বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

চাঙমা উপন্যাস সাহিত্যের অগ্রদূত ও ভাষা-নবজাগরণের নির্মাতা: আর্য্যমিত্র চাঙমা - ইনজেব চাঙমা

 



চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক ইতিহাসে যে কজন সাহিত্যসাধক তাঁদের সৃষ্টিশীল কর্মে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন, তাঁদের অগ্রভাগে উচ্চারিত হয় কবি, ঔপন্যাসিক, অভিধানকার, অনুবাদক ও শিক্ষাবিদ আর্য্যমিত্র চাঙমা-এর নাম। চাঙমা ঔপন্যাসিক ধারার কথা উঠলেই সর্বাগ্রে স্মরণ করা হয় তাঁকে। কারণ, তিনি কেবল একজন ঔপন্যাসিক নন; বরং চাঙমা ভাষার সাহিত্যভুবনে উপন্যাসের স্বতন্ত্র ভিত্তি নির্মাণকারী এক অগ্রদূত। বহুদিন ধরে যে শূন্যতা চাঙমা সাহিত্যে অনুভূত হচ্ছিল, তাঁর কলমেই তার পূর্ণতা লাভ করে। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একসময় চাঙমা ভাষায় মৌলিক উপন্যাস রচিত হওয়ার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন, আর্য্যমিত্র চাঙমা তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভায় সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। নিজস্ব চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাস রচনা করে তিনি ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
 
আনুমানিক ১৯৬২ সালের ২১ জুন (৭ আষাঢ়) খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার মিঙিনি নদীর তীরবর্তী মনোরম কাঠালতলী গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা বৈরেন্দ্র চাকমা এবং মাতা আনন্দবালা চাকমা। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশব পরবর্তী সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। পাহাড়, নদী, জনজীবন, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতিসত্তার বেদনাবোধ তাঁর সাহিত্যচেতনার অন্তঃসলিল স্রোত হয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
 
শিক্ষাজীবনের সূচনা দীঘিনালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৮৪–৮৫ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করলেও তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর শিক্ষাজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ১৯৮৬ সালে বিরাজমান পরিস্থিতে শতপরিবারের মতো তাঁকে ভারতের তাকুমবাড়ি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি শিক্ষার পথ থেকে বিচ্যুত হননি; ১৯৮৮ সালে বান্দরবান সরকারি কলেজ থেকে বহিরাগত পরীক্ষার্থী হিসেবে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধীনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়ন করেন।
 
কর্মজীবনের সূচনায় বান্দরবানের বাঘমারা জুনিয়র বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে কিছুদিন চট্টগ্রাম বেতারে খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সালে খাগড়াছড়ি কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও অধিক সময় শিক্ষকতার মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন আলোকিত করার পর ১ অক্টোবর ২০২৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষকতা তাঁর পেশা হলেও ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাধনাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।
 
চাঙমা ভাষার বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জনের আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর চাঙমা ভাষার লেখক সদস্য হিসেবে তিনি মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চাঙমা একাডেমি, যা চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রসারে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে আর্য্যমিত্র চাঙমার অবদান বহুমাত্রিক। তাঁর রচিত উপন্যাস ‘মনবি’ (২০২০), ‘তিন ফাগালা’ (২০২৩), ‘অঃমা কবি’ (২০২৩) এবং কিশোর উপন্যাস ‘মালাচান’ (২০২৪) চাঙমা উপন্যাস সাহিত্যের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। ভাষার শব্দসম্পদ সংরক্ষণে তিনি রচনা করেছেন ‘চাকমা শব্দভাণ্ডার’ (২০১১) ও ‘ভাচ আলাম’ (২০১৫) অভিধান। ভাষা শিক্ষার জন্য সম্পাদনা করেছেন ‘এয চাঙমা লেঘা শিখি’, ‘মিল কধা নকভাচ’ এবং ‘মাতৃভাষা’ সাময়িকী।
 
অনুবাদক হিসেবেও তাঁর অবদান সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ চাঙমা ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বসাহিত্য ও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পাঠকে মাতৃভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। পাশাপাশি ব্র্যাক, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনাও তিনি চাঙমা ভাষায় অনুবাদ করেছেন ও গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ ও ভাষা-শিক্ষাবিষয়ক রচনায়ও তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
 
ব্যক্তিজীবনে তিনি শুক্লা চাকমার সহধর্মী। তাঁদের কন্যা অমিতা চাকমা ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। পুত্র ত্রিলোক চাকমা প্রজ্জ্বল ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের চারুকলা বিভাগে অধ্যয়নরত।
 
আর্য্যমিত্র চাঙমা কেবল একজন সাহিত্যিক নন; তিনি ভাষার প্রহরী, সংস্কৃতির ধারক, জাতিসত্তার ইতিহাসসংরক্ষক এবং চাঙমা নবজাগরণের অন্যতম নির্মাতা। তাঁর সাহিত্যকর্মে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস, পাহাড়ের সৌন্দর্য, মানুষের সংগ্রাম, ভাষার আত্মমর্যাদা এবং জাতিসত্তার স্বপ্ন এক অনন্য শিল্পরূপে ধরা পড়েছে। চাঙমা ভাষায় উপন্যাসের যে দীপশিখা তিনি প্রজ্বলিত করেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাহিত্যপথকে দীর্ঘদিন আলোকিত করবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জ্যোতিপ্রভা লারমা: পাহাড়ি জীবনের আলো ও সংগ্রামের দীপ্ত প্রদীপ - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের রূপ-মাধুর্যের আড়ালে যে দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা কেবল সবুজ পাহাড়, কুলকুল ধ্বনিতে বহমান নদী কিংবা কুয়াশাঘেরা অরণ্যের স...