![]() |
| কবি লালন কান্তি চাঙমা |
![]() |
| কবি লালন কান্তি চাঙমা |
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি-পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একটি যুগের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবন, সাহিত্য এবং সংগ্রাম মিলেমিশে জাতিসত্তার ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়। কবি মুকুন্দ চাকমা তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারার অন্যতম প্রধান নির্মাতা, মাতৃভাষার নিবেদিতপ্রাণ সাধক এবং পাহাড়ের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বিশ্বস্ত কথক।
আমাদের এই তথাকথিত মাতৃভাষা প্রীতির স্বরূপ যেন আমাদেরই এক চিরন্তন চাঙমা প্রবাদের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম পরিহাস:
"কোচপাং কলে গালত পরে, কোচ ন পাং কলেও গালত পরে।" (ভালোবাসি বললেও চড় খেতে হয়, না বললেও চড় খেতে হয়।)
আমরা আজ এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চেতনার দোলাচলে দুলছি। হৃদয়ে ভাষা-প্রেমের অভিনয় করছি ঠিকই, কিন্তু সত্যকে বরণ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের এই মেকি ভালোবাসার রূপটি যেন আমাদেরই আরেক টুকরো লোকগাথার মতো—
"পধত পেলুং লাঙ, তাপ্পে-তুপ্পায় যাঙ।" (পথের মাঝে প্রেয়সীকে পেয়ে ক্ষণিক সোহাগ ছড়ানো, আর সে চোখের আড়াল হতেই তাকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দেওয়া।)
আমরাও ভাষার সাথে ঠিক এই ক্ষণিকের চপল প্রেমিকের মতোই আচরণ করছি। উৎসবের মঞ্চে বা সস্তা আবেগের মুহূর্তে আমরা ভাষার চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি, কিন্তু দিনশেষে তাকে অবহেলা আর বিস্মৃতির ধূসর ধুলোয় ফেলে রেখে আপন সার্থান্বেষণে মগ্ন হই।
আজকের এই স্বর্ণ যুগে মানুষের বিবেক আর মূল্যবোধ যেন বাঁধা পড়েছে অর্থের নিগড়ে। যেখানে বস্তুগত লাভ নেই, সেখানে মানুষ আজ বড় বেশি নিঃস্পৃহ। আমাদের সমাজজীবনের এক নগ্ন সত্য আজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে:
১। কোনো এক এনজিও যখন সভা কিংবা সেমিনারের ডাক দেয়, তখন মানুষের ঢল নামে। যেন এক বসন্তের কোকিলের মেলা! কারণ সেখানে মিলবে যাতায়াত ভাতা আর উপাদেয় চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়।
২। অথচ, যদি কোনো দরদী মানুষ নিঃস্বার্থভাবে সমাজের বা ভাষার সত্যিকার পুনর্জাগরণের জন্য একটি সভার আহ্বান করেন, তবে দেখা যায় সেই শূন্য প্রাঙ্গণে কেবল আহ্বানকারী একাকী দাঁড়িয়ে আছেন নিজের দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে। কারণ সেখানে কোনো নগদ প্রাপ্তি নেই।
হায়! আজ আমাদের প্রাণের ভাষার ভাগ্যাকাশও এই একই কুয়াশায় আচ্ছন্ন। যে ভাষা পরম মমতায় আমাদের শৈশবকে রাঙিয়েছিল, আজ পুঁজির বাজারে তার কোনো বিনিময় মূল্য নেই। যে ভাষা দিয়ে অর্থ বা প্রতিপত্তি অর্জন করা যায় না, এই বাণিজ্যিক দুনিয়ায় তা যেন এক অচল আধুলি। অর্থের অভাবে আজ আমাদের প্রাণের ভাষাও আমাদের কাছে মূল্যহীন, ব্রাত্য!
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—"অধিকার স্বত্বে যে জাতি উদাসীন, তার অস্তিত্ব মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে বাধ্য।" ভাষার অধিকার কখনো যাযাবরের মতো যাচ্ঞা করে পাওয়া যায় না, তা ছিনিয়ে নিতে হয়। ভাষার এই পরম মাধুর্য আর তার গুরুত্ব কেবল বাঙালি জাতি অনুধাবন করতে পেরেছিল। তাই ১৯৫২-র ফাল্গুনে তারা রাজপথ রাঙিয়েছিল বুকের তাজা রক্তে। রক্তের বিনিময়ে তারা কিনেছিল তাদের মায়ের মুখের বুলি।
আজ যদি আমরা, জুম্মরা, আমাদের ভাষার সেই মহিমান্বিত রূপ আর তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে বুঝতাম, তবে আমাদের এই দূরবস্থায় উপনীত হতে হতো না। আমাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের এই চরম মানসিক দৈন্যতা যে, নিজেদের ভাষার আঙিনায় আমরা আজ পরবাসী! আজ আমাদের লজ্জিত মস্তকে অন্যকে শুধাতে হয়—"অতিথি"-কে আমাদের ভাষায় কী বলে? কিংবা "অমুক" শব্দের প্রকৃত চাকমা প্রতিশব্দটি কী? এর চেয়ে বড় আত্মগ্লানি আর কী হতে পারে!
মহাকাল এখনো আমাদের সম্পূর্ণ গ্রাস করেনি, ছাইয়ের নিচে এখনো কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার বাকি আছে। শুধু অন্তঃসারশূন্য আবেগ দিয়ে কিংবা চারু বাক্যের মায়াজাল বুনে একটি বিপন্ন ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন ত্যাগ, সাধনা আর শেকড়ের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
তাই আসুন, এই মোহনিদ্রা আর আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভেঙে ফেলি। "নিজর গারখ্যে দর গরি" আমরা বেরিয়ে পড়ি দিক-দিগন্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালার গৌরব, আমাদের সংস্কৃতির সুবাস ছড়িয়ে দিই প্রতিটি জুম্ম সন্তানের হৃদয়ে। মাতৃভাষাকে কেবল মুখের ভাষা নয়, তাকে করে তুলি আমাদের বেঁচে থাকার হাতিয়ার ও প্রতিবাদের ভাষা। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের জাতিসত্তা, তবেই সার্থক হবে আমাদের এই পৃথিবীতে জুম্ম হিসেবে বেঁচে থাকা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহু যুগ ধরে এক অসুস্থ, ক্ষতবিক্ষত জনপদ। এই ভূখণ্ডের ক্ষত কেবল উপশম হয়নি, সময়ের নির্মম আবর্তে তা আরও গভীর, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। স্মৃতির পাতা উল্টালে দেখি এক দুঃসহ কাল—যখন পাহাড়ের মানুষকে দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগেই রাতের আহার সেরে নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করতে হতো। নিস্তব্ধ রজনীতে কুকুরের করুণ আর্তনাদও বুকের রক্ত হিম করে দিত। ভয়ের সেই করাল গ্রাসে দিনকে মনে হতো দীর্ঘ এক যুগ, আর রাতকে মনে হতো অন্তহীন এক শতাব্দী। চারিদিকে কেবল থমথমে, নিস্পৃহ নীরবতা। তখন পাহাড়ের সরল প্রাণের কাছে চিরস্থায়ী আতঙ্কের প্রতিশব্দ ছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর সেটেলার বাঙালি।

জন ত্রিপুরা
"যে
শান্তি জন্য রক্ত দিয়েছি, যে শান্তির জন্য শান্তি বাহিনী গঠন হয়েছিল, শান্তির জন্য
অস্ত্র জমা দিয়েছিল, সে শান্তি আর পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকবে না। তাই বলছি, প্রিয় বাংলাদেশ,
প্রিয় সরকার, প্রিয় বাঙালি বন্ধুরা, প্রিয় পাহাড়ি বন্ধুরা, চোখ খুলুন আপনাদের। চোখ
খোলার সময় এসে গেছে।"
গত ২৩ জুন ২০২৬, বান্দরবানের লামা উপজেলার নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ায় পাহাড়িদের ভূমি বেদখল, হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন জুম্ম তরুণদের প্রতিনিধি জন ত্রিপুরা। তাঁর এই বক্তব্য কেবল কোনো সাধারণ প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের মনে জমে থাকা গভীর ক্ষোভ ও তীব্র বারুদের এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পাহাড়ের সেই ঐতিহাসিক চুক্তি আজো পূর্ণাঙ্গ আলোমুখ দেখেনি। ভূমি কমিশন কার্যকর না থাকায় প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ হতে হচ্ছে আদিবাসীদের। এই চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে জন ত্রিপুরা সমাবেশে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন:
"এই লেখা পড়া আমাদের কাজে দিবে না, টাকা পয়সা আমাদের কাজেই দিবে না। যে বিল্ডিং আমাদের কাজেই দিবে না, যার কারণে আমি সম্পদ খুঁজি, সে সম্পদ যদি রাষ্ট্র নিরাপত্তা, দেশ, সরকার দিতে না পারে, আমাদের মা-বোনদের এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিতে না পারে তাহলে সেই আইন শৃঙ্খলা আমি চাই না। আমি নিজের নিরাপত্তা নিজেই তৈরি করবো। সেটি যদি বেআইনি পথে হয়, সেটি যদি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয় আমি সেথার জন্য প্রস্তুত।"
জন ত্রিপুরার এই বক্তব্য আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। যখন একটি অঞ্চলের নাগরিকরা নিজেদের মৌলিক নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষায় আইনি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন তা সমগ্র দেশের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সন্তু লারমার অবর্তমানে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দেওয়া কঠিন হুঁশিয়ারি। জন ত্রিপুরা বলেন:
"আপনারে সর্তক করছি, সন্তু লারমা যদি মৃত্যু হয় তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম কি অবস্থায় হয় তখন আপনারা বুঝতে পারবেন না। এই সন্তু লারমার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনই শান্তি বজায় রয়েছে। যেদিন সন্তু লারমা মারা যাবে সেদিন দেখবেন এ পার্বত্য চট্টগ্রাম আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তখন বুঝবেন এই সরকার কি ভুল করেছে। ...অপেক্ষায় থাকবেন না সন্তু লারমা মৃত্যুর জন্য। এটি ভুল করবেন। তার বেঁচে থাকার অবস্থায় আমাদের শান্তি প্রতিষ্ঠায় করতে হবে। যদি সে মারা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আর কোন দিন শান্তি হবে না।"
সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারের উচিত পাহাড়ের এই আর্তনাদ ও ক্ষোভের গভীরতা অনুধাবন করা। দমন-পীড়ন বা শক্তির ভাষা নয়, বরং সন্তু লারমার জীবদ্দশাতেই পার্বত্য চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ভূমি কমিশনের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ের এই সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। আর কতকাল পাহাড় এই উপেক্ষার আগুনে জ্বলবে? রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের শীতের সকালটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন বসন্তের আবাহন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে পাহাড়ের বুক চিরে কেবল বুলেটের আর্তনাদ আর বারুদের গন্ধ বের হতো, সেখানে এক টুকরো শান্তির কপোত উড্ডয়ন করেছিল ‘পার্বত্য চুক্তি’র হাত ধরে। চুক্তির সেই ঐতিহাসিক দলিলটি ছিল পাহাড়ের জখম হওয়া বুকে এক পশলা উপশম। কিন্তু কালের নিয়মে, সময়ের দীর্ঘ নদী বেয়ে আজ যখন আমরা প্রায় তিন দশক পার করছি, তখন সেই শান্তির কপোত কি সত্যি নীড় খুঁজে পেয়েছে, নাকি তা কোনো চোরাবালিতে ডানা হারিয়ে ছটফট করছে—তা আজ এক বিরাট জিজ্ঞাসার মুখোমুখি।
সম্প্রতি পাহাড়ের এক তরুণ কণ্ঠের আক্ষেপ—যেখানে তিনি নেতৃত্বকে "মাঝনদীতে দিক হারানো এক বিকল ইঞ্জিনের জাহাজের" সাথে তুলনা করে জনগণকে সেই ভাঙা তরী মেরামতের ‘মেকানিক’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন—তা আমাদের এক গভীর আত্মোপলব্ধির দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
সমালোচকদের চোখে (অংহ্লাচি মারমা, তথ্য প্রচার সম্পাদক,পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। গত কাল ২৩ জুন ২০২৬ Paharerkantho নামে পেজ থেকে এ বক্তব্য), বিশেষ করে তার দৃষ্টিতে, জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) আজ তার সেই পুরনো বৈপ্লবিক জৌলুস হারিয়ে এক ধূসর গোধূলিতে এসে দাঁড়িয়েছে। যে তরীটি একদা উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে অধিকারের তীরে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, অস্ত্র সমর্পণের পর তা যেন আজ এক নিশ্চল পাথরের মতো জলের স্রোতে ভাসছে। অভিযোগ উঠেছে, বিপ্লবের আগুন যেখানে মশাল হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা ব্যক্তিস্বার্থ আর সুবিধাবাদের মৃদু আলোয় নিভে যাচ্ছে। আন্দোলনের নামে এক ধরনের মায়াজাল বা কুয়াশা তৈরি করে সাধারণ মানুষকে এক অনন্ত অপেক্ষায় বন্দি রাখা হয়েছে। তার দাবি, এই জরাজীর্ণ তরীর হাল পরিবর্তন করতে হবে; সাধারণ মানুষকেই হতে হবে সেই কারিগর, যারা আন্দোলনের এই মৃতপ্রায় ইঞ্জিনে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করবে।
কিন্তু এই কঠোর ও নির্মম সমীকরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম মানবিক ও ঐতিহাসিক সত্য, যা কেবল ক্ষোভের চোখে দেখা সম্ভব নয়। দীর্ঘ চব্বিশটি বছর যারা পাহাড়ের অরণ্যে, শ্বাপদসংকুল গুহায়, আকাশের নিচে রাত জেগে অধিকারের লড়াই করেছিলেন, সেই শান্তিবাহিনীর সৈনিকেরা তো রোবট ছিলেন না; তারা ছিলেন মানুষ। ১৯৯৭ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তারা ছিলেন চূড়ান্তভাবে ‘রণক্লান্ত’।
দীর্ঘদিন পরিবার-পরিজনহীন, স্নেহের ছায়াবঞ্চিত এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা সেই ক্লান্ত মানুষগুলো রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন যুদ্ধের বিভীষিকা মুছে ফেলে একটুখানি স্নেহের ওমের নিচে, আপনজনদের পাশে শান্তিতে বাঁচতে। এই শান্তিকামনা কোনো কাপুরুষতা বা সুবিধাবাদ নয়, এটি জীবনের এক চিরন্তন ও স্বাভাবিক ব্যাকুলতা। তারা তাদের শ্রেষ্ঠ যৌবন পাহাড়ের ধূলিকণায় উৎসর্গ করে অবশেষে এক টুকরো নিরাপদ, স্বাধীন আশ্রয়ের খোঁজে ঘরে ফিরেছিলেন।
জেএসএস যখন বন্দুকের নল ছেড়ে নিয়মতান্ত্রিক ও কূটনৈতিক লবিংয়ের টেবিলে বসে অধিকার আদায়ের দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে লিপ্ত, ঠিক তখনই পাহাড়ের আকাশে জমা হতে শুরু করে অন্য এক কালো মেঘ। চুক্তির কম-বেশী পাওয়া এবংকি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার সুযোগে পাহাড়ের অন্দরে জন্ম নেয় চুক্তি-বিরোধী ও চরমপন্থী নতুন নতুন ধারা। ঘরের শত্রুরা যখন উগ্র মূর্তিতে অবতীর্ণ হলো, তখন পাহাড়ের সবুজ উপত্যকা আবারো এক রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। জেএসএস-কে তখন এক হাতে সামলাতে হয়েছে রাষ্ট্রের সাথে প্রতিশ্রুতির দরকষাকষি, আর অন্য হাতে লড়তে হয়েছে ঘরের ভেতরের ভাতৃঘাতী আত্মক্ষয়ী যুদ্ধ। এই দ্বিমুখী ঝড়ে তরীর গতি শ্লথ হওয়াটাই যেন ছিল প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম।
৯৭-এর চুক্তি-পরবর্তী জেএসএস-এর এই যাত্রাপথকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘সুবিধাবাদ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া ইতিহাসের প্রতি অবিচার হবে। নদী যেমন তার চলার পথে কখনো শান্ত, কখনো খরস্রোতা, জেএসএস-এর আন্দোলনও তেমনি আজ এক দীর্ঘস্থায়ী শান্ত রাজনৈতিক পরিক্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের সেই ‘মেকানিক’ হওয়ার ডাকটিকে আমাদের ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে। তবে তা তরীটিকে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং (যদি) তার পাল ছিঁড়ে যাওয়া অংশটুকু জোড়া লাগানোর জন্য। পাহাড়ের মানুষের অধিকারের লড়াই কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষোভের বিষয় নয়, এটি অস্তিত্বের লড়াই। অতীতের ক্লান্তি ও বর্তমানের ক্ষোভকে একীভূত করে, নবীন ও প্রবীণের মেলবন্ধনে যদি এই জরাজীর্ণ তরীকে আবার সচল করা যায়, তবেই পাহাড়ে শান্তির সেই অধরা সূর্যটি একদিন সত্যি উদিত হবে।
সেদিন ছিল ১৭ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, এক অলস বুধবার। চারদিকের আকাশ সকাল থেকেই মেঘের ঘন চাদরে ঢাকা। মাঝে মাঝে সেই মেঘের বুক চিরে সূর্য তার তেজস্বী উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে বটে, কিন্তু তাতে আলো ছড়ানোর চেয়ে গুমোট ভ্যাপসা গরমই বাড়ছিল কেবল। প্রকৃতির এই অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মাঝেই আমি ডুবে ছিলাম প্রিয় কাজে—চাকমা সাহিত্য পত্রিকা ‘চাদি’ ও চাঙমা সংবাদ পত্র “হিলর পচ্জন”র প্রকাশনা নিয়ে টেবিলজুড়ে আমার ব্যস্ততা।
বেলা ঠিক ১১:৫৬ মিনিটে হাতের মুঠোফোনটি তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জ্ঞান চাকমা (নলেজ)-এর নাম। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর ও কিছুটা তাড়া মেশানো কণ্ঠ ভেসে এল, "জেএসএস অফিসে আসো।"
সকালে স্রেফ নুন দিয়ে ভাত খাইয়ে আমার ছোট্ট মেয়ে জধা চাকমাকে সবেমাত্র ঘুম পাড়িয়েছিলাম। একটু ইতস্তত করে বললাম, "মেয়েটা ঘুমাচ্ছে তো, একটু পরে আসলে হয় না?" উত্তর এল সংক্ষিপ্ত ও অনমনীয়, "তাড়াতাড়ি আসলে ভালো হয়।"
মনটা কু ডাকল। একটা সংশয় মনের কোণে উঁকি দিল—কী এমন জরুরি দরকার, যা আমার জন্য অপেক্ষা করছে? আবার ভাবলাম, কদিন আগেই তো জেএসএস সাধারণ সম্পাদক সমীর দাকে আমাদের চাকমা লেখা (লেঘা) কোর্সটি চালু করার অনুরোধ করেছিলাম; হয়তো সেই বিষয়েই কোনো ইতিবাচক আলোচনা হবে।
