পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহু যুগ ধরে এক অসুস্থ, ক্ষতবিক্ষত জনপদ। এই ভূখণ্ডের ক্ষত কেবল উপশম হয়নি, সময়ের নির্মম আবর্তে তা আরও গভীর, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। স্মৃতির পাতা উল্টালে দেখি এক দুঃসহ কাল—যখন পাহাড়ের মানুষকে দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগেই রাতের আহার সেরে নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করতে হতো। নিস্তব্ধ রজনীতে কুকুরের করুণ আর্তনাদও বুকের রক্ত হিম করে দিত। ভয়ের সেই করাল গ্রাসে দিনকে মনে হতো দীর্ঘ এক যুগ, আর রাতকে মনে হতো অন্তহীন এক শতাব্দী। চারিদিকে কেবল থমথমে, নিস্পৃহ নীরবতা। তখন পাহাড়ের সরল প্রাণের কাছে চিরস্থায়ী আতঙ্কের প্রতিশব্দ ছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর সেটেলার বাঙালি।
ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সেই ভয়ের রাজত্বে কিছুটা হলেও স্বস্তির হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল। মানুষ আগের চেয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় মন দিতে পেরেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে পা বাড়িয়েছে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। কেউ কেউ ইট-কাঠের সুন্দর ঘর তুলেছে, অথচ জনসংখ্যার বিশাল অংশ আজও মৌলিক অধিকারের ন্যূনতম স্পর্শ থেকে বঞ্চিত। তবু স্বাধীনতা-উত্তর রক্তাক্ত অধ্যায়ের তুলনায় চুক্তি-পরবর্তী সময় নগণ্য হলেও জুম্ম জনগণের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিল।
কিন্তু ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! পার্বত্য চুক্তিকে মনঃপূত না করে পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম নিল ইউপিডিএফ। দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর শান্তি বাহিনীর জীর্ণ-ক্লান্ত যোদ্ধারা যখন বন্দুক রেখে সন্তান-পরিজন নিয়ে একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইলেন, ঠিক তখনই ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর চটকদার স্লোগান তুলে রণক্লান্ত সেই মানুষগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল চুক্তি-বিরোধী এই সংগঠন। সূচনা হলো জুম্ম জাতীয় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও করুণ অধ্যায়—ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়।
গত ২৮ বছরে এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে কত শত মেধাবী তরুণের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে, কতজনকে অন্ধকার কারাকক্ষে দিন গুনতে হয়েছে, তার নির্ভুল হিসাব মেলানো আজ দুষ্কর। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত বাবার ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই ঝরে গেছে, কত সন্তান মাথার উপর থেকে শেষ ছায়াটুকুও হারিয়েছে। মুক্তির নামে বয়ে যাওয়া এই রক্তগঙ্গা ২৮টি বসন্ত পেরিয়েও থামেনি।
আজ আমার লেখার কারণে আমাকে বারবার অভিযুক্ত করা হয়, আমি নাকি কেবল ইউপিডিএফ-এর অন্ধ সমালোচক। শুধু অভিযোগ নয়, আমার প্রতিটি পোস্টে জমা হয় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আর নানাবিধ হুমকি, যা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য নয়। আমাকে ‘জেএসএস’ তকমা দিয়ে খোঁজা হয় আমি কোন শাখার কর্মী। মূলত এই ভুল ধারণার অবসান ঘটাতেই আমার এই লেখা।
আমি কেন ইউপিডিএফ-এর সমালোচনা করি-
১। যে ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে সংগঠনটির জন্ম, ২৮টি বছর পেরিয়েও তারা সরকারের ওপর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ২০২২ সালের ৯ জুন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলামের হাতে একটি দাবিনামা তুলে দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক অর্জন নেই।
২। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিশুদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষার প্ল্যাকার্ড-স্লোগান শেখানো—এটি কোনো রাজনৈতিক সচেতনতা নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে সহিংসতা ও ঘৃণার বীজ বপন করা। আমরা তো চিরকাল শিখে এসেছি, সন্তানের সামনে মা-বাবা ঝগড়া করে না। অথচ এখানে রাজনীতির নামে শিশুমনে হিংসা ও ধ্বংসের বিষ ঢালা হচ্ছে।
অন্যদিকে জেএসএস চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে একঝাঁক মুক্তিপাগল মানুষকে নিয়ে নিরলস কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর জাতিসংঘের অধিবেশনে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নসহ অধিকারহারা মানুষের পক্ষে তারা সোচ্চার হচ্ছে।
জেএসএস যে ভুলের ঊর্ধ্বে বা ধোয়া তুলসীপাতা, তা বলছি না। কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে বড় কাজ করতে গেলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা অপরাধ নয়—অনিবার্য মূল্য। একটি বিশাল বটবৃক্ষের নিচে অন্য চারাগাছ সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বটগাছটি হয়তো তা জানে। কিন্তু সে এও জানে, তার একটি মহাজাগতিক দায় আছে—তার ডালে হাজারো পাখি বাসা বাঁধবে, ফল খেয়ে জীবন বাঁচাবে, আর ক্লান্ত পথিক তার ছায়ায় এসে দেহ-মন জুড়াবে।
আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, পাহাড়ের প্রতিটি মানুষই ‘মুক্তিপাগল’। কিন্তু শুধু মুখে বড় বড় বুলি আর ফাঁকা স্লোগানে মুক্তি আসে না। বুদ্ধ বলে গেছেন—“দুঃখ যেমন আছে, দুঃখমুক্তির উপায়ও আছে।” বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্বত্য চুক্তির কথা বলা এবং এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করা ছাড়া পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের আর কোনো যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত পথ নেই।
তাই ইউপিডিএফ-এর বন্ধুদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন ইস্যু নিয়ে ব্যক্তি-বিদ্বেষ ছড়াবেন না, হুমকি-ধমকির সংস্কৃতি বন্ধ করুন। নিজেদের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং মিশন-ভিশন নিয়ে নির্মোহ আত্মসমালোচনা করুন। এতে দল, দেশ ও জাতি, সবারই মঙ্গল হবে। যারা সত্যিকার অর্থে সমাজের জন্য কাজ করেন, তারা জানেন পার্বত্য চুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এর বাস্তবায়ন কতটা জরুরি।
এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের। আমার এই সত্য উচ্চারণ ও লেখনীর পর আপনারা আমাকে কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন? জাত-বিরোধী, নাকি দালালের তকমা দেবেন? আমি কেবল সত্য ও বাস্তবতার পক্ষে দাঁড়ানো এক নিঃসঙ্গ বন্দা।
চুক্তির পরবর্তী ২৮ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আমাদের কী দিয়েছে? দিয়েছে শুধু লাশের মিছিল, মা-বোনের আহাজারি আর মেধার অপচয়। পূর্ণস্বায়ত্তশাসন হোক বা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, লক্ষ্য যাই হোক, যদি তার পথ রচিত হয় ভাইয়ের রক্তে, তবে সে মুক্তি কার জন্য?
পাহাড়কে আর রক্তাক্ত করবেন না। আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেদের দেখুন। কারণ পাহাড়ের প্রতিটি পাথর আজও ফিসফিস করে বলে, “চুক্তি বাস্তবায়নই শেষ কথা”।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন