বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬

দিঘীনালার আকাশে বিঝুর রঙ- ইনজেব চাঙমা

 

বিঝু আসে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়—বিঝু আসে স্মৃতিতে, শিকড়ে, রক্তের ভেতর বহমান এক ইতিহাস হয়ে। দিঘীনালার আকাশে যখন রঙিন বেলুন উড়ে উঠল, তখন তা নিছক একটি মেলার উদ্বোধন ছিল না; ছিল শতাব্দীর সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই এবং জাতিগত স্মৃতির এক অনুচ্চারিত ঘোষণা।
৮ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি. বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে দিঘীনালায় অনুষ্ঠিত বিঝু মেলার শুভ উদ্বোধন যেন সেই ইতিহাসেরই এক দৃশ্যমান রূপ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেএসএস (এমএন লারমা গ্রুপ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বিমল কান্তি চাঙমা এবং চাঙমা জাতির ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের প্রতীক ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। সভাপতিত্ব করেন বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চয়ণ বিকাশ চাঙমা। সঞ্চালনায় ছিলেন সমীর চাঙমা, আর স্বাগত বক্তব্যে ইতিহাস ও ভাষার সেতুবন্ধন ঘটান চাঙমা ভাষা গবেষক আনন্দ মোহন চাঙমা।
বক্তৃতায় বিমল কান্তি চাঙমা স্মরণ করিয়ে দেন—বিঝু মানে শুধু হাসি-খুশির উৎসব নয়; বিঝু মানে ইতিহাস। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সেই অমোঘ সত্য—“চাঙমা যেখানে, সেখানেই বিঝু”—একটি বাক্যের ভেতরেই ধারণ করে পাহাড়, জঙ্গল, নদী আর মানুষের অবিরাম যাত্রার কাহিনি। একসময় দিঘীনালা ছিল গভীর অরণ্য—হিংস্র প্রাণীর আবাস, ভয় আর অনিশ্চয়তার নাম। বাঘের থাবায় প্রাণ হারিয়েছে কত মানুষ; তবু মানুষ থামেনি। প্রতিকূল প্রকৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে, অনাবাদী জমিকে আবাদে রূপান্তর করে, জীবনকে আঁকড়ে ধরে চাঙমারা আজও টিকে আছে। সেই টিকে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই তারা আজও বিঝু উদযাপন করে।
চাঙমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের কণ্ঠে উঠে আসে ইতিহাসের আরও গভীর এক অধ্যায়। তিনি স্মরণ করান ১৯১৪ সালের ঘটনা—রাজা ভূবন মোহন রায়-এর আমলে ব্রিটিশ শাসকরা মিঙিনি রিজার্ভ এলাকায় জুম চাষ বন্ধ করতে সৈন্য পাঠাতে উদ্যত হয়েছিল। তখন রাজা দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “সৈন্য লাগবে না—এটা আমাদের বিষয়।” সেই আত্মমর্যাদাপূর্ণ ঘোষণাই জন্ম দেয় প্রতিবাদের। সান্তু চাকমা (কারবারি)-র নেতৃত্বে জুমচাষিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয় জুম চাষ মেনে নিতে। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অঞ্চলটি চাঙমা সার্কেলের অংশ হয়ে ওঠে—মাটি পায় তার মালিকানা, মানুষ পায় তার অধিকার।
রাজা আরও বলেন, সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। অনেকেই নতুন প্রজন্মকে নিয়ে হতাশ; কিন্তু তিনি আশাবাদী। তাঁর চোখে আজকের তরুণরা আগের চেয়ে বেশি জ্ঞানী, বেশি সচেতন। লাল-সবুজ পতাকা হাতে ঋতুপূর্ণা চাঙমা, মনিকা চাঙমা ও রূপনা চাঙমা, কিংবা বিশ্বমুখী যাত্রায় সুরাকৃষ্ণ চাঙমা—তারা কেবল ব্যক্তি নয়; তারা একটি জাতির মুখ, একটি ইতিহাসের প্রতিনিধি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যখন দিঘীনালা, খাগড়াছড়ি, গুইমারা ও রাঙ্গামাটি জ্বলছিল, তখন এই নতুন প্রজন্মই রাজপথে নেমে এসেছিল—ন্যায়, অধিকার ও অস্তিত্বের পক্ষে।
বিঝুর মানবিক দর্শন এই প্রেক্ষাপটে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় বিঝু মানে ছিল ঘরে ঘরে আদর-স্নেহের আদান-প্রদান—বুড়বুড়িদের গোসল করানো, হাঁস-মুরগি আদার দেওয়া, গরিব-দুঃখীদের ধান-চাল দিয়ে সহায়তা করা। এই সহমর্মিতা, এই সামাজিক বন্ধনই বিঝুর প্রকৃত প্রাণ। উৎসবের চাকচিক্য বদলাতে পারে, সময়ের সঙ্গে রীতিও বদলাতে পারে; কিন্তু এই মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে বিঝু কেবল একটি আয়োজন হয়ে থাকবে—আত্মাহীন এক অনুষ্ঠান।
উল্লেখ্য, ২০১৯ খ্রি. চাঙমা সাহিত্য একাডেমির উদ্যোগে দিঘীনালায় বিঝু মেলার সূচনা হয়, যা আজও ধারাবাহিকভাবে চলমান। দিঘীনালার বিঝু মেলা তাই শুধু আনন্দের আয়োজন নয়—এ এক জীবন্ত ইতিহাস, এক চলমান সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি নীরব আহ্বান—
শিকড় ভুলে যেও না; কারণ শিকড়েই আছে তোমার পরিচয়, তোমার শক্তি, তোমার বিঝু।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দিঘীনালার আকাশে বিঝুর রঙ- ইনজেব চাঙমা

  বিঝু আসে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়—বিঝু আসে স্মৃতিতে, শিকড়ে, রক্তের ভেতর বহমান এক ইতিহাস হয়ে। দিঘীনালার আকাশে যখন রঙিন বেলুন উড়ে উঠল, তখ...