স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এক দীর্ঘ অস্থিরতা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। সত্তোর থেকে ৯০-এর দশকে জন্ম নেওয়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সে সময় শিক্ষা ও প্রগতির আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। সামরিক শাসন, একের পর এক গ্রাম অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতার কারণে সাধারণ জীবনযাত্রা ছিল চরমভাবে বিপর্যস্ত। ১৯৮৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর মেরুং চংড়াছড়ি রঞ্জনমণি কার্বারি পাড়া গ্রামে সংঘটিত মর্মান্তিক গণহত্যা সেই অন্ধকার সময়েরই একটি অন্যতম কালো অধ্যায়। এই ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মাঝেই উপেন্দ্র কার্বারি পাড়াতে ১৯৮৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন সুমিত্র চাঙমা। সব ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তিনি শিক্ষা অর্জন করেছেন এবং নিজেকে সাহিত্য ও সমাজসেবায় উৎসর্গ করেছেন।
সুমিত্র চাঙমার পিতা সুশীল বিকাশ চাঙমা এবং মাতা রোম্ভাপতি চাঙমা। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তৎকালীন সময়ে সেখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোর প্রদীপ (বিদ্যালয়) ছিল না। গ্রামের মানুষেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বছর চুক্তিতে 'প্রাইভেট মাস্টার' এনে শিক্ষার সলতে জ্বালিয়ে রাখতেন। সেখানেই সুমিত্র চাঙমার অক্ষরের সাথে প্রথম পরিচয়। শিক্ষার তীব্র তৃষ্ণা তাকে নিয়ে যায় 'রাঙামাটি মোনঘর'-এ, যেখানে ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির পর্ব কাটে। কিন্তু সময়ের টানে ১৯৯৯ সালে পুনরায় নিজ গ্রামে ফিরে এসে ভর্তি হন ছোট মেরুং হাই স্কুলে। চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সেখান থেকেই এসএসসি জয়ের পর, দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং মাটিরাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএসএস (BSS) সম্পন্ন করেন।
২০১০ সালে গরিমিলা চাঙমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁদের সংসারে এসেছে দুই সন্তান—গিয়েনসো চাঙমা ও অনুত্তর চাঙমা। পরিবার ও জীবনের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি নিজের ভেতরের কবিসত্তাকেও কখনো নিভতে দেননি।
স্কুলজীবনেই তাঁর হাতে জন্ম নেয় কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি। চারপাশের পাহাড়, মানুষের জীবন, আনন্দ-বেদনা এবং সময়ের অভিঘাত তাঁর কবিমানসে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয়েছে। তাঁর দশটি কবিতা স্থান পেয়েছে যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পুগবেল’-এ। পাশাপাশি রয়েছে তাঁর একটি অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—যেখানে হয়তো জমে আছে দীর্ঘদিনের অনুভব, না-বলা কথা এবং এক পাহাড়ি জীবনের অন্তর্লীন সুর।
সুমিত্র চাঙমার পরিচয় শুধু কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। মেরুং চংড়াছড়ি মনের মানুষ বাজারে প্রতিষ্ঠিত ‘সাঙু’ পাঠাগারের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। পাঠাগারের কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করা, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জ্ঞানচর্চার পরিসর বিস্তৃত করার এই প্রয়াস তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ।
নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালার প্রতিও তাঁর রয়েছে গভীর অনুরাগ। তিনি চাঙমা লেখার বর্ণমালা কোর্স সম্পন্ন করেছেন। মাতৃভাষার বর্ণমালা শেখা তাঁর কাছে নিছক একটি শিক্ষাক্রম নয়; বরং নিজের শিকড়, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের একটি পথ।
শিক্ষার আলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করেই তিনি থেমে থাকেননি; সেই আলো অন্যদের কাছেও পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। চংড়াছড়ি হাই স্কুলে টানা তিন বছর স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে এলাকার শিক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখেছেন। তাঁর এই নিরলস অংশগ্রহণ প্রমাণ করে—নিজে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সমাজকেও সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক গভীর প্রত্যয় তাঁর মধ্যে কাজ করে।
সুমিত্র চাঙমার জীবন তাই একটি পাহাড়ি জনপদের নীরব ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। যে সময়ে বিদ্যালয়ের অভাব ছিল, চারপাশে ছিল অনিশ্চয়তা, সেই সময়ের এক শিশু অল্প আলোয় বর্ণমালা শিখে একদিন কবিতার জগতে প্রবেশ করেছেন। বই, ভাষা, শিক্ষা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জীবনকে নির্মাণ করেছেন।
পাহাড়ের মাটিতে জন্ম নেওয়া অনেক স্বপ্নের মতো তাঁর পথও সহজ ছিল না। তবু প্রতিকূলতার পাথর সরিয়ে, অল্প আলোকে আপন করে, তিনি এগিয়ে চলেছেন। তাঁর জীবন যেন সেই সত্যেরই পুনরুচ্চারণ—শিক্ষার পথ যতই দুর্গম হোক, স্বপ্নের ভিতরে যদি আলো থাকে, মানুষ একদিন নিজের জন্য একটি পথ ঠিকই খুঁজে নেয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন