মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

সবার আগে আমি একজন মানুষ - ইনজেব চাঙমা


মানুষের পরিচয় কি কেবল তার ধর্মে?
সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—এই প্রশ্নের উত্তরেই কি তার সমস্ত অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের পরিচয়েরও আগে আছে একটি হৃদয়, একটি মন, কিছু স্বপ্ন, কিছু আনন্দ এবং মুক্তভাবে বেঁচে থাকার অধিকার?

 সম্প্রতি ‘শ্রাবণে মেঘগুলো’ ভিডিওকে কেন্দ্র করে স্কুলশিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল সমালোচনার মুখে পড়েছেন (২৩জুলাই ২০২৬ ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে সমালোচনা শুরু হয়)। তাঁকে ঘিরে যখন নানা প্রশ্ন, মন্তব্য ও বিতর্কের ঢেউ উঠেছে, তখন প্রতিবাদে সরব হয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ, কবি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষেরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, আমরা কি একজন মানুষকে তাঁর কর্ম দিয়ে বিচার করছি, নাকি তাঁর পরিচয়ের দেয়াল দিয়ে মাপছি?

 একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি পাতা নন। তিনি বিদ্যালয়ের ঘণ্টা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ থাকা বন্ধ করেন না। শ্রেণিকক্ষের বাইরে তাঁরও একটি পৃথিবী আছে, সেখানে আছে হাসি, গান, অনুভূতি, সংস্কৃতি, আনন্দ আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ছোট ছোট ইচ্ছা। দিনের পর দিন অন্যের সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব যিনি বহন করেন, তাঁর নিজের মনের জন্য কি সামান্য আকাশ থাকবে না?


মানুষের জীবন শুধু দায়িত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা নয়। দায়িত্বের পাশাপাশি আনন্দও আছে, কর্মের পাশাপাশি বিশ্রামও আছে, আর কঠোর বাস্তবতার পাশে আছে শিল্প ও বিনোদনের কোমল আশ্রয়। বিনোদন কোনো অপরাধ নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক অধিকার। গান মানুষের ক্লান্তি দূর করে, কবিতা মানুষের মনকে আলোড়িত করে, শিল্প মানুষকে জীবনের সৌন্দর্য চিনতে শেখায়।

 তবু কখনো কখনো আমরা ভুলে যাই, একজন মানুষের পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও তাঁর একটি ব্যক্তিসত্তা আছে। আমরা শিক্ষককে শুধু শিক্ষক হিসেবে দেখতে চাই, শিল্পীকে শুধু শিল্পী হিসেবে, শ্রমিককে শুধু শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু পরিচয়ের এই কঠিন খাঁচার ভেতরে যে একটি হৃদয় নিঃশব্দে স্পন্দিত হয়, তার কথা আমরা কতবার ভাবি?

 এই ঘটনাকে ঘিরে আমার মনে আরও একটি প্রশ্ন জাগে, তিনি যদি অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ হতেন, তবে কি একইভাবে তাঁকে এত প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হতো? প্রশ্নটি কোনো ধর্মকে ছোট করার জন্য নয়; বরং সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বৈষম্য ও দ্বিমুখী মানদণ্ডকে খুঁজে দেখার জন্য। মানুষের প্রতি আমাদের বিচার যদি ধর্মভেদে বদলে যায়, তবে সেখানে মানবতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

 ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে মানুষের কণ্ঠ স্বাধীন হবে, মর্যাদা নিরাপদ থাকবে এবং পরিচয়ের কারণে কেউ অবহেলিত বা বৈষম্যের শিকার হবেন না। আমরা ভেবেছিলাম, নতুন দিনের আলো পুরোনো সংকীর্ণতার অন্ধকার ভেদ করবে। কিন্তু আজও যদি ধর্ম, পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষের স্বাধীনতা নির্ধারণ করে, তবে আমাদের সেই স্বপ্নের পথ এখনো অনেক দূর।

 ধর্ম মানুষের বিশ্বাস—এটি হৃদয়ের আলো। কিন্তু ধর্ম কখনো মানুষের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়াক, তা কাম্য নয়। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রিস্টান, বিশ্বাসের পথ আলাদা হতে পারে, প্রার্থনার ভাষা ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু মানুষের কান্নার ভাষা এক, হাসির রং এক, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এক।

 আমরা যখন কাউকে দেখি, তখন আগে তাঁর ধর্ম নয়, তাঁর মানুষটিকে দেখি। আগে তাঁর পরিচয় নয়, তাঁর হৃদয়কে বুঝি। কারণ ধর্ম মানুষকে বিশ্বাসের পথ দেখায়, কিন্তু মানবতা মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে যায়।
আজ তাই আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে একটি বাক্য জেগে উঠুক—
“আমি হিন্দু নই, মুসলিম নই, বৌদ্ধ নই, খ্রিস্টান নই—এই পরিচয়গুলোরও আগে আমি একজন মানুষ।”
মানুষের পেশা তার দায়িত্ব, ধর্ম তার বিশ্বাস, সংস্কৃতি তার আত্মার ভাষা; কিন্তু মানবতা তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

 বিউটি রাণী পালকে ঘিরে এই আলোচনা তাই শুধু একজন শিক্ষিকাকে নিয়ে নয়। এটি আমাদের বিবেকের সামনে রাখা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা কি একজন মানুষকে দেখতে পাচ্ছি, নাকি শুধু তাঁর ধর্মীয় পরিচয়?

 সময় এসেছে পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানবতার পথে দাঁড়ানোর। সময় এসেছে অন্যের আনন্দকে সম্মান করার, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়ার এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার।
কারণ—
ধর্মের আগে মানবতা, পরিচয়ের আগে মর্যাদা, আর সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে—মানুষ।

 
#বি.দ্র.: “২০২৪ পর দেশে যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, আজ সেই প্রত্যাশা নানা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি হেনস্তা, ভয়ভীতি, সামাজিক অপমান কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ উদ্বেগজনক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সবার আগে আমি একজন মানুষ - ইনজেব চাঙমা

মানুষের পরিচয় কি কেবল তার ধর্মে? সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—এই প্রশ্নের উত্তরেই কি তার সমস্ত অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের পরিচ...