মানুষ গড়ার কারিগর এক আলোকিত শিক্ষকের গল্প
![]() |
| সুমনা চাঙমা |
একজন আদর্শ শিক্ষকও তেমনি একজন নির্মাতা। তিনি ইট-পাথরের স্থাপনা নির্মাণ করেন না; তিনি নির্মাণ করেন মানুষের বিবেক, চরিত্র, মনন ও স্বপ্ন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরাই একদিন সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, ঝরনার সুর, জুমক্ষেতের ঘ্রাণ আর নিরাভরণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ভেতর জন্ম নিয়েছেন এমনই এক আলোকিত মানুষ- সুমনা চাঙমা। তিনি কেবল একজন প্রধান শিক্ষিকা নন; তিনি একজন স্বপ্নসাধক, সংস্কৃতিসেবী, মানবিক শিক্ষাবিদ এবং অনেক অনেক শিক্ষার্থীর জীবনের নীরব স্থপতি।
প্রচারবিমুখ এই মানুষটি কখনো আলো খুঁজে বেড়াননি; বরং নিজেই আলো হয়ে উঠেছেন। তাঁর কর্মই তাঁকে পরিচিত করেছে। তাঁর সাফল্যের পরিমাপ কোনো পদক বা পদবিতে নয়; তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের জীবনেই তাঁর প্রকৃত পরিচয় লেখা আছে।
১৯৬৩ সালের ২২ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলার কমলছড়ি গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুমনা চাঙমা। তাঁর পিতা বিনোদ বিহারী চাকমা এবং মাতা লীলাময়ী চাঙমা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পরিবারে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও শিক্ষার যে পরিবেশ ছিল, তা তাঁর চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী, অধ্যবসায়ী ও সৃজনশীল। পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্য, আবৃত্তি ও সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। পাহাড়ের প্রকৃতি তাঁর সংবেদনশীল মনকে যেমন কোমল করেছে, তেমনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে মানবিক হতে শিখিয়েছে।
জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি বাঁধা পড়লেন বাঘাইছড়ি উপজেলার ঝগড়াবিল গ্রামে অনন্ত বিজয় চাকমার সাথে। স্বামী পেশায় ছিলেন মাটিরাঙা উপজেলার ফুড কন্ট্রোলার, আজ অবসরপ্রাপ্ত। বর্তমানে তাঁদের বসবাস খাগড়াছড়ি সদর উপালি পাড়া গ্রামে। তাঁদের কোল জুড়ে দুই কৃতী সন্তান - বড় ছেলে অগ্নিভ চাকমা তূর্য, খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের চিকিৎসক, বিসিএস ক্যাডারভুক্ত এক মানবিক ডাক্তার; আর ছোট ছেলে পৃথ্বীভ চাকমা নুটু, ছোট ছেলে পৃথ্বীভ চাঙমা নুটু পরিবেশ বিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।
অনেকে চাকরি করেন জীবিকা নির্বাহের জন্য; কিন্তু কিছু মানুষ পেশাকে জীবনদর্শনে পরিণত করেন। সুমনা চাঙমা ছিলেন সেই বিরল মানুষের একজন। বাড়ির পাশে উন্নয়ন বোর্ডে অফিস সহকারী পদে যোগদানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই চাকরি গ্রহণ করেননি। কারণ তাঁর স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার। মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তিনি শিক্ষকতার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন।
১৯৮৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি রাঙামাটি জেলার দুর্গম জুরাছড়ি উপজেলা “ফকিরাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়” সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পাহাড়ি দুর্গম পথ, দীর্ঘ পদযাত্রা, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, সব প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই শুরু হয় তাঁর কর্মজীবনের মহাকাব্য। সকাল ৮-৯টার দিকে যাত্রা শুরু করলে অনেক সময় বিকেল ৪-৫টার দিকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হতো। চারপাশের প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা ও কষ্ট তাঁকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং এসব প্রতিকূলতাকেই তিনি নিজের শিক্ষকতা জীবনের শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
তিনি মনে করেন—
"প্রতিকূলতা আমাকে কখনো ভয় দেখাতে পারেনি। আমার কাছে বিদ্যালয় ছিল উপাসনালয়, আর শিক্ষার্থীরা ছিল সেই উপাসনার দেবতা।"
২০০০ সালের ১৭ আগস্ট তিনি কুকিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বিদ্যালয়ের অবস্থা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। বৃত্তি পরীক্ষায় সাফল্যের হার শূন্য, শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল, সহশিক্ষা কার্যক্রম প্রায় অনুপস্থিত।
কিন্তু তিনি বিদ্যালয়টিকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেননি।
তিনি প্রথমেই বিদ্যালয়ের প্রতিটি নথি পর্যালোচনা করেন। কোথায় সমস্যা, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় সম্ভাবনা, সবকিছু বিশ্লেষণ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি বিদ্যালয়টিকে সম্পূর্ণ বদলে দেন।
যে বিদ্যালয় একসময় বৃত্তি পরীক্ষায় শূন্য ছিল, সেই বিদ্যালয়ই ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ বৃত্তি অর্জনে জেলার অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। শতভাগ পাস, ধারাবাহিক সাফল্য এবং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, এসবই তাঁর নিরলস সাধনার ফসল।
সুমনা চাঙমার কাছে শিক্ষা মানে ছিল না কেবল বই মুখস্থ করা। তিনি বিশ্বাস করতেন— "যে শিশু গান শেখে, সে সহিংসতা থেকে দূরে থাকে; যে শিশু কবিতা পড়ে, তার হৃদয় মানবিক হয়; যে শিশু ছবি আঁকে, সে পৃথিবীকে সুন্দরভাবে দেখতে শেখে।"
তাই বিদ্যালয়ে তিনি আবৃত্তি, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, গল্প লেখা, উপস্থিত বক্তৃতা, ক্রীড়া এবং পাঠাভ্যাসকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
নিজের অর্থে বই কিনেছেন। নিজের বাড়ির সংবাদপত্র বিদ্যালয়ে নিয়ে গেছেন। বিদ্যালয়ে পাঠাগার গড়েছেন। শিশুদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসেন, তখন শিক্ষা হয়ে ওঠে হৃদয়ের সম্পর্ক। দীর্ঘ বন্ধ/ছুটির সময় বাড়িতে তাঁর তত্ত্বাবধানে রেখে, মায়ের মতো স্নেহ-মমতায় লেখাপড়া করিয়েছেন। নিজের বিনোদন বিসর্জন দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে সময় দিতেন। এভাবে শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
তাঁর কাছে কোনো শিশুর পরিচয় ছিল না তার অর্থনৈতিক অবস্থান; তাঁর কাছে প্রতিটি শিশুই ছিল সম্ভাবনার এক একটি প্রদীপ।
তাঁর নেতৃত্বে কুকিছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে চিত্রাঙ্কন, কবিতা আবৃত্তি, গল্প লেখা, উপস্থিত বক্তৃতা, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করে।
২০১৪ সালে আশামণি চাকমা আন্তঃপ্রাথমিক অঙ্ক দৌড়ে প্রথম স্থান অধিকার করে বিদ্যালয়ের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনে। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করে।
তাঁর অনেক শিক্ষার্থী আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত এবং কেউ কেউ সম্পন্ন করেছে। কেউ বিদেশে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করছে, কেউ উন্নয়নকর্মী, কেউ শিক্ষক, সেনাবাহিনী, আবার কেউ বিদেশে অধ্যয়নরত আর কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে কর্মরত।
সুমনা চাঙমা শুধু শিক্ষক নন; তিনি একজন সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। তিনি একজন দক্ষ আবৃত্তিকার এবং রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। অবসর গ্রহণের আগে আন্তর্জাতিক শিল্পী-সাহিত্যিক সম্মিলন পরিষদ "বিশ্বভরা প্রাণ"-এর জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
অবসরের পর অধিকাংশ মানুষ যখন বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন সুমনা চাঙমা নতুন উদ্যমে সংস্কৃতিচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট-এ তিন বছর মেয়াদি রবীন্দ্রসংগীত কোর্সে অধ্যয়নরত। তাঁর এই অধ্যবসায় প্রমাণ করে, শেখার কোনো বয়স নেই। এ যেন তাঁর জীবনের আরেকটি বসন্ত। তিনি বিশ্বাস করেন, "শিক্ষা যেমন আজীবনের সাধনা, সংস্কৃতিও তেমনি আজীবনের অনুশীলন।"
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ (চট্টগ্রাম বিভাগ, ২০২২)। শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী সম্মাননা। এবং প্রথম আলোর বন্ধুসভা পুরস্কার ২০২২খ্রি.।
একাধিকবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচিত হন (০৯/০৪/২০০৮ খ্রি., ২৫/০৯/২০১২খ্রি., ২৯/০৯/২০১৪খ্রি. ও ১৯/০৭/২০১৫খ্রি.) । এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা হিসেবে বিভাগীয় সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ।
কালের কণ্ঠ পত্রিকায় "অনুকরণীয় শিক্ষক সুমনা চাকমা: পাহাড়ের কোলে আলোর দ্যুতি" শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে মালয়েশিয়া শিক্ষা সফর।
২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন সুমনা চাঙমা। কিন্তু তাঁর জীবনের কর্মযজ্ঞ থেমে যায়নি। আজও তিনি সাহিত্য পড়েন। রবীন্দ্রসংগীত শেখেন। আবৃত্তি করেন। নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেন। কারণ তিনি জানেন, আলো কখনো অবসর নেয় না। একজন মানুষ, এক অনন্ত উত্তরাধিকার; একজন শিক্ষক কত দূর পর্যন্ত মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারেন, সুমনা চাঙমার জীবন তার এক অনন্য উদাহরণ।
তিনি বিদ্যালয়কে ভালোবেসেছেন নিজের সংসারের মতো। শিক্ষার্থীদের ভালোবেসেছেন নিজের সন্তানের মতো। সংস্কৃতিকে ধারণ করেছেন আত্মার মতো। আর মানুষ গড়াকে গ্রহণ করেছেন জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে। আজ তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। তাঁদের প্রতিটি অর্জনের ভেতরে জেগে আছে এক শিক্ষকের নীরব স্পর্শ।
সুমনা চাঙমা তাই কেবল একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা-ইতিহাসের এক দীপ্তিমান অধ্যায়, এক মানবিক আলোকবর্তিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার নাম।
তথ্যসূত্র: পিন্টু চাঙমা, শিক্ষক (সুমনা চাঙমার শিক্ষার্থী)। “শতফুল” প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা। দৈনিক কালেকণ্ঠ, ৫ অক্টোবর ২০১০ খ্রি.

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন