বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

বিঝু: অস্তিত্ব রক্ষার সাংস্কৃতিক সংগ্রাম


 হাজারো বেদনা, শত যন্ত্রণা আর বাস্তুভিটা হারানোর দীর্ঘ ইতিহাস বয়ে চলেছে জুম্ম জাতির জীবনপথে। দেশ থেকে দেশান্তরে, পাহাড় থেকে সমতলে—উচ্ছেদ, দখল, যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় অবহেলার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেছে এই জনগোষ্ঠী। তবু সমস্ত ক্ষত, সমস্ত নিঃশব্দ কান্নার মধ্য দিয়েও বিঝু আসে—পাহাড়ের বুক জুড়ে আসে। বনজ ফুলের ঘ্রাণে, ঝরনার কলতানে, মানুষের চোখের গভীর প্রত্যয়ে বিঝু জানান দেয়—জুম্ম জাতি এখনও টিকে আছে।
বিঝু কোনো সাধারণ উৎসব নয়। এটি জুম্ম জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। যুগের পর যুগ ধরে এই উৎসব পাহাড়ি মানুষের জীবনচক্রে বুনে দিয়েছে মিলন, স্মৃতি ও প্রতিরোধের অনিবার্য সুতো। ইতিহাস যতবারই এই জাতিকে মুছে দিতে চেয়েছে, ততবার বিঝু নতুন করে ঘোষণা করেছে—এই জনগোষ্ঠীর ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে, স্মৃতি আছে।

প্রতি বছর বিঝু আসার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম থেকে শহর—সবখানে শুরু হয় এক নীরব প্রস্তুতি। ঘরের আঙিনায়, পাড়ার মোড়ে, শহরের উন্মুক্ত প্রান্তরে বসে বিঝু মেলা। ঢোল, বাঁশি ও গানের তালে পাহাড় মুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আয়োজন কি কেবল বিনোদনের জন্য? নাকি এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্বও বহন করে?

কারণ বিঝু শুধু আনন্দের উৎসব নয়—এটি স্মৃতি ও সংগ্রামের উৎসব। এই উৎসবের গভীরে লুকিয়ে আছে জুম্ম জাতির ভাষা, লোকসাহিত্য, বেদনার ইতিহাস এবং টিকে থাকার লড়াই। একসময় আগুনের পাশে বসে যে গল্প বলা হতো, যে ভাষায় মা সন্তানকে ঘুম পাড়াত—আজ সেই ভাষা ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। ভাষা হারানো মানে কেবল শব্দ হারানো নয়; ভাষা হারানো মানে ইতিহাস, চিন্তা ও আত্মপরিচয় হারানো।


এই সংকটময় বাস্তবতায় বিঝু মেলা হয়ে উঠতে পারে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ক্ষেত্র। এখানে শুধু নাচ-গান নয়—থাকতে হবে মাতৃভাষায় কবিতা পাঠ, লোককথা বলা, ঐতিহ্যবাহী নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আলোচনা। শিশু-কিশোরদের জন্য বিঝু হতে পারে মাতৃভাষা শেখার প্রথম বিদ্যালয়, তরুণদের জন্য ইতিহাস জানার মঞ্চ, আর প্রবীণদের জন্য স্মৃতি হস্তান্তরের দায়বদ্ধ পরিসর।


যদি বিঝু কেবল নাচ-গানের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শাসক সংস্কৃতির ভোগবাদী কাঠামোর অংশ হয়ে যাবে। কিন্তু বিঝু যদি হয়ে ওঠে ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য রক্ষার মঞ্চ—তবে তা হবে এক নীরব কিন্তু দৃঢ় সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এই প্রতিরোধ অস্ত্রহীন, কিন্তু গভীর; উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।

এই বিঝুতে আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট দায়িত্ব দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি বিঝু উদ্‌যাপন কমিটি, প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রতিটি সচেতন পাহাড়ি মানুষের প্রতি আহ্বান—বিঝুকে ফিরিয়ে দিন তার সংগ্রামী চেতনায়। গান হোক, নৃত্য হোক—কিন্তু তার সঙ্গে থাকুক ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও স্মৃতির চর্চা। কারণ বিঝু বাঁচলে কেবল একটি উৎসব বাঁচে না—বেঁচে থাকে জুম্ম জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিঝু: অস্তিত্ব রক্ষার সাংস্কৃতিক সংগ্রাম

  হাজারো বেদনা, শত যন্ত্রণা আর বাস্তুভিটা হারানোর দীর্ঘ ইতিহাস বয়ে চলেছে জুম্ম জাতির জীবনপথে। দেশ থেকে দেশান্তরে, পাহাড় থেকে সমতলে—উচ্ছেদ, দ...