বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

চাঙমা সাহিত্যের বিকাশ : গৈরিকা থেকে আশির দশকের সাহিত্য-প্রকাশনা আন্দোলন - ইনজেব চাঙমা

চাঙমা বা চাকমা সাহিত্যের ইতিহাস মূলত একটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, লোকস্মৃতি ও আত্মপরিচয় রক্ষার ইতিহাস। এই সাহিত্যধারার শিকড় প্রোথিত রয়েছে লোকগাথা, গেংখুলি, পালাগান, লোককথা, ছড়া ও মৌখিক ঐতিহ্যের গভীরে। তবে আধুনিক মুদ্রিত সাহিত্যচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে রাঙামাটির চাকমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত ‘গৈরিকা’ পত্রিকা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
    তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল-মে মাসে, ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখে ‘গৈরিকা’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। রাণী বিনীতা রায়ের উদ্যোগে প্রকাশিত এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রভাত কুমার দেওয়ান। পরবর্তী সময়ে অরুণ রায়ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। ‘গৈরিকা’র মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সুসংগঠিত সাহিত্যিক পরিসর তৈরি হয়। চাকমা ভাষার কবিতা ও সাহিত্যও ক্রমে মুদ্রিত রূপ পেতে শুরু করে।
    এই ধারার উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যে যে বিপুলসংখ্যক সংকলন, সাময়িকী ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, তা আজকের চাঙমা সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
১. সত্তরের দশকের সূচনা ও প্রকাশনা
‘লুরা’ (১৯৭২), সম্পাদক: দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, মুড়ল্যা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী প্রকাশনায় ছিল— বাংলা কত্তা (অংশ) ও মুড়ল্যা কত্তা (অংশ) গল্প- দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা ও অমূল্য রঞ্জন চাঙমা। কবিতা- সুপপিরঅ বরুং ও বসনা চাকমা। 
‘ফুরামোন’ (বৈশাখী পূর্ণিমা, ১৯৭২) সম্পাদক: দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, মুড়ল্যা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল উবাগীত, চাঙমা ছড়া, আহ্নোনাগা- ‘সাবেরং নাং তার’ গল্প, হঅর চন্দ্র চাঙমার গীত এবং দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার কবিতা।
‘জুনি’ (১ জুন ১৯৭২) সম্পাদক: নন্দিতা চাঙমা ও শিবানি দেওয়ান, জুভাপ্রদ মহিলা সংসদ কর্তৃত প্রকাশিত। ‘পহ্’র ওইয়্যে’ কনিকা চাঙমা , লেখক- ‘কৃষ্ণকিশোর চাঙমা’ ও  ছন্দা তালুকদার। 
‘সাঙু’ (১ নভেম্বর ১৯৭২) সম্পাদক: রমণী মোহন চাকমা, জুভাপ্রদ কর্তৃত প্রকাশিত।  রচয়িতাদের মধ্যে ছিলেন-  উদয় শংকর দেওয়ান, সত্যবীর, ননাধন চাঙমা এবং ছন্দা তালুকদার।
২. ১৯৭৩-১৯৭৫ : ভাষা, গান ও ইতিহাসচর্চা
‘চাঙমা গান’ (১৯৭৩) সম্পাদক: রঞ্জিৎ দেওয়ান ও ঝর্ণা চাঙমা জুভাপ্রদকর্তৃত প্রকাশিত। অংশগ্রহণকারী- রঞ্জিৎ দেওয়ান, বি. খীসা ও ননাধন চাঙমা।
‘চিজি বই’ (১৯৭৩) জুভাপ্রদ কর্তৃত প্রকাশিত। লেখক-ননাধন চাঙমা। ‘বারগি’ (১২ মে ১৯৭৩) জুভাপ্রদ কর্তৃত প্রকাশিত। গল্প- চম্পা দেওয়ান , ‘চাঙমা ইন বার্মা ছাড়িবার ইতিহাস’ - ননাধন চাঙমা, ‘এঝ ভেইল্যা’ - বিক্রমাদিত্য তঞ্চঙ্গ্যা ‘আফ্রিকা কঙ্গো’ - উদয় শংকর দেওয়ান। 
‘চাঙমা বাংলা কধাতারা’ (১৯৭৩) সম্পাদক: ননাধন চাঙমা জুভাপ্রদ কর্তৃত প্রকাশিত।  ‘শিঙ্গা’ (১৯৭৪) সম্পাদক: বিনয় শংকর চাঙমা, পাহাড়ী ছাত্র সমিতি সাংস্কৃতিক বিভাগ “গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী” কর্তৃক প্রকাশিত। কবিতা লিখেছেন- ননাধন চাঙমা, দেবজ্যোতি চাঙমা, রমণী মোহন চাঙমা, সমর কান্তি চাঙমা, ভগদত্ত খীসা, বিনয় শংকর চাঙমা ও রঞ্জিত দেওয়ান।
    ‘রাঞ্জুনি’ (২২ জানুয়ারি ১৯৭৪) সম্পাদক: ননাধন চাঙমা, দেবী প্রসাদ, উদয় শংকর দেওয়ান, সুকুমার আ ও কনিকা, জুভাপ্রদ কর্তক প্রকাশিত।  ‘চাঙমা ভাষায় ইতিবৃত্ত’ (১৯৭৪) লেখক- ননাধন চাঙমা জুভাপ্রদ কর্তক প্রকাশিত।  ‘চাঙমা ভাষায় ধ্বনিতত্ত্ব’ (১৯৭৪) লেখক- ননাধন চাঙমা। ‘পালি, প্রাকৃত, মায়াং ও চাকমা’ লেখক- ননাধন চাঙমা। এ গ্রন্থে পালি, প্রাকৃত, মায়াং ও চাকমা ভাষার তুলনামূলক আলোচনা করা হয়।
‘ওয়া’ (১৯৭২, আষাঢ়ী পূর্ণিমাÑ সম্পাদক: সাহানা দেওয়ান, মুড়ল্যা ও জাগরণী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী কর্তক প্রকাশিত।  চাঙমা কবিতা লিখেছেন সুপ্রিয় বরুং ও শাখনামা। ‘গোজেন লামা’ (জুলাই ১৯৭৫) সম্পাদনা- ননাধন চাঙমা শ্যামা প্রসাদ।  জুভাপ্রদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক সংসদ কর্তক প্রকাশিত। 
৩. ১৯৭৬-১৯৭৯ : কবিতা, গান ও তরুণ সাহিত্যিকদের উত্থান
‘বিজুগুলো’ ( ১৯৭৬) ধরন কবিতা সংকলনসম্পাদক- সুদত্ত খীসা জুভাপ্রদ কর্তক প্রকাশিত। ‘ছদক’ (জুলাই ১৯৭৬) সম্পাদক: সুহৃদ চাঙমা, জুভাপ্রদ ধরন: কবিতা সংকলন ‘ থেঝেরা’ (১৯৭৬) সম্পাদক: অমিতাভ চাঙমা, জুভাপ্রদ ।  ‘আহ্ওঝর চাঙমা গান’ (ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭)।সম্পাদক: সুগত চাঙমা সংগঠন: জুভাপ্রদ। অংশগ্রহণকারী- ননাধন চাঙমা, মণি সপন দেওয়ান, অমর শান্তি চাঙমা, রঞ্জিত দেওয়ান ও রমণী মোহন।
‘গেংখুলি’ (১৯৭৭) সম্পাদক: সুহৃদ চাঙমা ও ধুঙ্যা চাঙমা। অংশগ্রহণকারী- 
ননাধন চাঙমা, সত্যজিত চাঙমা, নির্মল চাঙমা, চুণীলাল দেওয়ান, সলিল রায়, ধুঙ্যা চাঙমা, মাধবিকা, কর্ণ, ধনঞ্জয়, মুকুন্দ, তিক্, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, পরমানন্দ বিকাশ দেওয়ান, সদক ও গুংগু।
    ‘চাঙমা গান’ (জুন ১৯৭৭) সম্পাদক: সুগত চাঙমা জুভাপ্রদ কর্তক প্রশাশিত। অংশগ্রহণকারী- দেব, রঞ্জিত, ননাধন, রমণী মোহন, অমর শান্তি, ফণীন্দ্র, সুশান্ত, জনি রায় ও রিপন। ‘কথোপকথন’ (১৯৭৭) সম্পাদক: অংচহ্লা ও ননাধন জুভাপ্রদ কর্তক প্রকাশিত। বাংলা বাক্যের চাঙমা ও মারমা অনুবাদ নিয়ে প্রকাশনা।
‘চিজির গান (নভেম্বর ১৯৭৭) সম্পাদক: সুগত চাঙমা। অংশগ্রহণকারী- সলিল রায়, ননাধন, রঞ্জিত ও ভগদত্ত খীসা। ‘রঙগীত’ (১৯৭৭) অংশগ্রহণকারী- ননাধন, সুশান্ত, ননুমণি, রমণী মোহন, রঞ্জিত, ফণীন্দ্র ও জনি রায়।
৪. ১৯৭৮ : বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার উত্থান
‘চাঙমা গান’ (জানুয়ারি ১৯৭৮) সম্পাদক: সুগত ও দেবী প্রসাদ দেওয়ান। অংশগ্রহণকারী- ননাধন, অমর কান্তি, চিত্রমোহন, রঞ্জিত দেওয়ান, দেব, ফণীন্দ্র, রমণী মোহন, সুশান্ত, জুনি রায়, ননুমণি, রিপন, সলিল রায় ও ভগদত্ত খীসা।
‘পাদারঙর কোচপানা’ (১৯৭৮) দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা। জুভাপ্রদ কর্তৃক প্রকাশিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার চাঙমা কবিতা সংকলন এবং সুগত চাঙমার ‘সবুজাভ ভালোবাসা’র অনুবাদ এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘রংধং’ (১৯৭৯) সুগত চাঙমার ২৪টি চাঙমা কবিতা নিয়ে সংকলন।
৫. বনফুল প্রকাশনা কমিটি (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) কর্তক প্রকাশিত  ‘বনফুল’ (সেপ্টেম্বর ১৯৭৮) সম্পাদক: সুহৃদ চাঙমা। চাঙমা গান ও কবিতা রচনায় অংশ নেন-  নবরশ্মি চাঙমা, রিপম দেওয়ান, জুনো সদক চাঙমা, নির্মল চাঙমা, জ্ঞানের আলো চাঙমা, প্রান্তিকা চাঙমা, ঠাকুর বিমল মোমেন চাঙমা ও পরমানন্দ বিকাশ দেওয়ান।
৬. মুড়াল্যা লিটারেচার গ্রুপ (আলবেরুনী হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়) এই সংগঠনটি তিনটি বিজু সংকলনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা বের করে। ‘ক’জলি’ (২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮) সম্পাদক- সুসময় চাঙমা ও সজীব চাঙমা। কবিতা- মানসজ্যোতি চাঙমা, সুব্রত চাঙমা ও নিবারণ চন্দ্র দেওয়ান।
‘বিজু’ (এপ্রিল ১৯৭৯) সম্পাদক- সুসময় চাঙমা। কবিতা- চন্দনা চাঙমা, সৃজনী, দেবাশীষ রায়, ইন্দ্রনীল, তপেন্দু বিকাশ চাঙমা, মনোরঞ্জন চাঙমা, শ্রীমঙ্গল চাঙমা ও চাঙমা কল্পতরু।
‘বিজু’ (এপ্রিল ১৯৮০) সম্পাদক- সুসময় চাঙমা। প্রবন্ধ: অ্যানথ্রোপলজি- সুহৃদ চাঙমা; চাঙমা কধা গাছছাড়া- সুসময় চাঙমা। অনুগল্প: রাঙা বিজুর ফুল গাছ’- অনু খীসা। ছড়া- সুসময় চাঙমা, সঞ্চয় চাঙমা, পান্থ, শিশির কান্তি চাঙমা, ফেলাযিয়্যা চাঙমা, পরিমল চাঙমা, রাস্কীন চাঙমা, সুদত্ত খীসা, ইন্দ্রনীল ও ননাধন।
‘রাধামন-ধনপুদি’ ( প্রথম খণ্ড, জুন ১৯৮০) সম্পাদক- সুগত চাঙমা ও সুসময় চাঙমা। ‘রেঙ’ (সেপ্টেম্বর ১৯৮০) সম্পাদক- সুসময় চাঙমা।
কবিতা লিখেছেন- সুহৃদ চাঙমা, গৌতম চাঙমা, রিকু চাঙমা, শিশির কান্তি চাঙমা, মৃত্তিকা চাঙমা, বিমল মমেন চাঙমা, সত্যজিত চাঙমা, মনোরঞ্জন চাঙমা, সঞ্চয় চাঙমা, শ্যামল কান্তি তালুকদার, তরুণ কুমার চাঙমা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, প্রভাত চাঙমা, নানধন চাঙমা, সুসময় চাঙমা ও প্রীতি কুসুম চাঙমা।
‘বিজু’ (এপ্রিল ১৯৮১) সম্পাদক- সুসময় চাঙমা।
কবিতা- দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, ননাধন চাঙমা, মনোরঞ্জন চাঙমা, সুসময় চাঙমা, দীপ্তিময় তালুকদার, কংকনা চাঙমা, কবিতা চাঙমা, সুহৃদ চাঙমা, আর্য্যমিত্র চাঙমা, সঞ্চয় চাঙমা, শিশির কান্তি চাঙমা, রিনোধ বিহারি চাঙমা, নির্মল চাঙমা, বাজুধন চাঙমা, মানস মুকুর চাঙমা, মৃত্তিকা চাঙমা, কনকচাপা চাঙমা, জুনি, মঙ্গল কুমার চাঙমা, দীপেন দেওয়ান ও পুষ্পিতা খীসা। এই সংকলনে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা ‘রাধামন-ধনপুদি’ গ্রন্থের সমালোচনাও করেন।
৭. হিল্লো সাহিত্য সংসদ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) ‘বিজুফুল’ (এপ্রিল ১৯৮১) সম্পাদক- মৃত্তিকা চাঙমা ও মঙ্গল কুমার চাঙমা। গদ্য: নিঝিরেদ কজমা ‘সবনর নাতদি মরনা’- সুহৃদ চাঙমা। কবিতা- মধুমিতা চাঙমা, মৃত্তিকা চাঙমা, হীরালাল চাঙমা, শিশির কান্তি চাঙমা, ননাধন চাঙমা, নিকুঞ্জ চাঙমা, সতিময় চাঙমা, মনোরঞ্জন চাঙমা ও অনাথ স্মৃতি চাঙমা।
‘বিজুফুল’ (এপ্রিল ১৯৮২) সম্পাদক- স্মৃতেন্দু চাঙমা। কবিতা- অমলেন্দু চাঙমা, অনাথ স্মৃতি চাঙমা, শ্যামল কুমার চাঙমা, শান্তিময় চাঙমা, মানস কুমার চাঙমা, ঝিমিত ঝিমিত চাঙমা, মৃত্তিকা চাঙমা ও স্মৃতেন্দু বিকাশ চাঙমা।
‘বিজুফুল’ (এপ্রিল ১৯৮৩) সম্পাদক- মানস মুকুর চাঙমা। গল্প-মৃত্তিকা চাঙমা ও মানস মুকুর চাঙমা। কবিতা- ভগদত্ত খীসা, মঙ্গল চাঙমা, বীর কুমার চাঙমা, ননাধন চাঙমা, মানস কুসুম চাঙমা, শিশির চাঙমা, বড়তোষ চাঙমা, লাল প্রেম চাঙমা, প্রীতিকুসুম চাঙমা ও তরুণ কুমার চাঙমা।
৮. রাঙ্গামাটি এস্থেটিকস কাউন্সিল: রাঙামাটি থেকে প্রকাশিত এই ধারাটি পরবর্তীকালে জুম এস্থেটিকস কাউন্সিল (জাক) নামে পরিচিত হয়।
‘রাধামন-ধনপুদি’ (দ্বিতীয় খণ্ড, ১৯৮১) সম্পাদক- চিরজ্যোতি চাঙমা।
‘সত্রং’ (এপ্রিল ১৯৮২) সম্পাদক- শ্যামল কুমার চাঙমা। গল্প ও প্রবন্ধে ছিলেন- মূল শোভা রাণী ত্রিপুরা, মানস মুকুর চাঙমা, জুম্মবি চাঙমা, ভাগ্যচন্দ্র চাঙমা, সুগত চাঙমা ও রাজা দেবাশীষ রায়। কবিতা- পরিমল চাঙমা, রঞ্জিত চাঙমা, প্রণয়ন খীসা, পুলক রায়, সুদত্ত চাঙমা, বিমল মমেন চাঙমা, প্রভাত চাঙমা, মনোরঞ্জন চাঙমা, সহেলী চাঙমা, সুসময় চাঙমা, বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বীর কুমার চাঙমা, জ্যোতি গজাল, শিশির চাঙমা, সুহৃদ চাঙমা ও সুপ্রিয় তালুকদার।
‘ইরুক’ (১৯৮২) সম্পাদক- দীপেন দেওয়ান ও কৃষ্ণ চাঙমা। প্রবন্ধ- রাস্কীন চাঙমা, বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা ও আর্য্যমিত্র চাঙমা। গল্প- বিমল মোমেন চাঙমা।
কবিতা- ননাধন চাঙমা, শিশির চাঙমা, মৃত্তিকা চাঙমা, জিনি চাঙমা, লালন চাঙমা, মানস মুকুর চাঙমা, বীর কুমার চাঙমা, গ গুলি ও দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা।
‘পাত্তলী’ (১৯৮৩) সম্পাদক- লালন চাঙমা ও বীর কুমার চাঙমা। ‘হিয়াংসিক’ (১৩ এপ্রিল ১৯৮৪) সম্পাদক- লালন চাঙমা। গল্প- অচেনা চাঙমা ও মানস মুকুর চাঙমা। প্রবন্ধ- মঙ্গল কুমার চাঙমা। কবিতা- ননাধন চাঙমা, সুহৃদ চাঙমা, বীর কুমার চাঙমা, চাঙমা শান্তিময়, যশেশ্বর চাঙমা, মিশন চাঙমা, চন্দন চাঙমা, লালন চাঙমা, হীরালাল চাঙমা, মৃগনাথ চাঙমা, শ্যামল তালুকদার ও ফেলাযিয়্যা চাঙমা।
‘সাঙেত’ (আগস্ট ১৯৮৪) সম্পাদক- চন্দন চাঙমা ও হরিকিশোর চাঙমা। গল্প- মানস মুকুর চাঙমা ও হরিকিশোর চাঙমা। কবিতা- পুষ্পিতা খীসা, মঙ্গল চাঙমা, তরুণ কুমার চাঙমা, গিরি বিজয় চাঙমা, ধন বিকাশ চাঙমা, নয়ন জ্যোতি চাঙমা ও নিহার বিন্দু চাঙমা।
‘রদঙ’ (১৯৮৫)  সম্পাদক: যশেশ্বর চাঙমা। গল্প- মানস মুকুর চাঙমা।
কবিতা- চাঙমা জুম্মবি খীসা, বীর কুমার চাঙমা ও সুহৃদ চাঙমা।
‘ইধরেগা’ (১৯৮৬) সম্পাদক-  নির্মলেন্দু চাঙমা ও সুখেশ্বর চাঙমা। গল্প- নির্মলেন্দু চাঙমা। কবিতা- সজীব চাঙমা, নিমাই চাঙমা, কনক শর্মা ও সুখেশ্বর চাঙমা।
‘এক ঝাক বিজোল রোদ’ (১৯৮৬)  সম্পাদক- ঝিমিত ঝিমিত চাঙমা। প্রবন্ধ- কৃষ্ণচন্দ্র চাঙমা ও ঝিমিত ঝিমিত চাঙমা। কবিতা- মৃত্তিকা চাঙমা, বীর কুমার চাঙমা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা ও চন্দনা চাঙমা। গান- রঞ্জিত দেওয়ান।
গীতিনাট্য ‘রাধামন-ধনপুদি’- লালন চাঙমা।
‘কবরক জুম আঙিযায় অইলুম’ (১৯৮৭) কবিতা- মৃত্তিকা চাঙমা ও নির্মল চাঙমা।
‘কজ’ ফুল’ (২২ জুন ১৯৮৭) সভাপতি/সম্পাদক: জ্ঞানদীপ্ত চাঙমা। ছড়া- সুখেশ্বর চাঙমা, নির্মলেন্দু চাঙমা, জ্ঞানদীপ্ত চাঙমা, সি.পি. রায়, অজান্তা চাঙমা, ভগদত্ত খীসা, জ্ঞানানন্দ শ্রমণ, খগেন্দ্র চাঙমা, জয়মণি চাঙমা, তরুণ চাঙমা, সুজাতা চাঙমা, সুজিত চাঙমা ও পুলক চাঙমা।
৯. ইরুক প্রকাশনী (রাঙামাটি): ‘ইরুক’ (সেপ্টেম্বর ১৯৮১) সম্পাদক-  সুহৃদ চাঙমা, রাস্কীন চাঙমা ও মৃত্তিকা চাঙমা। কবিতা- মৃত্তিকা চাঙমা, মিশন চাঙমা, শিশির চাঙমা, প্রীতি কুসুম চাঙমা, কৃষ্ণ চাঙমা, সত্যজিত চাঙমা, পুষ্পিতা খীসা, সুহৃদ চাঙমা, সঞ্চয় চাঙমা, রাস্কীন চাঙমা ও কনকচাপা চাঙমা।
‘ইরুক’ (ডিসেম্বর ১৯৮১) সম্পাদক- সুহৃদ চাঙমা ও মৃত্তিকা চাঙমা। গল্প ও প্রবন্ধ- প্রীতি কুসুম চাঙমা, রাস্কীন চাঙমা, লুনা চাঙমা ও মানস মুকুর চাঙমা।
কবিতা- রাজা দেবাশীষ রায়, কনকচাপা চাঙমা, শ্যামল কান্তি তালুকদার, মৃত্তিকা চাঙমা, মিশন চাঙমা, নির্মল চাঙমা, পুষ্পিতা খীসা, কৃষ্ণ চাঙমা, শিশির চাঙমা, দীপ্তিময় তঞ্চঙ্গ্যা ও ভবন্ত চাঙমা।
১০. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা- 
‘সত্রং’ (১৯৮২) হিল্লো লিটারেচার গ্রুপ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) সম্পাদকমণ্ডলী- চিরজ্যোতি চাঙমা, মানস মুকুল চাঙমা, শ্যামল চাঙমা, বজেন্দু চাঙমা, শুভ্রা চাঙমা ও মঙ্গল কুমার চাঙমা।
‘চাঙমা আগপুদি’ (১৯৮২) প্রকাশনা- চাকমা ভাষায় প্রকাশনা পরিষদ। সম্পাদক-  চিরজ্যোতি চাঙমা ও মঙ্গল চাঙমা।
‘জুম’ (এপ্রিল ১৯৮৩)  প্রকাশনা: জুম প্রকাশনা (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)
গল্প- অভয় চাঙমা।]কবিতা- সুহৃদ চাঙমা, সুসময় চাঙমা, হরেন্দ্র চাঙমা ও অনুপম চাঙমা।
‘কজমাপাদা’ (এপ্রিল ১৯৮৩) প্রকাশনা: আরুক, রাঙামাটি।
কবিতা- তুষিতা চাঙমা, কেতন চাঙমা, রতন চাঙমা, প্রবীন খীসা, হিমাদ্রী রায়, মিলন চাঙমা, প্রমেশ চাঙমা, সুজিত বিকাশ চাঙমা, প্রীতম রায় ও যশেশ্বর চাঙমা।
‘চাকমা পরিচিতি’ (১৯৮৩) প্রকাশক: বরগাঙ পাবলিকেশন্স, রাঙামাটি। লেখক- সুগত চাঙমা।
‘চম্পক’ (এপ্রিল ১৯৮৪) প্রকাশক: চম্পক পাবলিকেশন্স। সম্পাদক: বীর কুমার চাঙমা, সঞ্চয় চাঙমা ও প্রতিম রায়। কবিতা- প্রদীপ চাঙমা, তুষিতা চাঙমা, জ্যোৎস্না বিকাশ চাঙমা, প্রতিম রায়, বীর কুমার চাঙমা, যশেশ্বর চাঙমা, সঞ্চয় চাঙমা, রাজরতন চাঙমা ও বড়তোষ চাঙমা।
১১. ছাত্র সংগঠনগুলোর সাহিত্যচর্চা       
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা ট্রাইবেল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন
প্রকাশনা-    
ফদাংতাং’ (১৯৮৩), কাবিদ্যাঙ- দীপেন চাঙমা।
‘লাড়েই’ (এপ্রিল ১৯৮৪), প্রবন্ধ- জুনো সদক চাঙমা। গল্প- রাস্কীন চাঙমা।  কবিতা- ননাধন চাঙমা, ফেলাযিয়্যা চাঙমা, কবিতা চাঙমা, সুসময় চাঙমা, লালন চাঙমা, নুদিবানা চাঙমা, উর্মি চাঙমা, অনিল বিকাশ চাঙমা, অন্তরা চাঙমা, সজীব চাঙমা, অনুপম চাঙমা, চাঙমা সীমা দেওয়ান ও চাঙমা উৎপল দেওয়ান।   ফদাংতাং’ (জুন ১৯৮৪), গল্প- কনকচাপা চাঙমা। কবিতা- ফেলাযিয়্যা চাঙমা, অভয় চাঙমা, লালন চাঙমা, হরিন্দ্র সিং, অনুপম চাঙমা, নন্দীতা খীসা ও উৎপল দেওয়ান।
‘জধু’ (এপ্রিল ১৯৮৫) গল্প- অভয় চাঙমা। কবিতা- দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, ফেলাযিয়্যা চাঙমা, কবিতা চাঙমা, কনকচাপা চাঙমা ও অনুপম চাঙমা।
১২. রাঙামাটি ট্রাইবেল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন
‘কোচপানা’ (১৯৮৪), সম্পাদক: প্রতিম রায়।
‘পাজন’ (১৯৮৫), সম্পাদক: মিশন চাঙমা ও প্রতিম রায়। কবিতা- চাঙমা সতীশ শংকর, নিমাই চাঙমা, আলপনা চাঙমা, সুনীল কান্তি চাঙমা, অভয় কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, ধন কুমার চাঙমা ও তুষার কান্তি চাঙমা।
ঞযব ঠড়রপব জধঃংঁ (১৯৮৬) সম্পাদক: অরুণ জ্যোতি চাঙমা। কবিতা- অনুশ্রী দেওয়ান, অসিত বরণ চাঙমা ও অনুপম চাঙমা।
১৩. বৌদ্ধ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রকাশনা
‘বিশ্বজ্যোতি’ (১৯৮৪), সংগঠন: বৌদ্ধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ। সম্পাদক: সঞ্চয় চাঙমা ও অরুণ চাঙমা। কবিতা- সুরেশ চন্দ্র চাঙমা ও প্রতাপ চাঙমা।
‘স্বত্তিকা’ সংগঠন: সেন্টার ফর পাবলিকেশন অব বুদ্ধিজম। প্রথম সংখ্যা- সম্পাদক রেভা. ধর্মালংকার। কবিতা- সুমনান্দ শ্রমণ, ইতি চাঙমা, সুবর্ণা চাঙমা, পুষ্পিতা খীসা, সীমা খীসা ও ইউজিন খীসা।
দ্বিতীয় সংখ্যায়- চিত্তরঞ্জন চাঙমা ও দীপেন দেওয়ান।
তৃতীয় সংখ্যায়- বিনয় শংকর চাঙমা।
‘মৈত্রী বাণী’ প্রকাশক: পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ, ঢাকা। তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। পর্যায়ক্রমে সম্পাদনা করেন সুসময় চাঙমা, বিমলতিষ্য ভিক্ষু ও ডা. নিহার কুমার চাঙমা। প্রথম সংখ্যায় মৃত্তিকা চাঙমা ও সুসময় চাঙমার কবিতা প্রকাশিত হয়।
১৪. কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রকাশনা
চাঙমা সাহিত্যের বিস্তারে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ময়মনসিংহ প্রবাসী পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্রছাত্রীবৃন্দ
‘রানজুনি’ (এপ্রিল ১৯৭৭), সম্পাদক- সুমেধ কুমার দেওয়ান। কবিতা- সুমেধ কুমার দেওয়ান, চন্দনা চাঙমা, ড. মানিক লাল দেওয়ান, মলিনা চাঙমা, মোহন চাঙমা, বিকাশ দেওয়ান, ইন্দুলাল চাঙমা, সীমা দেওয়ান ও পল দেওয়ান।
রাঙামাটি সরকারি কলেজ- 
‘পাজন’ (১৯৮৩), সম্পাদক- যশেশ্বর চাঙমা। প্রবন্ধ- সতীশ শংকর চাঙমা। গল্প- খোকন চাঙমা, বরুণ কান্তি তালুকদার ও ইপদেব খীসা। কবিতা- তৃপ্তি শংকর চাঙমা, স্মৃতিকণা চাঙমা, বিনয় চাঙমা, জিতেন্দ্র চাঙমা, যশেশ্বর চাঙমা, জটিল চাঙমা, জ্ঞান বিকাশ চাঙমা ও রতন চাঙমা।
‘পাজন’ (১৯৮৪), সম্পাদক- অবিনাশ চাঙমা। গল্প- নমিতা দেওয়ান ও যশেশ্বর চাঙমা। কবিতা- প্রদীপ চাঙমা, মিথিলা চাঙমা, জগৎ চাঙমা, দেবাশীষ খীসা, অবিনাশ চাঙমা, সন্তোষ জীবন চাঙমা, বিজন দেওয়ান, অচিন্ত্য চাঙমা, সিনথিনা চাঙমা, খোকন চাঙমা, নীতিশ চাঙমা ও সুশান্ত চাঙমা।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ- 
‘রানজুনি’ (১৯৮৩), সম্পাদক- শুভাশীষ চাঙমা। কবিতা- অনিল বিকাশ চাঙমা, তুষার কান্তি দেওয়ান, অঞ্জন চাঙমা, তপন কান্তি দেওয়ান, বীরভদ্র চাঙমা, জওহর লাল চাঙমা, রুদ্র প্রতাপ ও মোহন চাঙমা।
১৫. ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশনা- 
তরুণ কুমার চাঙমা ঠিকানা: খারিক্ষ্যং বনানী পাঠাগার, বন্দুভাঙা। চাঙমা গানের একটি বই প্রকাশ করেন, যাতে ১৮টি গান ছিল। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত।
শ্রীকৃষ্ণ চাঙমা-
‘আরুক’ (১৯৮২, বিজয় দিবস) পাঁচ বছর ধরে পাঁচ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে। প্রবন্ধ- রাজ কুমার চাঙমা। কবিতা- বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, প্রতিম রায় ও তুষিকা চাঙমা।
‘আরুক’ (১৯৮৩, বিজু), গল্প/প্রবন্ধ- বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা ও সোনা কান্তি দেওয়ান। কবিতা- ধবল কিরণ চাঙমা, সুরভি কুসুম চাঙমা, ননাধন চাঙমা, জ্যোতিরিন্দ্র চাঙমা, রাজ কুমার চাঙমা, সুহৃদ চাঙমা, দীপেন দেওয়ান ও প্রবর্তন চাঙমা।
‘আরুক’ (১৯৮৪, বিজু), প্রবন্ধ- যামিনী রঞ্জন চাঙমা ও রমণী মোহন চাঙমা।
কবিতা- মৃত্তিকা চাঙমা, মিঠু চাঙমা, প্রতিম রায়, জটিল বিহারী চাঙমা, বড়তোষ চাঙমা, রঞ্জিত চাঙমা, সুসময় চাঙমা, বাবু দেওয়ান চাঙমা, নিরু বিকাশ চাঙমা, পুষ্পিতা খীসা ও প্রমেন্দ্রিয় চাঙমা।
১৬. চাঙমা নাটকের বিকাশ
সাহিত্যের পাশাপাশি নাটকও চাঙমা সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেয়।
নাট্যকার                    নাটকের নাম                          মঞ্চায়ন
ননাধন চাঙমা         ধেঙা বৈদ্য                                  ১৯৭৮
ননাধন চাঙমা        নীল মোন’ সবন                          ১৯৭৯
ভগদত্ত খীসা        অয় নয় বৈদ্য                                   ১৯৮২
চিরজ্যোতি চাঙমা       আনাত ভাজি উদে কা মু             ১৯৮৩
শান্তিময় চাঙমা        যে দিনত যে কাল                      ১৯৮৪
শান্তিময় চাঙমা           বিজু রামর স্বর্গত যানা              ১৯৮৫
শান্তিময় চাঙমা           আন্ধারত জুনি পহ্’র                      ১৯৮৬
মোঃ আরাফান আলী      পরাণ দান                       ১৯৮৭   
    এসব নাট্যচর্চা প্রমাণ করে, চাঙমা সাহিত্য কেবল মুদ্রিত বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি মঞ্চ, সংগীত, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
    চাঙমা সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি ধারাবাহিক বিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গৈরিকা থেকে শুরু হওয়া মুদ্রিত সাহিত্যচর্চা পরবর্তী সময়ে নানা সাময়িকী, সাহিত্যসংকলন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ছাত্রসমাজের প্রকাশনার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়। ১৯৭০-এর দশকে এই আন্দোলন নতুন গতি পায় এবং ১৯৮০-এর দশকে এসে তা এক বহুমাত্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনে রূপ নেয়।
    এই সময়ে কবিতা যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি গল্প, প্রবন্ধ, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, লোকসাহিত্য, গান, অনুবাদ, সাক্ষাৎকার, সাহিত্যসমালোচনা ও নাটকও চাঙমা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
    সুহৃদ চাঙমা, সুগত চাঙমা, ননাধন চাঙমা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, মৃত্তিকা চাঙমা, বীর কুমার চাঙমা, বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, মানস মুকুর চাঙমা, সুসময় চাঙমা, রঞ্জিত দেওয়ান, রমণী মোহন চাঙমা, লালন চাঙমা, পুষ্পিতা খীসা, ভগদত্ত খীসা, চিরজ্যোতি চাঙমা, যশেশ্বর চাঙমা, মঙ্গল কুমার চাঙমা, কনকচাপা চাঙমা, সঞ্চয় চাঙমা, রাস্কীন চাঙমা, প্রীতি কুসুম চাঙমা, শ্যামল কুমার চাঙমা, দীপেন দেওয়ানসহ অসংখ্য কবি-লেখকের সম্মিলিত প্রয়াসে এই সাহিত্যধারা বিকশিত হয়েছে।
    অতএব, চাঙমা সাহিত্য কোনো একক ব্যক্তি, একক সংগঠন বা একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থের সৃষ্টি নয়; এটি কয়েক প্রজন্মের লেখক, কবি, সম্পাদক, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রকাশকদের সম্মিলিত সাধনার ফসল। আর সেই দীর্ঘ যাত্রার আধুনিক মুদ্রিত ইতিহাসে ১৯৩৬ সালের ‘গৈরিকা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাবিন্দু, যার পরবর্তী উত্তরাধিকার বহন করে সত্তর ও আশির দশকের অসংখ্য সাহিত্যসংকলন চাঙমা সাহিত্যকে একটি স্বতন্ত্র লিখিত সাহিত্যধারায় প্রতিষ্ঠিত করার পথ তৈরি করেছে।
তথ্যসূত্র 

নন্দলাল শর্মা, গিরি দর্পন
বাংলাপিডিয়া, 
হিলবিড২৪, ‘গৈরিকা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম পত্রিকা’ 
যুগান্তর, ‘বৈচিত্র্যের সাহিত্যে উর্বর রাঙামাটি’ 
জুম জার্নাল, ‘চাকমা জাতির ইতিহাস চর্চা’ 
সুগত চাকমা, বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য, রাঙামাটি: ২০০২ 

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

প্রতিকূলতা পেরিয়ে আলোর দিশারী: কবি সুমিত্র চাঙমা - ইনজেব চাঙমা

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এক দীর্ঘ অস্থিরতা অরাজকতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে সত্তোর থেকে ৯০-এর দশকে জন্ম নেওয়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সে সময় শিক্ষা প্রগতির আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছিল সামরিক শাসন, একের পর এক গ্রাম অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতার কারণে সাধারণ জীবনযাত্রা ছিল চরমভাবে বিপর্যস্ত ১৯৮৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর মেরুং চংড়াছড়ি রঞ্জনমণি কার্বারি পাড়া গ্রামে সংঘটিত মর্মান্তিক গণহত্যা সেই অন্ধকার সময়েরই একটি অন্যতম কালো অধ্যায় এই ভয়াবহ রাজনৈতিক সামাজিক অস্থিরতার মাঝেই উপেন্দ্র কার্বারি পাড়াতে ১৯৮৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন সুমিত্র চাঙমা সব ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তিনি শিক্ষা অর্জন করেছেন এবং নিজেকে সাহিত্য সমাজসেবায় উৎসর্গ করেছেন

সুমিত্র চাঙমার পিতা সুশীল বিকাশ চাঙমা এবং মাতা রোম্ভাপতি চাঙমা দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান তৎকালীন সময়ে সেখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোর প্রদীপ (বিদ্যালয়) ছিল না গ্রামের মানুষেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বছর চুক্তিতে 'প্রাইভেট মাস্টার' এনে শিক্ষার সলতে জ্বালিয়ে রাখতেন সেখানেই সুমিত্র চাঙমার অক্ষরের সাথে প্রথম পরিচয় শিক্ষার তীব্র তৃষ্ণা তাকে নিয়ে যায় 'রাঙামাটি মোনঘর'-, যেখানে ৬ষ্ঠ ৭ম শ্রেণির পর্ব কাটে কিন্তু সময়ের টানে ১৯৯৯ সালে পুনরায় নিজ গ্রামে ফিরে এসে ভর্তি হন ছোট মেরুং হাই স্কুলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সেখান থেকেই এসএসসি জয়ের পর, দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং মাটিরাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএসএস (BSS) সম্পন্ন করেন

২০১০ সালে গরিমিলা চাঙমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি তাঁদের সংসারে এসেছে দুই সন্তানগিয়েনসো চাঙমা অনুত্তর চাঙমা পরিবার জীবনের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি নিজের ভেতরের কবিসত্তাকেও কখনো নিভতে দেননি

স্কুলজীবনেই তাঁর হাতে জন্ম নেয় কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি চারপাশের পাহাড়, মানুষের জীবন, আনন্দ-বেদনা এবং সময়ের অভিঘাত তাঁর কবিমানসে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর দশটি কবিতা স্থান পেয়েছে যৌথ কাব্যগ্রন্থপুগবেল’- পাশাপাশি রয়েছে তাঁর একটি অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থযেখানে হয়তো জমে আছে দীর্ঘদিনের অনুভব, না-বলা কথা এবং এক পাহাড়ি জীবনের অন্তর্লীন সুর

সুমিত্র চাঙমার পরিচয় শুধু কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নয় মেরুং চংড়াছড়ি মনের মানুষ বাজারে প্রতিষ্ঠিতসাঙুপাঠাগারের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পাঠাগারের কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করা, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জ্ঞানচর্চার পরিসর বিস্তৃত করার এই প্রয়াস তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ

নিজস্ব ভাষা বর্ণমালার প্রতিও তাঁর রয়েছে গভীর অনুরাগ তিনি চাঙমা লেখার বর্ণমালা কোর্স সম্পন্ন করেছেন মাতৃভাষার বর্ণমালা শেখা তাঁর কাছে নিছক একটি শিক্ষাক্রম নয়; বরং নিজের শিকড়, সংস্কৃতি আত্মপরিচয়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের একটি পথ

শিক্ষার আলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করেই তিনি থেমে থাকেননি; সেই আলো অন্যদের কাছেও পৌঁছে দিতে চেয়েছেন চংড়াছড়ি হাই স্কুলে টানা তিন বছর স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে এলাকার শিক্ষা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অবদান রেখেছেন তাঁর এই নিরলস অংশগ্রহণ প্রমাণ করেনিজে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সমাজকেও সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক গভীর প্রত্যয় তাঁর মধ্যে কাজ করে

সুমিত্র চাঙমার জীবন তাই একটি পাহাড়ি জনপদের নীরব ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত যে সময়ে বিদ্যালয়ের অভাব ছিল, চারপাশে ছিল অনিশ্চয়তা, সেই সময়ের এক শিশু অল্প আলোয় বর্ণমালা শিখে একদিন কবিতার জগতে প্রবেশ করেছেন বই, ভাষা, শিক্ষা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জীবনকে নির্মাণ করেছেন

পাহাড়ের মাটিতে জন্ম নেওয়া অনেক স্বপ্নের মতো তাঁর পথও সহজ ছিল না তবু প্রতিকূলতার পাথর সরিয়ে, অল্প আলোকে আপন করে, তিনি এগিয়ে চলেছেন তাঁর জীবন যেন সেই সত্যেরই পুনরুচ্চারণশিক্ষার পথ যতই দুর্গম হোক, স্বপ্নের ভিতরে যদি আলো থাকে, মানুষ একদিন নিজের জন্য একটি পথ ঠিকই খুঁজে নেয়

 

রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

সুগত চাকমা (ননাধন): আধুনিক চাকমা সাহিত্য, গবেষণা ও সংগীতের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

