পিতার রক্তের উপর জন্ম নেওয়া সেই শিশুরা আজ বড় হয়েছে। তারা বুকের ভেতর পুষে রেখেছে অপরিমেয় শক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনপদের প্রতিটি ঘরে ঘরে এখনও সেই ১৫ জুন ফিরে আসে। অমর কান্তির মতো হাজারো নাম না জানা দিনমজুরের আত্মত্যাগ মনে করিয়ে দেয় — ন্যায়বিচার না আসা পর্যন্ত এই অপেক্ষার শেষ নেই। আমরাও সেই দিনটির অপেক্ষায়, যেদিন পাহাড়ের মাটিতে আর কোনো শিশুকে পিতার রক্তের উপর জন্ম নিতে হবে না।

তথ্যসূত্র: স্যাটেলাইট. ৬ অক্টোবর ১৯৯২ 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মেগা প্রকল্প নয়, আগে ন্যায্যতা- ইনজেব চাঙমা

  গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের...