বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

কবি নূতন ধন চাঙমা: শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচেতনার অন্যতম এক আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

"যে মানুষ এক হাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালান, অন্য হাতে কবিতার অক্ষরে একটি জাতির আত্মপরিচয় রচনা করেন, তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের সাংস্কৃতিক জাগরণের দলিল।"


পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে জন্ম নেওয়া কবি নুতন ধন চাঙমা সেইসব আলোকিত মানুষের অন্যতম, যাঁরা শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ত্রিমাত্রিক সাধনায় নিজেকে নিবেদিত করেছেন। তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন সৃজনশীল কবি, দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী এবং সমাজমনস্ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর কলমে যেমন পাহাড়ের প্রকৃতি প্রাণ পায়, তেমনি উচ্চারিত হয় মানুষের জীবনসংগ্রাম, ভাষার অস্তিত্ব এবং জাতিসত্তার অম্লান চেতনা।

১৯৭৮ সালের ৩০ এপ্রিল খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার মধুমঙ্গল পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা আনন্দ রাখাল চাঙমা এবং মাতা চন্দ্র বালা চাঙমা। পারিবারিক স্নেহ, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত নির্মাণ করে। পরবর্তীকালে জীবনের সহযাত্রী হন সুপিলা চাঙমা, যিনি তাঁর সাহিত্য ও কর্মজীবনের নীরব প্রেরণার উৎস।

নুতন ধন চাঙমার শিক্ষাজীবন ছিল অধ্যবসায় ও আত্মনির্মাণের এক ধারাবাহিক যাত্রা। ১৯৯৪ সালে পুজগাংমুখ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৯৬ সালে পানছড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৯৮ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষকতা পেশাকে কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং জাতি গঠনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তিনি ২০০৫ সালে ফেনী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে এমএড ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষাবিদ হিসেবে নিজের দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেন।

২০০০ সালে লোগাং বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। শ্রেণিকক্ষ তাঁর কাছে ছিল কেবল পাঠদানের স্থান নয়; বরং একটি স্বপ্ন নির্মাণের কর্মশালা। তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, সংস্কৃতিবোধ এবং সাহিত্যপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেখান না, মানুষ গড়েন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতায়ও রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য পদচিহ্ন। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো-এর প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দৈনিক সমকাল এবং দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করেছেন।

সংবাদ সংগ্রহ তাঁর কাছে ছিল কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়; বরং প্রান্তিক মানুষের কথা, পাহাড়ের বাস্তবতা এবং সমাজের নীরব সত্যকে বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে তুলে ধরার এক সামাজিক অঙ্গীকার। তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পাহাড়ের জীবন, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সময়ের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা।

কবি নুতন ধন চাঙমার সাহিত্যচর্চার মূল ভিত্তি তাঁর মাতৃভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তিনি চাঙমা ভাষায় ‘ঘিলেফুল’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে মাতৃভাষার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।

‘ঘিলেফুল’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি পাহাড়ি মানুষের অনুভূতি, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য, প্রেম, স্মৃতি, জীবনসংগ্রাম এবং জাতিগত আত্মপরিচয়ের কাব্যিক দলিল। তাঁর কবিতায় পাহাড়ের সবুজ, ঝরনার কলতান, মানুষের হাসি-কান্না এবং ভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা একাকার হয়ে যায়। সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষা তাঁর কাব্যকে সাধারণ পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

নুতন ধন চাঙমা সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একই সূত্রে বেঁধেছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করেছেন; সাংবাদিক হিসেবে সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন; আর কবি হিসেবে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে শব্দের অলংকারে অমর করে রেখেছেন।

তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বৃহত্তর সমাজ, ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধ অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে তাঁর রচনা কেবল নান্দনিকতার জন্য নয়, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দলিল হিসেবেও মূল্যবান।

কবি নুতন ধন চাঙমার জীবন আমাদের শেখায়—কলম যখন শিক্ষার আলো, সাহিত্যের সৌন্দর্য এবং সমাজের দায়বদ্ধতাকে একসূত্রে গাঁথে, তখন একজন মানুষ নিজের সীমানা অতিক্রম করে সময়ের সম্পদে পরিণত হন। তাঁর কর্ম, সাহিত্য এবং আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাতৃভাষা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের পথে অনুপ্রাণিত করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে তাঁর নাম তাই এক নিবেদিত শিক্ষক, এক সংবেদনশীল কবি এবং এক দায়িত্বশীল সমাজসচেতন মানুষের পরিচয়ে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবি নূতন ধন চাঙমা: শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচেতনার অন্যতম এক আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

"যে মানুষ এক হাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালান, অন্য হাতে কবিতার অক্ষরে একটি জাতির আত্মপরিচয় রচনা করেন, তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইত...