বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
বিঝু মেলার পথে, একটি না-ভোলা দিনের দিনলিপি- ইনজেব চাঙমা
বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
দীপনা চাঙমা দীপু: দুঃখের ভেতরও যে কলম থামে না - ইনজেব চাঙমা
চাঙমা সাহিত্যভুবনে নারী লেখকের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল। সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক দায়িত্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে যাঁরা নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে বুকে ধারণ করে নিরন্তর লিখে চলেছেন, কবি দীপনা চাঙমা দীপু তাঁদেরই একজন। তিনি শুধু কবি নন—গল্পকার, ছোটগল্পকার, সাহিত্যকর্মী এবং সর্বোপরি মাতৃভাষা চাঙমার প্রতি গভীর দায়বদ্ধ এক নিরলস লেখক। তাঁর সাহিত্যযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে একজন নারীর সংগ্রাম, একজন মায়ের দায়িত্ব এবং একজন লেখকের অদম্য স্বপ্ন।
দীপনা চাঙমা দীপুর জন্ম ১৯৮৬ সালের ২১ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের মণিগ্রামে। পিতা পারুল বিকাশ চাঙমা ও মাতা মৃণাদেবী চাঙমার সংসারে দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। (তাঁর বড় বোন ভারতে শরণার্থী জীবনে স্বর্গে গমন করেন।) জন্মের পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর পরিবারকে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে প্রায় তিন মাস অবস্থানের পর তাঁরা আবার নিজ দেশে ফিরে আসেন। জীবনের শুরুতেই বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার যে ছায়া তাঁকে স্পর্শ করেছিল, পরবর্তী জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার এক অদৃশ্য যোগসূত্র যেন থেকে যায়।
শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে তিনি শিক্ষাজীবনে বিএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। স্কুলজীবনে লেখালেখির তেমন সুযোগ বা পরিসর তিনি পাননি, কিন্তু শব্দের প্রতি এক অদৃশ্য আকর্ষণ তাঁর ভেতরে ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছিল। সেই আকর্ষণই কলেজজীবনে এসে প্রকাশের পথ খুঁজে নেয়। ঢাকায় প্রকাশিত একটি লিটলম্যাগ “কথোপকথন” এ বিভাগে নিয়মিত ও ‘চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা’-য় লেখালেখির মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। সেই যে কলম হাতে নিয়েছিলেন, তা আর থামেনি।
তাঁর কাছে লেখা নিছক মনের ভাব প্রকাশের কোনো ব্যক্তিগত অবকাশ নয়। লেখা তাঁর কাছে নিজের জাতিসত্তা, মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের কথা বলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলা ভাষায় লেখার পাশাপাশি নিজের মাতৃভাষা চাঙমাকে তিনি সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান অবলম্বন করেছেন। কবিতা, গল্প ও ছোটগল্পে তিনি তুলে ধরেছেন চাঙমা সমাজের মানুষ ও তাদের জীবনযাপন, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি, সামাজিক টানাপোড়েন এবং প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক ছবি।
দীপনার লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি তার জীবনঘনিষ্ঠতা। তাঁর সৃষ্টিতে কৃত্রিমতার চেয়ে বাস্তবতার স্পর্শ বেশি। চারপাশের মানুষ, তাদের হাসি-কান্না, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অভাব, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তাঁর লেখার উপাদান হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের দেখা জীবন কখনো কবিতার পঙ্ক্তি, কখনো গল্পের চরিত্র, আবার কখনো ছোটগল্পের নিঃশব্দ বেদনা হয়ে তাঁর কলমে ফিরে আসে। তাঁর সাহিত্য তাই কেবল কল্পনার ফুল ফোটায় না; সেখানে মাটির গন্ধ আছে, মানুষের দীর্ঘশ্বাস আছে, আছে জীবনের অনুচ্চারিত কথার প্রতিধ্বনি।
তাঁর কবিতা, গল্প ও ছোটগল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সাহিত্যসংকলন এবং অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও তাঁর কোনো একক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু একজন লেখকের সাহিত্যিক মূল্য কেবল প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। অনেক সময় দীর্ঘদিনের নীরব সাধনা, অবিচল লেখালেখি এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতার ধারাবাহিকতাই হয়ে ওঠে একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয়।
২০২৩ সালে নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে প্রকাশিত যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পুগবেল’-এ তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। একক গ্রন্থের অপেক্ষায় থাকা একজন কবির জন্য এটি ছিল নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় সাহিত্যিক অর্জন।
সাহিত্যের পাশাপাশি দীপনা চাঙমা দীপু চাঙমা সমাজের সংবাদ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন। ‘হিলর পচ্জন’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি শুধু নিজের সাহিত্যচর্চার পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর এই সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক ব্যক্তিগত আত্মপ্রকাশ নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার নাম।
তবে দীপনা চাঙমা দীপুর জীবনকাহিনির সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় তাঁর ব্যক্তিজীবন। দিঘীনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের নুনছড়ি গ্রামের জেলাস চাঙমার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই সন্তান, শ্রাবণ চাঙমা ও কার্তিকা চাঙমা। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন স্বামীর দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁদের জীবনে নেমে আসে গভীর দুর্যোগ হয়ে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, সংসারের ব্যয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব, সবকিছু একসঙ্গে বহন করতে হয়েছে দীপনাকে।
দীপনার জীবন যেন আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। জীবিকার তাগিদে কখনো তাঁকে রাস্তার পাশে বসে পাজন ও তরিতরকারি বিক্রি করতে হয়েছে। সংসারের প্রয়োজন তাঁকে নানা ধরনের কাজের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যে হাত কবিতার শব্দ লিখেছে, সেই হাতই সংসার চালানোর জন্য জীবিকার সামগ্রী সাজিয়েছে। যে চোখ সাহিত্যের স্বপ্ন দেখেছে, সেই চোখই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে রাত কাটিয়ে যাচ্ছেন। জীবন কখনো তাঁকে কবির জন্য আলাদা কোনো অবকাশ দেয়নি। তবু তাঁর কলম থামেনি।
অভাব এসেছে, নিঃসঙ্গতা এসেছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা বারবার তাঁকে নত করতে চেয়েছে, কিন্তু সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তাঁকে থামতে দেয়নি। নুনছড়ি গ্রামের ছোট্ট সংসারে দুই সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম চালিয়েও তিনি লিখে চলেছেন। তাঁর কাছে তাই লেখালেখি শুধু সাহিত্যচর্চা নয়, এ যেন বেঁচে থাকারও এক অনন্য ভাষা।
কেউ কেউ অবসর থেকে সাহিত্য লেখেন; আর কেউ কেউ লেখেন জীবনের গভীর ক্ষত থেকে। তাঁর শব্দের ভেতর তাই কেবল কাব্যিক সৌন্দর্য নেই; আছে জীবনের উত্তাপ। আছে একজন নারীর সংগ্রাম, একজন মায়ের মমতা এবং একজন লেখকের অদম্য স্বপ্ন।
দীপনার সাহিত্যিক সত্তার আরেকটি উজ্জ্বল দিক তাঁর মাতৃভাষাপ্রীতি। তিনি নিজের ভাষাকে পেছনে ফেলে অন্য কোনো ভাষার ছায়ায় বড় হতে চাননি, বরং চাঙমা ভাষাকেই সঙ্গে নিয়ে নিজের সাহিত্যিক পথ নির্মাণ করতে চেয়েছেন। চাঙমা ভাষায় তাঁর লেখালেখি তাই ব্যক্তিগত সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষারও এক নীরব প্রয়াস। একটি ভাষা তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন সেই ভাষায় মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসে, কাঁদে, কথা বলে এবং সাহিত্য সৃষ্টি করে। দীপনা তাঁর কলমের মাধ্যমে সেই বেঁচে থাকার কাজটিই করে চলেছেন।
হয়তো তাঁর ঘরে বইয়ের তাক এখনও পূর্ণ হয়নি। হয়তো তাঁর নামে একক কাব্যগ্রন্থের মলাট এখনও প্রকাশকের ছাপাখানা থেকে বেরিয়ে আসেনি। কিন্তু একজন লেখকের জীবন কি কেবল মলাটবন্দি বইয়ের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায়? দীপনার জীবনের প্রতিটি দিনই যেন এক একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি। সেখানে আছে অভাবের অক্ষর, শোকের বাক্য, মাতৃত্বের মমতা, সংগ্রামের দীর্ঘ অধ্যায় এবং আশার কিছু অনুচ্চারিত পঙ্ক্তি। তাঁর জীবনই যেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ,যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখা আছে বেঁচে থাকার ইতিহাস।
দীপনা চাঙমা দীপু তাই শুধু একজন কবির নাম নয়; তিনি এক সংগ্রামী নারীর নাম, এক মায়ের নাম, এক সাহিত্যকর্মীর নাম এবং এক মাতৃভাষাপ্রেমী লেখকের নাম। প্রতিকূলতার কাছে পরাজিত না হয়ে যিনি শব্দকে সঙ্গী করেছেন, দুঃখকে করেছেন সৃষ্টির উপাদান, আর জীবনসংগ্রামকে রূপ দিয়েছেন সাহিত্যের অনিঃশেষ প্রেরণায়।
দুঃখ তাঁকে থামাতে পারেনি, অভাব তাঁর স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি, সংসারের ভার তাঁর কলমকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং জীবনের যত কঠিন পথ তিনি অতিক্রম করেছেন, তাঁর লেখার ভেতর তত গভীর হয়েছে মানুষের প্রতি মমতা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা।
চাঙমা সাহিত্যের অঙ্গনে দীপনা চাঙমা দীপুর পথচলা এখনও দীর্ঘ হওয়ার অপেক্ষায়। তাঁর একক গ্রন্থের মলাট হয়তো সময়ের কাছে এখনও ঋণী, কিন্তু তাঁর কলম ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছে, সাহিত্য শুধু কাগজে লেখা হয় না; কখনো কখনো একজন মানুষের সমগ্র জীবনই হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘ কবিতা। আর দীপনা চাঙমা দীপুর জীবন, সেই অসমাপ্ত কবিতারই এক বেদনাময়, সংগ্রামী অথচ দীপ্ত অধ্যায়।
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
পেনশনের টাকায় মানবতার আলো চঞ্চল কান্তি চাঙমা—এক নীরব মানবপ্রেমিকের জীবনকথা - ইনজেব চাঙমা
![]() |
| চঞ্চল কান্তি চাঙমা |
মানুষের জীবন কতটা বড়, তা তার ঘরের আয়তনে, ব্যাংকের হিসাবের অঙ্কে কিংবা পদ-পদবির উচ্চতায় মাপা যায়না। মানুষের জীবন বড় হয়ে ওঠে অন্য মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।নিজের প্রাপ্তিকে কতটা অন্যের জন্য বিলিয়ে দেওয়া যায়, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের প্রকৃত মহত্ত্ব।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দিঘীনালা উপজেলার উত্তর কামুক্কোছড়া গ্রামের চঞ্চল কান্তি চাঙমা তেমনই একজন মানুষ। তিনি কোনো বিত্তবান সমাজপতি নন, নন কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। একজন সাধারণ চাকরিজীবী হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে পাওয়া পেনশনের সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন অসহায় প্রবীণ মানুষের পাশে। তাঁর এই ছোট্ট উদ্যোগের মধ্যে যে বিশাল মানবিকতার পরিচয় রয়েছে, সেটিই তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছে।
তাঁর জীবনদর্শনের একটি বাক্য যেন তাঁর সমগ্র জীবনকে ধারণ করে, “মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো পরিশ্রম ও সদাচরণ।” এই কথাটি তিনি শুধু বলেননি; নিজের জীবন দিয়ে তার অর্থ বুঝিয়েছেন।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জন্ম ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দিঘীনালা উপজেলার বোয়ালখালী ইউনিয়নের কামুক্কোছড়া গ্রামে। তাঁর পিতা মৃত নিরতা রঞ্জন চাঙমা এবং মাতা সুনীতি বালা চাঙমা।
তাঁর সহধর্মিণীর নাম শান্তি রাণী চাঙমা। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে চার সন্তানের জন্ম—দুই কন্যা ও দুই পুত্র। সন্তানরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
১. বিটি চাঙমা — অ্যাকাউন্টেন্ট, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, রাঙামাটি।
২. ইতি চাঙমা — সিনিয়র স্টাপ নার্স, রাঙামাটি।
৩. মুক্তা চাঙমা — উপ-মেডিকেল অফিসার, সিভিল সার্জন অফিস, রাঙামাটি।
৪. সুমন চাঙমা — যুগ্ম পরিচালক, ক্ষুদ্রঋণ বিভাগ, হেড অফিস, ঢাকা।
সংসার, কর্মজীবন ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে চঞ্চল কান্তি চাঙমার পারিবারিক জীবন যেমন পূর্ণতা পেয়েছে, তেমনি সন্তানদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠাও তাঁর দীর্ঘ জীবনের শ্রম, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
একটি সাধারণ ও সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। জীবনের শুরু থেকেই তাঁকে বুঝতে হয়েছে অভাবের ভাষা। তবু স্বপ্ন ছিল, পড়াশোনা করবেন, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বেন। সেই স্বপ্নের পথে তিনি এগিয়েছিলেনও। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাস করেন। কিন্তু বাস্তবতা সব স্বপ্নকে সমান সুযোগ দেয় না। পরিবারের আর্থিক অনটন তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ থামিয়ে দেয়। বই-খাতা সরিয়ে তাঁকে হাতে তুলে নিতে হয় কর্মজীবনের দায়িত্ব। ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি কেপিএমে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন।
পরে ১৯৭৯ সালের ২০ ডিসেম্বর রাঙামাটি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে যোগ দেন। দীর্ঘদিন হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অবসর গ্রহণ করেন।
কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি যখন অবসরে ফিরলেন, তখন তাঁর সামনে ছিল নিজের জন্য একটু স্বস্তির জীবন কাটানোর সুযোগ। কিন্তু চঞ্চল কান্তির হৃদয়ের ভেতর তখনও বেঁচে ছিল আরেকটি পুরোনো স্বপ্ন—মানুষের জন্য কিছু করা।
চাকরির ব্যস্ততায় মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছেটা হয়তো সবসময় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু কোনো কোনো স্বপ্ন মানুষের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে। সময়ের অপেক্ষা করে। চঞ্চল কান্তির সেই স্বপ্নও বেঁচে ছিল। অবসর তাঁকে সেই সুযোগ এনে দিল।
তবে মানুষের সেবায় তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ছিল নিজের বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন। অবসরজীবনের শুরুতেই তিনি বাবা-মায়ের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁদের জন্য গড়ে তোলেন ‘অবসর ভবন’।
বাবা-মায়ের পাশে বসে, তাঁদের বার্ধক্যের দিনগুলো কাছ থেকে দেখে তিনি যেন নিজের চারপাশের আরও অনেক প্রবীণ মানুষের মুখ দেখতে পেলেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষ, চিকিৎসার অর্থ নেই; প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই; ছোটখাটো প্রয়োজন মেটানোরও ক্ষমতা নেই—এই বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করলেন, প্রবীণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়—প্রয়োজন একজন মানুষের হাত, যে বলবে, “আপনি একা নন।”
এই উপলব্ধি থেকেই চঞ্চল কান্তি চাঙমা গড়ে তোলেন ‘পেনশন’ নামে একটি সংগঠন। আর নিজের অবসর ভাতার অর্থ থেকেই শুরু করেন অসহায় প্রবীণদের জন্য ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ। ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবসে দিঘীনালা উপজেলা ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি প্রকাশ্যে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেন।
সেদিন তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল তহবিল। ছিল না বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা। ছিল শুধু নিজের পেনশনের টাকা এবং মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর এই উদ্যোগ দেখে অন্যরাও এগিয়ে আসুক। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো যেন বুঝতে পারেন, প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো শুধু রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের মানবিক দায়িত্ব।
আজও নিজের অবসর ভাতা থেকে তিনি প্রতি মাসে পাঁচজন প্রবীণকে ৫০০ টাকা করে মোট ২,৫০০ টাকা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। অর্থের অঙ্কটি হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু ভালোবাসার অঙ্কে এর মূল্য অনেক বেশি।
কারণ, এই টাকা কোনো দানশীল প্রদর্শনের অর্থ নয়; এটি একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নিজের প্রাপ্য অর্থ থেকে অন্যের জন্য তুলে রাখা অংশ। নিজের আরামের ভেতর থেকে অন্যের প্রয়োজনকে জায়গা করে দেওয়া, এটাই তো মানবতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার পেনশন তাঁর নিজের বার্ধক্যের নিরাপত্তার জন্যও ব্যবহার করা যেত। নিজের ঘর, নিজের প্রয়োজন, নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, সবকিছুই হতে পারত সেই অর্থের স্বাভাবিক গন্তব্য। কিন্তু তিনি অন্য একটি পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর কাছে পেনশন শুধু অবসরজীবনের প্রাপ্য অর্থ নয়; এটি হয়ে উঠেছে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি মাধ্যম। এখানেই তাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রাখে, আমরা যা পেয়েছি, তার কতটুকু অন্যের জন্য রাখতে পারি? চঞ্চল কান্তির উত্তর তাঁর কর্মেই রয়েছে।
তিনি জানেন, পাঁচজন প্রবীণকে মাসে ৫০০ টাকা করে দেওয়া দিয়ে সমাজের সব দুঃখ দূর হবে না। কিন্তু একজন অসহায় মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু অর্থ দেওয়া নয়; তাঁর আত্মমর্যাদাকে একটু শক্ত করে দেওয়া, তাঁর মনে একটু আশার আলো জ্বালানো।
মানুষের জন্য করা কাজ কখনো কখনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চঞ্চল কান্তি চাঙমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে এবং এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়।
২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ তাঁকে প্রদান করে ‘মানবাধিকার পদক’। স্বীকৃতি তাঁকে সম্মানিত করেছে, কিন্তু তাঁর কাজের আসল পুরস্কার হয়তো কোনো পদক বা অর্থ নয়। তাঁর আসল পুরস্কার সেই প্রবীণ মানুষের মুখের স্বস্তি, যিনি মাসের শেষে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সামান্য সহায়তায় প্রয়োজনীয় একটি জিনিস কিনতে পারেন।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবন কোনো রাজকীয় কাহিনি নয়। এটি একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। তিনি আমাদের শেখান, মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য বিপুল সম্পদের মালিক হতে হয় না। বড় পদে অধিষ্ঠিত হতে হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি সংবেদনশীল হৃদয়।
তিনি আরও শেখান, মানুষের জন্য কাজ করার সময় কখনোই ‘সময় নেই’ কথাটি চূড়ান্ত অজুহাত হতে পারে না। চাকরিজীবনে সুযোগ কম ছিল, কিন্তু অবসরে এসে তিনি তাঁর বহুদিনের ইচ্ছাকে কাজে পরিণত করেছেন।
জীবনের শেষভাগে এসে তিনি যেন নিজের কাছে ফিরে পেয়েছেন সেই তরুণ চঞ্চলকে, যে একদিন অভাবের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু মানুষের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্নটি কখনো থামায়নি।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবনকে তাই শুধু একজন অবসরপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষকের জীবনী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর জীবন একটি মূল্যবোধের গল্প। এটি এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ মানবিক হয়ে ওঠার গল্প।
একদিকে তাঁর জীবনের শুরু, অভাব, সীমিত শিক্ষা, কর্মজীবনের সংগ্রাম। অন্যদিকে জীবনের শেষ অধ্যায়, নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো। জীবন যেন তাঁকে একটি পূর্ণ বৃত্ত দিয়েছে।
যে মানুষটি একসময় অভাবের কারণে নিজের পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেননি, সেই মানুষটিই পরবর্তীকালে বুঝেছেন, অভাবের কষ্ট কী। আর সেই উপলব্ধিই তাঁকে নিয়ে গেছে অন্যের অভাবের পাশে দাঁড়াতে। তাই চঞ্চল কান্তি চাঙমা কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি মানবিক দর্শনের নাম।
তাঁর হাতে হয়তো বিপুল অর্থ নেই, কিন্তু আছে দেওয়ার মানসিকতা। তাঁর কাছে হয়তো বিশাল প্রতিষ্ঠান নেই, কিন্তু আছে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাঁর কণ্ঠে হয়তো বড় কোনো বক্তৃতা নেই, কিন্তু তাঁর কর্মই তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্য।
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া মানবিকতার আলো থেকে যায়। চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবনও তেমন এক আলোর গল্প। তাঁর পেনশনের সামান্য অর্থ হয়তো একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি যে দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন, তার মূল্য শেষ হওয়ার নয়।
তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—
নিজের জন্য বাঁচা জীবনের স্বাভাবিকতা, কিন্তু অন্যের জন্য বাঁচতে শেখাই জীবনের মহত্ত্ব। একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের পেনশন যখন পাঁচজন অসহায় প্রবীণের মুখে স্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে, তখন সেই অর্থ আর শুধু টাকা থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানবতার অমলিন দলিল।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
মানুষ বড় হয় সম্পদে নয়, হৃদয়ের উদারতায়। মানুষ স্মরণীয় হয় পদে নয়, কর্মে। আর জীবন সার্থক হয় নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য কিছু করতে পারলে।
তাঁর নিজের ভাষায়—“মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো পরিশ্রম ও সদাচরণ।”
এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে চঞ্চল কান্তি চাঙমা আজও হেঁটে চলেছেন—নীরবে, নিরবে; কিন্তু তাঁর সেই নীরব পদচিহ্নে জেগে থাকে মানবতার এক উজ্জ্বল পথরেখা।
অধিকার ছাড়া কোনো জাতির ভবিষ্যৎ স্থায়ী হয় না -ইনজেব চাঙমা
প্রতিটি বস্তুরই নিজস্ব ধর্ম আছে, আছে নিজস্ব সত্তা ও বৈশিষ্ট্য। একই রক্ত-মাংসের মানুষ হলেও প্রত্যেকের চিন্তা, চেতনা, উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। একই গোত্র, একই জাতি কিংবা একই সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়েও মানুষের চিন্তাভাবনা ও অভিব্যক্তির মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য থাকে। কারণ প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার আলোকে পৃথিবীকে দেখে এবং সেই উপলব্ধি থেকেই নিজের মত প্রকাশ করে।
তাই আমার লেখাকে কেউ সমালোচনা করলে আমি তা খুশি মনেই গ্রহণ করি। সমালোচনা চিন্তার বিকাশ ঘটায়, ভুল ধরিয়ে দেয় এবং নিজের অবস্থানকে নতুন করে যাচাই করার সুযোগ তৈরি করে। তবে আমি কাউকে পূজা করতে পারি না—তার মানে এই নয় যে আমি কাউকে অশ্রদ্ধা করি। বরং ব্যক্তি হিসেবে যাঁদের আমি শ্রদ্ধা করি, তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অন্তরের গভীরতা থেকেই আসে। অন্ধ আনুগত্য আর শ্রদ্ধা এক বিষয় নয়; শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রশ্ন থাকতে পারে, মতপার্থক্য থাকতে পারে, এমনকি সমালোচনাও থাকতে পারে।
গত মার্চ মাস থেকে আমি বাংলা ভাষায় কিছু লেখা শুরু করেছি। বিষয়টি অনেকের কাছে হয়তো বিস্ময়ের কারণ হতে পারে। কারণ আমি মূলত চাঙমা ভাষায় লেখালেখি করি এবং দীর্ঘদিন ধরে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে কাজ করে আসছি। তাহলে হঠাৎ বাংলা ভাষায় কেন লিখছি, এর পেছনে অবশ্যই একটি কারণ রয়েছে। সেই কারণ এখনই বিস্তারিত বলতে চাই না। সময় হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আপাতত মূল আলোচনায় আসি।
আমি জানি, আমার লেখা অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তাঁদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের কাছে আমার একটি প্রশ্নও আছে, কেন আমি লিখছি, সেটিও কি একবার ভেবে দেখা যায় না?
দীর্ঘ বছর চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, অধিকার ছাড়া কোনো কাজই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য কিংবা বর্ণমালা যতই সমৃদ্ধ হোক, সেই জাতির নিজের অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না থাকলে তার অস্তিত্ব ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অধিকারহীন জাতি অনেকটা পরগাছার মতো বেঁচে থাকে, নিজের শিকড় থাকলেও নিজের মাটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
এই উপলব্ধিই আমাকে শুধু ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে।
আমাদের সমাজের দিকে তাকালে এখনো কিছু পুরোনো মানসিকতার অস্তিত্ব চোখে পড়ে। ব্যক্তিবাদ, আত্মীয়বাদ, গোত্র-গোষ্ঠীবাদ, এলাকাবাদ, এসবের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে আছে দলবাদ। দলীয় পরিচয় অনেক সময় ব্যক্তির চিন্তা, যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়নের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কেউ কোনো কথা বললে তার বক্তব্যের সত্যতা, যুক্তি কিংবা প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই তাকে সমালোচনা কিংবা আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়।
কখনো বক্তব্যে ত্রুটি না পেলে ব্যক্তির জন্মপরিচয়, পারিবারিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অতীত টেনে এনে আক্রমণ করা হয়। এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। মতের বিরোধিতা যুক্তি দিয়ে হওয়া উচিত, ব্যক্তিকে আক্রমণ করে নয়।
আমি এই সংস্কৃতির বাইরে আসতে চাই। আমি চাই, আমাদের সমাজে মানুষকে তার দল, গোত্র, পরিবার কিংবা পরিচয় দিয়ে নয়, তার চিন্তা, কর্ম, যুক্তি ও অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হোক। মতের পার্থক্য থাকবে, সমালোচনা থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু সেই বিতর্ক যেন যুক্তিনির্ভর ও সভ্য হয়।
আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই, আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও মতকে আলাদা করতে শিখিনি। একজন মানুষকে শ্রদ্ধা করা মানেই তার প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। আবার কারও বক্তব্যের সমালোচনা করা মানেই তাকে অসম্মান করা নয়। এই সহজ সত্যটি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি।
এই জায়গা থেকেই আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির কোন বিষয় সঠিক, কোন বিষয় অসম্পূর্ণ, কোন বিষয় নিয়ে সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন আছে, এসব নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু চুক্তির বাস্তবায়নের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অধিকারগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
চুক্তির বাস্তবায়ন কেবল প্রশাসনিক কোনো বিষয় নয়; এটি আমাদের সমাজের চিন্তা ও চেতনার বিকাশের সঙ্গেও সম্পর্কিত। অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও স্বাধীনভাবে ভাবতে পারে। তখন ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য, অর্থনীতি, আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, সবকিছু নিয়েই আরও গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়।
আমার কাছে তাই ভাষার অধিকার এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক অধিকার পরস্পর বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা রক্ষার সংগ্রাম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকার ও পরিবেশ প্রতিষ্ঠাও গুরুত্বপূর্ণ।
আমি কারও পূজা করতে চাই না, কারও অন্ধ অনুসারীও হতে চাই না। আমি চাই প্রশ্ন করতে, জানতে, ভুল হলে ভুল স্বীকার করতে এবং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে। আমার বক্তব্য ভুল হলে সমালোচনা করুন; যুক্তি দিয়ে ভুল প্রমাণ করুন। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, চলুন আমরা চিন্তার সঙ্গে চিন্তার, যুক্তির সঙ্গে যুক্তির এবং ধারণার সঙ্গে ধারণার মোকাবিলা করি।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল আবেগ দিয়ে নির্মিত হয় না; তা নির্মিত হয় জ্ঞান, অধিকার, আত্মসমালোচনা, যুক্তিবোধ ও দূরদর্শী চিন্তার ভিত্তির ওপর।
আজ আমি বাংলা ভাষায় লিখছি, এরও একটি উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য হয়তো আজ সবার কাছে স্পষ্ট নয়। সময়ই তার উত্তর দেবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি কারও বিরুদ্ধে লিখতে চাই না; আমি লিখতে চাই আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমাদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে, আমাদের সম্ভাবনা নিয়ে, আমাদের অধিকার নিয়ে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
কারণ অধিকারহীন অবস্থায় শুধু টিকে থাকা নয়, নিজের ভবিষ্যৎ নিজের মতো করে নির্মাণ করাই একটি জাতির প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অমর শান্তি চাঙমা : পাহাড়ের এক নিরলস সৃষ্টিসাধনার জীবন - ইনজেব চাঙমা
“উত্তোন পেইগে মেঘে মেঘে”, “ফুল ভমরা ফুল বাগান নাজি নাজি যয়”, “থেঙত কারু ঝনাত ঝনাত” “এ দেঝর মোন-মুরহ্ ছরাহ্-ছুরিহ্ গাঙ”, “মুক্তি পাগল জুম্মবী...
-
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন , যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের নিরলস কর্মে নির্মাণ ...
-
সেদিন ছিল ১৭ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, এক অলস বুধবার। চারদিকের আকাশ সকাল থেকেই মেঘের ঘন চাদরে ঢাকা। মাঝে মাঝে সেই মেঘের বুক চিরে সূর্য তার তেজস্...
-
পাহাড়ে আজ যে ‘মর্ডানিজম’ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা নয়। এটি হলো সাজানো-গোছানো এক নতুন উপনিবেশ। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভেতর...



