“পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি নিয়ে সুখবর আসবে”—মন্ত্রীর কণ্ঠে উচ্চারিত এই বাক্য খবরের কাগজের শিরোনামে যেন এক টুকরো রোদ্দুর হয়ে ঝরে পড়ে। অথচ সেই রোদ পাহাড়ের গহিনে পৌঁছায় না। সেখানে বহুকাল ধরে জমে থাকা ছায়া, দীর্ঘশ্বাস আর না-শুকানো রক্তের দাগ। স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে জুম্ম জনগোষ্ঠীর মাথার ওপর দিয়ে যে রাষ্ট্রীয় লাঙলের ফলা চলেছে, তার ফসল কি সত্যিই শান্তি? নাকি সেই লাঙলের প্রতিটি টানে তাদের স্বর্গভূমি তিলে তিলে শ্মশানের নীরবতা ধারণ করেছে?
শান্তি কোনো মঞ্চের মাইকে ঘোষিত পঙ্ক্তি নয়। শান্তি কোনো প্রজ্ঞাপনের কালিতে লেখা অনুচ্ছেদ নয়। শান্তি হলো সেই নদী, যা ন্যায়ের উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে সম্মানের উপত্যকা পেরিয়ে আত্মপরিচয়ের সাগরে গিয়ে মেশে।
যখন বিচারহীনতার রাত্রি ফুরায় না, যখন নিজভূমে পরবাসী হয়ে বাঁচতে হয়, যখন মাতৃভাষার শব্দগুলো রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নেড়ে ফিরে আসে—তখন ‘শান্তি’ শব্দটি কেবল একটি ধ্বনিমাত্র। তার ভেতরে প্রাণ থাকে না।
পার্বত্য মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বকীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “পাহাড়ি-বাঙালি ভেদাভেদ নেই।” আহা, কী স্নিগ্ধ উচ্চারণ!
কিন্তু পাহাড়ের বুক চিরে শুনুন। কর্ণফুলী কি সেই সমতার কলকল গায়? সাজেকের মেঘ কি আজও নিঃসংকোচে জুমঘরে নেমে আসে?
বাস্তবের পাহাড় বলে ভিন্ন কথা। যেখানে সম্মতিহীন মানচিত্রে ভূমি অধিগ্রহণের কালো দাগ পড়ে, যেখানে ‘নিরাপত্তা’ নামের লৌহকপাট সংস্কৃতির উঠানে ঝুলে থাকে, সেখানে ‘ভেদাভেদ নেই’ এই বাক্যটি রাজনীতির সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো একটি ছবি হয়ে যায়। ছবির ভেতর জীবন নেই।
উনিশশো সাতানব্বই সালের দুই ডিসেম্বর। একটি কলম, একটি কাগজ, একরাশ স্বপ্ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। পাহাড় ভেবেছিল, এই বুঝি তার দীর্ঘ রাত্রির অবসান।
অথচ আটাশটি বসন্ত পার হয়ে গেল। চুক্তির অক্ষরগুলো কাগজের কারাগারে বন্দি রয়ে গেল। ভূমি কমিশন নামের ঠোঁটে হাসি নেই, কাজ নেই। তার টেবিলে জমে থাকা হাজার হাজার দরখাস্ত ধুলোর সঙ্গে মিশে পুরাণ হয়ে যাচ্ছে। স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি আজও দূরের পাহাড়চূড়ায় মেঘের মতো ভাসে। ধরা দেয় না। আর অস্থায়ী ক্যাম্পের ‘অস্থায়ী’ শব্দটি স্থায়ী হতে হতে পাহাড়ের অভিধানে নতুন অর্থ লিখেছে।
এই ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আবার যখন “সুখবর”-এর ডমরু বাজে, তখন পাহাড়ের বুক কেঁপে ওঠে। এ বুঝি নতুন সুর, নাকি পুরোনো রাগিণীর পুনরাবৃত্তি?
শান্তিরও রঙ আছে। যদি শান্তির রঙ হয় একরঙা, যদি শান্তির অর্থ হয় সবাইকে একই ছাঁচে ঢেলে নেওয়া, যদি শান্তির নাম হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের শিকলকে ফুল দিয়ে সাজানো—তবে সে শান্তি জুম্ম জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তি নয়। সে এক সুনিপুণ অভিশাপ।
জুম্ম মানুষের শান্তি অন্যরকম। তাদের শান্তি হলো জুমের আগুন নেভার পর নিশ্চিন্ত ঘুম। তাদের শান্তি হলো নিজের বাগানের আমগাছে নিজের অধিকার। তাদের শান্তি হলো বিজু, সাংগ্রাই, বৈসাবিতে বন্দুকের ছায়া ছাড়া নাচের অধিকার। তাদের শান্তি হলো আদালতে নিজের ভাষায় কান্নার অর্থ বোঝাতে পারা।
শান্তি আসে না ভাষণে। শান্তি আসে ফিরিয়ে দেওয়ায়। শান্তি আসে ভূমির দলিল ফিরিয়ে দিলে।
শান্তি আসে চুক্তির প্রতিটি অক্ষরকে পাহাড়ের পাথরে, নদীর স্রোতে, মানুষের ঘরে প্রাণ দিলে।
শান্তি আসে যখন রাষ্ট্র পাহাড়কে ‘সমস্যা’র চোখে না দেখে ‘সম্পদে’র চোখে দেখে। যখন সে বোঝে, বাংলাদেশের মানচিত্র কেবল সমতলের সবুজে নয়, পাহাড়ের বুনো ফুলেও আঁকা।
এই সত্য ছাড়া যেকোনো “সুখবর” কেবল পুরোনো ক্ষতের ওপর নতুন প্রলেপ। প্রলেপে ক্ষত ঢাকে, কিন্তু ভেতরে পচন ধরে। আর সেই পচনের গন্ধ একদিন ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে এই বলে—
স্বাধীনতার পর থেকে একটি জাতির মাথার ওপর দিয়ে হালচাষ চলেছিল। আর তাদের স্বর্গভূমি তিলে তিলে শ্মশান হয়েছিল। ক্ষত সারাতে হলে আগে প্রলেপ সরাতে হয়। আলো আর হাওয়া লাগাতে হয়। তারপরই কেবল শান্তি নামের বনফুল ফোটে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন