রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নৃগোষ্ঠী: হাজার বছরের ইতিহাস ও সমসাময়িক বাস্তবতা - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এক অনন্য ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক জনপদ। এই অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা হলেও, দেশি-বিদেশি প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণা এবং দালিলিক প্রমাণ নিশ্চিত করে যে, এখানকার আদিবাসীরা এই ভূমির সাথে হাজার বছরের শিকড়ে আবদ্ধ। বিশেষ করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর ধারাবাহিক ইতিহাস এই অঞ্চলের ভূমিজ সত্তার অকাট্য প্রমাণ দেয়।

চাকমা রাজবংশের ইতিহাস কোনো আধুনিক উদ্ভাবন নয়, বরং এটি দশম শতাব্দী থেকে বিদ্যমান একটি সুদীর্ঘ রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ১০০০-১০২০ খ্রিস্টাব্দে রাজা বিজয় সিং এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এইচ. এইচ. রিসলি (H.H. Risley) তাঁর ১৮৯১ সালে প্রকাশিত "The Tribes and Castes of Bengal" গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন:

"চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৃগোষ্ঠী এবং তারা নিজেদের এই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা বলে দাবি করে, যাদের দশম শতাব্দী থেকে একটি নিরবচ্ছিন্ন রাজবংশীয় ইতিহাস রয়েছে।"

. নাগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর "The Chakma Race" (১৯৭৪) বইতে এই যুক্তিতে আরও যোগ করেন যে, চাকমারা আরাকান থেকে আসা কোনো অভিবাসী গোষ্ঠী নয়। বরং আরাকানের সাথে তাদের যে ঐতিহাসিক যোগাযোগ, তা ছিল একটি সাময়িক গৌণ ঘটনা মাত্র। তাদের মূল সভ্যতা অন্তত দশম শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য প্রধান নৃগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাসও একইভাবে প্রাচীন।

  • মারমা: প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী . গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী (১৯৯২) দেখিয়েছেন যে, মারমারা মূলত চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই এই অঞ্চলে বসবাস করছে। তাদের সাথে আরাকানের যোগসূত্র প্রধানত সাংস্কৃতিক ভাষাগত, যা কোনোভাবেই অভিবাসন বা বহিরাগত বসতি স্থাপন হিসেবে গণ্য নয়।
  • ত্রিপুরা: ঐতিহাসিক সি.. বাকল্যান্ড (১৯০৬) তাঁর গ্যাজেটিয়ারে লিখেছেন, ত্রিপুরারা ব্রিটিশ আমল শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই এখানে বসবাস করছে। সমতলের ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে তাদের সম্পর্ক থাকলেও পাহাড়ে তাদের অবস্থান বহু শতাব্দীর।
  • ম্রো: ডক্টর রবার্ট উইনস্টেড (১৯১৭) তাঁর গবেষণায় আরও বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, ম্রোরা সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীনতম অধিবাসী, যারা এমনকি চাকমাদের আগমনের আগে থেকেই এই পাহাড়ের আদিম জনপদ গড়ে তুলেছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল চাকমা-মারমাদের আবাস নয়, বরং এটি বহু জাতি ভাষার মিলনস্থল। ১৮৩০-এর দশকের ব্যাপটিস্ট মিশনারি রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, বম জনগোষ্ঠী অনেক আগে থেকেই দক্ষিণ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃতিপূজারী হিসেবে বসবাস করছিল। . নাসির উদ্দীনের (২০০১) গবেষণা মতে, খুমি, খিয়াং, লুসাই এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। ভাষাগত দিক থেকেও এই বৈচিত্র্য অনন্য। . হাসান আহমেদ (২০০৮) তাঁর সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা চাকমা ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর নিজস্ব ব্যাকরণ উচ্চারণ পদ্ধতি রয়েছে, যা প্রমাণ করে এই প্রতিটি জাতি নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে এখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে আছে।

একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গিয়েছিল। তবে ঐতিহাসিক আব্দুল করিম (১৯৯২) তাঁর "History of Bengal: Mughal Period" গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন যে, বখতিয়ার খিলজির অভিযান মূলত বাংলা বিহারের সমতল অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। মধ্যযুগ জুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন উপজাতীয় রাজাদের মাধ্যমেই শাসিত হয়েছে এবং বখতিয়ার খিলজি কখনোই পার্বত্য চট্টগ্রামে পা রাখেননি।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সুপ্রাচীন জনতাত্ত্বিক কাঠামো এক বড় সংকটের মুখে পড়ে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (১৯৯২) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (২০০১) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশির দশক থেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার হাজার বাঙালি সেটেলারদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে আদিবাসীদের নিজস্ব ভূমি থেকে বিচ্যুতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রফেসর জেমস জে. ফ্রিডারস (২০০২) এই পরিস্থিতিকে 'রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উপনিবেশায়ন' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আদিবাসীদের 'অভিবাসী' হিসেবে প্রমাণের যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হয়েছে, তা মূলত তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার একটি ঔপনিবেশিক হাতিয়ার মাত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ইতিহাস কোনো অস্পষ্ট ধারণা নয়, বরং এটি রিসলি, বাকল্যান্ড বা আব্দুল করিমের মতো পণ্ডিতদের দ্বারা স্বীকৃত দালিলিক সত্য। তাদের নিজস্ব ভাষা, রাজবংশ এবং ভূমি অধিকার হাজার বছরের পুরনো। এই সত্যকে অস্বীকার করা কেবল ইতিহাস বিকৃতি নয়, বরং একটি প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শামিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত শান্তি উন্নয়নের জন্য এই ঐতিহাসিক সত্যকে গ্রহণ করে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা অপরিহার্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মেগা প্রকল্প নয়, আগে ন্যায্যতা- ইনজেব চাঙমা

  গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের...