পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে নীল জলরাশির বিস্তার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাপ্তাই লেক। বাইরের মানুষের কাছে এটি অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু চাকমা সহ পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই লেকের প্রতিটি ঢেউ একেকটি দীর্ঘশ্বাস। এটি শুধু জলাধার নয়, এটি একটি জাতির বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস, চোখের পানির দলিল।
ইতিহাসের পাতায় ১৯৬০-এর দশক এক বিষাদময় অধ্যায়। উন্নয়নের করাল গ্রাসে সেদিন কয়েক লক্ষ মানুষকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হয়েছিল। এই নির্বাসন বা ‘বরপরং’ কেবল স্থান পরিবর্তন ছিল না, তা ছিল শেকড় থেকে ছিন্ন হওয়ার নামান্তর। সেই হারানো মানুষেরা ভারতের অরুণাচল, মিজোরাম ও ত্রিপুরার বন্ধুর পথে পথে ঘুরে বেরিয়েছে; আজও তারা পরবাসে নিদারুণ কষ্টে তাদের অস্তিত্বের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখছে। যে হ্রদে আজ সূর্যের আলো ঝিলমিল করে, তার নিচেই তলিয়ে গেছে কয়েক প্রজন্মের সোনালি স্মৃতি আর শত শত গ্রামের চিহ্ন।
সময়ের পরিক্রমায় এই হ্রদকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন জীবনযাত্রা। নীল জলে জাল ফেলে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে, জলপথের সহজ যাতায়াতে জীবন হয়েছে কিছুটা গতিশীল। কিন্তু এই বাহ্যিক সুবিধা কি সেই গভীর ক্ষতকে উপশম করতে পেরেছে? মাছ আর পানির প্রাচুর্য কি ভিটেমাটি হারানোর হাহাকার মুছে দিতে পারে? প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে উঠে আসে সেই অমীমাংসিত সত্য—পেটের খিদে হয়তো মিটছে, কিন্তু মনের গহিনে ভূমি হারানোর শঙ্কা আজও অমোঘ।
আধুনিকতার নামে পর্যটন আজ এক ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু পাহাড়ের মানুষের ভূমি অধিকার আজও সুদূরপরাহত। পর্যটন বিকাশের রঙিন মোড়কে আদিবাসীদের ভূমি থেকে বিচ্যুত করার এক সুক্ষ্ম ও কুটিল প্রক্রিয়া চলছে। সাজেকের বুকে ত্রিপুরারা আজ ভূমিহীন হওয়ার পথে, পাংখোয়া আর লুসাইরা অভিমানী মেঘের মতো দেশান্তরিত হয়ে মিশে গেছে মিজোরামের পাহাড়ে। কাজল তালুকদারের কণ্ঠে সেই ভীতিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে—ছলচাতুরীর আশ্রয়ে যেভাবে জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাতে একদিন হয়তো নিজেদের পাহাড়েই পরবাসী হতে হবে পাহাড়ের সন্তানদের।
ব্রিটিশ আমলের ১৯০০ সালের আইন (1900 Act) পাহাড়ের মানুষের জন্য ছিল এক সুরক্ষাবর্ম। এটি ছিল তাদের ঐতিহ্য ও ভূমির অধিকার রক্ষার দলিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেই ঐতিহাসিক অধিকারও আজ হরণের অপচেষ্টা চলছে। ভূমি যদি সুরক্ষার আইনি ভিত্তি হারায়, তবে পাহাড়ের মানুষের অস্তিত্ব বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়বে।
কাপ্তাই হ্রদের জল নীল হলেও এর ভেতরে মিশে আছে আদিবাসীদের লোনা জল। ভূমিহীন মানুষ ডানা ভাঙা পাখির মতো দিশেহারা। তাই উন্নয়ন যেন কেবল কংক্রিটের দালান আর বিলাসিতার পর্যটনে সীমাবদ্ধ না থাকে; উন্নয়ন হতে হবে মানুষের অধিকারকে সম্মান জানিয়ে। যদি পার্বত্যবাসীর ভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হয়, তবে এই ক্ষোভ ও বঞ্চনার আগুন একদিন পাহাড়ের শান্তিকে গ্রাস করবে। কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জল আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শেকড় ছাড়া কোনো মহীরুহ যেমন বাঁচতে পারে না, ভূমি ছাড়া কোনো জাতিও তেমনি টিকে থাকতে পারে না।
[গতকাল (১০ এপ্রিল ২০২৬) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার এক অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বেদনা ও শঙ্কার প্রতিধ্বনি উঠে এসেছে।]

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন