সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

লংগদুর ছাইচাপা অঙ্গার থেকে জেগে ওঠা দ্রোহের নাম — পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ - ইনজেব চাঙমা

 

৪ঠা মে, ১৯৮৯। পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশে সেদিন সূর্য ডুবেছিল রক্তের আল্পনায়। লংগদুর সবুজ উপত্যকা মুহূর্তে পরিণত হয়েছিল ধূসর শ্মশানে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়েছিল কেবল কাঠ-বাঁশের কুটির নয় — পুড়েছিল জুম্ম জাতির হাজার বছরের স্বপ্ন, পুড়েছিল বুদ্ধের করুণা-মাখা মূর্তি, পুড়েছিল মাতৃভাষার বর্ণমালা। শিশুর কান্না, জননীর আর্তনাদ আর বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস মিশে সেদিন লংগদুর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
 
ইতিহাস সাক্ষী, ৩২টি তাজা প্রাণ, ১১টি রক্তাক্ত শরীর, ৯টি গ্রাম (টিনটিলা, মানিকজোড় ছড়া, বাত্যাপাড়া, লংগদু বড়াদম, মহাজন পাড়া, সোনাই, বামে আটরকছড়া, ডানে আটরকছড়া ও করল্যাছড়ি)- ১০১১টি ভস্মীভূত নীড়, ২টি স্কুল ( সোনাই সরকারি প্রাথমিক স্কুল ও লংগদু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বড়াদম), ৬টি বিধ্বস্ত বিহার (টিনটিলা বনবিহার, মনোরমা বৌদ্ধ বিহার, আটরকছড়া, দশবল ধর্মরত্ন বৌদ্ধ বিহার, সোনাই বৌদ্ধ বিহার, সোনাই, করল্যাছড়ি বৌদ্ধ বিহার, বড়াদম বৌদ্ধ বিহার) — এই হলো রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সেই ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম পরিসংখ্যান। হাজারো জুম্ম সন্তান সেদিন উদ্বাস্তু হয়ে পথে নামে, কারও কারও ঠাঁই হয় কাঁটাতারের ওপারে।
 
কিন্তু ছাইচাপা পড়ে না অঙ্গার। লংগদুর সেই দগ্ধ ভূমির বুক চিরে, শহীদের রক্তস্নাত মাটিতে পা রেখে, ঠিক ১৬ দিন পর — ২০শে মে, ১৯৮৯ — জন্ম নিল এক দ্রোহ, এক শপথ, এক অনির্বাণ মশাল: পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ।
 
যে মিছিলে উচ্চারিত হয়েছিল প্রতিবাদের প্রথম শ্লোগান, যে দেয়ালে লেখা হয়েছিল অধিকার-এর প্রথম পঙক্তি, সে মিছিলের অগ্রভাগে ছিল পাহাড়ের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ। তারা শপথ নিয়েছিল — এই রক্ত বৃথা যেতে দেবে না।
 
আজ পাহাড়ের গ্রামগুলো আর সেই আগের মতো নয়ন-ভোলানো সবুজ নয়। ভূমি-হারানো মানুষের চোখে শূন্যতা, ভাষা-হারানো শিশুর কণ্ঠে নীরবতা। উন্নয়নের নামে কর্ষিত হয় পাহাড়ের বুক, আর নির্বাসিত হয় তার আদিম সন্তান।
 
তবুও, হতাশার এই ধূসর মরুতে এক চিলতে ওয়েসিস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। তাই জুম্ম জনতার প্রত্যাশা, পিসিপি যেন শহীদের ঋণ শোধ করে কলমে, কণ্ঠে আর কর্মে।
 
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমি — প্রতিটি জাতির নিজস্ব বর্ণমালা আজ মৃত্যু-শয্যায়। মাতৃভাষার অক্ষরগুলো যেন লংগদুর ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া সোনার মোহর। পিসিপি’র কাছে জনতার আকুতি: তোমরা সেই মোহর কুড়িয়ে আনো, বর্ণের মিছিলে মাতৃভাষাকে ফিরিয়ে দাও তার হারানো সিংহাসন। 
 
একটি শিশু যখন নিজের লিপিতে ‘মা’ লিখতে শিখবে, সেদিনই লংগদুর একেকটি আত্মা শান্তি পাবে।
শহীদের নামগুলো যেন কেবল ৪ঠা মের পোস্টারে বন্দী না থাকে। লংগদু, লোগাং, নানিয়াচর, বাঘাইছড়ি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে — প্রতিটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের মৌখিক ইতিহাস, দলিল আর দীর্ঘশ্বাস সংগ্রহ করে আগামীকে জানাও। কারণ যে জাতি ইতিহাস ভোলে, সে জাতি আত্মপরিচয় হারায়।
 
প্রতিশোধের আগুনে নয়, প্রতিবাদের যুক্তিতে পাহাড়কে জাগাও। বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন আর রাজনীতির অস্ত্রে শান দাও জুম্ম তরুণকে। যাতে সে বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে বলতে পারে — ‘আমি জুম্ম, আমি মানুষ, আমারও অধিকার আছে’।
 
ভূমি আমার মা। সেই মায়ের অধিকার ফিরিয়ে আনতে পিসিপি’কে হতে হবে বজ্রকণ্ঠ। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি আর আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে রাজপথ যেন কখনো নীরব না হয়।
 
লংগদুর ছাই আজও উড়ে বেড়ায় পাহাড়ের বাতাসে। সেই ছাইয়ের গন্ধে মিশে আছে প্রতিশ্রুতি। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ যদি তার জন্মলগ্নের শপথ ভুলে যায়, তবে শহীদের আত্মা আরেকবার মরবে।
 
কিন্তু যতদিন পাহাড়ের কোনো তরুণ নিজের বর্ণমালায় কবিতা লিখবে, যতদিন কোনো কিশোরী নিজের ভাষায় গান গাইবে, যতদিন মিছিলের অগ্রভাগে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম” শব্দটি ধ্বনিত হবে — ততদিন লংগদুর ঋণ শোধের পথ খোলা থাকবে।
 
পাহাড় আবার সবুজ হবে। কারণ রক্ত কখনো বৃথা যায় না। রক্ত বীজ হয়ে ফিরে আসে, ফুল হয়ে ফোটে, ফল হয়ে জন্ম দেয় নতুন ভোরের। পিসিপি, তুমি সেই ভোরের প্রথম আলোকরেখা হয়ো।
 
তথ্যসূত্র: ১৯৮৯ সালে ১৫ জুলাই জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত প্রতিবেদন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মেগা প্রকল্প নয়, আগে ন্যায্যতা- ইনজেব চাঙমা

  গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের...