চাঙমা সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, এটি এক জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত উচ্চারণ। এককালে এই সাহিত্য চর্চা হতো নিজস্ব অঝাপাত বা চাঙমা বর্ণমালায়। “গোজেন লামা”, “মা-বাবর বারমাস”, “লক্ষীপালা” কিংবা “চান্দবি”—এসব গ্রন্থ ছিল পাহাড়ি জনপদের প্রকৃত হৃদস্পন্দন। অঝাপাতের হরফে লেখা পুঁথিগুলো একসময় ঘরে ঘরে উচ্চারিত হতো; গানে-কথায় বয়ে চলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
কালের নির্মম স্রোতে নিজস্ব লিপির ব্যবহার ক্ষীণ হয়ে আসে। জীবনের তাগিদে ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার চাপে চাঙমা মনন আশ্রয় নেয় বাংলা বর্ণমালায়। তবে ভাষা তার মাধুর্য হারায়নি, বরং সেজেছে নতুন বসনে।
১৯৩৬ সাল—চাঙমা সাহিত্যের আধুনিক যাত্রার এক মাইলফলক। চাঙমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত “গৈরিকা” পত্রিকায় বাংলা হরফে প্রথম আধুনিক চাঙমা কবিতা লেখেন চিত্রশিল্পী সুনানু চুণিলাল দেওয়ান। তাঁর পথ ধরে কলম ধরেন সুনানু মুকুন্দ চাঙমা ও সুনানু সলিল রায়। সেই যে শুরুর যাত্রা, তারপর আর থামেনি।
সত্তরের দশক ছিল চাঙমা সাহিত্যের নবজাগরণ। চাঙমা ভাষায় নতুন গান, কবিতা ও নাটক কেবল রচিতই হয়নি, বরং নিয়মিত মঞ্চস্থ হতে থাকে। সাহিত্যের এই ধারায় যোগ হয় নতুন মাত্রা—উপন্যাস। সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা-র ৪টি চাঙমা উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই ভাষার গদ্য সাহিত্যের ভিত্তি আরও মজবুত হয়। পরবর্তীতে কম্পিউটারে ব্যবহারোপযোগী চাঙমা ফন্ট উদ্ভাবিত হওয়ার পর নিজস্ব বর্ণমালাও আবার মুদ্রণের আলোয় ফেরার সুযোগ পায়।
এই সমৃদ্ধ ধারাকে সময়ের সাথে শাণিত করেছেন একঝাঁক কালজয়ী স্রষ্টা: দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, ড. ভগদত্ত খীসা, সুহৃদ চাঙমা ও কবিতা চাঙমা। মৃত্তিকা চাঙমা, প্রমোদ বিকাশ কার্বারী (ফেলাযেয়া চাঙমা), বীর চাঙমা ও কৃষ্ণ চন্দ্র চাঙমা। রণজিত দেওয়ান, সমিত রায়, চিরজ্যোতি চাঙমা, শান্তিময় চাঙমা ও ঝিমিত ঝিমিত চাঙমা প্রমুখ।
তাঁদের ছড়া, কবিতা, গীত ও নাটক চাঙমা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে করেছে ঐশ্বর্যময়। সম্প্রতি জাবারাং ভাষা বিকাশ উদ্যোগ ও কক ক্রিয়েটিভিটিস-এর যৌথ প্রয়াসে প্রকাশিত “আবেদি” (১২তম কবিতা সংকলন) প্রমাণ করে অঝাপাত মরেনি, সে ফিরছে নতুন প্রজন্মের হাতে।
যদিও ২০২৬ সালের বিঝু উৎসবে নতুন কোনো গ্রন্থের সুবাস সেভাবে পাওয়া যায়নি, তবু চাঙমা সাহিত্য একাডেমির “হিলর পচ্জন” ও “চাদি” পত্রিকা দুটি নিয়মিত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখছে। তবে সাফল্যের আড়ালে কিছু বেদনার ক্ষতও রয়ে গেছে। কবি উদয় শংকর চাঙমার “আন্নো খেইয়্যা ডাইয়িরে” কবিতাগ্রন্থটি কেবল অর্থাভাবে আলোর মুখ দেখতে পারছে না। প্রকাশ পেলে হয়তো এবারের বিঝু আরও রঙিন এবং জাতির কণ্ঠস্বর আরও শাণিত হতো।
চাঙমা সাহিত্য অঝাপাতে জন্ম নিয়ে বাংলা হরফের নৌকায় চড়ে আধুনিকতার সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। আজ সে আবার ফিরতে চাইছে নিজের লিপির ঘরে। এই ফেরার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়—আর্থিক দৈন্য, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা আর পাঠকের সংকট তো রয়েছেই। তবু যতদিন “হিলর পচ্জন”-এর পাতা উল্টাবে কোনো কিশোর, যতদিন “চাদি”-তে ছাপা হবে নতুন কবিতা, ততদিন চাঙমা সাহিত্যের প্রদীপ নিভবে না।
ভাষা মরে না, সে কেবল অপেক্ষায় থাকে—একটি যোগ্য উচ্চারণের এবং একজোড়া মমতাভরা হাতের, যে তাকে আবার লিখবে অঝাপাতে, পড়বে এবং ভালোবাসবে। চাঙমা সাহিত্য তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, সে এক সোনালী ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
ধর্ম:
১. ধাম্মাপাদা- ভিক্ষু তি রতন জ্যোতি
২. উদ্যান - ভিক্ষু তি রতন জ্যোতি
উপন্যাস-
1. “ফেবো” লেঘিয়্যা সুনানু দেবপ্রিয় চাঙমা, যুনিও নানান পত্রিকাত উপন্যাস ইজেবে কোই কয় আজলে ইবে এক্কো ছোটগল্প। ফগদাঙ- ২০০৪
2. “মেগুল দেবা আহ্’ঝি” লেঘিয়্যা সুনানু সুরোজ কান্তি চাঙমা, ফগদাঙি: কল্পতুরু রাঙামাত্যা, ফগদাঙ: ২০১৯ খ্রি.
3. “মনবি” লেঘিয়্যা: সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা, ফগদাঙি: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খগাড়াছড়ি; ফগদাঙ: ২০১৯ খ্রি.
4. তুই এভে ভিলে লেঘিয়্যা: শ্যামলকান্তি তলুকদার
5. “তিন ফাগারা “ সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা – ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
6. ”অমা কবি“- সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা
7. মালাচান- সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা
ম্যাগাজিন:
1. “মা ভাচ (মাতৃভাষা)” ফগদাঙি: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খগাড়াছড়ি।
2. “চাদি” ১ – ১১ পয়ধে (চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা): ফগদাঙি- নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ; ফগদাঙ: ২০২২ খ্রি. ১০ নভেম্বর। ইবে ধারাদিঘলী ফগদাঙ অই যার।
3. “তারুম” কাবিদ্যাঙ: উদয় শংকর চাঙমা, রাঙামাত্যা ফগদাঙ: ১ জুলাই ২০১৭ খ্রি. ২ পয়ধে সং ফগদাঙ।
কবিদে:
1. “ফুল বারেঙ” লেঘিয়্যা- সুনানু আলোময় চাঙমা, ফগদাঙি: কল্পতুরু, রাঙামত্যা, ফগদাঙ: ২০১৮ খ্রি.
2. “ধেবা কুল্যা নাগরি” লেঘিয়্যা: সুনানু সোহেল তালুদার ফগদাঙি: পূর্ণিমা প্রেস, খাগাড়াছড়ি; ফগদাঙ ২০১৯ খ্রি.
3. এচ্যা বিঝুত মা গঙ্গিত তরে দ্বিবে বিঝু ফুল - তরুণ কুমার চাঙমা
4. “জুম চাব” – কাবিদ্যাঙ ইনজেব চাঙমা
5. “আহ্’ভিল্যাচ” লেঘিয়্যা” বিনয় বিকাশ তালুতদার, ফগদাঙি: ২০১৮ খ্রি.
6. “আহ্’লি গাদিয়্যা মালি ফুল” প্রিয়দর্শী চাঙমা
7. মেঘ সেরে মোন’ চুক” সুনানু মৃত্তিকা চাঙমা, ঢাকা বই মেলা ২০১১ খ্রি.
8. নুঅ গরি ফাগোন এযের- ম্যাকলিন চাঙমা
9. ধনপুদি” – সুনানু ইনজেব চাঙমা (ফগদাঙ: নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ- ১ আগষ্ট ২০২২খ্রি.)
10. উত্তিপুত্তি - সুনানু ইনজেব চাঙমা (ফগদাঙ: নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ- ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩খ্রি.)
11. পুগবেল (চাঙমা কবিদ্যা সংকলন)- কাবিদ্যাঙ, ইনজেব চাঙমা; ফগদাঙ: নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)
12. আবেদি (চাঙমা কবিদ্যা সংকলন)- ২০২৫ খ্রি.
ছড়া:
1. “জুনিপুক” লেঘিয়্যা: সুনানু শ্যামল তালুকদার, ফগদাঙি: কধা ফগদাঙি, ফগদাঙ: ২০১৭ খ্রি.
2. “ওলি ওলি” কাবিদ্যাঙ: ব্যারিষ্টার সুনানু দেবাশীষ রায় আ সুনানু দেবপ্রিয় চাঙমা
3. মিল কধা নকবাচ” মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আ জাবারাং
পত্রিকা
1. “করোদি” কাবিদ্যাং সুভাশীষ চাঙমা, ২০১৫ খ্রি তিন পয়ধে সং ফগদাঙ।
2. চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা “চাদি” – কাবিদ্যাঙ-ইনজেব চাঙমা ধারাদিঘলী ফগদাঙ অর।
চিজি বই
১. (১) শব্দ কোই,
২. (২) তারুম আ রানজুনি- ইনজেব চাঙমা, সোনামণি চাঙমা, তুহিন চাঙমা।
৩. (১) চিজি অংক তারা,
৪. (২) অঝাপাদর ছড়া,
৫. (৩) এয’ অংক শিঘি- শান্তি চাঙমা, শ্রেয়সী চাঙমা, কে.ভি. দেবাশীষ।
৬. (১) ছড়া বই-
৭. (২) এক সমারে ভালক্কানি- প্রসন্ন কুমার চাঙমা, প্রিয়সী চাঙমা, মণি চাঙমা।
৮. (১) চাঙমা শব্দ বই-
৯. (২) চিজির তালমিলতি কধা- সম্ভুমিত্র চাঙমা, পরেশ চাঙমা, এলিয়েন্স চাঙমা।
১০. (১) হ্’েমান আ পেইক
১১. (২) মনর সবন- জ্ঞানদর্শী চাঙমা, এজেন্সী চাঙমা, পুর্ণাঙ্গ চাঙমা।
১২. (১) আমা ফল পাগোর আ গুলগুলি-
১৩. (২) চিজির অহ্’রক বই- আর্য্যমিত্র চাঙমা, কুশলী চাঙমা, লক্ষীপতি চাঙমা।
১৪. ইক্কুল’ অক্ত- ভবেশ মিত্র চাঙমা, লুসী চাঙমা, নীল চন্দ্র চাঙমা।
অনুবাদ বই
|
রাজা আ কংজরি |
|
মিলে ফুতবলার আনাই আ আনুচিং মারমা |
|
বাক আ সিংহ |
|
মেলাত আহ্’রা-আহ্’রি |
|
শিয়াল্যা আ ত বোবুয়া |
|
আনাচ মাধাত এ্যাইল মুকুট |
|
রাঙা বল |
|
আহ্’ওচ |
|
মাচ তোগেয়্যা বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত অত্নজীবনী |
অভিধান:
3. চাঙমা-বাঙলা কধাতারা- জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর- ১৯৭৩
4. চাঙমা কধা ভান্ডাল- সি. আর চাকমা- ১৯৮৭
5. চাকমা ডিক্সসিনারি- পিবি কারবারি – ১৯৯৩
6. চাঙজ্জা – ২০০৬
7. দভাকাধি- TSUBP – ২০০৭
8. চাকমা শব্দ ভান্ডাল – আর্য্যমিত্র চাঙমা- ২০১১
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন