কখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে বাড়ির উঠান। ঘরের পুরোনো টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ করে পানি পড়ছে। টিনগুলো কেনা হয়েছিল ২০০৪ সালে। এতদিনে জং ধরে অনেক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে।
কিন্তু এই আনন্দময় পরিবেশের মাঝেও তজিমের মন ভারী হয়ে আছে। আকাশের মেঘলা চেহারার মতোই তার মনটাও যেন বিষণ্ণ।
একসময় তার সংসার ছিল ভরপুর। তখন তার স্ত্রী নাগরো ছিল পাশে। ছোট্ট হলেও ছিল তাদের একটি সুখী সংসার। অভাব ছিল না তেমন। ছেলে-মেয়েরা নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করত। সন্ধ্যায় সবাই একসাথে বসে গল্প করত। নাগরো রান্নাঘর থেকে ডাক দিত—
“ওই, হাত-মুখ ধুয়ে এসো। ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
সেই ডাক এখনো যেন তার কানে ভেসে আসে।
নীরবে বসে দাবা থানতে থানতে হঠাৎ পুরোনো দিনের স্মৃতি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনে হলো সময় যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পাঁচ বছর আগের সেই দিনগুলোতে।
তখন তজিম নিজের সমস্ত সময় ও শক্তি উৎসর্গ করেছিল তার মাতৃভাষা—চাঙমা ভাষা রক্ষার কাজে।
গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে সচেতন করা, নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা শেখানো, ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য সভা করা—এসব কাজেই তার দিন কেটে যেত। অনেকেই তাকে পাগল বলত।
কেউ বলত,
“ভাষা দিয়ে কি পেট ভরবে?”
কেউ আবার হাসতে হাসতে বলত,
“এইসব করে লাভ কী?”
কিন্তু তজিম থামেনি। কারণ সে জানত—ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মা।
এই সংগ্রামের পেছনে নীরব শক্তি হয়ে ছিল তার স্ত্রী নাগরো। সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে। মাঠের কাজ, ঘরের কাজ, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা—সবই সামলাত ধৈর্য আর ভালোবাসা দিয়ে।
একদিন রাতে নাগরো তাকে বলেছিল—
“তুমি তোমার কাজ করো। ভাষার জন্য কাজ করা খারাপ কিছু না। সংসারটা আমি দেখছি।”
তজিম তখন চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই চোখে ছিল কৃতজ্ঞতা।
কিন্তু সময় সবসময় মানুষের ইচ্ছার মতো থাকে না।
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল নাগরো। প্রথমে সবাই ভেবেছিল সাধারণ । কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। হাসপাতালে নেওয়ার পরে
সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।
সেই দিন থেকেই যেন তজিমের জীবনে এক অদৃশ্য শূন্যতা নেমে আসে।
সংসারের ভার এখন তার একার কাঁধে।
এখন তার মেয়ে অনার্সে পড়ে। ছেলে নবম শ্রেণিতে। তাদের পড়াশোনার খরচ দিন দিন বাড়ছে। অথচ তার নিজের আয় খুবই কম।
ঠিক তখনই হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল মেয়ের নাম।
তজিম ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মৃদু কণ্ঠে মেয়েটি বলল—
“বাবা, ৫০০ টাকা পাঠাবে? জরুরি লাগবে।”
কথাটা শুনে তজিমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
এই মুহূর্তে তার কাছে একটাও টাকা নেই।
সে পকেট হাতড়ে দেখল। পুরোনো একটি কাগজ ছাড়া আর কিছুই নেই। মনে হলো যেন শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরেছে।
কিন্তু মেয়েকে কি করে বলবে—
“মা, আমার কাছে টাকা নেই”?
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে শুধু বলল—
“আচ্ছা মা, পাঠিয়ে দেব।”
তারপর ধীরে ধীরে কলটা কেটে দিল।
ফোনটা নামিয়ে রেখে তজিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বাইরে তখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। মনে হলো প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতরে গিয়ে বাজছে।
এমন সময় তার মায়ের কথাগুলো আবার কানে ভেসে উঠল—
“তজিম, তুমি আর কতদিন এভাবে অভাবে থাকবে? তোমার তো জমি-জমা আছে, বাগান-বাগিচা আছে। সমাজের কাজ একটু কমিয়ে নিজের কাজ করলে তো অভাব থাকবে না।”
বাবাও প্রায়ই বলেন—
“মানুষের জন্য কাজ করা ভালো, কিন্তু নিজের সংসারের কথাও ভাবতে হয়।”
ভাই-বোনেরাও একই কথা বলে।
তজিম এসব কথা শুনে শুধু মৃদু হাসে। কখনো তর্ক করে না,
কাউকে বোঝানোরও চেষ্টা করে না।
কারণ সে জানে—তার পথটা সহজ নয়।
তার হৃদয়ের গভীরে একটি প্রতিজ্ঞা জ্বলছে।
সে মনে মনে বারবার বলে—
“যতদিন না চাঙমা ভাষা তার প্রাপ্য সম্মান পায়, যতদিন না আমাদের ভাষা মুক্তভাবে বেঁচে থাকে, ততদিন আমি এই পথ ছেড়ে যাব না।”
অভাব তাকে কষ্ট দেয়,
কিন্তু দুর্বল করে না।
হাজারো সংকটের মাঝেও তজিম নিজের সংগ্রামকে কখনো ব্যর্থ মনে করে না। কারণ সে জানে—তার এই লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়।
এটি তার মাতৃভাষার জন্য।
তার সংস্কৃতির জন্য।
তার জাতির ভবিষ্যতের জন্য।
বাইরে তখনও বসন্তের বাতাস বইছে। দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে। ফুলের সুগন্ধে ভরে আছে চারপাশ।
তজিম ধীরে ধীরে উঠল। ভেজা উঠানের দিকে তাকাল। তারপর আকাশের দিকে চোখ তুলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
মনে হলো নাগরো যেন কোথাও থেকে তাকে দেখছে।
হঠাৎ তার বুকের ভেতর নতুন এক দৃঢ়তা জন্ম নিল।
ফাগুনের এই দিনে সে আবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—
“আমি থামব না।”
“যত কষ্টই আসুক, আমি থামব না।”
প্রকৃতির আনন্দের মাঝেও এক মানুষের সংগ্রাম চলতেই থাকে—নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে, অটুট বিশ্বাস নিয়ে।
ফাগুনের ফুল একদিন ঝরে যাবে।
বসন্ত চলে যাবে।
কিন্তু তজিমের প্রতিজ্ঞা ঝরবে না।
কারণ সে জানে—
একটি ভাষা বাঁচলে তবেই বাঁচবে একটি জাতির আত্মা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন