![]() |
| শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার |
সুরের অমলিন প্রদীপ: শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার
মানুষের জীবন কখনো কখনো একটি গানের মতো—কখনো উচ্ছ্বাসে ভরা, কখনো বেদনার সুরে বিষণ্ন। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর জীবন কোনো একক জীবনের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; তাঁর কণ্ঠ, তাঁর শিল্প আর তাঁর সৃষ্ট স্মৃতি সময়ের স্রোত পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্পর্শ করে। শরীর একদিন নিঃশেষ হয়, অথচ শিল্পের অনুরণন থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায়, একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগীত-ঐতিহ্যে তৃপ্তি তালুকদার ছিলেন তেমনই এক উজ্জ্বল নাম—যাঁর জীবন ছিল সংগীত, সংস্কৃতি, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয়।
তৃপ্তি তালুকদার নামে তিনি সর্বাধিক পরিচিত হলেও জন্মসূত্রে ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত দেওয়ান পরিবারের কন্যা। তাঁর পিতা তেজেন্দ্র লাল দেওয়ান এবং মাতা জ্যোতির্ময়ী দেওয়ান। ১৯৪০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন লারমা গঝা পিড়াভাঙা গুত্তিভুক্ত এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। এই পরিবারে শিক্ষা, শিল্পচর্চা, সংস্কৃতিপ্রীতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত মূল্যবোধ। সেই পরিবেশেই শৈশবের তৃপ্তির হৃদয়ে প্রথম জেগে ওঠে সংগীতের প্রতি অনুরাগ, নৃত্যের প্রতি আকর্ষণ এবং অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি মঞ্চে গান গাইতে শুরু করেন। যে বয়সে অধিকাংশ শিশু খেলায় মগ্ন থাকে, সে বয়সেই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে শিল্পের প্রথম আহ্বান। সেই ক্ষুদ্র পদচারণাই পরবর্তীকালে তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম স্মরণীয় কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করে।
১৯৪৯ সালে তিনি রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মেধা, শৃঙ্খলা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিভার জন্য অল্প সময়েই তিনি শিক্ষকদের স্নেহ ও সহপাঠীদের শ্রদ্ধা অর্জন করেন। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে বিদ্যালয়ের ‘বেস্ট গার্ল’ নির্বাচিত হয়ে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূতের হাত থেকে একটি রূপার কাসকেট পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি ছিল কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর সম্মাননা নয়; ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল শিল্পীসত্তার প্রতি সময়ের নীরব স্বীকৃতি।
১৯৫৯ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরও এক বছর আগে, ১৯৫৮ সালে, তিনি অমিয় প্রকাশ তালুকদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু সংসার তাঁর শিল্পসাধনার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। বরং বিবাহোত্তর জীবনেই তিনি চট্টগ্রামের সঙ্গীত ভবন থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত ও রবীন্দ্রসংগীতে তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা অর্জন করে নিজের শিল্পীজীবনকে আরও পরিপূর্ণ করে তোলেন।
সংসারও ছিল তাঁর আরেকটি সৃজনভূমি। তিনি ছিলেন তিন পুত্রের স্নেহময়ী জননী—তুষার শুভ্র তালুকদার (বাবলী), পার্থ প্রতিম তালুকদার (মিঠুল) এবং আশীষ তালুকদার (বিটু)। মাতৃত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব এবং শিল্পসাধনা—এই তিন ধারাকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় একসূত্রে বেঁধেছিলেন।
তাঁর কণ্ঠ ছিল কোমল অথচ দৃঢ়, মধুর অথচ গভীর। রবীন্দ্রসংগীতের আবেগময় সৌন্দর্য যেমন তিনি নিখুঁত ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করতে পারতেন, তেমনি চাকমা লোকগানের সহজ-সরল প্রাণস্পন্দনও তাঁর কণ্ঠে নতুন প্রাণ লাভ করত। তাঁর কাছে সংগীত ছিল না কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ; ছিল আত্মপরিচয়ের ভাষা, সংস্কৃতির ধারক এবং মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার সবচেয়ে নির্মল পথ।
গানের পাশাপাশি নৃত্য ও নাট্যকলাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। রাঙামাটির ঐতিহাসিক রাজবাড়ীতে রাজমাতা বিনীতা রায় ও সলিল রায়ের পরিচালনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘মৃণালিনী’ নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। সেই নাট্যমঞ্চে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়, কুমার সৌমিত রায়, রাজকুমারী মৈত্রী রায়, রাজকুমারী রাজশ্রী রায়, কবি অরুণ রায়, অনিল রায়, জয়তী রায়, প্রণতি দেওয়ানসহ রাজপরিবার ও সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁদের পাশে সমান দক্ষতায় অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় বংশে নয়, প্রতিভায়; পরিচিতিতে নয়, সাধনায়।
বাংলাদেশের বেতারজগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের নিবন্ধিত রবীন্দ্রসংগীত ও চাকমা গানের শিল্পী। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পাহাড়িকা’ অনুষ্ঠানের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তাঁর সুরেলা কণ্ঠ বেতারের তরঙ্গে ভেসে পৌঁছেছে পাহাড়ের জনপদ থেকে সমতলের অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে।
বিশেষত চাকমা ভাষার গান পরিবেশন করে তিনি এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেন। গীতিকার সুগত চাকমা ননাধন ও শিল্পী রঞ্জিত দেওয়ানের রচিত বহু গান তিনি কণ্ঠে ধারণ করেন। রঞ্জিত দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর গাওয়া একাধিক দ্বৈত সংগীতও শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর কণ্ঠে মাতৃভাষার গান যেন পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছতা, অরণ্যের বাতাসের নির্মলতা এবং মানুষের মমত্বের উষ্ণতা একসঙ্গে ধারণ করত।
তৃপ্তি তালুকদার কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন একজন আদর্শ স্ত্রী, স্নেহময়ী মা এবং সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। সংসারের দায়িত্ব পালনের মধ্যেও তিনি কখনো শিল্পচর্চাকে বিসর্জন দেননি। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—যে মানুষ শিল্পকে ভালোবাসে, সে জীবনকেও ভালোবাসে।
২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর উত্তর কালিন্দীপুরের নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল পঁচাশি বছর। তিনি রেখে গেছেন তিন পুত্র, তিন পুত্রবধূ এবং চারজন নাতি-নাতনি। তবে তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তাঁর পরিবার নয়; তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য গান, তাঁর শিল্পসাধনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর আজীবন নিবেদন।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবু পাহাড়ি সন্ধ্যায় যখন কোনো পুরোনো চাকমা গান ভেসে আসে, কিংবা রবীন্দ্রসংগীতের কোনো সুর হৃদয়কে নীরব করে দেয়, তখন মনে হয়—তৃপ্তি তালুকদারের কণ্ঠ এখনও বাতাসে মিশে আছে। কারণ প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শিল্পে, তাঁর উত্তরসূরিদের স্মৃতিতে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীরতম অনুচ্ছেদে।
তৃপ্তি তালুকদারের জীবন তাই কেবল একজন শিল্পীর জীবনী নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগীত-ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—শিল্পের সাধনা নিছক ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার নীরব সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের এক নিবেদিত, বিনয়ী ও দীপ্তিমান যোদ্ধা ছিলেন শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার।
তথ্য: তুষার শুভ্র তালুকদার

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন