রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের নামে জনগণের বিরুদ্ধে রাজনীতি- ইনজেব চাঙমা

 


পূর্ণস্বায়ত্তশাসন, শব্দটি একসময় অনেকের কাছে আশার প্রতীক ছিল। মনে হতো, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম। বিশ্বাস ছিল, যারা এই দাবি তোলে, তারা পার্বত্য চুক্তির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে জনগণের জন্য নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলতে চায়। কিন্তু আজ প্রশ্ন একটাই, এই পূর্ণস্বায়ত্তশাসন কি আদৌ জনগণের জন্য, নাকি জনগণের বিরুদ্ধেই পরিচালিত একটি রাজনীতি?
২০২২ সালের ৯ জুন দুধুকছড়ার ঘটনা সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলামের হাতে দাবিনামা তুলে দেওয়া কোনো রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, এটি প্রকাশ্য চাপ প্রয়োগ। সেদিনই বোঝা গিয়েছিল, পূর্ণস্বায়ত্তশাসন এখানে নীতির বিষয় নয়, এটি ভয় দেখানোর একটি কৌশল।
এরপর থেকে দৃশ্যপট আরও নগ্ন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, কবি–সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সরকারি চাকরিজীবী, যারা কেউই অস্ত্রধারী নন, কেউই ক্ষমতাবান নন, শুধু ভিন্নমত পোষণ করেন। মতের অমিল মানেই দেশদ্রোহী, শত্রু, দালাল, কিংবা “জনবিরোধী”। এই রাজনীতিতে যুক্তির কোনো স্থান নেই, আছে শুধু লেবেল আর হুমকি (অন্য বিষয় উল্লেখ করলাম না। কেননা কোন মহৎ উদ্দেশ্যর কিছু ক্ষতি হয়)।
সবচেয়ে নৈতিকভাবে দেউলিয়া চিত্রটি দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষায় প্ল্যাকার্ড - স্লোগান শেখানো, এটি রাজনৈতিক সচেতনতা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহিংসতার ভাষায় দীক্ষিত করার চেষ্টা। আমরা তো শিখে এসেছি, সন্তানের সামনে মা–বাবা ঝগড়া করে না। অথচ এখানে রাজনীতির নামে শিশুদের মনে ”হিংসা, ধ্বংসাত্মক বিষ বপন" করা হচ্ছে।
১৯৯৮ সালের “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন” শ্লোগান নিয়ে প্রতিষ্ঠিত দলটি আজ নিজেদের আয়নায় তাকালে কী দেখবে? জনগণের ঐক্য, নাকি জনগণের বিভাজন? মুক্তির রাজনীতি, নাকি ভয়ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ?
একদিকে ঐক্যের কথা বলা হয়, “এগত্তর”র বুলি আওড়ানো হয়; অন্যদিকে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষায় প্ল্যাকার্ড - স্লোগান শেখানো, ভিন্নমতাবলম্বীদের সামাজিকভাবে চরিত্রহনন করা হয়। এই দ্বিচারিতা কোনো মুক্তিকামী আন্দোলনের লক্ষণ নয়, এটি ক্ষমতা রক্ষার রাজনীতির পরিচয়।
পূর্ণস্বায়ত্তশাসন জনগণের ন্যায্য দাবি হতে পারে। আর যে আন্দোলন প্রশ্নকে দমন করে, শিশুদের ব্যবহার করে, আর জনগণের ওপরই আক্রমণ চালায়, সে আন্দোলন মুক্তির পথ দেখায় না। বরং তা প্রমাণ করে, সমস্যার নাম স্বায়ত্তশাসন নয়; সমস্যার নাম সেই রাজনীতি, যা জনগণকে বাদ দিয়ে নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়।
এই রাজনীতি বদলানো না গেলে, পূর্ণস্বায়ত্তশাসন শব্দটি ইতিহাসে আর অধিকার নয়, ভয়ের প্রতিশব্দ হিসেবেই লেখা থাকবে।
১৩ জুন ২০২৬ খ্রি.  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের নামে জনগণের বিরুদ্ধে রাজনীতি- ইনজেব চাঙমা

  পূর্ণস্বায়ত্তশাসন, শব্দটি একসময় অনেকের কাছে আশার প্রতীক ছিল। মনে হতো, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের স...