শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

ফাগুনের প্রতিজ্ঞা- ইনজেব চাঙমা

আজ ফাগুনের ২২ তারিখ।  চারদিকে বসন্তের রঙ ছড়িয়ে আছে। গাছের ডালে ডালে নতুন পাতার মেলা, দূর থেকে ভেসে আসছে কোকিলের কুহু কুহু ডাক। তুরিং ফুল, ভেইক ফুল আর নকশা ফুলের সুগন্ধে চারদিক ভরে উঠেছে। পাগলা বসন্তের বাতাস যেন পুরো প্রকৃতিকে মাতিয়ে তুলেছে

কখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে বাড়ির উঠান। ঘরের পুরোনো টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ করে পানি পড়ছে। টিনগুলো কেনা হয়েছিল ২০০৪ সালে। এতদিনে জং ধরে অনেক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে

কিন্তু এই আনন্দময় পরিবেশের মাঝেও তজিমের মন ভারী হয়ে আছে। আকাশের মেঘলা চেহারার মতোই তার মনটাও যেন বিষণ্ণ

একসময় তার সংসার ছিল ভরপুর। তখন তার স্ত্রী নাগরো ছিল পাশে। ছোট্ট হলেও ছিল তাদের একটি সুখী সংসার। অভাব ছিল না তেমন। ছেলে-মেয়েরা নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করত। সন্ধ্যায় সবাই একসাথে বসে গল্প করত। নাগরো রান্নাঘর থেকে ডাক দিত—

ওই, হাত-মুখ ধুয়ে এসো। ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”

সেই ডাক এখনো যেন তার কানে ভেসে আসে

নীরবে বসে  দাবা থানতে থানতে হঠাৎ পুরোনো দিনের স্মৃতি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনে হলো সময় যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পাঁচ বছর আগের সেই দিনগুলোতে

তখন তজিম নিজের সমস্ত সময় শক্তি উৎসর্গ করেছিল তার মাতৃভাষা—চাঙমা ভাষা রক্ষার কাজে

গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে সচেতন করা, নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা শেখানো, ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য সভা করা—এসব কাজেই তার দিন কেটে যেত। অনেকেই তাকে পাগল বলত

কেউ বলত,
ভাষা দিয়ে কি পেট ভরবে?”

কেউ আবার হাসতে হাসতে বলত,
এইসব করে লাভ কী?”

কিন্তু তজিম থামেনি। কারণ সে জানত—ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মা

এই সংগ্রামের পেছনে নীরব শক্তি হয়ে ছিল তার স্ত্রী নাগরো। সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে। মাঠের কাজ, ঘরের কাজ, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা—সবই সামলাত ধৈর্য আর ভালোবাসা দিয়ে

একদিন রাতে নাগরো তাকে বলেছিল—

তুমি তোমার কাজ করো। ভাষার জন্য কাজ করা খারাপ কিছু না। সংসারটা আমি দেখছি।”

তজিম তখন চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই চোখে ছিল কৃতজ্ঞতা

কিন্তু সময় সবসময় মানুষের ইচ্ছার মতো থাকে না

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল নাগরো। প্রথমে সবাই ভেবেছিল সাধারণ কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। হাসপাতালে নেওয়ার পরে
সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল

সেই দিন থেকেই যেন তজিমের জীবনে এক অদৃশ্য শূন্যতা নেমে আসে

সংসারের ভার এখন তার একার কাঁধে

এখন তার মেয়ে অনার্সে পড়ে। ছেলে নবম শ্রেণিতে। তাদের পড়াশোনার খরচ দিন দিন বাড়ছে। অথচ তার নিজের আয় খুবই কম

ঠিক তখনই হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল

স্ক্রিনে ভেসে উঠল মেয়ের নাম

তজিম ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মৃদু কণ্ঠে মেয়েটি বলল—

বাবা, ৫০০ টাকা পাঠাবে? জরুরি লাগবে।”

কথাটা শুনে তজিমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল

এই মুহূর্তে তার কাছে একটাও টাকা নেই

সে পকেট হাতড়ে দেখল। পুরোনো একটি কাগজ ছাড়া আর কিছুই নেই। মনে হলো যেন শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরেছে

কিন্তু মেয়েকে কি করে বলবে—

মা, আমার কাছে টাকা নেই”?

কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে শুধু বলল—

আচ্ছা মা, পাঠিয়ে দেব।”

তারপর ধীরে ধীরে কলটা কেটে দিল

ফোনটা নামিয়ে রেখে তজিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল

বাইরে তখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। মনে হলো প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতরে গিয়ে বাজছে

এমন সময় তার মায়ের কথাগুলো আবার কানে ভেসে উঠল—

তজিম, তুমি আর কতদিন এভাবে অভাবে থাকবে? তোমার তো জমি-জমা আছে, বাগান-বাগিচা আছে। সমাজের কাজ একটু কমিয়ে নিজের কাজ করলে তো অভাব থাকবে না।”

বাবাও প্রায়ই বলেন—

মানুষের জন্য কাজ করা ভালো, কিন্তু নিজের সংসারের কথাও ভাবতে হয়।”

ভাই-বোনেরাও একই কথা বলে

তজিম এসব কথা শুনে শুধু মৃদু হাসে। কখনো তর্ক করে না, কাউকে বোঝানোরও চেষ্টা করে না

কারণ সে জানে—তার পথটা সহজ নয়

তার হৃদয়ের গভীরে একটি প্রতিজ্ঞা জ্বলছে

সে মনে মনে বারবার বলে—

যতদিন না চাঙমা ভাষা তার প্রাপ্য সম্মান পায়, যতদিন না আমাদের ভাষা মুক্তভাবে বেঁচে থাকে, ততদিন আমি এই পথ ছেড়ে যাব না।”

অভাব তাকে কষ্ট দেয়, কিন্তু দুর্বল করে না

হাজারো সংকটের মাঝেও তজিম নিজের সংগ্রামকে কখনো ব্যর্থ মনে করে না। কারণ সে জানে—তার এই লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়

এটি তার মাতৃভাষার জন্য

তার সংস্কৃতির জন্য

তার জাতির ভবিষ্যতের জন্য

বাইরে তখনও বসন্তের বাতাস বইছে। দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে। ফুলের সুগন্ধে ভরে আছে চারপাশ

তজিম ধীরে ধীরে উঠল। ভেজা উঠানের দিকে তাকাল। তারপর আকাশের দিকে চোখ তুলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল

মনে হলো নাগরো যেন কোথাও থেকে তাকে দেখছে

হঠাৎ তার বুকের ভেতর নতুন এক দৃঢ়তা জন্ম নিল

ফাগুনের এই দিনে সে আবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—

আমি থামব না।”

যত কষ্টই আসুক, আমি থামব না।”

প্রকৃতির আনন্দের মাঝেও এক মানুষের সংগ্রাম চলতেই থাকে—নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে, অটুট বিশ্বাস নিয়ে

ফাগুনের ফুল একদিন ঝরে যাবে

বসন্ত চলে যাবে

কিন্তু তজিমের প্রতিজ্ঞা ঝরবে না

কারণ সে জানে—

একটি ভাষা বাঁচলে তবেই বাঁচবে একটি জাতির আত্মা

 

বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

বিঝু: অস্তিত্ব রক্ষার সাংস্কৃতিক সংগ্রাম


 হাজারো বেদনা, শত যন্ত্রণা আর বাস্তুভিটা হারানোর দীর্ঘ ইতিহাস বয়ে চলেছে জুম্ম জাতির জীবনপথে। দেশ থেকে দেশান্তরে, পাহাড় থেকে সমতলে—উচ্ছেদ, দখল, যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় অবহেলার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেছে এই জনগোষ্ঠী। তবু সমস্ত ক্ষত, সমস্ত নিঃশব্দ কান্নার মধ্য দিয়েও বিঝু আসে—পাহাড়ের বুক জুড়ে আসে। বনজ ফুলের ঘ্রাণে, ঝরনার কলতানে, মানুষের চোখের গভীর প্রত্যয়ে বিঝু জানান দেয়—জুম্ম জাতি এখনও টিকে আছে।
বিঝু কোনো সাধারণ উৎসব নয়। এটি জুম্ম জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। যুগের পর যুগ ধরে এই উৎসব পাহাড়ি মানুষের জীবনচক্রে বুনে দিয়েছে মিলন, স্মৃতি ও প্রতিরোধের অনিবার্য সুতো। ইতিহাস যতবারই এই জাতিকে মুছে দিতে চেয়েছে, ততবার বিঝু নতুন করে ঘোষণা করেছে—এই জনগোষ্ঠীর ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে, স্মৃতি আছে।

প্রতি বছর বিঝু আসার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম থেকে শহর—সবখানে শুরু হয় এক নীরব প্রস্তুতি। ঘরের আঙিনায়, পাড়ার মোড়ে, শহরের উন্মুক্ত প্রান্তরে বসে বিঝু মেলা। ঢোল, বাঁশি ও গানের তালে পাহাড় মুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আয়োজন কি কেবল বিনোদনের জন্য? নাকি এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্বও বহন করে?

কারণ বিঝু শুধু আনন্দের উৎসব নয়—এটি স্মৃতি ও সংগ্রামের উৎসব। এই উৎসবের গভীরে লুকিয়ে আছে জুম্ম জাতির ভাষা, লোকসাহিত্য, বেদনার ইতিহাস এবং টিকে থাকার লড়াই। একসময় আগুনের পাশে বসে যে গল্প বলা হতো, যে ভাষায় মা সন্তানকে ঘুম পাড়াত—আজ সেই ভাষা ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। ভাষা হারানো মানে কেবল শব্দ হারানো নয়; ভাষা হারানো মানে ইতিহাস, চিন্তা ও আত্মপরিচয় হারানো।


এই সংকটময় বাস্তবতায় বিঝু মেলা হয়ে উঠতে পারে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ক্ষেত্র। এখানে শুধু নাচ-গান নয়—থাকতে হবে মাতৃভাষায় কবিতা পাঠ, লোককথা বলা, ঐতিহ্যবাহী নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আলোচনা। শিশু-কিশোরদের জন্য বিঝু হতে পারে মাতৃভাষা শেখার প্রথম বিদ্যালয়, তরুণদের জন্য ইতিহাস জানার মঞ্চ, আর প্রবীণদের জন্য স্মৃতি হস্তান্তরের দায়বদ্ধ পরিসর।


যদি বিঝু কেবল নাচ-গানের আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শাসক সংস্কৃতির ভোগবাদী কাঠামোর অংশ হয়ে যাবে। কিন্তু বিঝু যদি হয়ে ওঠে ভাষা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য রক্ষার মঞ্চ—তবে তা হবে এক নীরব কিন্তু দৃঢ় সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এই প্রতিরোধ অস্ত্রহীন, কিন্তু গভীর; উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।

এই বিঝুতে আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট দায়িত্ব দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি বিঝু উদ্‌যাপন কমিটি, প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রতিটি সচেতন পাহাড়ি মানুষের প্রতি আহ্বান—বিঝুকে ফিরিয়ে দিন তার সংগ্রামী চেতনায়। গান হোক, নৃত্য হোক—কিন্তু তার সঙ্গে থাকুক ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও স্মৃতির চর্চা। কারণ বিঝু বাঁচলে কেবল একটি উৎসব বাঁচে না—বেঁচে থাকে জুম্ম জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়।

চবি প্রাক্তন ছাত্র ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরা পেলেন পিএইচডি

 

ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরা
১৯ এপ্রিল ২০২৩ – চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরা জার্মানির RUHR University Bochum থেকে ডক্টরেট (PhD) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বাংলাদেশি ত্রিপুরা জাতির মধ্যে তিনিই এই উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন আদিবাসী ছাত্রদের সংগঠন CUIS ড. ত্রিপুরাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরার জীবনপথ অনুপ্রেরণামূলক। তিনি তৈলাফাং গ্রাম, বর্ণাল ইউনিয়ন, মাটিরাঙ্গা উপজেলা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা-তে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে উঠেন। ১৯৮৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল পরিস্থিতির কারণে ভারতে শরণার্থী হন এবং ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষাজীবন পার করার পর তিনি ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে BRAC-এ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য প্রোগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন।
উচ্চতর শিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ার Victoria University থেকে ২০১৩-১৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর জার্মানির RUHR University Bochum-এ ৫ বছরের গবেষণার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকারভিত্তিক আন্দোলন ও জনঅংশগ্রহণ বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন।
বর্তমানে ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরা ফ্রীল্যান্ড গবেষক হিসেবে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত এবং এক কন্যা সন্তানের জনক।
CUIS জানিয়েছে, ড. ত্রিপুরার অর্জন প্রমাণ করে যে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ও নিন্ম-মধ্যবিত্তদের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে উচ্চ শিক্ষার শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।
#তথ্য: Chittagong University Indigenous Students - CUIS

মেগা প্রকল্প নয়, আগে ন্যায্যতা- ইনজেব চাঙমা

  গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের...