ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কিছু জাতি জন্ম নেয় কেবল টিকে থাকার জন্য নয়, বরং প্রতিকূলতার ললাটে জয়ের তিলক এঁকে দেওয়ার জন্য। চাকমা জাতি সেই অদম্য প্রাণশক্তিরই এক অবিনশ্বর নাম। যে জাতির ধমনিতে প্রবাহিত হয় দ্রোহ আর বীরত্বের রক্তধারা, তাদের বিনাশ নেই। আজ সময়ের দাবি হলো সেই রক্তঋণ শোধ করা—নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা আর সংস্কৃতির দীপশিখাকে প্রজ্বলিত রাখার মাধ্যমে।
চাকমা জাতির ইতিহাস কোনো সাধারণ খতিয়ান নয়, এটি নিরন্তর সংগ্রামের এক মহাকাব্য। মোগলদের দাপট কিংবা ব্রিটিশদের কূটকৌশল—কোনো কিছুই এই পাহাড়ী অরণ্যের সন্তানদের মেরুদণ্ডকে নত করতে পারেনি। পাকিস্তান শাসনামলে কাপ্তাইয়ের কৃত্রিম জলরাশি দিয়ে যখন এক বিশাল জনপদকে ডুবিয়ে মারার নীল নকশা করা হয়েছিল, তখনো তারা ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছিল। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশেও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই জাতির স্বকীয়তা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। কিন্তু ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে এই ভূমি ও মানুষের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
আমাদের এই আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইয়ে সবচাইতে ধ্রুপদী ও সাহসী উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছিল মহান সংসদের পবিত্র আঙিনায়। যখন একক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে ক্ষুদ্রতর জাতিসত্তাগুলোকে বিলীন করে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল, তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা -
"আমি একজন চাকমা। আমাদের নিজস্ব ভাষা আছে, বর্ণমালা আছে। আমি কোনোদিন নিজেকে বাঙালি বলিনি।"
তাঁর এই অকুতোভয় ঘোষণা কেবল একটি বাক্য ছিল না; এটি ছিল হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতির অহংকার এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক অমোঘ অঙ্গীকার। তিনি শিখিয়ে গেছেন, নাগরিকত্ব আর জাতিসত্তা এক নয়। আমরা এদেশের নাগরিক, কিন্তু আমাদের হৃদস্পন্দনের ভাষা ও বর্ণমালা আমাদের একান্তই নিজস্ব। লারমার সেই তেজস্বী আদর্শ আজও আমাদের ধমনিতে প্রবহমান।
একটি জাতির আত্মপরিচয় নিহিত থাকে তার ভাষায়। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালা কেবল কতগুলো রেখা নয়, বরং এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের চিন্তা ও দর্শনের প্রতিচ্ছবি। যখন চাপিয়ে দেওয়া হয় ভিন্ন কোনো সত্তা, তখন আমাদের রক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়ায় আমাদের ভাষা। নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে হলো নিজের শিকড় কেটে ফেলা। তাই আমাদের বর্ণমালাকে কেবল অক্ষরের ফ্রেমে বন্দি না রেখে তাকে সাহিত্যের মূলধারায় এবং আধুনিক জ্ঞানের চর্চায় গ্রহণ করতে হবে।
হে আগামীর কাণ্ডারিরা, তোমরা কেবল এক একজন শিক্ষার্থী নও; তোমরা হলে জাতির গর্বের প্রতীক এবং হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের অগ্রদূত।
আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিজেকে সজ্জিত করো, কিন্তু হৃদয়ের মণিকোঠায় গেঁথে রাখো সেই প্রাচীন পাহাড়ী সুর।
নিজের ইতিহাস ও বর্ণমালা নিয়ে নিবিড় পড়াশোনা করো, যাতে কোনো মিথ্যা তথ্য তোমাদের শেকড়কে উপড়ে ফেলতে না পারে।
চাকমা জাতির প্রতিটি সন্তানের শিরায় যে রক্ত বহমান, তা কোনো পরাজয় চেনে না। যারা বারবার মৃত্যুঘণ্টা উপেক্ষা করে ফিরে এসেছে, তাদের নিঃশেষ করার সাধ্য কারও নেই। এখন সময় নিজেকে চেনার, নিজের স্বকীয়তাকে বিশ্বের দরবারে সগৌরবে মেলে ধরার। লারমার সেই স্পর্ধাকে হৃদয়ে ধারণ করে তোমরা এগিয়ে চলো; মনে রেখো, বীরের জাতি কখনো পথ হারায় না, তারা পথ তৈরি করে। শিক্ষা কেবল জীবিকা নয়—শিক্ষা হলো আত্মপরিচয়ের বাতিঘর। সেই বাতিঘরের আলো জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব তোমাদেরই। ইতিহাস তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, ভবিষ্যৎ তোমাদের নামে ডাকছে। এগিয়ে চলো—ভাষার জন্য, সংস্কৃতির জন্য, জাতিসত্তার মর্যাদার জন্য।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন