পীরেন স্নাল। ছবি : সংগৃহীত
বন পাহাড়ে উড়ে ঘুরে গাইবে বলে
লাল সে মাটির গন্ধ বুকে পুষবে বলে
সবুজ মায়ার বাঁধন অটুট রাখবে বলে
শাল বৃক্ষের মতোন সিনা টান করে সে
মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে।’’
পীরেন স্নালকে নিয়ে গানের দল মাদলের গাওয়া এই গানে ফুটে উঠেছে স্বাধীন সংগ্রামী চেতনা তথা তাঁর মহান আত্নবলিদানের কথা। কে এই পীরেন স্নাল? কি তার অবদান? কেন তাকে আত্নবলিদান দিতে হল? জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা, আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইকে শাণিত করতে এইসব নতুন করে ভাবতে হবে।
পীরেন স্নাল। মধুপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিপ্লবী এক নাম। আজকের ইকো-পার্কহীন মধুপুর গড়ায় যার অবদান অসামান্য। তাঁর অবদানকে স্বীকার করেই মধুপুরের অধিকার রক্ষার আন্দোলন এগিয়ে নিতে হবে।
টাঙ্গাইলের মধুপুর গারো, কোচ, বর্মণ, মান্দাই জাতিসত্তার আদি বসতি। মান্দিরা মধুপুরকে ভালবেসে নাম দিয়েছে হা.বিমা। হা. অর্থ মাটি আর বিমা স্ত্রী বাচক (মা) অর্থে ব্যবহৃত। প্রিয় মধুপুরকে নিয়ে তাবেদার শাসকগোষ্ঠীর তথাকথিত উন্নয়নী প্রকল্প পরিকল্পনা আজকের নয়, অতি পুরনো। পুরনো সেই মহাপরিকল্পনা ‘ইকো-পার্ক’ আকারে গড় হাজির হয় ২০০৩/০৪ সালে চার দলীয় জোট সরকারের আমলে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, ইকো-পার্ক মধুপুর জাতীয় উদ্যান প্রকল্পের আওতায় ৯৭.৩ মিলিয়ন টাকার বিল পাস হয় পূর্ববর্তী আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে। যা বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আরোহনের পর গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়। ইকো-পার্ক প্রকল্প বাস্তবায়নের বেলায় সরকারি তরফ থেকে প্রচারণা চালিয়ে বলা হয়, ‘জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও বিলুপ্ত উদ্ভিদ প্রজাতি, পশু-পাখি ও বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নির্মাণে তৈরি করা হচ্ছে ইকো-পার্ক।’ প্রকৃতপক্ষে এটা যে শাসকগোষ্ঠীর মিষ্টি বুলি প্রকৃতিপ্রেমী বনবাসী তা বুঝে ফেলে। যার ফলে জীবন দিয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করে।

বনবিভাগের এই দেয়াল স্থানীয় আদিবাসী মানুষের স্বাভাবিক জীবনে কত ভয়াবহ দুর্বিষহ পরিনাম ডেকে আনবে তা বনবাসী মানুষ আঁচ করতে সক্ষম হন। আদিবাসীরা সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে দাবি সমূহ সরকার সমীপে তুলে ধরার তদবির চালায়। আন্দোলনের চাপে তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ ২০০৩ সালের ৪ জুলাই দোখলায় আদিবাসী নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠক কোন ফলাফল বয়ে আনেনি। বরং ষড়যন্ত্র প্রক্রিয়ায় আন্দোলনকারীদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়। সেই বিভেদ রেখা টেনে সংখ্যাগুরু আন্দোলনকারী সংগ্রাম অব্যাহত রাখে।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৩ ডিসেম্বর গায়রায় অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে ৩ জানুয়ারি ২০০৪ সালে ইকোপার্ক বিরোধী মিছিলের ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণার প্রেক্ষিতে, ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি গায়রা গ্রামে সাধুপাড়া, কাঁকড়াগুনি, জয়নাগাছা, জালাবাদা, বিজয়পুর, সাতারিয়া’সহ আশেপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ নিজেদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে সমবেত হন। গারোদের রণধ্বণি খাঁ সাংমা, খাঁ মারাক ধ্বণিতে মূহুর্তেই ধ্বণিত হয়ে উঠে পুরো শালবন।
এদিকে সমাবেশ ও মিছিলের খবর পেয়ে সকাল থেকেই সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও অস্ত্রধারী বনরক্ষী এমনকি ঠিকাদারের ভাড়াটে লোকদেরও মোতায়েন করা হয়। সমাবেশ শেষে দুপুর বারোটার দিকে শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল। মিছিলটি কিছুদূর অগ্রসর হতেই পুলিশ ও বনরক্ষী নির্বিচারে আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। গুলিতে ঘটনা স্থলেই নিহত হন জয়নাগাছা গ্রামের বিশ বছরের তরুণ পীরেন স্নাল। বেপরোয়া বর্ষিত গুলিতে মারাত্নক আহত হন রবীন সাংমা, উৎপল নকরেক, পঞ্চরাজ ঘাগ্রা, এপ্রিল সাংমা, রহিলা সিমসাং, শ্যামল সাংমা, রিতা নকরেক সহ প্রায় ২৫ জন আদিবাসী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর।
এই ঘটনার পর আদিবাসীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। মাসব্যাপী চলে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ। বন বিভাগ চুপটি মেরে বসে থাকেনি। ৪ জানুয়ারি রাতেই নিহত পীরেন স্নাল ও গুলিতে আহত উৎপল নকরেক, জর্জ নকরেক, শ্যামল সাংমা, মৃদুল সাংমা, হ্যারিসন সাংমা, বিনিয়ান নকরেক’সহ প্রায় ছয়শত জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মধুপুর থানার দারোগা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। একটি পরিসংখ্যান বলে, শুধুমাত্র জুন ২০০৩ থেকে জুলাই ২০০৪ পর্যন্ত সময়কালেই আদিবাসী নেতৃবৃন্দসহ নিরীহ অনেকের নামে বনবিভাগ মামলা দায়ের করে মোট একুশটি। এই একুশটি মামলার সবকটিতেই অজয় মৃ, প্রশান্ত মানখিন, পঞ্চরাজ ঘাগ্রা, মালতি নকরেক, স্বপন নকরেক, নেরি দালবত, মাইকেল নকরেক, নিহত চলেশ রিছিলের নামও আছে।
পীরেন স্নালের আত্ম বলিদানে ইকো-পার্ক নির্মাণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়। কিন্তু ইকো-পার্কের প্রেতাত্মা এখনো মধুপুর ছাড়েনি। এখনো সামাজিক বনায়ন, ইকো-ট্যুরিজম প্রভৃতির আলখেল্লা পড়ে ইকো-পার্কের প্রেতাত্মা হাজির হয়। এসব ঈগল চোখে দৃষ্টিগোচর হয়।
৩রা জানুয়ারী, পীরেন স্নালের আত্মহুতি দিবস। অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে বীর গতিপ্রাপ্ত পীরেন স্নালের প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
উন্নয়ন ডি. শিরা, তরুণ লেখক।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন