মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬

বই পড়েই বাঁচবে ভাষা, জাগবে জাতি- ইনজেব চাঙমা

 


ভাষার প্রাণটা ঠিক কোথায় থাকে—এই প্রশ্নটা আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
বর্ণমালা শিখলেই কি ভাষা বাঁচে? ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করালেই কি একটি জাতির ভাষা সমৃদ্ধ হয়?
দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে চাঙমা সাহিত্য একাডেমি একটি মৌলিক সত্য উপলব্ধি করেছে—ভাষার আসল শক্তি থাকে পাঠকের হৃদয়ে। থাকে বই পড়ার অভ্যাসে। বই ছাড়া ভাষা কেবল অক্ষরের কাঠামো হয়, প্রাণ পায় না।
এই উপলব্ধি থেকেই ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুরু হয় বই পড়া আন্দোলন। এই উদ্যোগের উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচালক সুনানু জিতেন চাঙমা। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দিঘীনালা উপজেলা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নবকমল চাঙমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাচালং সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সুনানু দেবপ্রসাদ দেওয়ান, চাঙমা ঔপন্যাসিক আর্য্যমিত্র চাঙমা ও চাঙমা সাহিত্য একাডেমি সুনানু ত্রিদিব কান্তি চাঙমা।
এই আন্দোলন যে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণ মেলে পরবর্তী কার্যক্রমে।

২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দিঘীনালা সরকারি কলেজে বই পড়া আন্দোলনের শুভ উদ্বোধন করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত মাচাং মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুনানু তরুন কান্তি চাঙমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সুনানু ড. রুপন চাঙমা ও সাবেক শান্তি বাহিনী সুনানু দীপঙ্কর প্রসাদ চাঙমা।
এরপর ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দিঘীনালার প্রতিটি উচ্চ বিদ্যালয়ে “শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ” শীর্ষক সেমিনারের মাধ্যমে বইয়ের গুরুত্ব শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—পাঠক তৈরি করা।
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে একাডেমির কর্মীরা একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী বর্ণমালা শিখলেও বই পড়ার সুযোগ ও উপকরণের অভাবে সেই দক্ষতা ধরে রাখতে পারে না। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা মানুষ তৈরি করে না; বই পড়াই মানুষকে চিন্তাশীল করে তোলে।
বই পড়া কেবল জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়, এটি আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের ভাষায় লেখা গল্প পড়ে, নিজের জাতির ইতিহাস জানে, নিজের সংস্কৃতির কথা আবিষ্কার করে—তখন তার ভেতরে জন্ম নেয় আত্মমর্যাদা। তখন সে আর নিজের পরিচয় নিয়ে সংকুচিত হয় না।
এই কারণেই চাঙমা সাহিত্য একাডেমির লক্ষ্য এখন দ্বিমুখী—একদিকে বর্ণমালা ও ভাষা শিক্ষার কাজ অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে বই পড়ার গভীর ও স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা। এজন্য প্রয়োজন সহজপাঠ্য সাহিত্য, প্রয়োজন গ্রামে গ্রামে ছোট পাঠাগার, বই পড়ার আড্ডা ও পাঠচক্র।
আমরা যদি সত্যিই ভাষা বাঁচাতে চাই, তবে কেবল দিবস পালন বা বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। ভাষা বাঁচে তখনই, যখন কেউ আগ্রহ নিয়ে বইয়ের পাতা ওল্টায়।
একটি জাতি জাগে তখনই, যখন তার তরুণেরা পাঠক হয়ে ওঠে।
পরিবর্তনের চাবিকাঠি বই।
আর বই পড়ার অভ্যাসই পারে ভাষাকে বাঁচাতে, জাতিকে জাগাতে।
আজই সময়—বইয়ের দিকে ফিরি,
নিজের ভাষার দিকে ফিরি,
নিজের অস্তিত্বের দিকে ফিরি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বই পড়েই বাঁচবে ভাষা, জাগবে জাতি- ইনজেব চাঙমা

  ভাষার প্রাণটা ঠিক কোথায় থাকে—এই প্রশ্নটা আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বর্ণমালা শিখলেই কি ভাষা বাঁচে? ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করালেই কি এক...