কবি বিনয় বিকাশ তালুকদার "একটি জাতির ভাষা যখন তার নিজস্ব বর্ণমালায় উচ্চারিত হয়, তখন সেই ভাষার প্রতিটি শব্দ ইতিহাসের মতো দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। আর সেই ইতিহাসকে যাঁরা কলমে ধারণ করেন, তাঁরাই জাতির প্রকৃত আলোকবর্তিকা।"
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় শুধু সবুজ বনানী, ঝরনা আর মেঘের নিবাস নয়; এটি শতাব্দীপ্রাচীন ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত ভাণ্ডার। সেই ভাণ্ডারের নীরব প্রহরীদের অন্যতম কবি বিনয় বিকাশ তালুকদার, যিনি জীবনের আরাম-আয়েশ নয়, বেছে নিয়েছেন শব্দের কঠিন সাধনা এবং জাতিসত্তার সেবাকে।
১৯৬১ সালের ১১ নভেম্বর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার নাবিদে পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা রেবতি রঞ্জন তালুকদার এবং মাতা কল্পলতা চাঙমার স্নেহছায়ায় বেড়ে উঠলেও শৈশব ছিল অভাব, অনটন ও সংগ্রামে ঘেরা। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁর স্বপ্নকে পরাজিত করতে পারেনি; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস এবং নিজের জাতির জন্য কিছু করার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই তাঁর জীবনের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
শিক্ষাজীবনের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র তার ভাষা ও সাহিত্য। সেই উপলব্ধি থেকেই সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে। তাঁর কলমে জন্ম নিতে থাকে কবিতা, নাটক, গল্প, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ। ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা অতিক্রম করে তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে পাহাড়ের জীবন, মানুষের সংগ্রাম, সংস্কৃতির গৌরব এবং অস্তিত্ব রক্ষার আকুতি। তাঁর রচনাগুলো বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়ে পাঠকমহলে বিশেষ সমাদৃত হয়।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সমান সক্রিয় ছিলেন। ২০১৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক ফোরাম-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সাহিত্য আন্দোলনে নতুন প্রাণসঞ্চার করেন। ২০১৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ অ্যাসোসিয়েশন-এর শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। পরের বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম শিক্ষা সহায়ক ফাউন্ডেশন-এর ট্রাস্টি সম্পাদক হিসেবে শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর কর্মপরিধি কেবল সংগঠনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। ‘তানঝাং’ নামের চাঙমা সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি নতুন লেখকদের উৎসাহিত করেছেন, সাহিত্যচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন এবং চাঙমা ভাষার বিকাশে নিরলস শ্রম দিয়েছেন। একই সঙ্গে চাঙমা ভাষা প্রশিক্ষক হিসেবে মাতৃভাষা ও চাঙমা বর্ণমালা শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাপ্রীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে জাগ্রত করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।
কবি বিনয় বিকাশ তালুকদারের সাহিত্যজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আহ্’ভিল্যাচ’। এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণ চাঙমা ভাষায় এবং চাঙমা বর্ণমালায় প্রকাশিত, যা কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক সাংস্কৃতিক ঘোষণা। নিজস্ব ভাষা ও লিপিতে সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মা, ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি।
আজ বিনয় বিকাশ তালুকদার কেবল একজন কবির নাম নন; তিনি এক নীরব সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর কলমে পাহাড়ের নিসর্গ যেমন কথা বলে, তেমনি উচ্চারিত হয় মানুষের অধিকার, ভাষার মর্যাদা এবং সংস্কৃতির অমর আবেদন। তিনি বিশ্বাস করেন, যে জাতি তার ভাষাকে ভালোবাসে, সেই জাতির ইতিহাস কখনো বিলীন হয় না।
সময়ের স্রোত একদিন মানুষের জীবনকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের সাহিত্যিকের সৃষ্টি কখনো থেমে থাকে না। বিনয় বিকাশ তালুকদারের শব্দসাধনা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অটল নিবেদন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর সাহিত্যকর্ম ও সাংস্কৃতিক অবদান চাঙমা জাতিসত্তার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে দীর্ঘকাল স্মরণীয় থাকবে।

ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশে এরা নিরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের লেখনির মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্ব টিকে রবে পাহাড় তথা পৃথিবীর বুকে….
উত্তরমুছুন