“পাহাড়ী ছাত্র-ছাত্রী দল, জ্ঞান মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে চল”, লাক লাক রাঙাবেল জ্বলিবো”, “এক্কো রেত্তো এল, স্ববনে কাদি গেল”, “জুম্মবী কমলে আহ্দিবে ধাগত”, “রেত্তো জনম্মুঅ থেব”, “এ্যাল এ্যাল আমাদেজ' মোন মুরোউন”, “কৃষ্ণচুড়ো রঙে পত্থান রাঙেয়্যে”, “এল' এল' বারিঝে রিনি চা পরাণী”, “এই শহরর নাঙান রাঙামাত্যে”, “বেইন বুনের গাভুরি থুরচুমা লারিনে”, “হিল্ল মিলাবো জুমত যায়দে”, “মুই তর লক্ষী মিলাবো ও-মা তরে কন কেত ন’ যেম”, “তুই একদিন আহ্রে যেবেগোই সাগরত”— 

চাকমা সংগীতের ভুবনে এমন অসংখ্য গান রয়েছে, প্রথম পঙ্ক্তি উচ্চারিত হলেই চাকমা সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে আজও এক অনির্বচনীয় আবেগের ঢেউ জেগে ওঠে। পাহাড়ের সবুজ, জুমচাষের জীবন, কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি, স্বপ্ন এবং জাতিসত্তার গভীর অনুভবসবকিছু যেন একসূত্রে গাঁথা হয়েছে তাঁর গানের কথা সুরের জগতে। আধুনিক চাকমা সংগীতের এই স্মরণীয় সৃষ্টিগুলোর পেছনে যে সৃজনশীল মনন কাজ করেছে, তিনি হলেন আধুনিক চাকমা সাহিত্য, গবেষণা সংগীতের অন্যতম অগ্রপথিক সুগত চাকমা (ননাধন)

যে মানুষ কলমকে কেবল সাহিত্যসৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি আত্মপরিচয়ের বাহন হিসেবে ধারণ করেন, তাঁর কর্ম সময়ের সীমানা অতিক্রম করে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সুগত চাকমা (ননাধন) সেই বিরলপ্রজ সাহিত্যসাধকদের একজন, যিনি কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, ইতিহাসচর্চা এবং গীতরচনার মাধ্যমে চাকমা সাহিত্যকে আধুনিকতার এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন শিল্পের সৌন্দর্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইতিহাসের অনুসন্ধান, ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতিসত্তার গভীর আত্মবোধ।

১৯৫১ সালের ২৪ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে সুগত চাকমার জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি পাহাড়ের অপরূপ প্রকৃতি, কাপ্তাই হ্রদের বিস্তৃত জলরাশি, জুমচাষের জীবনধারা, লোকঐতিহ্য এবং চাকমা সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। পাহাড়ের প্রকৃতি তাঁর কাছে নিছক সৌন্দর্যের বিষয় ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল জীবন, স্মৃতি, সমাজ ইতিহাসকে বোঝার এক জীবন্ত পাঠশালা। পরবর্তী সময়ে তাঁর কবিতা, গান গবেষণাকর্মে পাহাড়ি জীবনের যে গভীর প্রতিফলন দেখা যায়, তার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় এই শৈশবের অভিজ্ঞতার মধ্যেই।

শিক্ষাজীবনে সুগত চাকমা ছিলেন মেধাবী অধ্যবসায়ী। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন। বিজ্ঞানের কঠোর যুক্তিবাদী বিশ্লেষণী পদ্ধতি তাঁর চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে ভাষা, ইতিহাস সংস্কৃতির গবেষণায়ও তাঁর এই বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর পাওয়া যায়।

ভাষা সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে একসময় গবেষণার বিস্তৃত জগতে নিয়ে যায়। ২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকেপার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা উপভাষার শ্রেণীকরণবিষয়ে গবেষণা করে এম.ফিল. ডিগ্রি অর্জন করেন। বিজ্ঞানশিক্ষায় অর্জিত বিশ্লেষণী মনন এবং ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের এই সমন্বয় তাঁর গবেষণাকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য গভীরতা।

১৯৭০-এর দশকের সূচনালগ্নেই সুগত চাকমা সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এটি ছিল আধুনিক চাকমা সাহিত্যের বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা ইতিহাসচর্চাকে একই সৃজনধারায় প্রবাহিত করে চাকমা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা প্রদান করেন। আধুনিক চাকমা কবিতার ইতিহাসে তাঁকে অন্যতম অগ্রগামী এবং শক্তিশালী রোমান্টিক কবি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

তাঁর কবিতায় প্রেম প্রকৃতির মাধুর্য যেমন অনুরণিত হয়েছে, তেমনি জাতিসত্তা, ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মমর্যাদা এবং অস্তিত্ব রক্ষার চেতনাও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সহজ, সুরময় আবেগঘন ভাষার সঙ্গে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সংমিশ্রণ তাঁর সাহিত্যকে করেছে স্বতন্ত্র।

সুগত চাকমার সাহিত্যজীবনের অন্যতম শক্তিশালী দিক তাঁর গবেষণাকর্ম। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিকীতে প্রকাশিতচাকমাদের ইতিহাসপ্রবন্ধ তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীকালেশাক্য থেকে চাকমা, মগধ থেকে রাঙ্গামাটিপ্রবন্ধে তিনি চাকমা জাতি ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন, যা গবেষক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।

তাঁর গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোতিনি ইতিহাসকে কেবল ঘটনাপঞ্জি হিসেবে দেখেননি। ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ, লোকবিশ্বাস, ঐতিহ্য নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সমন্বিত আলোকে তিনি ইতিহাসকে অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। ফলে তাঁর রচনাগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভাষা সংস্কৃতিচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

১৯৭৮ সালে তিনি তৎকালীন উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বর্তমান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি- এর সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি গবেষণা, প্রকাশনা, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, শিল্পী গঠন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসর তাঁর সৃজনশীল জীবনের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিলেও ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি গবেষণার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা অব্যাহত থাকে।

তিনি কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন না; ছিলেন একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক পরিকল্পনাবিদও। তাঁর উদ্যোগ সহযোগিতায় পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ঐতিহ্য সংরক্ষণে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বহু শিল্পী, গবেষক সাহিত্যিক তাঁর উৎসাহ, দিকনির্দেশনা সহযোগিতায় নিজেদের সৃজনশীল পথকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছেন।

দেশের গণ্ডি পেরিয়েও সুগত চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন। ২০০৮ সালে থাইল্যান্ডের আয়ুথিয়ায় অনুষ্ঠিত UNESCO Award of Excellence কর্মশালায় UNDP-CHTDF-এর প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। একই বছরের ডিসেম্বরে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত Promoting and Preservation of Cultural Diversity এবং ASEM Conference- প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে অংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ঐতিহ্যের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করেন।

সুগত চাকমার রচিত সম্পাদিত গ্রন্থের পরিসর বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে

  • চাঙমা-বাঙলা কধাতারা (চাকমা-বাংলা অভিধান) (১৯৭৩)
  • রংধংচাকমা কবিতার গ্রন্থ (১৯৭৮)
  • চাকমা পরিচিতি (১৯৮৩)
  • বাংলাদেশের উপজাতি (১৯৮৫)
  • পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় ভাষা (১৯৮৮)
  • চাকমা রূপকথা (১৯৯৫)
  • চাকমা ঢাক ইতিহাস আলোচনা (২০০০)
  • বাংলাদেশের উপজাতি আদিবাসীদের সমাজ, সংস্কৃতি আচার-ব্যবহার (২০০০; দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০২)
  • বাংলাদেশের চাকমা ভাষা সাহিত্য (২০০২)—চাকমা ভাষা সাহিত্যের ইতিহাসভিত্তিক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকরগ্রন্থ
  • আদিবাসী জনগোষ্ঠী (২০০৭)—বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশনা; অন্যতম সম্পাদক
  • পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি (২০০৯)—পার্বত্য অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলোর সমাজ, ভাষা সংস্কৃতিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ
  • ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক প্রথা রীতিনীতি: চাকমা, মারমা ত্রিপুরা (২০১১)
  • খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার চাকমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা (২০১৯)

এই গ্রন্থসম্ভার থেকে স্পষ্ট হয়- সুগত চাকমার সাহিত্যচর্চা কোনো একক শাখায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাষা, ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, লোককথা নৃতত্ত্ব-বহু শাখাকে তিনি একই জ্ঞানভুবনের অংশ হিসেবে দেখেছেন।

তবে সুগত চাকমার সৃষ্টিশীল পরিচয়ের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর গীতরচনা। তিনি আধুনিক চাকমা গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার। তাঁর গানে পাহাড়ি জনজীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতির রূপমাধুর্য, জাতিগত স্মৃতি মানবিক অনুভূতি এক অপূর্ব শিল্পরূপ লাভ করেছে।

তাঁর গানের ভাষায় যেমন প্রেমের কোমলতা আছে, তেমনি আছে পাহাড়ের মাটির গন্ধ। কোথাও কাপ্তাইয়ের জলরাশি, কোথাও জুমের জীবন, কোথাও প্রিয়জনের স্মৃতি, আবার কোথাও জাতিসত্তার গভীর আকুলতা, সব মিলিয়ে তাঁর গান হয়ে উঠেছে চাকমা জীবনের এক সাংস্কৃতিক দলিল।

এই কারণেই তাঁর বহু গান কেবল গান হয়ে থাকেনি; প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, সংগীতের উপস্থাপনার ধরন বদলেছেকিন্তু তাঁর গানের আবেগ আবেদন আজও অম্লান।

সাহিত্য, গবেষণা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি সুগত চাকমার ব্যক্তিজীবনও ছিল পারিবারিক বন্ধন সহযাত্রিতায় সমৃদ্ধ। ১৫ জুলাই ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি শীলা চাঙমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ জীবনের পথচলায় শীলা চাঙমা তাঁর সহধর্মিণী সহযাত্রী হিসেবে পাশে থেকেছেন।

তাঁদের পারিবারিক জীবনে রয়েছে এক পুত্র এক কন্যা। পুত্র সুবর্ণ চাঙমা, যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত। কন্যা শ্রাবস্তী চাঙমা, যিনি জাতিসংঘের সহায়তাধীন চিকিৎসা কার্যক্রমে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের নিজ নিজ কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠা সুগত চাকমার পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষার প্রতি তাঁর গুরুত্ব এবং প্রজন্ম গড়ে তোলার দীর্ঘ সাধনারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।

একজন সাহিত্যিকের জীবন কেবল তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর চিন্তা, মূল্যবোধ জীবনদর্শনও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত হয়। সেই অর্থে তাঁর পরিবারও তাঁর জীবনসাধনার ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সুগত চাকমা (ননাধন) এমন একজন সাহিত্যসাধক, যাঁর পরিচয় কোনো একটি অভিধায় ধারণ করা কঠিন। তিনি একই সঙ্গে কবি, গীতিকার, গবেষক, ইতিহাসচর্চাকারী, ভাষাবিশারদ, সম্পাদক সাংস্কৃতিক সংগঠক। তাঁর কলমে যেমন প্রেম প্রকৃতি কথা বলেছে, তেমনি কথা বলেছে ইতিহাস, জাতিসত্তা, ভাষা সংস্কৃতির অস্তিত্বের প্রশ্ন।

তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সাহিত্য গবেষণাকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন করেননি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল অনুভবের ভাষা, আর গবেষণা ছিল সেই অনুভবের শিকড় অনুসন্ধানের পথ। ফলে তাঁর সৃষ্টিকর্মে আবেগ যুক্তি, সৌন্দর্য ইতিহাস, কাব্য গবেষণা পাশাপাশি চলেছে।

তাঁর কলমে পাহাড় কেবল প্রকৃতির প্রতীক নয়; এটি ইতিহাসের স্মৃতি, ভাষার আত্মা, সংস্কৃতির ধারক এবং জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি। তাঁর গবেষণা কেবল একাডেমিক সম্পদ নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভাষা, ইতিহাস সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাঁর গান কেবল বিনোদনের উপাদান নয়; তা চাকমা সমাজের অনুভূতি, স্মৃতি জীবনযাত্রার এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক দলিল।

একজন সৃষ্টিশীল মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন তাঁর জীবদ্দশার প্রশংসায় নয়, বরং তাঁর সৃষ্টির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের মধ্যে নিহিত। সেই বিচারে সুগত চাকমা (ননাধন) আধুনিক চাকমা সাহিত্য, গবেষণা সংগীতের ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম।

তাঁর জীবন কর্মের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, একটি জাতির ভাষা সংস্কৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য তার অস্তিত্বকে সংরক্ষণ করা। সুগত চাকমা সেই দায়িত্বই পালন করেছেন তাঁর কলমে, গবেষণায়, গানে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

তাই সুগত চাকমা (ননাধন) শুধু একজন কবি নন, শুধু একজন গবেষক নন, শুধু একজন গীতিকারও নন- তিনি আধুনিক চাকমা সাংস্কৃতিক জাগরণের এক নিবেদিত নির্মাতা। তাঁর সৃষ্টিকর্ম যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন পাহাড়ের ভাষা, গান, সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নামও শ্রদ্ধা ভালোবাসায় উচ্চারিত হবে। সময়ের স্রোত বহু নামকে মুছে দেয়, কিন্তু যাঁরা একটি জাতির স্মৃতি স্বপ্নকে শব্দে, সুরে জ্ঞানে সংরক্ষণ করে যান, তাঁদের আলো সহজে নিভে না। সুগত চাকমা (ননাধন) সেই অম্লান আলোরই একজন বাহক।


নোয়ারাম চাঙমা : অঝাপাতের শেষ প্রদীপটি যিনি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন - ইনজেব চাঙমা

একটি জাতির ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়ার ইতিহাস নয়। ইতিহাসের পাতা শুধু রাজদণ্ড হাতে থাকা মানুষদের নামেই পূর্ণ হয় না। ইতিহাসের গভীরতম জায়গাগুলোতে ক...