শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

লোগাং: রক্তের নদীর ধারে দাঁড়িয়ে - ইনজেব চাঙমা

আজ ১০ই এপ্রিল।
আজ এমন এক দিনের কথা বলতে হয়, যেদিন পাহাড় কেবল পাহাড় ছিল না—পাহাড় ছিল ক্ষতবিক্ষত স্মৃতি।

পাহাড়ের ভেতরে, খাগড়াছড়ি জেলার পানছরি উপজেলায়, একটি নদী আছে—লোগাং। সেই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল একটি গুচ্ছগ্রাম। সবুজে মোড়া সেই জনপদে একসময় ছিল ছয়শোর কাছাকাছি কাঁচা ঘর, পরিবার, শিশুদের হাসি, নারীদের শ্রম, আর পাহাড়ি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।

সময়টা ১৯৯২ সাল। সামরিক শাসনের পতনের পর দেশ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পাহাড়ের মানুষের জীবনে কিন্তু সেই পরিবর্তনের কোনো আলো পৌঁছায়নি।

ঘটনার সূচনা ছিল একেবারেই সাধারণ। গ্রামের একটু দূরে, দুই পাহাড়ি কিশোরী ঘাস কাটতে গিয়েছিল। আশপাশে কেউ ছিল না। সেখানেই হাজির হয় কয়েকজন বাঙালি সেটেলার যুবক। উত্যক্ত করার চেষ্টা, অসৎ উদ্দেশ্যের প্রকাশ—এক পর্যায়ে পরিস্থিতি আত্মরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে যায়। হাতে থাকা দা দিয়ে আঘাত লাগে এক যুবকের। পরে সে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে মারা যায়।

এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই রটানো হয় মিথ্যা অভিযোগ—গুচ্ছগ্রামে শান্তিবাহিনী ঘাঁটি গেড়েছে, তারাই নাকি হত্যার জন্য দায়ী।

১০ই এপ্রিল, দুপুরবেলা। কয়েকশ বাঙালি সেটেলার, তাদের সঙ্গে অস্ত্রধারী ভিডিপি, আনসার ও বিডিআর—লোগাং গ্রাম ঘিরে ফেলে। নির্দেশ দেওয়া হয়: সবাই ঘরের ভেতরে ঢুকবে।

তারপর শুরু হয় পরিকল্পিত ধ্বংস।

এক এক করে প্রতিটি ঘরে আগুন লাগানো হয়। যারা ভয়ে ঘর ছেড়ে বেরোতে চেয়েছে, তারা আর ফিরে আসেনি। কেউ গুলির মুখে পড়েছে, কেউ দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে নিথর হয়েছে। কেউ আবার ঘরের ভেতরই আটকা পড়ে আগুনে প্রাণ হারিয়েছে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউ রেহাই পায়নি।

গ্রামের মাত্র আড়াইশ মিটার দূরে ছিল বিডিআর ক্যাম্প। নিরাপত্তার প্রতীক যারা, তারা সেদিন নীরব ছিল না—প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা হামলাকারীদের পাশেই দাঁড়িয়েছিল।

এই হত্যাকাণ্ডে কতজন প্রাণ হারিয়েছিল—তার কোনো নির্ভুল সংখ্যা নেই।
পরদিন খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যানকে আংশিক এলাকা দেখতে দেওয়া হয়। তিনি ১৩৮টি মৃতদেহ দেখতে পান। একজন বাঙালি চিকিৎসক বলেন, তিনি প্রায় ৩০০ পর্যন্ত গুনতে পেরেছিলেন — তারপর আর পারেননি।

সাড়ে পাঁচশোর মতো ঘর ভস্মীভূত হয়। যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পরই কেবল অনেকে ফিরতে পারে।

এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতার বর্ণনা উঠে এসেছে Amnesty International-এর প্রতিবেদনে, এবং বিপ্লব রহমানের পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ গ্রন্থে—প্রত্যক্ষদর্শীদের কণ্ঠে।

ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকা থেকে সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের একটি দল লোগাংয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেই দলে ছিলেন আনু মুহাম্মদ, সারা হোসেনের মতো মানুষ। কিন্তু পানছরির এক সামরিক ক্যাম্পেই তাঁদের আটকে দেওয়া হয়। লোগাংয়ে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি।

সে সময় পাহাড় জুড়ে চলছিল বিঝু উৎসবের প্রস্তুতি। কিন্তু সেই বছর পাহাড়ি ছাত্র ও তরুণরা বিঝু বর্জনের ডাক দেয়। উৎসব হয়নি। আনন্দের জায়গায় ছিল শোক।

আজও প্রতিবছর বিঝু আসে। আমরা উৎসব করি। কিন্তু ফুল বিজুর দিনে, লোগাং নদীর জলে আমরা কয়েক ফোঁটা চোখের জল মিশিয়ে দিই।

আজ থেকে ৩৪ বছর আগে, এই দিনেই, পানছরির লোগাং গ্রাম চাকমাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। গাঢ় সবুজ অরণ্যের বুকে এক ছোপ লাল—একটি পতাকার মতোই, কিন্তু সে পতাকা ছিল মৃত্যু আর বেদনার।

তরুণ বাঙালি বন্ধুরা, আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ—এই ঘটনাটি মনে রাখবেন।
এটা আপনাদের ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, কিন্তু ইতিহাসের দায়। কী করবেন জানি না—শুধু ভুলে যাবেন না।

লোগাং নামে একটি পাহাড়ি নদী আছে—অ লোগাং।
সেদিন সে নাম কেবল অর্থ ছিল না, বাস্তবতা ছিল।

পহেলা বৈশাখের পাঁচ দিন আগে, এক ফোঁটা চোখের জল ফেলবেন—আপনাদের কয়েকশ পাহাড়ি ভাইবোনের স্মরণে।
এইটুকু তো নিশ্চয়ই পারবেন।

আজ লোগাং গণহত্যার ৩৪ বছর।
আজ পাহাড় আবার উৎসবের পথে হাঁটছে—বিঝু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু, বিহু, চাংক্রান—জীবনের উৎসবে।
কিন্তু সেই উৎসবের স্রোতের নিচে এখনো বইছে এক নীরব রক্তের নদী—লোগাং।

তথ্য: জুম্ম সংবাদ বুলেটিন 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

𑄟𑄮𑄚𑄴 𑄟𑄪𑄢𑄴 𑄍𑄧𑄢 𑄉𑄋𑄴 𑄍𑄨𑄢𑄨 𑄟𑄳𑄠𑄢𑄗𑄧𑄚𑄴 𑄟𑄧𑄐𑄴𑄌𑄧𑄖𑄴 𑄛𑄮𑄖𑄧𑄛𑄮𑄖𑄳𑄠 𑄞𑄣𑄬𑄘𑄨 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄴 𑄝𑄨𑄌𑄴𑄧𑄝𑄨𑄘𑄳𑄠𑄠𑄧𑄢𑄴 𑄟𑄠𑄬𑄌𑄨𑄁 𑄟𑄢𑄴𑄟

𑄟𑄠𑄬𑄌𑄨𑄁 𑄟𑄢𑄴𑄟 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄎𑄬𑄣 𑄟𑄮𑄚𑄴 𑄟𑄪𑄢𑄧 𑄘𑄬𑄏𑄧𑄖𑄴𑄪𑄚𑄴 𑄃𑄪𑄘𑄨 𑄃𑄬𑄥𑄳𑄠𑄬 𑄘𑄧𑄋𑄬 𑄚𑄧 𑄛𑄌𑄳𑄠𑄬 𑄟𑄧𑄚𑄧...