সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তির প্রতিশ্রুতি, রক্তের পুনরাবৃত্তি - ইনজেব চাঙমা

 

ইনজেব চাঙমা

"একটি পাহাড় কেবল মাটি, পাথর আর বৃক্ষের সমষ্টি নয়; সেখানে বাস করে মানুষের স্মৃতি, পূর্বপুরুষের পদচিহ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দশটি ভাষাভাষী এগারোটি জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়।"

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় আজও সবুজে মোড়া। দূর থেকে তাকালে মনে হয় প্রকৃতি যেন এখানে তার সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। অথচ সেই সবুজের গভীরে স্তরে স্তরে জমে আছে দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা এবং অমীমাংসিত ইতিহাসের ভার। যতবার মনে হয় শান্তি বুঝি হাতের নাগালে, ততবারই কোনো না কোনো ঘটনা সেই আশার প্রদীপে নতুন ঝড় তোলে।
২২ জুলাই ২০২৬। খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় বাজারে যাওয়ার পথে কয়েকজন আদিবাসী বাসিন্দার ওপর হামলা, মারধর ও মালামাল লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। নারীসহ অন্তত ছয়জন আহত হন। শরীরের ক্ষত হয়তো একদিন শুকিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের মনে যে ভয় জন্মায়, তার কোনো সহজ আরোগ্য নেই।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই, আজ ২৭ জুলাই ২০২৬, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার খেদারমারা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাবলাখালী এলাকায় নিজের দাবি করা ভূমি রক্ষায় বাধা দিতে গিয়ে মহেন্দ্র চাকমা (৫৫) আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে উত্তেজিত পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এলাকা ত্যাগ করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত আজ সময়ের দাবি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ঘটনাগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার চিত্র, নাকি বহু দশক ধরে অমীমাংসিত একটি সংকটের পুনরাবৃত্ত প্রতিধ্বনি?
পার্বত্যবাসীর বিশ্বাস, পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন নীতির পর এই অঞ্চলের সামাজিক ভারসাম্যে গভীর পরিবর্তন এসেছে। একসময়ের সহাবস্থান, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পাহাড় আজ ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তাহীনতার ছায়ায় বারবার আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। পাহাড় যেন আজ আর শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়; সে যেন তার বুকের ভেতর বহন করে চলেছে দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব আর্তনাদ।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—অমীমাংসিত প্রশ্ন কখনো সময়ের গর্ভে হারিয়ে যায় না। তারা নতুন নতুন ঘটনার ছদ্মবেশে আবার ফিরে আসে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট হিসেবে দেখলে তার গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এটি ভূমির প্রশ্ন, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রজ্ঞারও প্রশ্ন।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এই অঞ্চলের মানুষের কাছে একদিন একটি নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি হয়ে এসেছিল। বহু মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এই চুক্তির মধ্য দিয়েই দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নতুন অধ্যায় রচিত হবে। কিন্তু প্রায় তিন দশক পরও চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ার সমস্যা আরো গুরুতর হচ্ছে। পার্বত্যবাসীর বিশ্বাস, চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি স্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদলের বিবরণ সংরক্ষণ করে না; ইতিহাস স্মরণ রাখে সেইসব রাষ্ট্রনায়কদের, যাঁরা বিভক্ত মানুষের মধ্যে আস্থার সেতু নির্মাণ করেছেন, সংঘাতের স্থলে সংলাপ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং ক্ষতবিক্ষত জনপদে শান্তির বীজ বপন করেছেন। যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক সমাধানের পথে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে।
কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ, পাহাড়ি হোক কিংবা বাঙালি, কেউই রক্তের রাজনীতি চায় না। তারা চায় নিরাপদ বসতি, ভূমির নিশ্চয়তা, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং সন্তানদের জন্য একটি ভয়মুক্ত আগামী। কোনো সাধারণ মানুষ যেন আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বলি না হন, এটাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন হলে জয়ী হবে না কোনো একক পক্ষ; জয়ী হবে ন্যায়বিচার, জয়ী হবে সহাবস্থান, জয়ী হবে বাংলাদেশ। আর শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে মানবতাই।
তথ্য: হিল ভয়েচ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সবার আগে আমি একজন মানুষ - ইনজেব চাঙমা

মানুষের পরিচয় কি কেবল তার ধর্মে? সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—এই প্রশ্নের উত্তরেই কি তার সমস্ত অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের পরিচ...