মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬

রাষ্ট্রের ভাষা আছে, আদিবাসীর ভাষা নেই - ইনজেব চাঙমা


রাষ্ট্র কথা বলে সংবিধান কথা বলে উন্নয়ন কথা বলে কিন্তু বাংলাদেশের আদিবাসীরা যখন কথা বলতে চায়, তখন রাষ্ট্র কানে তুলা গুঁজে রাখে কারণ তারা যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষা রাষ্ট্রের কাছেঅপ্রয়োজনীয়”, “অলাভজনক”, “পিছিয়ে থাকা”—এই তকমাগুলোই যেন তাদের একমাত্র পরিচয়

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম The Guardian বলছে, আগামী ১০০ বছরে পৃথিবী থেকে অন্তত তিন হাজার ভাষা বিলুপ্ত হবে এই ভবিষ্যদ্বাণী কোনো দূরদেশের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বাস্তবতা কারণ এখানে রাষ্ট্রীয় অবহেলা, শিক্ষা-নীতির একচোখা দৃষ্টি আর প্রশাসনিক অনীহার কারণে আদিবাসী ভাষাগুলো প্রতিদিন একটু একটু করে মারা যাচ্ছে

ভাষা গবেষণা সংস্থা Summer Institute of Linguistics জানায়, পৃথিবীতে এমন ৫১টি ভাষা আছে যেগুলোর শেষ একজন বক্তা এখনো জীবিত প্রশ্ন হলোবাংলাদেশে কতটি ভাষা এই তালিকায় ঢোকার অপেক্ষায়? রাষ্ট্র কি কখনো সেই হিসাব কষেছে?

পরিসংখ্যান নির্মম: পৃথিবীর জীবিত ভাষার মাত্র শতাংশ ভাষায় কথা বলে বিশ্বের ৯৪ শতাংশ মানুষ আর বাকি ৯৪ শতাংশ ভাষায় কথা বলে মাত্র শতাংশ মানুষ বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষাগুলো এই ক্ষমতাহীন ৯৪ শতাংশের দলে সংখ্যায় তারা অনেক, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তারা প্রায় অদৃশ্য

বাংলাদেশের Chittagong Hill Tracts কিংবা সমতলের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একটি শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন তার প্রথম পাঠই হয় আত্মবিচ্ছেদের পাঠ মাতৃভাষা নয়তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় প্রভাবশালী ভাষা শিশুটি শেখে, নিজের ভাষাঅকাজের”, “ঘরের ভেতরের”, “পিছিয়ে থাকা এভাবেই রাষ্ট্র এক প্রজন্মকে শেখায়নিজেকে অস্বীকার করতে

Living Tongues Institute for Endangered Languages-এর গবেষক Gregory Anderson বলেন, “যখন কোনো জনগোষ্ঠী মনে করে যে তাদের ভাষা অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়নের পথে বাধাতখনই সেই ভাষা বিলুপ্তির পথে হাঁটেবাংলাদেশে এই ধারণা রাষ্ট্র নিজেই তৈরি করে দিয়েছে চাকরি, আদালত, প্রশাসন, শিক্ষাসবখানেই আদিবাসী ভাষা অনুপস্থিত তাহলে মানুষ শিখবে কীভাবে যে তাদের ভাষার মূল্য আছে?

একটি শিশু কাঁদে, কারণ সে বলতে পারে না তার কষ্টের ভাষা রাষ্ট্রের কাঠামোয় আদিবাসীর অবস্থাও তাই তারা চিৎকার করেকখনো জমির জন্য, কখনো ভাষার জন্য, কখনো অস্তিত্বের জন্য কিন্তু রাষ্ট্র সেই কান্নাকেউন্নয়ন-বিরোধী”, “বিচ্ছিন্নতাবাদী”, “অযৌক্তিক দাবিবলে দমিয়ে দেয়

ভাষাহীন মানুষ মানে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ যার ভাষা নেই, তার ইতিহাসও থাকে না রাষ্ট্রের খাতায় তার জ্ঞানকে বলা হয় লোককথা, তার দর্শনকে কুসংস্কার এভাবেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আদিবাসীদের মানুষ নয়, সমস্যায় পরিণত করে

অথচ ইতিহাস প্রমাণ করেভাষা ফেরানো যায় হিব্রু আইনু ভাষা আজ জীবন্ত, কারণ রাষ্ট্র সেখানে দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশে কেন তা সম্ভব নয়? কেন এখনো আদিবাসী ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করাঝুঁকিপূর্ণমনে হয়? কেন সংবিধানের বহুত্ববাদ কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ?

আদিবাসী ভাষা রক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয় এটি রাষ্ট্রের দায় মাতৃভাষায় শিক্ষা, প্রশাসনিক স্বীকৃতি, গবেষণা লিখিত চর্চার সুযোগএসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া ভাষা বাঁচে না

রাষ্ট্র যদি সত্যিই বহুভাষিক, বহুজাতিক হওয়ার সাহস রাখে, তবে তাকে আগে আদিবাসীদের ভাষা ফিরিয়ে দিতে হবে না হলে একদিন ইতিহাস প্রশ্ন করবেতোমাদের উন্নয়ন কার ভাষায় লেখা হয়েছিল, আর কাদের ভাষা চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল?

ভাষা মারা গেলে মানুষ শুধু চুপ করে নামানুষ ধীরে ধীরে রাষ্ট্র থেকেও মুছে যায়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

রাষ্ট্রের ভাষা আছে, আদিবাসীর ভাষা নেই - ইনজেব চাঙমা

রাষ্ট্র কথা বলে । সংবিধান কথা বলে । উন্নয়ন কথা বলে । কিন্তু বাংলাদেশের আদিবাসীরা যখন কথা বলতে চায় , তখন রাষ্ট্র কানে তুলা ...