সংশয় ঝেড়ে ফেলে মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে কোলে নিলাম। সোজা রওনা হলাম অফিসের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে দেখি জ্ঞান চাকমা নলেজ (সাংগঠনিক সম্পাদক, জেএসএস, দিঘীনালা থানা শাখা) এবং প্রদীপ চাকমা (দপ্তর সম্পাদক, জেএসএস, দিঘীনালা থানা শাখা) বসে আছেন, পাশে এক বয়োবৃদ্ধ মানুষ। উনার সাথে কি কথা যেন বলছেন। আমাদের দেখেই জ্ঞান চাকমা রূঢ় স্বরে বললেন, "মেয়েকে তার মায়ের কাছে দিয়ে এসো।" জধার মা দীঘিনালার লারমা স্কয়ারে বসে শাকসবজি বিক্রি করে। নিরুপায় হয়ে মেয়েকে তার মায়ের জিম্মায় রেখে দ্রুত আবার অফিসে ফিরে এলাম।
কিন্তু চেয়ারে বসতে না বসতেই ঘরের বাতাস যেন বিষিয়ে উঠল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই জ্ঞান চাকমা আচমকা তর্জন-গর্জন শুরু করলেন, "তুমি একটা বেকুব, বেআক্কল! তোমার মতো মানুষকে মেরে ফেললে কী বা ক্ষতি হবে? বড়জোর জেএসএস থেকে বহিষ্কার হতে হবে, এই তো!" একের পর এক অপমানজনক গালিগালাজ ধেয়ে আসতে লাগল আমার দিকে।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম, "আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কী হয়েছে?" তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, "তোমাকে সাইনবোর্ড দিতে কে বলেছে?" "কীসের সাইনবোর্ড? আমি তো কোথাও কোনো সাইনবোর্ড দিইনি!" আকাশ থেকে পড়লাম আমি। আমার বিস্ময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি আরও জ্বলে উঠলেন, "তুমি না দিলে কে দেবে? তোমার সব কাজ আজ থেকে বন্ধ। তুমি আর কোনো কাজ করতে পারবে না এখানে। তুমি কি ত্রিদীপকে চেয়ারম্যান করতে চাও? মনে রেখো, এখানে আমি ছাড়া কেউ চেয়ারম্যান হতে পারবে না!"
তাঁর কথার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রদীপ চাকমা রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, "তুমি কোন ইউনিয়নের লোক? কেন সেখানে কাজ করো?" এরপর জ্ঞানের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কেন বহিষ্কার হবে হে? এই ইনজেবকে হাত-পা ভেঙে রেখে দিলে কী এমন হবে? কিচ্ছু হবে না!"
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করে শামীল দা বললেন, "আমি তোমাকে বহুকাল ধরে চিনি। আচ্ছা, তুমি যদি সাইনবোর্ডটা দিয়েও থাকো, সেটা সরিয়ে নিলেই তো ঝামেলা চুকে যায়।"
আমি জোড়হাতে বিনীতভাবে বললাম, "দা, আমি তো কোনো পর মানুষ নই। সবার সহযোগিতা নিয়েই তো কাজ করছি। এটি শুধু আমার ব্যক্তির কাজ নয়। এই সাইনবোর্ড আমি দিইনি। আমি নিশ্চয়ই কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি, এটা খতিয়ে দেখা দরকার। গত ২৩ মার্চ আমি যে তিনটি সাইনবোর্ড দিয়েছিলাম, তা তো জ্ঞান চাকমা নিজেই ভেঙে দিয়েছেন। তারপর থেকে তো আমি ওমুখো হইনি। তাছাড়া, তখন তো প্রয়োজন মনে করে এলাকার গণ্যমান্য সকলের সাথে পরামর্শ করে, অধিবেশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই ‘অঝাপাত স্কয়ার’-এর সাইনবোর্ড দিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে যখন জ্ঞান চাকমার এত আপত্তি, তখন আমি কেন আবার নতুন করে দিতে যাব?"
আমার যুক্তিপূর্ণ আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ হতে পারল না। প্রদীপ চাকমা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, "কোনো কথা নয়! এখান থেকে উঠে যাও। আর যেন তোমাকে চোখের সামনে না দেখি। অন্যথায় লাঠি পেটা করে বের করে দেব!"
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, এক বুক অপমান আর লাঞ্ছনা নিয়ে আমি সেই তপ্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সুব্রত দার দোকানে বসে এক কাপ চা খেলাম, কিন্তু ভেতরের অস্বস্তিটা কমছিল না। সত্যটা যাচাই করতে নিজেই গেলাম সেই মোড়ে। গিয়ে দেখি, সত্যিই কোনো নতুন সাইনবোর্ড নেই।
জ্ঞান চাকমাকে ফোন করে জানালাম, "আমি তো কোনো সাইনবোর্ড দেখছি না।" তিনি ওপাশ থেকে নির্দেশ দিলেন, "পূর্ব কোণায়, মানে কবাখালী রোডের দিকে গিয়ে দেখো।"
সেখানে গিয়ে দেখলাম, একটি সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেটি তো নতুন নয়! সেটি তো সেই ২৩ মার্চে দেওয়া পুরোনো সাইনবোর্ডটিই, যা পূর্বেই স্থাপন করা হয়েছিল। আমি পুনরায় জ্ঞান চাকমাকে ফোন করে বললাম, "এটি তো ২৩ মার্চের দেওয়া পুরোনো সাইনবোর্ড, কোনো নতুন বোর্ড নয়।" উত্তরে জ্ঞান চাকমা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "আমার চোখে কি লের পড়েছে? এতদিন তো দেখিনি!" আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, "আমার কাছে প্রমাণ আছে, ছবি তোলা আছে। আপনি চাইলে দেখতে পারেন। আর যারা সাইনবোর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে তাদের থেকে জিজ্ঞেস করে দেখেন তারা কয়টি ভেঙ্গে দিয়েছে আর আমি কয়টি সাইনবোর্ড দিয়েছি"
স্মৃতির পাতা হাতড়ালে মনে পড়ে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দীঘিনালার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা-বাবুছড়া সংযোগ সড়ক মোড়টির নাম দেওয়া হবে “অঝাপাত স্কয়ার”। সেই সামাজিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই গত ২৩ মার্চ আমি জয় চাকমাকে সাথে নিয়ে সেখানে সাইনবোর্ডটি স্থাপন করেছিলাম।
অথচ, সেই মহৎ উদ্যোগের পর থেকেই জ্ঞান চাকমা (নলেজ) বারবার আমাকে কটূক্তি করেছেন, হুমকি দিয়েছেন। এমনকি আমাকে জেএসএম বা ইউপিডিএফ করার ‘পরামর্শ’ দিয়ে নিজের ইউনিয়নে কাজ না করার জন্য লিখিত নোটিশ পর্যন্ত পাঠিয়েছেন।
আজকের পৃথিবী বিজ্ঞানের ডানায় ভর করে বহুদূরে এগিয়ে গেছে। ঘরে বসেই আমরা লহমায় হাতের মুঠোয় পেয়ে যাচ্ছি পুরো দুনিয়ার খবরাখবর। মানুষ মহাকাশ জয় করছে, সীমানা পেরিয়ে অজানাকে চিনছে। অথচ, আমরা? নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতির সুতোয় যারা সমাজকে বাঁধতে চাই, তারা আজও কোন আদিম হিংসা আর সংকীর্ণতার বৃত্তে বন্দী হয়ে আছি? প্রগতির আলো কি তবে আমাদের এই বৃত্তের অন্ধকারকে কখনো স্পর্শ করতে পারবে না?
যে জাতির ভিটে কেড়েছে কাপ্তাইয়ের নীল সলিল, যে জাতির স্বপ্ন পিষেছে সেটেলার পুনর্বাসনের লৌহচাকা—সেই চাকমা জাতির ললাটে বিধাতা বুঝি হীরকের কলমে...