বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

পাহাড়ের দেয়ালে ঠেকা পিঠ এবং জন ত্রিপুরার বিস্ফোরক সতর্কতা- ইনজেব চাঙমা

জন ত্রিপুরা

"যে শান্তি জন্য রক্ত দিয়েছি, যে শান্তির জন্য শান্তি বাহিনী গঠন হয়েছিল, শান্তির জন্য অস্ত্র জমা দিয়েছিল, সে শান্তি আর পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকবে না। তাই বলছি, প্রিয় বাংলাদেশ, প্রিয় সরকার, প্রিয় বাঙালি বন্ধুরা, প্রিয় পাহাড়ি বন্ধুরা, চোখ খুলুন আপনাদের। চোখ খোলার সময় এসে গেছে।"

গত ২৩ জুন ২০২৬, বান্দরবানের লামা উপজেলার নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ায় পাহাড়িদের ভূমি বেদখল, হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন জুম্ম তরুণদের প্রতিনিধি জন ত্রিপুরা। তাঁর এই বক্তব্য কেবল কোনো সাধারণ প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের মনে জমে থাকা গভীর ক্ষোভ ও তীব্র বারুদের এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পাহাড়ের সেই ঐতিহাসিক চুক্তি আজো পূর্ণাঙ্গ আলোমুখ দেখেনি। ভূমি কমিশন কার্যকর না থাকায় প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ হতে হচ্ছে আদিবাসীদের। এই চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে জন ত্রিপুরা সমাবেশে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন:

"এই লেখা পড়া আমাদের কাজে দিবে না, টাকা পয়সা আমাদের কাজেই দিবে না। যে বিল্ডিং আমাদের কাজেই দিবে না, যার কারণে আমি সম্পদ খুঁজি, সে সম্পদ যদি রাষ্ট্র নিরাপত্তা, দেশ, সরকার দিতে না পারে, আমাদের মা-বোনদের এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিতে না পারে তাহলে সেই আইন শৃঙ্খলা আমি চাই না। আমি নিজের নিরাপত্তা নিজেই তৈরি করবো। সেটি যদি বেআইনি পথে হয়, সেটি যদি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয় আমি সেথার জন্য প্রস্তুত।"

জন ত্রিপুরার এই বক্তব্য আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। যখন একটি অঞ্চলের নাগরিকরা নিজেদের মৌলিক নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষায় আইনি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন তা সমগ্র দেশের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সন্তু লারমার অবর্তমানে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দেওয়া কঠিন হুঁশিয়ারি। জন ত্রিপুরা বলেন:

"আপনারে সর্তক করছি, সন্তু লারমা যদি মৃত্যু হয় তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম কি অবস্থায় হয় তখন আপনারা বুঝতে পারবেন না। এই সন্তু লারমার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনই শান্তি বজায় রয়েছে। যেদিন সন্তু লারমা মারা যাবে সেদিন দেখবেন এ পার্বত্য চট্টগ্রাম আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তখন বুঝবেন এই সরকার কি ভুল করেছে। ...অপেক্ষায় থাকবেন না সন্তু লারমা মৃত্যুর জন্য। এটি ভুল করবেন। তার বেঁচে থাকার অবস্থায় আমাদের শান্তি প্রতিষ্ঠায় করতে হবে। যদি সে মারা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আর কোন দিন শান্তি হবে না।"


এই তরুণ নেতার বক্তব্য প্রমাণ করে, পাহাড়ের শান্তি আজ কতটা ভঙ্গুর সুতোয় ঝুলছে। শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের পর দীর্ঘ ২৯ বছর পার হলেও শান্তি না আসায় তরুণদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। জন ত্রিপুরা সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, এই মুহূর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দুঃখ ও ক্ষোভ না বুঝে যদি ভাবা হয় যে অস্ত্র দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যাবে, তবে সেটি হবে "মস্তবড় বোকামি কাজ।"

সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারের উচিত পাহাড়ের এই আর্তনাদ ও ক্ষোভের গভীরতা অনুধাবন করা। দমন-পীড়ন বা শক্তির ভাষা নয়, বরং সন্তু লারমার জীবদ্দশাতেই পার্বত্য চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ভূমি কমিশনের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ের এই সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। আর কতকাল পাহাড় এই উপেক্ষার আগুনে জ্বলবে? রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পাহাড়ের দেয়ালে ঠেকা পিঠ এবং জন ত্রিপুরার বিস্ফোরক সতর্কতা- ইনজেব চাঙমা

জন ত্রিপুরা "যে শান্তি জন্য রক্ত দিয়েছি, যে শান্তির জন্য শান্তি বাহিনী গঠন হয়েছিল, শান্তির জন্য অস্ত্র জমা দিয়েছিল, সে শান্তি আর পার্বত...