শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

লিটল ম্যাগাজিন: ভাষা ও নির্ভিক সংগ্রাম - ইনজেব চাঙমা


লিটল ম্যাগাজিনকে শুধু ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো একটি মঞ্চ ভাবলে তার অর্ধেক পরিচয় আড়ালে থেকে যায়। সে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও গভীরে গিয়ে সে প্রশ্ন তোলে ভাষার প্রতি, অভ্যাসের প্রতি, পিঠ চাপড়ানোর সংস্কৃতির প্রতি। গড়পড়তা সাহিত্যের আবহাওয়া, 'দাদা-দিদি'দের বলয়, প্রাতিষ্ঠানিক রুচির শাসন— সবকিছুর দিকেই লিটল ম্যাগাজিন আঙুল তোলে। তার অস্তিত্বের শর্তই হলো অসম্মতি। সবসময় যে তাকে মলাটবদ্ধ ম্যাগাজিন হতে হবে তাও নয়। একটা লিফলেট, একটা দেয়াললিখন, একটা জেরক্স করা প্যামফ্লেটও নিজের চরিত্রগুণে লিটল ম্যাগাজিন হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়।

লিটল ম্যাগাজিনের আন্তর্জাতিক ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, তার জন্ম সংকট ও সংঘাতের গর্ভে। ১৮৪০ সালের আমেরিকা। গৃহযুদ্ধের আর মাত্র দুই দশক বাকি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষমতাকে প্রশ্ন তোলার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। সেই সময় বস্টন থেকে প্রকাশিত হয় 'দ্য ডায়াল'। র্যালফ ওয়াল্ডো এমারসন ও মার্গারেট ফুলার সম্পাদিত এই পত্রিকাকে প্যামফ্লেট বললেও ভুল হয় না। ট্রান্সেন্ডেন্টালিস্ট আন্দোলনের মুখপত্র হয়ে 'দ্য ডায়াল' প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, ইউরোপকেন্দ্রিক চিন্তা ও বস্তুবাদী জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ছোট্ট এই পত্রিকার হাত ধরেই লিটল ম্যাগাজিনের ধারণার জন্ম।

এরও প্রায় পঞ্চাশ বছর পর ১৮৯৬ সালে লন্ডনে আর্থার সাইমনসের সম্পাদনায় বেরোয় 'দ্য স্যাভয়'। ভিক্টোরিয়ান যুগের কপট নৈতিকতা ও রক্ষণশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে এই পত্রিকা তীব্র প্রতিবাদ তোলে। অব্রে বিয়ার্ডসলির অলংকরণ, ইয়েটসের কবিতা, সাইমনসের প্রবন্ধ— সব মিলিয়ে 'দ্য স্যাভয়' হয়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠানের আতঙ্ক। ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার যে সাহস, তা লিটল ম্যাগাজিনের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।
বিংশ শতকের শুরুতে ১৯১২ সালে হেরিয়েট মনরো ও এজরা পাউন্ডের হাতে শিকাগো থেকে পথচলা শুরু করে 'পোয়েট্রি: এ ম্যাগাজিন অফ ভার্স'। অলংকার-সর্বস্ব কবিতার ধারণা ভেঙে এই পত্রিকাই ইমেজিজম, আধুনিকতাবাদের বীজ বপন করে। টি এস এলিয়টের 'দ্য লাভ সং অফ জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক' প্রথম ছাপা হয় এই পত্রিকাতেই।
বিশ্বসাহিত্যের এই ধারার সমান্তরালে বাংলাতেও লিটল ম্যাগাজিন নিজের পথ কেটে নেয়। ১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত 'সবুজপত্র'কে বাংলার প্রথম সচেতন লিটল ম্যাগাজিন বলা চলে। 'সবুজপত্র' শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, ছিল একটি আন্দোলন। সাধু ভাষার এলিটিজম ভেঙে চলিত ভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদা দেওয়া, যুক্তি ও মননের চর্চাকে প্রাধান্য দেওয়া— এই পত্রিকার হাত ধরেই বঙ্গ সাহিত্যে আধুনিকতার বোধ তৈরি হয়। আজও অনেকেই যে কোনো পরীক্ষামূলক পত্রিকাকে আদর করে 'সবুজপত্র' বলে ডাকেন।

ষাটের দশকে এই ধারায় সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটায় হাংরি আন্দোলন। মলয় রায়চৌধুরী, সুবিমল বসাক, দেবী রায়, ফাল্গুনী রায়, বাসুদেব দাশগুপ্তেরা একজোট হয়ে প্রচলিত সমস্ত ধারণাকে নস্যাৎ করেন। তাঁদের হাতিয়ার ছিল 'হাংরি বুলেটিন' সহ নানা লিটল ম্যাগাজিন। শ্লীল-অশ্লীলের ধারণা, কবিতার বিষয়, ভাষার ব্যাকরণ— সমস্ত বাঁধন ভেঙে তাঁরা শব্দকে মুক্তি দেন। মার্কিন বিট প্রজন্মের অ্যালেন গিন্সবার্গ ও জ্যাক কেরুয়াকের প্রভাব তাঁদের উপর পড়েছিল, কিন্তু হাংরিদের প্রতিবাদ ছিল একেবারে এদেশের মাটি, রাষ্ট্র ও সমাজকে ঘিরে। মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতার জন্য মামলা, গ্রেফতার— এসবই প্রমাণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে লিটল ম্যাগাজিন কতটা ভয়ের কারণ হতে পারে।
হাংরি আন্দোলনের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। অনেকেই তাঁদের ভাষা ও ভঙ্গিকে গ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু এই আন্দোলন বাংলা কবিতা ও গদ্যের যে জমাট বরফ ভেঙে দিয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

লিটল ম্যাগাজিনের সবচেয়ে জরুরি কাজ বোধহয় ভাষাকে তার প্রাতিষ্ঠানিক ছায়া থেকে মুক্ত করা। সেই মুক্তির লড়াই আজও চলছে। তার সাম্প্রতিক উদাহরণ চাঙমা ভাষার লিটল ম্যাগাজিন 'চাদি'। নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর চাঙমা ভাষা ও চাঙমা বর্ণমালায় এই পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। মূলধারার প্রকাশনা শিল্প যেখানে সংখ্যালঘু ভাষার সাহিত্যকে জায়গা দেয় না, সেখানে নিজের হরফে, নিজের ভাষায় ১৪টি সংখ্যা প্রকাশ করা নিজেই এক রাজনৈতিক উচ্চারণ। এটি কেবল সাহিত্যচর্চা নয়, ভাষা বাঁচানোর লড়াই এবং আত্মপরিচয়ের দৃঢ় ঘোষণা।
তথ্য: দৈনিক প্রথম আলো, ২২ জুলাই ২০২২

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

লিটল ম্যাগাজিন: ভাষা ও নির্ভিক সংগ্রাম - ইনজেব চাঙমা

লিটল ম্যাগাজিনকে শুধু ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো একটি মঞ্চ ভাবলে তার অর্ধেক পরিচয় আড়ালে থেকে যায়। সে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে ঠিকই, কিন্তু তার চ...