সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

কবি বিনয় শংকর চাঙমার জীবন, সাহিত্য ও সংগ্রাম - ইনজেব চাঙমা

 
“যে কবি নিজের জনপদের কান্না শুনতে পান, তিনিই একদিন একটি জাতির স্মৃতির ভাষা হয়ে ওঠেন।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় কেবল সবুজ অরণ্যের বিস্তার নয়; তার প্রতিটি ঢালে জমে আছে ইতিহাসের স্তর, প্রতিটি ছড়ায় প্রবাহিত হয় মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের দীর্ঘ উপাখ্যান। সেই উপাখ্যানকে শব্দে, কবিতায় এবং গানে রূপ দিয়েছেন কবি বিনয় শংকর চাঙমা। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি পাহাড়ের স্মৃতিরক্ষক, স্বজাতির ভাষার প্রহরী এবং সংস্কৃতির অন্যতম নিবেদিতপ্রাণ সাধক।

প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং জীবনের নির্মম বিপর্যয় তাঁর সাহিত্যযাত্রাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি ক্ষত তাঁর সৃষ্টিকে করেছে আরও গভীর, আরও মানবিক। তাই তাঁর কলমে যেমন ফুটে উঠেছে পাহাড়ের অপরূপ প্রকৃতি, তেমনি উচ্চারিত হয়েছে মানুষের বেদনা, ইতিহাসের দহন, জাতিসত্তার সংগ্রাম এবং অস্তিত্ব রক্ষার অদম্য প্রত্যয়। তাঁর অমর সৃষ্টি “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক।

১৯৪৯ সালের ১১ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার কিয়াংঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বিনয় শংকর চাঙমা। পিতা বিত্তলাল চাঙমা এবং মাতা বিজন মালা চাকমা এর স্নেহময় পরিবারেই তাঁর শৈশবের বীজ রোপিত হয়।

শৈশবের পাঠশালা ছিল পাহাড়, নদী, ছড়া, জুমক্ষেত, বনভূমি আর প্রকৃতির উন্মুক্ত অঙ্গন। পাহাড়ি মানুষের সরল জীবন, উৎসবের রঙ, প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য এবং লোকজ সংস্কৃতির স্পন্দন তাঁর কিশোর মনকে এমনভাবে আলোড়িত করেছিল যে পরবর্তী জীবনে সেগুলোই হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যজগতের প্রধান অনুষঙ্গ। প্রকৃতি তাঁর কাছে কেবল দৃশ্য নয়, সে ছিল শিক্ষক, বন্ধু এবং অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস।

ব্যক্তিজীবনে তিনি জীবনসঙ্গিনী বাসনা চাঙমাকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক স্নেহময় পরিবার। তাঁদের দুই কন্যা বিজয়িনী (সোনা) ও বিদুসিনি (রূপা) এবং দুই পুত্র—বিমুক্তি দর্শন চাঙমা ও অলিয়ন চাঙমা।

রাঙামাটিতে শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি উপলব্ধি করেন, একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
এই উপলব্ধিই তাঁকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে। তিনি পাহাড়ী ছাত্র সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তরুণ শিল্পীদের সংগঠিত করেন।
তাঁর লেখা প্রকাশিত ‘শিঙা’ গানের সংকলন পাহাড়ি সাংস্কৃতিক জাগরণের এক স্মরণীয় মাইলফলক। যেন দীর্ঘ নীরবতার পর আত্মপরিচয়ের ”শিঙা” প্রথমবারের মতো প্রতিধ্বনিত হয়েছিল পাহাড়ের উপত্যকায়।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি লেমুছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাঁচ বছর শিক্ষকতা করার পর সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগে যোগ দেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু সরকারি চাকরির ব্যস্ততা কখনোই তাঁর সাহিত্যচর্চাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। দিনের দাপ্তরিক কর্মব্যস্ততার পর রাতের নির্জনতাই হয়ে উঠত তাঁর সৃষ্টির সময়। পাহাড় যেন নীরবে তাঁর সঙ্গে কথা বলত, আর তিনি সেই কথোপকথনকে কবিতা, গান ও গদ্যের ভাষায় অমর করে রাখতেন।
বিনয় শংকর চাঙমার সাহিত্যজীবন যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বেদনাবিধুর। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও গান লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যসাধনার পথ বারবার আগুনে দগ্ধ হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ে মিজো ও পাঠানদের হামলায় তাঁর বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়ে যায়। দীর্ঘ সাধনার ফসল মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়।
এরপর ২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট মহালছড়িতে সেটেলার বাঙ্গালির সংঘটিত সহিংসতায় তাঁর বাড়িঘর অগ্নিসংযোগে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই আগুনে তাঁর অবশিষ্ট সাহিত্যকর্মও ভস্মীভূত হয়।
চাকমা সমাজে একটি প্রবাদ আছে, “চুরে নিলে তিন কুন, আগুনে নিলে চের কুন।” অর্থাৎ, চোর কিছু নিয়ে গেলেও কিছু অবশিষ্ট থাকে; কিন্তু আগুন গ্রাস করলে আর কিছুই ফিরে পাওয়া যায় না।

এই প্রবাদ যেন তাঁর জীবনেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, আগুন তাঁর কাগজ পুড়িয়েছে, তাঁর স্বপ্ন নয়। প্রতিবার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই তিনি আবার নতুন করে কলম হাতে তুলে নিয়েছেন।
বিনয় শংকর চাঙমা একজন শক্তিমান গীতিকারও। তাঁর রচিত “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” গানটি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মণি স্বপন দেওয়ান-এর সুরে পরিবেশিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা অতিক্রম করে দেশ-বিদেশের চাকমা সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এটি কেবল একটি গান নয়; এটি পাহাড়ের মানুষ, লোগাং, নদী, ভালোবাসা এবং স্বদেশচেতনার এক জীবন্ত দলিল। আজও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিঝু উৎসব কিংবা প্রবাসী চাকমা সমাজের মিলনমেলায় এই গান একই আবেগে উচ্চারিত হয়।
যে গান মানুষের স্মৃতিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে, সেটিই প্রকৃত অর্থে লোকঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” সেই মর্যাদাই অর্জন করেছে।

বিনয় শংকর চাঙমার সাহিত্যভুবন বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। তিনি চাকমা ভাষা ও বাংলায় সমান দক্ষতায় কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, ভ্রমণকাহিনি এবং আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ, ১। রাঙাবেল (চাকমা কবিতা ও বাংলা অনুবাদসহ, ২০১৯), ২। চিত্তমণি ও ধিত্তমণি: সাত প্রজন্মের বংশতালিকা (২০২১), ৩। এযের ফাগুন মাচ (চাকমা কবিতা, ২০২৩), ৪। আমি আদিবাসী (চাকমা কবিতা, ২০২৩), ৫। সবুজ পাহাড়ের কান্না (বাংলা কবিতা, ২০২৩)
এছাড়াও তাঁর ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ রচনা এখনও অপ্রকাশিত। এর মধ্যে রয়েছে, ১। মার ভাচ, ২। ফাগুত্তুম, ৩। মিয়ানমার ভ্রমণ কাহিনী, ৪। ভারতের তীর্থ ও ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ কাহিনী, ৫। অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ কাহিনী, ৬। আমার অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ৭। চিগোন ছড়া, ৮। আতঙ্কিত জনপদে বিঝু প্রভৃতি।

বিনয় শংকর চাঙমার কবিতায় পাহাড় কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের প্রতীক। তাঁর ভাষা সহজ, স্বচ্ছ ও হৃদয়স্পর্শী; কিন্তু তার অন্তর্গত অনুভব গভীর। লোকজ উপমা, চাকমা সংস্কৃতির চিত্রকল্প, প্রকৃতির প্রতীকী ব্যবহার এবং মানবিক সংবেদনশীলতা তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তাঁর রচনায় প্রকৃতি কখনো মায়ের মতো আশ্রয়দাত্রী, কখনো প্রতিবাদের সহযাত্রী, আবার কখনো ইতিহাসের নির্বাক সাক্ষী। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে সমসাময়িক পাহাড়ি সাহিত্যধারায় অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিনয় শংকর চাঙমার জীবন ও সাহিত্য পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য প্রতিফলন। ব্যক্তিগত ক্ষতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অগ্নিকাণ্ডে বারবার পাণ্ডুলিপি হারানো, কোনো প্রতিকূলতাই তাঁর সাহিত্যসাধনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি।
তিনি শুধু কবিতা রচনা করেননি; তিনি একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে সাহিত্যের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয়, একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি।

আজ তিনি খাগড়াছড়ির খবং পজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা অতিক্রম করে বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরেও গভীর মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সময় মানুষের দেহকে ক্ষয় করে, কিন্তু সত্যিকারের সাহিত্যিক সময়কে অতিক্রম করেন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। বিনয় শংকর চাঙমার জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

আগুন তাঁর পাণ্ডুলিপিকে ছাই করেছে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি; ধ্বংস করেছে কাগজ, কিন্তু নিভিয়ে দিতে পারেনি তাঁর স্বপ্নের প্রদীপ। তাই তিনি কেবল একজন কবি নন, তিনি পাহাড়ের স্মৃতিবাহক, ভাষার প্রহরী এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক অনমনীয় রক্ষক।
যতদিন পাহাড় থাকবে, ছড়ার জল বহমান থাকবে, মানুষের মুখে মুখে লোকগান ভেসে উঠবে, ততদিন বিনয় শংকর চাঙমার নামও উচ্চারিত হবে পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে। তাঁর সাহিত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে—ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিই একটি জাতির সবচেয়ে স্থায়ী আশ্রয়, আর সেই আশ্রয় নির্মাণে কবির কলম কখনো পরাজিত হয় না।

তথ্যসূত্র
১. কবি বিনয় শংকর চাঙমার ব্যক্তিগত জীবনবৃত্তান্ত ও মৌখিক সাক্ষাৎকার।
২. কবির প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সবার আগে আমি একজন মানুষ - ইনজেব চাঙমা

মানুষের পরিচয় কি কেবল তার ধর্মে? সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—এই প্রশ্নের উত্তরেই কি তার সমস্ত অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের পরিচ...