জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর রূপ বদলায়—এ কথা ধ্রুব সত্য। কিন্তু সময়ের আবর্তে মানুষের মনস্তত্ত্ব, দায়বদ্ধতা আর সম্পর্কের সমীকরণগুলোও যে এতটা নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে, তা আমার দীর্ঘ চব্বিশ বছরের পথচলা না হলে অজানা থেকে যেত। ২০০৪ সালে যখন মাতৃভাষা রক্ষার পবিত্র ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করি, তখন ভেবেছিলাম পাহাড়ি জনপদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ভাষার প্রশ্নে আমরা সবাই এক মোহনায় মিলিত হব। কিন্তু অভিজ্ঞতার ঝুলি আজ বলছে—আদর্শের মুখোশ পরা মানুষের আসল রূপ চিনতে দীর্ঘ সময়ের দহন প্রয়োজন।
আমার এই যাত্রার বীজ বপন করা হয়েছিল ২০০৪ সালে। মেরুং, চংড়াছড়ি হাই স্কুলে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা শিক্ষার প্রথম ব্যাচ চালুর মধ্য দিয়ে যে আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত হয়, তা ক্রমে বাজেইছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৬ সাল নাগাদ যখন আঞ্চলিক দল জেএসএস-এর ভাঙন শুরু আর দেশে ১/১১-এর জরুরি অবস্থা জারি হয়, তখন চারদিকের অস্থিরতা আমার কাজেও ছায়া ফেলে। ২০০৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আমি কুদুকছড়িতে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিই। শারীরিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও থামেনি আমার পাঠদান। সেখান থেকে জান্দিমুড়, শিবঙ্গপাড়া (২০০৮-২০১০) হয়ে প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে আমি ফিরে আসি দিঘীনালার।
২০১৫ সাল থেকে দিঘীনালায় পূর্ণ শক্তিতে নিজেকে নিয়োজিত করি। লক্ষ্য ছিল একটাই—চাঙমা ভাষা, বর্ণমালা ও সাহিত্যের পুনর্জাগরণ। এই দীর্ঘ যাত্রায় স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা আর আর্থিক, মানসিক সহযোগিতা আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ভাষা রক্ষায় দীর্ঘ মিছিলে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন একঝাঁক নিঃস্বার্থ ভাষাপ্রেমী। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার অধিক শিক্ষার্থীকে চাঙমা বর্ণমালার প্রাথমিক পাঠ দিতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের এই কাজ বিভিন্ন এনজিও ও সামাজিক সংগঠনের দৃষ্টি কেড়েছে, অর্জিত হয়েছে সম্মাননা। কিন্তু এই সাফল্যের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে কিছু দহনগাথা, যা বলতে দ্বিধা জাগলেও ইতিহাসের প্রয়োজনে বলা জরুরি।
২৪ ডিসেম্বর ২০১৫, দিঘীনালা সাংস্কৃতিক একাডেমি হলরুমে ৩৯৭ জন শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেট প্রদান অনুষ্ঠানের পর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। ডিজিএফআইরা সিভি ও সার্টিফিকেটের ফটো কপি চাওয়া এবং পরবর্তীতে গবেষক সুনানু আনন্দ মোহন চাঙমার বাড়িতে গিয়ে তথ্যানুসন্ধান আমাদের কাজের স্বাভাবিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, মেরুং, লাম্বাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সুনানু দীপাংশু চাকমার কক্ষ দিতে অস্বীকৃতি এবং ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল বাবুছড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের "টেবিল ভেঙে যাবে" এমন হাস্যকর অজুহাতে কক্ষ না দেওয়া আমাদের শিক্ষার প্রতি অনুদার মানসিকতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বাবুছড়া ফ্রেন্ডশিপ স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ইউএনও জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম এবং উদ্বোধক হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান সুনানু নবকমল চাঙমা উপস্থিত থাকলেও, কেবল ব্যানারে নাম না থাকার অভিমানে বাবুছড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সুনানু পরিতোষ চাঙমা অনুষ্ঠান ত্যাগ ও হুমকি প্রদান ছিল অত্যন্ত অনভিপ্রেত।
এপ্রিল- ৫, ২০১৭-তে লক্ষীছড়ি উপজেলায় কোর্স উদ্বোধনের আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে প্রদীপ দা অপমানিত হন উপজেলা চেয়ারম্যান সুনানু সুপার জ্যোতি চাঙমা কাছ থেকে এবং আমাকেও ফোনে কটু কথা শুনতে হয়। ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি মালছড়ি সরকারি কলেজে কোর্স পরিচালনায় ছাত্রলীগের কিছু নেতার বাধা ও প্ল্যাকার্ড ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা আমাদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বকেই প্রমাণ করে।
১০ ডিসেম্বর ২০২৪, বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাছে সহযোগিতা নয় হাজার টাকার চাইতে গেলে তাঁর মন্তব্য (সার্টিফিকেট প্রদান অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে)—"দিপুলক্ষ চাঙমা থাকলে আমি থাকবো না"—আমাকে গভীরভাবে আহত করেছে। এমনকি ২০২৫ সালে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় বিঝু ও সাহিত্য মেলা রাজনৈতিক অজুহাতে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। আর ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ দিঘীনালার কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদ অফিস থেকে "অঝাপাত স্কোয়ার" নামক সাইনবোর্ড স্থাপন সংক্রান্ত নোটিশ হাতে পাওয়া, যেন এই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে নতুন নতুন বাধার সম্মুখীন হওয়ারই এক করুণ পরিণতি।
আমার এই লেখাটি কোনো অভিযোগপত্র নয়; এটি মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার নির্যাস। লেখাটি কেবল আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সারাংশও নয়, এটি এই সত্যেরই প্রমাণ যে, ভিন্ন ভাষাভাষীরা অনেক সময় মাতৃভাষা রক্ষায় যতটা আন্তরিক হন, আমাদের নিজেদের সমাজের কিছু মানুষ ততটা হন না। কিন্তু তবুও, পথচলা থামবে না। কারণ মাতৃভাষা কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে, সকল বাধা অতিক্রম করে মাতৃভাষা রক্ষার এই যুদ্ধে আমি লড়ে যাবো, চিরকাল।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন