চৈত্রসংক্রান্তির তপ্ত দ্বিপ্রহর যখন ঘুঘুর ডাকে উদাস হয়ে ওঠে, যখন পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কোকিল, কাত্থোল পাবোক আর কুয়ে পাখির কলতান প্রতিধ্বনিত হয়—ঠিক তখনই নাকশা-রিবেক ফুলের মদির সুবাস আর তরিং ফুলের শ্বেতশুভ্র পাপড়ি জানান দেয়, পাহাড়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে ‘বিঝু’। অরণ্যঘেরা জনপদে এ এক অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই চিরায়ত উৎসবের ক্যানভাসে এবার লেগেছে নতুন রঙের ছোঁয়া। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবি আর আবেগকে সম্মান জানিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন।
৯ এপ্রিলের প্রেস ব্রিফিংয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান স্পষ্ট করে জানালেন—এখন থেকে আর ‘বৈসাবি’ নয়, প্রতিটি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব নাম, রীতি ও বোধে উৎসব উদযাপন করবে। এই উচ্চারণে পাহাড়ের ইতিহাস যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকা হলো। কারণ, ‘বৈসাবি’ নামটি কার্যত তিনটি জনগোষ্ঠীর প্রতীক হয়ে উঠেছিল; অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক বাস্তবতায় রয়েছে ১১টি জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন উৎসব-ভাষা, ভিন্ন ভিন্ন আচার।
মন্ত্রীর ঘোষণায় তাই নতুন করে উচ্চারিত হলো—বিঝু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু, বিহু, চাংক্রান, চাংলানসহ প্রত্যেকের নিজস্ব নাম। নামের এই প্রত্যাবর্তন কেবল শব্দের সংশোধন নয়; এটি স্মৃতি, ইতিহাস ও অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাম হারালে উৎসবও ধীরে ধীরে অর্থ হারায়—এই উপলব্ধিই ঘোষণাটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
একই ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী আরও ইঙ্গিত দেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাহাড়ের স্বকীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি ‘খুব শিগগিরই ইতিবাচক খবর’-এর আশ্বাস দেন। এই ‘সুখবর’ আপাতত প্রতিশ্রুতি, তবে পাহাড়ের মানুষ জানে—প্রতিশ্রুতিও কখনো কখনো আশার বীজ হয়ে ওঠে।
১২ এপ্রিল ফুল বিঝু প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, নদীতে ফুল নিবেদন
১৩ এপ্রিল মূর বিঝু ঘরে ঘরে ‘পাজন’ রান্না, অতিথি আপ্যায়ন
১৪ এপ্রিল গোজ্যাপোজ্যা দিন বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ গ্রহণ, নতুন বছর বরণ
পার্বত্য মন্ত্রী অ্যাড. দীপেন দেওয়ান তার বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জন্য একটি “ইতিবাচক সুখবর” আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের এই তোড়জোড় পাহাড়বাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকারের এই নিশ্চয়তা পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে বিঝুর ছুটি নিয়ে পাহাড়বাসীর মনে এক ধরনের আক্ষেপ কাজ করত। ব্রিটিশ আমলে দীর্ঘ এক মাসের ছুটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে বর্তমানে ১-৩ দিনে ঠেকেছে। উৎসবকে ‘বৈসাবি’র বদলে নিজস্ব নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করায় এখন উৎসবের ব্যাপ্তি ও ছুটি বৃদ্ধির একটি জোরালো নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এটি কেবল বিনোদনের অবকাশ নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস এখন বিঝু, বৈসু কিংবা সাংগ্রাইয়ের সুরে মুখরিত। ‘বৈসাবি’র ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসা এই নবযাত্রা জুম্ম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমনে সহায়ক হবে।
পাহাড়ের ১১টি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এই পদক্ষেপ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এখন পাহাড়বাসীর দৃষ্টি সেই প্রতিশ্রুত ‘সুখবর’-এর দিকে, যা হয়তো শান্তি ও প্রগতির এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে আসবে।





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন