পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী ছাত্র রাজনীতিতে প্রসিত চক্র পলাশ খীসা

হঠাৎ সেদিন ২২ সেপ্টেম্বর ২০০১ জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর একটি খবর চমকে দিল আমাদের।আমাদের কলেজ জীবনের বন্ধু রূপক আর পৃথিবীতে নেই।খুব কাছ থেকে গুলি করে গতকাল তাকে হত্যা করা হয়েছে।চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ নেতা প্রসিত বিকাশ খীসার নির্বাচনী প্রচার কাজ করতে গিয়ে তাকে জীবন দিতেহলো।সমবেদনা, সহ মর্মিতা জানাই তার বাবা-মা পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের। নীতি-নৈতিকতায় আচার ব্যবহারে রূপক ছিল একজন চমৎকার মানুষ। তবে সেছিল প্রসিতের অন্ধভক্ত।তাদের দু'জনের বাড়ী ছিল পাশাপাশি, খাগড়াছড়ির পূর্ব নারান খাইয়ায়।রূপক আমার কলেজ জীবনের ঘনিষ্ট বন্ধুদের একজন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে সেছিল বিজ্ঞান বিভাগে, আমি মানবিকে। থাকতাম নিউ হোস্টেলে।দুই বছর কাছাকাছি থেকেছি, বহু জায়গায় এক সাথে ঘুরেছি, তাদের বাড়ীতে খেয়েছি, থেকেছি নিজের বাড়ীর মতো। রাজনীতি থেকে শুরু করে সমস্ত বিষয়ে আলোচনা করেছি। তার কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শুনেছি প্রসিতের প্রশংসা, বিভিন্ন সময়ে দেয়া কুবুদ্ধি বা পরামর্শ, খাগড়াছড়ি স্কুলে পড়াকালীন সময়ের নানান ঘটনার কথা। দুটো ঘটনার কথা বলি-

এক,

খাগড়াছড়িতে তৎসময়ে 'আলম সীল' নামে ফুটবল প্রতিযোগিতা চলতো। যোগ্যতা হলো স্কুলের পড়ুয়া ৪ ফুট ৯ ইঞ্চি লম্বা ছাত্র। নারানখাইয়া গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করতো রূপকরাও। তাদের ওস্তাদ বা পরামর্শ দাতা ছিলেন প্রসিত। কিভাবে গোল দিতে হয় তা না শিখিয়ে তিনি শিখাতেন কিভাবে ল্যাং মারতে হয়।

দুই.

তৎসময়ে বাইরে থেকে কোন বাঙালী ছেলে পাড়ার পাশ দিয়ে খাগড়াছড়ি-পানছড়ি রাস্তায় আসতে দিতে চাইতেন না প্রসিত। কিন্তু তারপরও দু'একজন মাঝে মধ্যে বেড়াতে যেতো। প্রসিতের পরামর্শে তাদেরকে মারতো রূপকেরা। বিনা কারণে তো কাউকে মারা যায় না, কোন না কোন অজুহাত সৃষ্টি করতে হয়। তাই বুদ্ধি দিতেন প্রসিত এভাবে প্রথমে হাঁটার সময় একজন ধাক্কা মারতো, যখনি বাঙালী ছেলেটা প্রতিবাদ করবে তখনি চলতো উত্তম-মধ্যম। তাতেও কাজ না হলে বাঙালী ছেলেটাকে বলা হতো 'ঐদিন আঙাবে কি কয়স'? (ঐদিন আমাকে কি বলেছ?)। তার জবাব যাই হোক না কেন তাকে মারধর করা হতো।

উপরোক্ত বিষয়ে আলোচনা করলাম এ কারণে যে, রূপকের মৃত্যু স্বাভাবিক কোন মৃত্যু নয় এবং এটিই প্রথম মৃত্যু নয়। এর আগেও চুক্তি পক্ষে বিপক্ষে অনেকেই নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে তার এই করুণ পরিণতি। বিভেদপন্থী প্রসিত-সঞ্চয়ের নেতৃত্বে চুক্তি বিরোধী চক্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি অনেক অনেক প্রতিভাবান, সৎ, সাহসী, দেশপ্রেমিক রূপকের মতো অকালে জীবন দিলেন যা ভাবতেও খারাপ লাগে। প্রসিত-সঞ্চয় কে, কেন চুক্তি পক্ষ-বিপক্ষ? কোন কারণে রাজপথে সাহসী লড়াকু সৈনিকেরা আজ দ্বিধাবিভক্ত এবং পরষ্পরকে হত্যা করছে, এ বিষয়ে অনেক দিন ধরে লিখবো লিখবো করেও লেখা হয়নি। কিছুদিন আগে রাঙ্গামাটির

কল্যাণপুরে আঞ্চলিক পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান জুম্ম জনগণের প্রিয় নেতা সন্তু লারমার বাসভবনে গিয়ে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার বিভাগের সম্পাদক শ্রদ্ধেয় মঙ্গল কুমার চাকমা আমাকে অনুরোধ করলেন আমি যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্র রাজনীতি প্রসঙ্গে কিছু লিখি। তাই মঙ্গলদার অনুরোধে এবং ব্যক্তিগত জীবনে চুক্তি বিরোধীদের অনেক কাছ থেকে দেখার সুবাদে আমার এ লেখা:

একজনের প্রচেষ্টায় একদিনে যেমনি কোন সংগঠন গড়ে উঠে না, তেমনি একটি কারণে একদিনে কোন সংগঠন বিভক্ত হয় না। সঙ্গত কারণে চুক্তির সাথে সাথে চুক্তি বিরোধীদের উৎপত্তি হয়নি। এর পেছনে অনেক ঘটনা ও দীর্ঘ প্রচেষ্টা রয়েছে তাদের। তাই আমার এই লেখা দীর্ঘ হওয়া স্বাভাবিক। ১৯৮৮ সালের শুরুতেই আমি যখন মহালছড়ি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন আমরা স্কুলের ছাত্রদের কিছু দাবীদাওয়া নিয়ে ও প্রধান শিক্ষকের বৈষম্যমুলক আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করি। এক পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক আমাদের দাবী মেনে নেন। এর পরপরই তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্বাবিদ্যালয়ের ছাত্র প্রজ্ঞান খীসার সাথে (বর্তমানে মুবাছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান) আমাদের পরিচয় হয়। তিনি প্রায়ই আমাদের সাথে দেখা করে জুম্ম জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে ছাত্র-যুব সমাজের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করতেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই আকৃষ্ট হতাম তার কথাবার্তায়। ভালো লাগতো, শ্রদ্ধা করতাম, এখনো করি। একদিন খবর এলো বুদ্ধ শিবিরের দুইজন ছেলে মহালছড়ি আসছে, তারা জুম্ম জাতির শত্রু, আমরা যেন রসিদ বইসহ তাদের আটকে রাখি। যথাসময়ে তারা আসলো, আমরা রসিদ বইগুলো জব্দ করে তাদেরকে প্রথম বারের মতো ছেড়ে দিলাম। কলেজে ভর্তি হয়ে বন্ধুবর রূপকের কাছ থেকে বুদ্ধ শিবির সম্পর্কে যা জানলাম তা হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কিছু পাহাড়ী ছাত্র বুদ্ধ শিবির করে। এরা ধর্ম ব্যবসায়ী, জুম্ম জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিপক্ষে, আর্মীর দালাল ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে বুদ্ধ শিবির সম্পর্কে একটি খারাপ ধারণা ও কৌতুহল জন্মালো। সাথে সাথে দেখার, কথা বলার আগ্রহও জন্মালো। আমরা (রূপক ও আমি) সিদ্ধান্ত নিলাম যে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ে ভর্তি হবো বুদ্ধ শিবির দমন করার জন্য।

অপরদিকে প্রসিত বিকাশ খীসাসহ কিছু পাহাড়ী ছাত্র জুম্ম জাতির মুক্তির জন্য লড়ছেন। প্রসিতকে ধনদা হিসেবে রূপক সম্বোধন করতো। তার মুখে ধনদার এতই প্রশংসা শুনেছি যে তাকে একনজর দেখা ও কথা বলার জন্য আগ্রহ বাড়তেই থাকলো। একদিন সেই সুযোগ সৃষ্টি হলো। ধনদাসহ তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমাদের নিউ হোষ্টেলে আসলেন অল্প সময়ের জন্য। খুব সম্ভবতঃ ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) এর একটি প্রোগ্রামে আমরা যেন অংশগ্রহণ করি সেজন্য তারা এসেছিলেন।

পিসিপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমাদের ভিক্টোরিয়া কলেজসহ কুমিল্লার ছাত্রদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তখন কুমিল্লার পাহাড়ী ছাত্রদের 'হিল স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন' নামে একটি সংগঠন ছিল।

উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ভর্তি হলাম চবিতে। ভর্তি প্রক্রিয়া চলাকালীন সময় আমি খুঁজতে থাকি বুদ্ধ শিবিরের অস্তিত্ব। এ বিষয়ে বেশ ক'জন বড় ভাইয়ের সাথেও আলাপ করি। সবাই একবাক্যে বলেন বুদ্ধ শিবির বলতে চবিতে কোন সংগঠন নেই। এটা প্রসিতের দেয় একটি নাম। চবিতে পিসিপি গঠনের আগ পর্যন্ত উপজাতীয় ছাত্র পরিষদ নামে পাহাড়ী ছাত্রছাত্রীদের একটি সংগঠন ছিল। সেই সংগঠন দুটো গ্রুপে বিভক্ত ছিল। একটিতে নেতৃত্ব দিতেন প্রসিত এবং প্রতিপক্ষ গ্রুপের নাম দিতেন বুদ্ধ শিবির। উপজাতীয় ছাত্র পরিষদে নেতৃত্ব নির্ধারণের সময় প্রতি বছর সরাসরি ভোট হতো। সেই ভোটে প্রসিত গ্রুপের বিকোশিতা খীসা (প্রসিতের বোন) ছাড়া অন্য কেউ জিততে পারতো না। আবার সেই সংগঠনের নেতৃত্ব পর্যায়ে কেউ কেউ বুদ্ধ ছাত্র সংসদের সাথে জড়িত ছিল।

পাহাড়ী ছাত্রদের বুদ্ধ ছাত্র সংসদ করার ক্ষেত্রে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার প্রভাব ছিল বলে জানা যায়। তার ভাষ্য মতে কিছু সংখ্যক বড়ুয়া ছেলে বুদ্ধ ছাত্র সংসদের নাম দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে প্রতি বছর মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ করে। সেই টাকা যাতে আত্মসাৎ করতে না পারে এবং সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় সেজন্যে প্রকৃতিবাবু কিছু পাহাড়ী ছাত্রকে বুদ্ধ ছাত্র সংসদ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই সুযোগে প্রসিত প্রতিপক্ষ গ্রুপকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার জন্য এদের নাম দেন বুদ্ধ শিবির। চবিতে একমাস যেতে না যেতেই খবর পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছি। ঢাবিতে ভর্তি হতে গেলে সঞ্চয় চাকমা চবিতে পড়ার পরামর্শ দিলেন। তিনি বলেছিলেন চবিতে নেতৃত্বে পর্যায়ে আমাদের লোক তেমন নেই। তাছাড়া প্রজ্ঞান খীসাও নাকি আমাকে চবিতে রাখতে চায় বলে তিনি জানান। সবশেষে তিনি আমার উপর ছেড়ে দিলেন। তারপরও আমি ঢাবিতে ভর্তি হলাম এবং পিসিপির সাথে, যুক্ত হয়ে গেলাম অধিকতর সক্রিয়ভাবে।

ভর্তি হওয়ার বছরই আমাকে পিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার কার্যকরী কমিটির সদস্য এবং একই বছরে অর্থ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এরপর ঢাকা মহানগর শাখার সহ সাধারণ সম্পাদক ও পরের বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে হয়। অবিভক্ত পিসিপিতে '৯৬ এর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক এবং পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের নামে কিছু নীতিচ্যুত উচ্চাভিলাষী ছাত্র সংগঠন থেকে বের হয়ে যাবার পর সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে হয়। পিসিপির সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিই ২৩ মে ২০০০ সালে।

লংগদু হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ২০ মে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রশিদ হলে গঠিত হয় বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)। পিসিপি গঠিত হওয়ার আগে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক সংগঠন ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপজাতীয় ছাত্র পরিষদ, ঢাকায় ট্রাইবেল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, রাজশাহীতে হিল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, কুমিল্লায় হিল স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন ইত্যাদি। ফলে ভিন্ন পথ ও মতের সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হওয়া পিসিপিতে শুরু থেকে মত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে প্রসিত বিকাশ স্বীসাকে প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করার ক্ষেত্রে চবি থেকে প্রবল আপত্তি করা হয়। তারপরও ধীরাজ চাকমা বাবলি, বিধানদের অনুরোধে প্রথম কমিটিতে রাখা হয়েছে সদস্য হিসেবে। চবির ছাত্রদের যে অভিযোগ তা হলো প্রসিত যেখানে যাবেন সেখানে গ্রুপিং করবেন। তার চরিত্র হচ্ছে সামন্তীয়। তিনি মনে করেন তার মত কেউ বুঝে না। কাজেই তিনি যা বলবেন তাই হবে সিদ্ধান্ত। চবি ছাত্র সংগঠনকে দ্বিধাবিভক্ত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সবচাইতে উল্লেখযোগ্য। চবি ছাত্রদের যে আশংকা ছিল তার প্রতিফলন ঘটাতে প্রসিতের বেশী সময় লাগেনি। খুব দ্রুত তৃতীয় কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভপতির পদটি দখল করে নেন গ্রুপিং-এর মাধ্যমে। গ্রুপিং-এর পাশাপাশি শান্তিবাহিনীর নামে বেশ কয়েকজন ছাত্রকে বেনামী চিঠি প্রদানের মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি দেন, যাতে তারা সংগঠন থেকে সরে যায় এবং প্রসিতকে সভাপতি নির্বাচন করে। ফলে যারা প্রসিতের সমসাময়িক তারা বিতর্কে না গিয়ে নীরবে বেশীর ভাগই ছাত্র সংগঠন ছেড়ে চলে যায়।

নানিয়ারচর গণহত্যা

সংগঠনের অভ্যন্তরে বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হয় ১৯৯৩ সালের ১৭নভেম্বর নানিয়ারচর গণহত্যার পর। এর আগেও ২০ মে ১৯৯২ রাঙ্গামাটিতে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালনের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হলে কিছুটা বিতর্ক ও উত্তেজনা দেখা দেয়। বিশেষ করে প্রসিতের এক জঘন্য মন্তব্যকে নিয়ে। তিনি মন্তব্য করেন 'রাঙ্গামাটির লোকেরা সবাই সুবিধাবাদী, আপোষকামী, সরকারী দালাল। অনেক ঘর পুড়ে গেছে ভাল হয়েছে। এবার বুঝুক বাঙালীরা তাদের বন্ধু নয়।' প্রসিতের এ মন্তব্য রাঙ্গামাটির সচেতন ছাত্র সমাজ সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি, মেনে নিতে পারেননি অভিভাবকরাও। তিনি প্রায়ই মন্তব্য করতেন, 'What Khagrachari thinks today, Rangamati thinks tommorrow', '৯৩-এ নানিয়ারচর গণহত্যার পর সংগঠনের অভ্যন্তরে বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হয় এই কারণে যে, নানিয়ারচর গণহত্যার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনেকাংশে দায়ী প্রসিত এ কথা মনে করতো তৎসময়ে ঢাকাস্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশীর ভাগ সচেতন ছাত্ররা যারা ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানে। ব্যক্তিগতভাবে আমিও মনে করতাম, এখনো করি।

২৭ অক্টোবর '৯৩ নানিয়ারচর শাখার প্রথম কাউন্সিল সম্পন্ন করার জন্য তৎকালীন পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রসিত স্বীসার নেতৃত্বে একদল ছাত্র নেতা নানিয়ারচর যান। ২৮ অক্টোবর কাউন্সিল সম্পন্ন করে রাঙ্গামাটি আসার উদ্দেশ্যে যাত্রী ছাউনিতে চলে আসে সফরকারী টীম। আসার সাথে সাথে প্রসিত যাত্রী ছাউনির বসার জায়গায় পা রেখে উপরে বসে যায়। সেই যাত্রী ছাউনিটি দীর্ঘদিন ধরে অর্ধেক অংশ সেনাবাহিনী চেকপোষ্ট হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। চেকপোষ্টে দায়িত্বরত সেনা সদস্যরা তা মানতে পারেনি। প্রসিতকে সেখান থেকে নেমে ভালভাবে বসার জন্য বলে সেনা সদস্যরা। প্রসিত সেনা সদস্যদের কথায় নিচে না বসে বিতর্কে জড়িয়ে যায়, সাথে সাথে সফরকারী টীমের অন্যান্য সদস্যরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনীর উর্ধতন এক কর্মকর্তা সেখানে এসে যায়। সফর টীমের জন্য নির্ধারিত ট্রলারের হ্যান্ডেলটি উপরে তুলে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী। অবস্থা বেগতিক দেখে নানিয়ারচর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের খবর দেয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের জমায়েত বেশী হয়ে গেলে নিরাপত্তা বেষ্টনী সৃষ্টি করে মিছিল সহকারে প্রসিতকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় এবং প্রসিত রাঙ্গামাটি না গিয়ে মহালছড়ি হয়ে খাগড়াছড়ি চলে আসে। আসার আগে নানিয়ারচর নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দিয়ে আসে তারা যেন যাত্রী ছাউনি সেনামুক্ত করার জন্য কর্মসূচী ঘোষণা করে। পাশাপাশি সেখান থেকে ফোনে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও ঢাকায় জানানো হয় যে, প্রসিতকে নানিয়ারচরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে সেদিনই (২৮ অক্টোবর) বিকালে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। সে মিছিলে পুলিশ সেনাবহিনীর সহযোগিতায় বিনা উস্কানীতে হামলা করে। এতে বেশ কিছু পিসিপি কর্মী আহত ও গ্রেপ্তার হয়। আগের দিন আটককৃত ছাত্রদের মুক্তির দাবীতে ২৯ অক্টোবর ডিসি অফিস ঘেরাও করা হয় এবং পরের দিন ডিসি অফিসের সামনে অবস্থান ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়া হয়। রাতে মাইকিং করতে গেলে পুলিশ মাইক জব্দ করে খানায় নিয়ে যায় এবং সংগঠনের দু'জন কর্মী রিপন চাকমা ও ধর্মজ্যোতি চাকমাকে আটকে রাখে এবং পরে ছেড়ে দেয়। ৩০ অক্টোবর ডিসি অফিসে অবস্থান ধর্মঘট পালনের লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার খেজুর বাগান মাঠ হতে মিছিল শুরু হলে পুলিশ বিনা উস্কানীতে মিছিলে হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পিসিপির কর্মী মারাত্মকভাবে আহত হয়। নানিয়ারচর ও খাগড়াছড়ি ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়। প্রসিত খীসা নভেম্বরের প্রথম দিকে ঢাকায় চলে গেলে নানিয়ারচর ঘটনা ও ভুল তথ্য দিয়ে ফোন করার জন্য ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন। ১৭ নভেম্বর নানিয়ারচরে যাত্রী ছাউনি সেনাযুক্ত করার কর্মসূচীর কথা জানালে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়। তিনি অনেক যুক্তি দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেন কেন সেই কর্মসূচী পালন করা উচিৎ।

পক্ষান্তরে যুক্তি দেয়া হয় নানিয়ারচরের যাত্রী ছাউনি সেনামুক্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম সেনামুক্ত হবে না। তাই আমাদের আন্দোলন নির্দিষ্ট কোন সেনা ছাউনির বিরুদ্ধে নয়, সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেনা ক্যাম্প ও সেনা শাসনের বিরুদ্ধে। তা ছাড়া ২৮ অক্টোবর '৯৩ এর ঘটনা এবং নানিয়ারচর বাজারের অবস্থানগত কারণেও এই কর্মসূচী বাতিল করা উচিৎ বলে অনেকে যুক্তি প্রদান করেন। এছাড়াও ১৭ নভেম্বর বুধবার নানিয়ারচরের বাজার দিন। দূর-দূরান্ত গ্রাম থেকে নিরীহ মানুষ বাজারে আসবে, কোন কারণে সংঘর্ষ বাঁধলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। যুক্তি দেয়ার পরও প্রসিত তার দেয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার পক্ষে নয়। ১৫ নভেম্বর নানিয়ারচর থেকে ফোন করা হয় ঢাকায়। এতে জানানো হয় - নানিয়ারচেরর পরিস্থিতি থমথমে ১৭ তারিখের কর্মসূচী পালন করলে সংঘর্ষ অনিবার্য, সেনাবাহিনী বহিরাগত বাঙালীদের প্রস্তুত রেখেছে হামলার জন্য। টিএনও ইতিমধ্যে নানিয়ারচর থেকে বাড়ীতে চলে গেছেন, ১৭ তারিখের আগে নানিয়ারচরে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। এই পরিস্থিতিতে তারা কর্মসূচী বাতিল করবে কিনা জানতে চান। কিন্তু প্রসিত কোন অবস্থায় বাতিল হবে না বলে জানিয়েছেন। কর্মসূচী পালিত হলো, পিসিপির মিছিলে বহিরাগত বাঙালীরা হামলা করলো। ফলে সংঘর্ষ বেধে যায়। বহিরাগত বাঙালীরা যখন পারছে না তখনই সেনাবাহিনী গুলি চালালো। সেনাবাহিনীর গুলি ও বাহিরাগত বাঙালীদের হামলায় গ্রাম থেকে আসা অনেক নিরীহ পাহাড়ী দিন-দুপুরে মারা গেল। পুড়িয়ে দেয়া হলো পাহাড়ীদের ঘরবাড়ী। দু'একদিনের মধ্যে লেইকের মধ্যে

ভেসে উঠলো একের পর এক পাহাড়ী লাশ। রচিত হয়ে গেলো পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেকটি জঘন্যতম গণহত্যা। সমালোচিত হলেন প্রসিত। সংগঠনের অভ্যন্তরে সমালোচনা-পর্যালোচনা হলেও নানিয়ারচর গণহত্যার প্রতিবাদ সাংগঠনিক উপায়ে অব্যাহত রাখা হয়েছিল। নানিয়ারচর গণহত্যার প্রতিবাদে ৭ ডিসেম্বর '৯৩ ঢাকায় শোক সমাবেশ ও মিছিলের আয়োজন করা হয়, ৯ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-সেনা সদস্যসহ তাদের মদদপুষ্ঠ বহিরাগত বাঙালীদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবীতে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতীক অনশন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

বিজু বর্জন

১৭ মার্চ '৯৪ ঢাবির জগন্নাথ হলের চায়ের দোকানের পাশে বর্তমানে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তিটা যেখানে রয়েছে সেখানে অনানুষ্ঠানিক এক মিটিং-এ নানিয়ারচর গণহত্যা, সেনাবাহিনী ও সরকারের অব্যাহত দমন-পীড়নের প্রতিবাদে বিজু উৎসব বর্জনের প্রস্তাব করেন প্রসিত। সেদিন অনেকে এই বিজু উৎসব বর্জনের বিপক্ষে মত দেয়, অনেকে ভেবে দেখার কথা বলে। কারণ বিজু পাহাড়ীদের এমন একটা উৎসব যা বর্জন করা সহজ নয়। '৯২ সালের ১০ এপ্রিল লোগাং গণহত্যার পর ১৩ এপ্রিল বিজু বর্জনে ছিল জনগণের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। '৯৪-এর বিজু বর্জন নানিয়ারচর গণহত্যার প্রতিবাদে, সেটা সংঘটিত হয়েছিল প্রায় ৬ মাস আগে। ফলে বিজু বর্জন কতটুকু কার্যকরী হবে সেদিন প্রশ্ন উঠেছিল। তাছাড়া '৯৩-এর শেষের দিকে হিন্দু সম্প্রদায় দুর্গা পূজা বর্জনের ডাক দিয়েছিল, কার্যতঃ দুর্গাপূজা বর্জন হয়নি। ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবসমূহ বর্জন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজ নয়। এছাড়াও বিজু উৎসবের প্রক্রিয়া শুরু হয় দু'এক মাস আগে থেকে। বিভিন্ন গ্রামে বিজু উৎসবকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। তাই সেদিন প্রশ্ন উঠেছিল ১৭ মার্চের পরে বিজু বর্জনের ডাক দিলে (বিজুর ২৪/২৫ দিনের আগে) কতটুকু সফল হবে? কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে প্রসিত একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত দিলেন বিজু বর্জন হবে তবে তিন পার্বত্য জেলার নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে। এছাড়াও সিদ্ধান্ত হয় যে, যদি বিজু বর্জন করা হয় তাহলে সেটি হবে পিসিপির উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজু উৎসব আগে যেভাবে পালন করা হতো সেভাবে হবে না, সাধারণ খানাপিনা ঘোরাফিরা চলবে।

'৯১ সালে আমরা যারা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছি তাদের মধ্যেকার একতা-আন্তরিকতার সম্পর্ক ছিল সবচাইতে বেশী। '৯২এর শেষের দিকে আমাদের ব্যাচের সবাই মিলে একটা পিকনিক আয়োজন করে। কিন্তু '৯৩-এ বিভিন্ন সমস্যার কারণে পিকনিক বা পুনর্মিলনী করা সম্ভব হয়নি। ফলে '৯৪-এর বিজুর সময় কেউ গ্রামের বাড়ীতে বা তিন পার্বত্য জেলার কোথাও না গিয়ে এক সাথে বিজুতে ঘুরবো এ ধরনের সিদ্ধান্ত ছিল। ব্যাচের সবাইকে সংগঠিত করাসহ পরিকল্পনা গ্রহণ করার দায়িত্ব ছিল বিপ্লব চাকমা ও জীতেন চাকমার উপর। তারা পরিকল্পনা গ্রহণ করে এভাবে জনপ্রতি ১০০ টাকা করে চাঁদা দেবে সে টাকায় মাইক্রোবাস ভাড়া করা হবে। তৎসময়ে মাইক্রো ভাড়া পেট্রোল ছাড়া দৈনিক ৭০০ টাকা। ৮ এপ্রিল '৯৪ তিন সংগঠনের (পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফ) নামে ঢাকায় একটি লিফলেট বিলি করা হয়। তাতে লেখা হয় 'বিজু সর্বাত্মকভাবে বর্জন করা হবে। খানাপিনা ঘুরাফিরা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয় 'সমস্যায় পড়ে যায় '৯১ ব্যাচের পরিকল্পনা। কারণ ৮ তারিখের আগে তারা অনেকের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেছে এবং মাইক্রো ভাড়াও অগ্রিম দিয়েছে।

১০ এপ্রিল ৯৪ লোগাং গণহত্যা দিবস উপলক্ষে জগন্নাথ হল মাঠ গ্যালারীতে একটি আলোচনা সভা ও স্মরণসভার আয়োজন কর। হয়। স্মরণসভা শেষে বিপ্লব চাকমা ও জীতেন চাকমা তৎসময়ে পিসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদ্বয় সঞ্চয় চাকমা ও দেবাশীষ চাকমার সাথে বিস্তারিত আলাপ করে। তখন তারা বলেছিলেন যে অসুবিধা নেই, তোমরা ঘুরতে পারবে। ফলে বিজুর সময় ৯১ ব্যাচের ৩৪ জনের অধিক ছাত্রছাত্রী দু'টো মাইক্রো বাসে করে ঘুরে বেড়ায়। বিজুর পর পরই শুরু হলো বিতর্ক। এক পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় বলা হলো যারা বিজুতে ঘুরেছে তারা দালাল, জুম্ম জাতির শত্রু। তৎসময়ে ঢাকা মহানগর শাখার অর্থ সম্পাদক চম্পানন চাকমা ও দপ্তর সম্পাদক মনোৎপল চাকমা (বর্তমানে প্রভাষক, মহালছড়ি ফলেঞ্জ) এমন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে যে, উভয়ের মধ্যে মারামারি হওয়ার মতো অবস্থা। তৎসময়ে ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জলিমং মারমা, সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ চাকমা এবং আমি তিনজনে চম্পানন ও মনোৎপলকে ডেকে সমাধান করে দিলাম এবং সবাইকে জানিয়ে দিলাম যে বিজু খাওয়া না খাওয়া নিয়ে আর বিতর্ক বা আলোচনা করা যাবে না। কিন্তু প্রসিত আমাদের সিদ্ধান্তের সাথে একমত না হয়ে বিজু নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একটা আলোচনা সভা আহ্বান করার জন্য ঢাকা মহানগর শাখাকে নির্দেশ দিলেন। আমরা তাকে জানালাম যে বিজু নিয়ে ঢাকা মহানগরে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, এ সময়ে যদি আলোচনা-পর্যালোচনা আহ্বান করা হয় তাহলে বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। তারপরও তিনি আহ্বান করার পক্ষে মত দিলেন এবং যে সমস্যা সৃষ্টি হবে তা তিনি সমাধান করবেন বলে জানালেন।

আমরা ৩০ এপ্রিল '৯৪ বিজু-উত্তর পর্যালোচনা সভা জগন্নাথ হলের টেনিস কক্ষে আহ্বান করলাম। সেখানে শুরু হলো বিতর্ক-সমালোচনা। আমি '৯১ ব্যাচের ও ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে (যারা বিচ্ছু খেয়েছে) বিস্তারিত আলোচনা করলাম এবং বললাম যে বিজু বর্জনের লিফলেট পাওয়ার পরও বিজু খাওয়া আমাদের ঠিক হয়নি (যদিও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের অনুমোদন ছিল), সেজন্যে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। তবে আমরা বিষ্ণু খেয়ে যে ভুল করেছি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি থেকে সদস্য পর্যন্ত অনেকেই সে ভুল করেছেন। কেউ যদি প্রমাণ চান তাহলে আমি তা দিতে প্রস্তুত আছি। কারণ আমরা জানতাম প্রসিও নিজেও বিজু খেয়েছেন, ঘুরেছেন। এছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটির সঞ্চয়, বর্তিকা, বাঞ্ছা, দেবাশীষসহ অনেকেই বিজু খেয়েছেন, ঘুরেছেন

কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে সেদিন কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি যে তারা বিষ্ণু খায়নি, ঘুরেনি। কিন্তু ক্যাহাচিং মারমা যারা বিচ্ছু খেয়েছে তাদেরকে নানা অপবাক্য প্রয়োগ করে সমালোচনা করে। তখন অনেকে প্রশ্ন করেছিলেন বিজু বর্জন সংগঠনের সিদ্ধান্ত নাকি ব্যাক্তি প্রসিতের? সংগঠনের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে তবে কখন সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে? এবং কখন তিন সংগঠনের বৈঠক হয়েছে? কোন সংগঠন থেকে কারা উপস্থিত ছিল? লিফলেট লেখার দায়িত্ব কে

নিয়েছে? সেদিন এত প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, জেলা পরিষদ মেনে যারা স্বাক্ষর করেছে এবং যারা জেলা পরিষদে সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে তাদেরকে আমরা দালাল, সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল বলি। আর প্রসিতের বাবা অনন্ত বিহারী খীসা ৯ দফায় স্বাক্ষরকারী খাগড়াছড়ি জেলার ৩নং ব্যক্তি এবং সে সুবাদে আর্মীদের কাছ থেকে অনেক অনেক সুবিধা নিয়েছেন, তাকে দালাল বলি না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর সেদিন প্রসিত দিতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন এসব প্রশ্ন মাস্তানীসূলভ। কেন তিনি 'মাস্তানীসূলভ' বলেছেন সভা শেষে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার জবাব দেন 'মাস্তানীসুলভ' বলিনি, 'মাষ্টারীসূলভ' বলেছি। অমীমাংসিতভাবে সেদিনের আলোচনা শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ছাত্র সমাজের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষে আবারও আলোচনা সভার আহ্বান করা হয় জগন্নাথ হলের উত্তর বাড়ীর টিভি কক্ষে। সেদিন প্রসিত বা কোন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত থাকেনি। সেদিনও প্রচণ্ড বিতর্ক হয়, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে বিচ্ছু না খাওয়ার লোকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বাকীরা সবাই কোন না কোনভাবে খেয়েছে। সেদিন কাহোচিং মারমাকে অশালীন বক্তব্য রাখার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য ক্যাহাচিং মারমা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল।

৪র্থ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল

১৩-১৫ জুন '৯৪ চট্টগ্রাম 'ওয়াজিউল্লাহ ইনষ্টিটিউটে ৪র্থ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে চবি শাখার সাথে কেন্দ্রীয় কমিটির বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়। চবি শাখার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকের তালিকা দেয়া হলে কেন্দ্রীয় কমিটি দু'জন পর্যবেক্ষকের নাম পরিবর্তন করে দেয় এবং প্রতিনিধি সুখেশ্বর চাকমা পল্টু, তৎকালীন চবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক'কে হলে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। কেন্দ্রীয় কমিটির এই সিদ্ধান্ত চবি শাখা মানতে পারেনি। তারা তাদের দেয়া তালিকা মোতাবেক প্রতিনিধি পর্যবেক্ষক রাখার দাবী জানালে কেন্দ্রীয় কমিটি তা নাখোশ করে দেয়। প্রতিনিধি হিসেবে না নেয়ার কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে পল্টুকে বলা হয় সে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে রাঙ্গামাটিতে বিজু উদযাপন করার জন্য যে র‍্যালীর আয়োজন করা হয়েছে তার প্রচারণার কাজে (মাইকিং) জড়িত ছিল। সে কারণে তাকে প্রতিনিধি করা যাবে না। এ খবর চবিতে ছড়িয়ে পড়লে পরের দিন ১৪ জুন সেখান থেকে ৫০/৬০ তান ছাত্র ওয়াজিউল্লাহ ইনষ্টিটিউটে এসে কেন্দ্রীয় কমিটিকে তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পল্টুকে প্রতিনিধি করার জোর দাবী জানায় এবং তা নিয়ে জনৈক কেন্দ্রীয় নেতার সাথে তুমুল বিতর্ক চলে। ফলে একটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সে সময় প্রসিত চক্রের পক্ষ থেকে সুক্ষ্মভাবে প্রতিনিধিদেরকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, চবি থেকে দালাল প্রতিক্রিয়াশীল কিছু ছাত্র এসেছে যে কোন মুহুর্তে মারামারি হতে পারে। ১৪ জুনের শেষ অধিবেশনে রাত প্রায় সাড়ে ৮টায় পল্টুর লিখিত একটি আবেদনপত্র কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে তৎকালীন সভাপতি প্রসিত খীসা পড়ে শোনান। সে লিখেছিল চবি শাখার প্রতিনিধি হয়েও তাকে কেন কেন্দ্রীয় কমিটি কাউন্সিলে ঢুকতে দিল না তার কারণ ব্যাখ্যা করে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য যেন সুযোগ দেয়া হয়। সেই সময়ে বিভিন্ন শাখার সাংগঠনিক রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা চলছিল। প্রসিত বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করবেন কিনা মতামত জানতে চাইলেন। তিনি এভাবে বলেছিলেন-'এখন শাখাসমূহের সাংগঠনিক রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা চলছে এই  মুহুর্তে পল্টুর বিষয়টা আলোচনা করা যায় কিনা? তবে কেন্দ্রীয় কমিটি এই মুহুর্তে আলোচনা করার পক্ষপাতি নয়।'

তৎসময়ে সংগঠনের অবস্থা এমন ছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখাগুলো বাদে অন্যান্য শাখাগুলো কেন্দ্রীয় কমিটির মতের বিপক্ষে একটা বাক্যও উচ্চারণ করতে চাইতো না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা থেকে বেশ কয়েকজন আলোচনা করার পক্ষে মত দেন। ব্যক্তিগতভাবে আমিও তখন বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার পক্ষে।

ছিলাম। কারণ দ্বিতীয় দিনের শেষ অধিবেশনে যদি বিষয়টা নিষ্পত্তি না হয় তাহলে শেষ দিন (তৃতীয় দিন) পর্যন্ত চবি শাখার একজন প্রতিনিধি কম হবে। তাই আমি বিষয়টা নিষ্পত্তি করে হয় তাকে না হয় অন্য আরেকজন প্রতিনিধি নির্বাচন করার পক্ষে মতামত রেখেছিলাম। যেহেতু সেই মুহুর্তে কেন্দ্রীয় কমিটি আলোচনার পক্ষে নয় সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় শাখাসমূহ বাদে সবাই আলোচনার বিপক্ষে। কণ্ঠভোটে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে মত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার সাথে সাথে চবি শাখার নেতৃবৃন্দসহ ঢাকা ও রাজশাহী বেশীর ভাগ নেতৃবৃন্দ হল থেকে বের হয়ে যায় এবং সেই সময় দরজায় একটা বড় শব্দ হয়। ঠিক তখনই হলের ভিতর থেকে প্রসিত চক্রের কিছু উচ্ছৃংখল কর্মী উত্তেজিত হয়ে 'ধর ধর' বলে চিৎকার করে উঠে এবং চেয়ার হাতে দরজার দিকে যেতে চেষ্টা করে। বেশীর ভাগ প্রতিনিধি পর্যবেক্ষক নিজ আসনে বসেছিল। ফলে উচ্ছৃংখল কর্মীদের পক্ষে দরজার বাইরে গিয়ে মারামারি করা সম্ভব হয়নি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ছাত্র রাজনীতি আর করবো না। কারণ আমরা যারা প্রতিনিধি পর্যবেক্ষক হয়ে হলে ছিলাম তারা সবাই বিভিন্ন শাখার নেতৃস্থানীয়। যারা 'ধর ধর' বলছে তারা সংগঠনের কোন না কোন শাখার নেতা এবং যাদেরকে ধরতে বলছে তারাও কোন না কোন শাখার নেতা। আমরা যদি নিজেরা 'ধর ধর, মার মার' করি, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ কি হবে? এসব ভেবে সংগঠনের পদ থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু সেই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না কার কাছে পদত্যাগপত্র দেবো ঢাকার মহানগর শাখার নাকি কেন্দ্রীয় কমিটির বরাবরে। সেটা জানার জন্য একজন স্বেচ্ছাসেবককে তৎকালীন সভাপতি প্রসিত খীসার কাছে পাঠালাম। উত্তরে তিনি জানালেন আমাকে কেউ কিছু করবে না, আমি যেন হল ত্যাগ না করি। এ তথ্য পেয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকের বরাবরে দু'টি পদত্যাগ পত্র দিয়ে সেদিন রাতে ঢাকায় চলে গেলাম। পল্টুর বিষয়টা অমীমাংসিত রেখে কাউন্সিল সমাপ্ত হয়।

সদ্য বিদায় নেয়া সভাপতি প্রসিত খীসা ও নব নির্বাচিত সভাপতি কে এস মং মারমার নেতৃত্বে কাউন্সিল শেষ হওয়ার পরপরই একটা টীম চবিতে যায়। সেখানে কর্মী সভা করার চেষ্টা করলে সফরকারী কেন্দ্রীয় টীমকে অপদস্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। কাউন্সিলের ঘটনা এবং চবিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অপদস্থ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীঘিনালার বাবুছড়ায় তৎকালীন চবি শাখার সহ সভাপতি রিপন চাকমাকে (বর্তমানে ফ্রান্সে) মারধর করা হয়। তার জের ধরে প্রসিতের অনুসারী চবি হাত্র জ্ঞান জ্যোতি চাকমাসহ দু'জনকে মারধর করা হয় ক্যাম্পাসে।

প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে মারধর

২০ মে '৯৫ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আলোচনা সভা চলাকালীন সময়ে খাগড়াছড়ির খেজুর বাগান মাঠে চবি শাখার প্রতিনিধি (গ্রামের বাড়ী বাঘাইছড়ি) রাজীব চাকমাকে (বর্তমানে প্রভাষক, দীঘিনালা কলেজ) মারধর করে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্র দীলিপ চাকমা ও চবি ছাত্র রমেশ দেওয়ানের নেতৃত্বে স্কুল-কলেজে পড়ুয়া বাঘাইছড়ি শাখার ছাত্ররা রাজীবকে মারধর করে। তাদের কাছ থেকে রাজীব চাকমাকে জামিন নেয় তৎকালীন খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা। রাতে আমি আমার বড় বোনের বাসায় মধুপুরে ছিলাম। সকালে চবির ছাত্রনেতা সুগতদর্শী চাকমা (বর্তমান প্রভাষক, দীঘিনালা কলেজ) আমাকে ডাকতে যায়। সে বলল রাজীবকে বাঘাইছড়ির ছাত্ররা নিয়ে যাবে এবং নিয়ে গেলে তাকে মেরে ফেলবে। মনটা খুবই খারাপ হলো, রাজীব আমার বন্ধু। একই ব্যাচে চবিতে ভর্তি হয়েছি। মানুষ হিসেবে রাজীবকে খারাপ বলার কোন যুক্তি নেই। সুগতদর্শী কথাটা বলার সাথে সাথে আমি তৈরী হয়ে তার সাথে যাত্রা করলাম। উদ্দেশ্য যেভাবে হোক রাজীবকে নিতে না দেয়া। প্রথমে গেলাম উন্নয়ন বোর্ডের কোয়ার্টারে এমং চাকের কাছে। এমংসহ চলে গেলাম খবংপয্যায় যেখান থেকে বাজীবকে নিয়ে যাবে। সেখানে গিয়ে দেখা হয় উজ্জ্বল স্মৃতির সাথে। উজ্জ্বল স্মৃতিও বন্ধু মানুষ। তাকে জিজ্ঞেস করলাম রাজীব কোথায়? সে বলল রাজীব রাতে পালিয়ে গেছে (মনে মনে বললাম ভালো হয়েছে প্রাণে বেঁচে গেছে)। বাঘাইছড়ির ছাত্ররা নাকি উজ্জ্বলকে চোখ রাঙিয়ে চলে গেছে রাজীবকে না পেয়ে। তাকে বললাম যারা চোখ রাঙিয়ে গেল তারা কারা, আর তুমিই বা কে? বাঘাইছড়ির থানা শাখার কর্মী হয়ে যদি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদককে চোখ রাঙিয়ে যেতে পারে তাহলে তুমি কি নেতা হলে? তোমার জেলার সাধারণ সম্পাদকের পদটা চেঙ্গী নদীর ওপারে ফেলে দাও। এসব বিষয়ে তার সাথে বেশ কিছু আলোচনা করে আমরা চলে গেলাম মধুপুরে।

দীর্ঘদিন খাগড়াছড়িতে ছিলাম, ৪ জুন ঢাকায় গিয়ে শুনি পরিস্থিতি অনেক দূর চলে গেছে। এরমধ্যে ৩০ মে '৯৫ সন্ধ্যায় জাবি ছাত্র দীলিপকে রাজীবের বন্ধুরা (আমারও বন্ধু) জাবি ক্যাম্পাসে মারধর করেছে। তার মাথা ফেটে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তার এক শিক্ষক সেই মুহুর্তে সেখানে না পৌঁছলে তার অবস্থা আরো খারাপ হতে পারতো। বন্ধুরা এত ক্ষিপ্ত হওয়ার পেছেনে কারণ হলো রাজীবের মারাত্মক আহত হওয়া। এমনভাবে রাজীবকে মারধর করা হয়েছে কয়েকদিন পর্যন্ত তাকে বিছানা থেকে ধরে তুলতে নামাতে হয়েছে। শরীরের কয়েক জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। সুস্থ হতে পারবে কি পারবে না নিশ্চয়তা ছিল না। রাজীবের সুভাগ্য বলতে হবে সে সুস্থ হয়ে এখন দীঘিনালা কলেজে অংক বিষয়ে পড়ায়।

পরে খবর নিয়ে জানা যায়, রাজীবকে মারার পেছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি কারণ ছিল উল্লেখযোগ্য। '৯৪ এর বিজু বর্জনের পর চবি'র ক্যাফেটোরিয়ায় বিজু-উত্তর পর্যালোচনা সভা করা হয়। সেখানে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে সঞ্চয় চাকমা উপস্থিত ছিলেন। সেই পর্যালোচনা সভায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে রাজীব বলেছিল যে, প্রকৃত দালাল ও সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নেতাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। প্রসিতের বাবা একজন প্রকৃত দালাল ও সুবিধাবাদী হয়েও তাকে সেভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না। কারণ প্রসিডের বাবা হলেন '৮৯ সালের ৯ দফায় স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে তিন নম্বর ব্যক্তি। সেই সুবাদে তিনি আর্মীদের কাছ থেকে অনেক সুবিধা নিয়েছেন। খাগড়াছড়ি বাজারের অনেক প্লট নিজের নামে করেছেন। তা ছাড়া আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে যেটা বিরোধিতা করি সেই চাকমা উন্নয়ন সংসদ গঠন করে এবং সভাপতির পদ গ্রহণ করে আর্মীদের দালালীপনা করেছেন। কারণ এসব সংগঠন সরকারের 'ভাগ করো শাসন করো' নীতির অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী গঠন করে দেয়।

ঘটনার পরের দিন ২১ মে রমেশ দেওয়ানের নেতৃত্বে খবংপয্যার অনিল চাকমার বাড়ীতে (যে বাড়ীতে রাজীব ছিল) তল্লাসী চালায় এবং অশোভন আচরণ করে। ঘটনার ২/৩ দিন পর রাজীবের বাবা-মার কাছ থেকে লিখিতভাবে অঙ্গীকার নেয়া হয় যে, তিন দিনের মধ্যে রাজীবকে প্রসিত চক্রের হাতে হস্তান্তর করতে হবে। অন্যথায় রাজীবের বাবার স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। তিনদিন পর রাজীবের বাবা বলেন যে তার পক্ষে রাজীবকে হাজির করে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ রাজীব বর্তমানে তার অবাধ্য। তখন রাজীবের বাবার কাছ অঙ্গীকার নেয়া হয় যে, আমার ছেলে দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কাজ করছে। কাজেই তাকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে হত্যা করলে আমার কোন আপত্তি বা দাবী দাওয়া নেই। একই মাসে তৎকালীন চবি ছাত্র বিতাংশু চাকমা (বর্তমানে প্রভাষক, দীঘিনালা কলেজ) সন্ধ্যায় মিলনপুর বেড়াতে গেলে প্রিয় সম্পদ চাকমার নেতৃত্বে ঘেরাও করা হয়। বিতাংশু চাকমা খাগড়াছড়ির স্থানীয় ছেলে হওয়ায় তিনিও পাল্টা হুমকি দেন। ফলে প্রিয় সম্পদরা ভয়ে পালিয়ে যায়। এরপর আরেকবার রাতে বিতাংশুকে বাড়ীতে ঘেরাও করে প্রসিত চক্র। সে সময়ে সে বাড়ীতে ছিল না।

এসব ঘটনার পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ছাত্রদের একটা তালিকা তৈরী করে প্রসিত চক্র। প্রত্যেকটি থানা শাখায় পাঠিয়ে দেয়া হয় সে তালিকা এবং নির্দেশ দেয়া হয় যে সংশ্লিষ্ট শাখা যেন তালিকাভুক্ত পরিবারে হুমকি দিয়ে আসে। তাছাড়াও এসব ছাত্রদেরকে গ্রামে গেলে যাতে বিনা আঘাতে ছেড়ে দেয়া না হয় তার নির্দেশ দেয়া হয়। এই নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে আমার গ্রামের বাড়ীতে হুমকি দেয়া হয়েছে ২৩ জুন'৯৫। হুমকি দেয়া হয়েছে বঙ্গরত্ন চাকমা (বর্তমানে লেদার ইঞ্জিনিয়ার), বিপ্লবসহ ১০/১২ জনের বাড়ীতে।

এরমধ্যে মনোৎপল চাকমা (বর্তমানে প্রভাষক, মহালছড়ি কলেজ) জন্ডিসে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য গ্রামের বাড়ী পানছড়িতে যায়। যাওয়ার ২/১ দিন পর খাগড়াছড়ি থেকে প্রসিত চক্রের দুই ট্যাক্সী সন্ত্রাসী পানছড়ি পিসিপি অফিসে (পানছড়ি বাজারের ক্লাব) যায়। সেখান থেকে এক সন্ত্রাসী পানছড়ির এক ছাত্রকে নিয়ে মনোৎপলের বাড়ীতে গিয়ে তাকে বলে যে, বড় ভাইয়েরা তাকে ক্লাবে যেতে বলেছে। মনোৎপল জানায় সে জন্ডিসে আক্রান্ত। প্রয়োজন থাকলে তাদের বাড়ীতে গিয়ে কথা বলার জন্য। এরপরই তারা ক্লাবে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়ে যায় এবং অর্ধেক রাস্তা থেকে পানছড়ির ছেলেটা মনোৎপলের বাড়ীতে ফিরে এসে তাকে বলে যে, খাগড়াছড়ি থেকে ১০ জন ছাত্র এসেছে আপনাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাদের গতিবিধি খুব বেশী ভাল নয়। বরং আপনি অন্যত্র চলে যান। ছেলেরা ক্লাবে ফিরে যাওয়ার পর বাকিরা ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং মনোৎপলের বাড়ী ঘেরাও করে। ঘেরাও করার আগেই মনোৎপল অন্যত্র চলে যায়। মনোৎপলকে না পেয়ে উচ্ছৃংখল ছেলেরা তার বাবা মাকে নির্দেশ দিয়ে আসে যে, পরের দিন বেলা ১টার মধ্যে

খাগড়াছড়ির হোয়াং বই-ও বা'তে যেন মনোৎপলকে হাজির করে দেয়া হয়। মনোৎপল বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। ফলে মনোৎপলকে পানছড়ি থেকে পায়ে হেঁটে ফেনী-তবলছড়ি হয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয় তার মা-বাবা এবং মনোৎপলকে ছাড়া তার মা ও তার ভগ্নিপতি দুপুর ১২টায় হোয়াং বই-ও বাতে হাজির হয়। তাদেরকে সেখানে এক চেয়ারে ১০ ঘন্টা (রাত ১০টা পর্যন্ত) আটকে রেখে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।

এর পরপরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সচেতন ছাত্র সমাজ একমত হয় যে, প্রসিত চক্রকে অবশ্যই হটাতে হবে, পদ্ধতিগতভাবে সংগঠন থেকে বের করে দিতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজশাহী মহানগর শাখা থেকে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে প্রসিত চক্রকে হটিয়ে সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন সন্তোষ বিকাশ খীসা (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, নানিয়ারচর কলেজ)।

ঢাকা মহানগর কাউন্সিল

২৩ জুন '৯৫ ঢাকা মহানগর শাখার মহানগর শাখার কাউন্সিল জগন্নাথ হলের দক্ষিণ বাড়ীর টিভি কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলের একদিন আগে জগন্নাথ হলের পূর্ব বাড়ীর ছাদে ঢাকাস্থ বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেলে পড়া ছাত্রছাত্রী প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বিরাট মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিটিংয়ে প্রসিত চক্র জাতীয় মুক্তির বিপক্ষে কাজ করে চলেছে বলে মত প্রকাশ করা হয়। কাজেই তাদেরকে সংগঠনের কোন প্রকার পদ দেয়া যাবে না। কাউন্সিলের দিনে বড় ধরনের অনাকাংখিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বাসাবো এলাকা থেকে আগত ৪০/৪৫জন ছাত্রকে কাউন্সিলর করা হয়নি, তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। অপরদিকে একই এলাকা থেকে আসা প্রসিতের অনুসারীদের কাউন্সিলর করা হয়েছে। এ বিষয়টা নিয়ে হলের বাইরে তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা দেবাশীষ চাকমার (বর্তমানে আমেরিকায়) সাথে বাসাবো এলাকার ছাত্র নেতা জিকো চাকমার (বর্তমানে প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার) তর্কাতর্কি ও হাতাহাতি হয়। এক পর্যায়ে দেবাশীষ চাকমা আনারস বিক্রেতার চাকু দিয়ে জিকোকে আঘাত করতে চেষ্টা করলে জিকো তা ধরে ফেলে। ফলে তার হাতের কয়েকটা আঙ্গুল কিছুটা কেটে যায়। এক পর্যায়ে দেবাশীষ জগন্নাথ হলের মাষ্টানদের দিয়ে জিকোকে হলের দক্ষিণ বাড়ীতে ধরে নিয়ে যায়। একটা রুমে আটকে রেখে তাকে মারধর করা হয়, তার গলার চেইন, পরনের গেঞ্জী ও মানিব্যাগ কেড়ে নেয় মাষ্টানরা। খবর পেয়ে ছাত্ররা তাকে উদ্ধার করতে যায়। তারা রুমের কাছাকাছি পৌঁছলে মাষ্টানরা তাকে ছেড়ে দেয়। বাসাবো এলাকার ছাত্ররা বাদেও প্রায় ৩০০-এর মতো প্রতিনিধি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। প্রসিতের পক্ষে মংসানু মারমা (বর্তমানে আমেরিকায়) সভাপতি প্রস্তাব করা হলে প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে পলাশ খীসাকে সভাপতি পদে প্রস্তাব করা হয়। এভাবে ২১টি পদের মধ্যে ১৭টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। পলাশ খীসার নেতৃত্বে প্রসিত বিরোধী প্যানেল বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হলে বিজয়ী কমিটিকে শপথবাক্য পাঠ করান তৎকালীন সভাপতি কে এস মং মারমা।

ঢাকা মহানগর শাখার কাউন্সিলের পরপরই সমীরণ চাকমা সচিব চাকমাকে একটি চিঠির মাধ্যমে জানায় কে এস মং এর বিশ্বাসঘাতকতা ও সঞ্চয়ের নির্লিপ্ততার কারণে ঢাকা মহানগর শাখা হাত ছাড়া হয়ে গেছে। ঢাকা এবং রাজশাহীতে পূর্ণ প্যানেলে প্রসিত   চক্র হেরে যাওয়ায় তারা ভোটে যেতে চায় না। সে কারণে চবি শাখার কাউন্সিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলেও কেন্দ্রীয় কমিটি তা গ্রহণ করে না। ফলে কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে চবি শাখার সাথে কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকবার আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বাক-বিতন্ডা হয়।

একদিকে সচেতন ছাত্র সমাজের অব্যাহত প্রচেষ্টা ও অন্যদিকে ১৫ জুন '৯৫ দুদুকছড়ায় এক প্রকাশ্য জন সমাবেশে জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রসিত বিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। তিনি বলেন 'হঠকারী কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে। রিক্সার পাম্প ছেড়ে, গুলতি মেরে, সামাজিক বিশৃংখলা সৃষ্টি করে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।' লিডারের এই ঐতিহাসিক বক্তব্য এবং একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখাসমূহ হাত ছাড়া হওয়ায় প্রসিত চক্র বুঝতে পারে তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে এবং সেই প্রতিক্রিয়া (প্রসিত বিরোধী জনমত) ছড়িয়ে যাচ্ছে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রিত শাখা দিয়ে বিরোধী শক্তিকে দমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রসিত চক্র। নানিয়ারচর শাখার তৎকালীন সভাপতি জ্যোতি লাল চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৮ জুলাই '৯৫ এক সভা থেকে তৎকালীন রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি সন্তোষ বিকাশ খীসা, চবি শাখার অর্থ সম্পাদক সমর বিজয় চাকমা (বর্তমানে Task Force একাউন্টেন্ট, ব্রাক), রাজশাহী মহানগর শাখার সদস্য তোষণ চাকমা (বর্তমানে আইনজীবি) ও তৎকালীন নানিয়ারচর শাখার দপ্তর সম্পাদক সতীশ চন্দ্র চাকমাকে (৬ নভেম্বর ২০০০ চুক্তি বিরোধী সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করে) মারধর করা হয়।

বর্মাছড়ি সমাবেশ

বর্মাছড়ি বাজারে একটি সমাবেশ আহ্বান করা হয় ৬ অক্টোবর '৯৫। বর্মাছড়ির নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে কে কে যেতে পারবেন জানার জন্য ঢাকায় যান। সে সময় কেন্দ্রীয় দপ্তরে কেন্দ্রীয় কমিটির দীপ্তি শংকর চাকমা বাদে কেউ ছিল না। তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি কেন্দ্রীয় দপ্তরে গেলে বর্মাছড়ির নেতৃবৃন্দের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং অনুরোধ করেন ৬ অক্টোবরের বর্মাছড়ির সমাবেশে আমি যাতে অংশগ্রহণ করি। আমার ৫ তারিখ একটি পরীক্ষা ছিল। তারপরও দীপ্তি শংকর ও বর্মাছড়ির নেতৃবৃন্দের অনুরোধে রাজী হয়ে বললাম আমরা দু'জন যাবো। কিভাবে যেতে হবে তা জেনে নিলাম। ৫ অক্টোবর পরীক্ষা শেষ করে জিতেন চাকমা (তৎকালীন ঢাকা মহানগরের সহ সাধারণ সম্পাদক) ও আমি বর্মাছড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। আমরা যখন চবির হাসান অতিথি ভবনে পৌঁছলাম তখন রাত ১১টা ১৫ মিনিট। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। রাত যতই গভীর হচ্ছে ততই বৃষ্টির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। খুব ভোরে আমরা যখন যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তখনও বৃষ্টি থামেনি। তারপরও করার কিছু নেই, নির্ধারিত প্রোগ্রাম কোন অবস্থায় বাদ দেয়া যাবে না। তাই বৃষ্টি হলেও আমরা যেতে শুরু করি। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি বাসে উঠে নাজিরহাট ঝুমুর সিনেমা হলে নেমে সেখান থেকে বেবী ট্যাক্সীতে নানুপুর চলে গেলাম। নানুপুরে প্রায় দু'ঘন্টা 'অপেক্ষা করার পর একটা জীপে (চাঁদের গাড়ী) করে খিরাম পর্যন্ত গেলাম। রাস্ত াগুলো এতই খারাপ যে মাঝে মধ্যে নামতে হতো। খিরাম থেকে হেঁটে বর্মাছড়ি বাজার যেতে হবে (প্রায় এক ঘন্টার রাস্তা)। হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে মাইকের আওয়াজ শোনা গেল। ঘোষক বলছে কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের সমাবেশ শুরু হবে, আমাদের মাঝে

উপস্থিত রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক নিকোলাষ চাকমা, ঢাকা মহানগর শাখার প্রাক্তন অর্থ সম্পাদক চম্পানন চাকমা, ঢাবি ছাত্র মিল্টন চাকমা, আরও উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি ইত্যাদি ইত্যাদি....। কিন্তু আমরা যে যাবো তা ঘোষক বলছে না। আমরা বলাবলি করছি নিকোলাষ কোন না কোনভাবে সমস্যা সৃষ্টি করে রেখেছে। তা না হলে আমাদের নাম তো ঘোষকের হাতে থাকার কথা। তখন প্রায় ১টা বাজে আমরা সমাবেশ স্থলে পৌঁছি। সেখানে গিয়ে আমাদের ধারণা সত্যে পরিণত হলো। আমাদের সাথে কেউ কথা বলছে না, কেউ সৌজন্যতাও দেখালো না। যারা বার বার অনুরোধ করেছে (ঢাকায়) সমাবেশে আসার জন্য তারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের কাছাকাছি। কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করছে। যেখানে সমাবেশ হবে তার দক্ষিণ পূর্ব সাইডে গাছের ছায়ায় কিছু লোক (দেখে নেতা মনে হলো) দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমরা সেখানে গেলাম, হাত বাড়িয়ে আমাদের পরিচয় দিলাম। তারাও খুশী হয়ে তাদের পরিচয় দিলো। একজন কাউখালী থানা শাখার সহ সভাপতি প্রদীপ চাকমা। তিনি খুবই আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের সাথে আলাপ করলেন। তাদের শাখার সাথে গাছ ব্যবসায়ীদের একটা সমস্যার কথা বললেন এবং আমরা যাতে কেন্দ্রীয় কমিটির নিকোলাষসহ গিয়ে সমাধা করে দিয়ে আসি তারও অনুরোধ জানালেন। আমরা বললাম ঠিক আছে নিকোলাষের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। আমরা জানতাম নিকোলাষ কোনদিন আমাদের নিতে চাইবে না। কারণ আমরা গেলে তার দুর্বলতাগুলো ধরা পড়বে। এক পর্যায়ে নিকোলাষ এসে বলল এন্ট্রি করেছি কিনা? তার কথায় আমরা আমাদের নাম ও পদবীসহ জমা দিলাম। জমা দেয়ার পর একবার আমাদের নাম মাইকে ঘোষণা করা হলো। এরপর মিছিল শুরু হলো। আমরাও মিছিলে যোগ দিলাম। মিছিলের পর সবাই (প্রদীপ বাদে) মঞ্চে উঠে গেল, আমাদের কেউ ডাকলো না। আমি প্রদীপকে বললাম চল আমরাও মঞ্চে যায়। মঞ্চে গিয়ে বক্তব্য শুরু হলো। মিল্টন, চম্পাননসহ সবাই বক্তব্য রাখলো কিন্তু ঢাকা মহানগরের সহ সাধারণ সম্পাদক হয়েও জিতেন চাকমাকে বক্তব্য দিতে দেয়া হলো না।

আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর জিতেন বলল- প্রতিবাদ করি। আমি বললাম এখানে নয়, ঢাকায় গিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে লিখিত আকারে জানাবো। এমন সময় আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করলেন ভাত খেয়েছি কিনা? তাকে বললাম ভোরে চবিতে নাস্তা করেছি, খুব বেশী ক্ষিদে নেই (যদিও ২/৩ ঘন্টা আগে থেকে ক্ষিদে শুরু হয়ে গ্যাষ্টিকের অসহ্য যন্ত্রণায় ভিতরে ভিতরে জ্বলে যাচ্ছি)। সমাবেশের পরে ভাত খেয়ে এসে শুনি প্রদীপবাবুর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা। তিনি বলেন নিকোলাষ'দা আজ আমাদের কাউখালী পৌঁছতে অনেক রাত হবে, রাস্তাগুলো খারাপ, সরু পথে যেতে হবে, পথে জোকের উপদ্রব বেশী। নিকোলাষ বলল দেশ-জাতের স্বার্থে সবকিছু করতে হবে। কথাগুলো আমাদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে এটা স্পষ্ট বুঝা যায়। নিকোলাষ আমাদের বলল তোমরা থাকবে নাকি চলে যাবে? আমি বললাম যাওয়ার মতো অবস্থা থাকলে চলে যেতাম। রাস্তায় গাড়ী পাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নেই, পথে কোন পাহাড়ী ঘর বা গ্রামও নেই যে অর্ধেক রাস্তায় থাকা যাবে। তাই এখানেই থাকতে হবে। হাজার হোক এই পাহাড়ীরা তো বাঙালীদের চাইতে খারাপ হবে না। এরপর সবাই হাটা শুরু করলাম। বর্মাছড়ি বাজার থেকে যেতে প্রথম যে পাহাড়ী গ্রামটা ছিল সে গ্রামে রবি চেয়ারম্যানের বাসায় আমাদেরকে নিয়ে যাবার জন্য একজন ছাত্রকে দায়িত্ব দেয়া হলো। সে একমাত্র ছেলে যে সেই গ্রাম থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে বা দেবে। ছেলেটাকে বলা হলো সে যেন নিকোলাধদের জুতাগুলো নিয়ে যায়। আমাদেরকে যে বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে বাড়ীতে নিকোলাষরা তার আগের রাতে ছিল এবং জুতাগুলো রেখে গিয়েছিল। রাতে ছেলেটাকে বেড়াতে আসার জন্য বলেছিলাম। রাতে তার সাথে কথার এক পর্যায়ে জিজ্ঞাসা করলাম সে জুতাগুলো কখন দিয়ে আসবে, কারণ তারা সেদিন রাতে চলে যাবার কথা বলেছিল। ছেলেটি বলল আগামীকাল সকাল ১০টায় একটা কর্মী সভা আছে, তখন নিয়ে যাবো। এরপর সে জানতে চাইলো আমরা যাবো কিনা কর্মী সভায়? আমরা যা বুঝার বুঝেই তাকে বললাম আমাদের কিছু কাজ আছে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। সকালে এখান থেকে ঢাকায় চলে যাবো। আমরা যাতে কর্মী সভায় থাকতে না পারি সে কারণে নিকোলাষরা আমাদেরকে মিথ্যে বলেছিল যে তারা রাতে কাউখালী চলে যাবে।

ঢাকায় ফিরে আমি টিএসসি'র দিকে যাওয়ার পথে জগন্নাথ হলের উত্তর গেইটে বড় ভাই প্রবীন খীসা তাতু (পিসিপি দলীয় পতাকার ডিজাইনার এবং বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ার), বাঞ্ছানিধি খীসা, দীপেন চাকমা (উন্নয়ন বোর্ডের কর্মরত) সহ দু'এক জনের সাথে দেখা হয়। আমার সাথে কথা আছে বলে তারা আমাকে জগন্নাথ হলের মাঠের দোকানগুলোতে নিয়ে আসে। টেনিস মাঠের উত্তর দিকে বসে চা খাচ্ছিলাম, সূর্য ডুবে গেছে, সন্ধ্যা হয়েছে। ঠিক সেই সময় টেনিস মাঠের দক্ষিণ সাইডে গাছের নীচে মারামারি হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না কাকে কে মারছে। কারণ হলে সেই সময়ে ছাত্র লীগের দু'টো গ্রুপের মধ্যে প্রায় মারামারি হতো। একজনকে মারতে মারতে মাঠের মাঝখানে নিয়ে এসেছে। যে মার খাচ্ছে সে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। আমি উঠে গেলাম। মাঠে নাস্তা খাওয়া ছাত্ররাও উঠে বাঁচাতে গেলো। ফলে যারা মারছে তারা দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। গিয়ে দেখি সে ছাত্রলীগের কেউ নয়, আমাদের পাহাড়ী ছেলে চম্পানন চাকমা। আমরা যেখানে বসেছিলাম তাকে সেখানে নিয়ে আসলাম। মুখের কয়েকটা জায়গায় ফুলে গেছে। কে মেরেছে জিজ্ঞাসা করলে সে নাম জানে না বলল, তবে চেহারা চেনে। ট্রাইবেল হোস্টেলে থাকে ছেলেগুলো। তাকে কেমন আছেন বলে হ্যান্ডসেক করার পর আমাদের সিটগুলো হারিয়েছি তোমাকেও ছাড়বো না বলে তাকে মারতে শুরু করল। চম্পাননকে নিয়ে হলের রুমে রুমে এবং আশেপাশে ছেলেগুলোকে খুঁজলাম। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। তাকে নিয়ে নীলক্ষেতে ডাক্তারের কাছে গেলাম। হলে এসে দেখি চোখের পাশে বড় করে ফুলে যাচ্ছে। খুব কষ্ট পাচ্ছে সে। তখন আমাদের তৎকালীন ঢাকা মহানগর শাখার সহ সভাপতি বঙ্গরত্ন চাকমা তাকে নিয়ে আবারও ডাক্তারের কাছে যায়। পরে জানলাম চম্পানমকে যারা মেরেছে তারা পাহাড়ী হোষ্টেলের ছাত্র ছিল এবং চম্পাননের কারণে তারা তাদের সিটগুলো হারিয়েছে। ফলে প্রতিশোধ হিসেবে চম্পাননকে মেরেছে তারা। কোন রাজনৈতিক কারণ সেখানে ছিল না। রাতে জরুরী ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর শাখার সভা আহ্বান করলাম। মিটিংয়ে বর্মাছড়িতে মহানগর নেতৃবৃন্দকে অবমাননা করা, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক নিকোলাষ চাকমার অসৌজন্যমূলক আচরণ ও মিথ্যা কথা বলা এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির বরাবরে লিখিতভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু জানানোর পরেও তার কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

ঢাকায় নবীনবরণ

১২ ডিসেম্বর '৯৫ ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে ঢাকাস্থ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভর্তি হওয়া পাহাড়ী ছাত্রছাত্রীদের বরণ করে নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রধান অতিথি ঢাবি তৎকালীন উপাচার্য এমাজউদ্দিন আহমেদকে ঠিক করা হয় এবং ঢাবির ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের অডিটোরিয়াম ভাড়া করা হয়। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ৯-১১ ডিসেম্বর ৭২ ঘন্টার হরতাল এবং পরিবহন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ৭-৮ ডিসেম্বর দু'দিন পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। ফলে নবীন বরণ অনুষ্ঠান যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে। সবচাইতে সমস্যায় পড়তে হয় কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তের কারণে। ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে বিশেষ অতিথি করা হয় তৎকালীন পাহাড়ী গণ পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য সৌখিন চাকমা, সহ সাধারণ সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা, পিসিপি কেন্দ্রীয় সভাপতি কে এস মং মারমা। কে এস মং মারমা দীর্ঘদিন যাবৎ বান্দরবানে অবস্থান করার কারণে কেন্দ্রীয় দপ্তরের সাথে তার খুব বেশী যোগাযোগ ছিল না। ফলে পিসিপি কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে ৬ ডিসেম্বর '৯৫ বলা হলো সৌখিন চাকমাকে অতিথি করা যাবে না। কারণ তিনি জুম্ম জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী কাজে লিপ্ত, আর্মীদের সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ইত্যাদি ইত্যাদি। ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটিকে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখিতভাবে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করি। পরের দিন কেন্দ্রীয় কমিটি লিখিতভাবে জানালো যে, সৌখিন চাকমাকে অতিথি করা যাবে না। কিন্তু বিস্তারিত কোন কারণ তারা উল্লেখ করেনি। সেই সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে খাগড়াছড়ি গিয়ে সৌখিন চাকমার সাথে আলাপ করার সিদ্ধান্ত হলেও পরিবহন ধর্মঘটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছেন। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা সিনিয়রদের সাথে পরামর্শ করলাম। তারা আমাদের জানালো যেহেতু সৌখিন চাকমাকে অতিথি করা হয়েই গেছে অর্থাৎ তাকে বলা হয়েছে, আমন্ত্রণপত্রে তার নাম ছাপানো ও বিলি করা হয়েছে কাজেই তাকে বাদ দেওয়া যায় না। আমরা মহানগর শাখার নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিলাম যা হবার হোক আমাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সৌখিন চাকমা অতিথি হবেন। পরবর্তীতে সৌখিন চাকমার বিষয়ে আমরা খবর নিয়ে তেমন কিছু পেলাম না। মূল কারণ হলো সৌখিন চাকমার সাথে প্রসিতের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো নয়। প্রসিতের ভুলগুলোর একজন তীব্র সমালোচক তিনি। তাই তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তাছাড়া পাহাড়ী গণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অতিথি হবার কথা প্রসিতের সাংগঠনিক দিক বিবেচনা করলে। সেই জায়গায় সৌখিন চাকমাকে অতিথি হিসেবে প্রসিতের বা তার অনুসারী পিসিপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভবপর ছিল না। ফলে যে কোন অজুহাতে সৌখিন চাকমাকে বাদ দিতে চায় তারা। কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে কোন প্রকার সহযোগিতা তো দূরের কথা বরং বিরোধিতা করা হলো। অনুষ্ঠানে যাতে ছাত্রছাত্রীদের্ জমায়েত কম হয় তার চেষ্টা করা হলো। প্রসিতের অনুসারীরা কেউই সেই অনুষ্ঠানে যায়নি। তারপরও লোকের উপস্থিতি বা শৃঙ্খলার দিক দিয়ে কোন প্রকার ঘাটতি ছিল না। অত্যন্ত সুন্দরভাবে নবীনবরণ অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হয়।

বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন

১৫-১৬ ডিসেম্বর '৯৫ বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন কুতুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। কুতুকছড়ি প্রসিতের সমর্থিত অঞ্চল বলা যায়। সেই প্রতিনিধি সম্মেলনে ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে আমরা তিনজন কনকবরণ ত্রিপুরা, জিতেন চাকমা ও আমি অংশগ্রহণ করি। সেই সম্মেলনে এতই শৃঙ্খলা (?) আরোপ করা হয় যে, কুতুকছড়ি শাখার পক্ষ থেকে যেখানে বলবে সেখানে আমাদের থাকতে হবে। অথচ আমি সম্মেলনের বেশ কিছুদিন পূর্বে আমার স্কুল জীবনের ঘনিষ্ট বন্ধু সুবর্ণ চাকমাকে চিঠিতে জানিয়েছি যে, প্রতিনিধি সম্মেলনের সময় আমরা তাদের বাড়ীতে থাকবো। তাদের বাড়ী বাদলছড়ি গ্রামে, বাজারের সামান্য পূর্ব দিকে। সেই অনুযায়ী সুবর্ণ আমাদের অপেক্ষায় ছিল। আমরা যখন তাদের বাসায় যেতে চাচ্ছি তখন পিসিপি নেতা অমর জীবন চাকমা যেতে দিচ্ছে না। ইতিমধ্যে সুবর্ণের বড় ভাই অহিংসা'দাও সেখানে উপস্থিত হয়েছেন চবি শাখার নেতাদেরকে তাদের বাড়ীতে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু কাউকেই যেতে দিচ্ছে না অমর জীবন। অহিংসা'দা যেহেতু অভিলাষের বড় ভাই (আপন মামাতো ভাই) তাই তিনি এক প্রকার জোর করে নিয়ে গেলেন তাদের বাড়ীতে। আমি জানি না সেই সম্মেলনে আমাদের অবস্থা কি হতো। কারণ আমরা অত্যন্ত গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি যে, আমাদেরকে কুতুকছড়ি সম্মেলনে প্রসিত চক্র বড় ধরনের ক্ষতি করবে। তাই সুবর্ণ এবং অহিংসা'দা দু'ভাই আমাদের জন্য বাজারে অপেক্ষা করতেন যতক্ষণ আমাদের অধিবেশন চলতো। তাদের বাড়ী কুতুকছড়ি বাজারের পাশে এবং এলাকার শিক্ষিত ছেলে হিসেবে তাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। তাদের সামনে আমাদেরকে কোন কিছু করা সেই সময়ে কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। সম্মেলনে ঢাকা মহানগর শাখার উপর নিন্দা জ্ঞাপন করা হয় নবীনবরণ অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার অপরাধে। আমরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রেখেছি। সম্মেলনে ব্যক্তি বিশেষে আমাদেরকে তীব্রভাবে সমালোচনা করে কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক নিকোলাষ চাকমা। সে বলে "জিতেন চাকমা বর্মাছড়িতে বক্তব্য রাখতে না পারায় চম্পানন চাকমাকে ঢাকায় মারধর করা হয়েছে। চম্পাননকে মারধর করেছে পলাশ খীসার মাস্তানরা। তার সব সময় ৭/৮ জনের একটি মাস্তান বাহিনী থাকে। যাকে ইচ্ছে করে তাকে পেটায় সে তার মাস্তান বাহিনী দিয়ে।" এছাড়াও অনেক অনেক অযৌক্তিক, বানোয়াট ও মিথ্যা কথা বলেছিল নিকোলাষ। কেন্দ্রীয় কমিটির কোন কোন বক্তার একতরফা অযৌক্তিক সমালোচনা বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলার তৎকালীন সভাপতি মৃগাঙ্ক খীসাসহ অনেকেই সমালোচনা করেন। কেন্দ্রীয় কমিটির বক্তব্য আরো মার্জিত এবং তথ্য ভিত্তিক হওয়া উচিৎ বলে শাখার নেতৃবৃন্দ মন্তব্য করেন।

সেই প্রতিনিধি সম্মেলনে তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা প্রতীক দেওয়ান বলেন, প্রসিত উদীয়মান সূর্যের মতো। তার যোগ্যতাকে কেউ ঢেকে রাখতে পারবে না। বিভিন্ন সময়ে শোনা যায় প্রসিত গ্রুপ বনাম সমীর গ্রুপ, প্রসিত গ্রুপ বনাম পাম্পু গ্রুপ, প্রসিত গ্রপ বনাম শক্তিমান গ্রুপ। প্রসিতকে ঘিরে প্রায় সব সময় অন্য একটা গ্রুপকে তার বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়।

৭ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৬ষ্ঠ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল

২০ মে '৯৬ ৭ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ২১-২৩ মে ৬ষ্ঠ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০ মে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং র‍্যালী সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সমাপ্ত হয়।

কিন্তু বিকালে আলোচনা সভা চলাকালীন সময়ে আমাদের এক শুভাকাঙ্খী খবর দিলেন বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান হতে চলেছে। আমাদের সতর্ক অবস্থায় থাকা উচিৎ। আলোচনা সভা শেষ হওয়ার পর সংক্ষিপ্তাকারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানসূচী শেষ করা হয়। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে সঞ্চয়, দেবাশীষ ও আমি বিভিন্ন পাহাড়ী সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করি। এছাড়াও অন্যান্য শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শ নিই। সবাই কাউন্সিল স্থগিত করে তিন পার্বত্য জেলা থেকে আগত ছাত্রছাত্রীদের ফেরৎ পাঠিয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন। আমরাও বিষয়টা চিন্তা করে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সবাইকে এক এক করে বিদায় দেয়া হচ্ছে। কিন্তু রাঙ্গামাটি জেলাকে বিদায় দেয়া যাচ্ছেনা জেলা শাখার সভাপতি মৃগাঙ্ক খীসা ও সাধারণ সম্পাদক বোধিসত্ত্ব চাকমাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে। সজল চাকমা চাম্পা সমস্ত জায়গা খোঁজাখুঁজি করেও পায়নি। আমার হঠাৎ মনে পড়লো সেই সময়ে সিনিয়র কয়েকজন নেতৃবৃন্দের সাথে একটি জায়গায় মত বিনিময় করার কথা ছিল তাদের। তাৎক্ষিণকভাবে আমি সেখানে গিয়ে তাদেরকে ডেকে নিয়ে আসলাম। তখনই সঞ্চয়দের সন্দেহ হলো যে, রাঙ্গামাটি জেলা শাখাও তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। যেহেতু মৃগাঙ্ক ও বোধি'কে আমি খুঁজে নিয়ে এসেছি।

স্থগিত করা কাউন্সিলের তারিখ পুনঃ নির্ধারণ করা হয় ১৮-২০ জুন '৯৬। স্থান খাগড়াছড়ি জেলা সদরে খবংপয্যা পুরাতন প্রাইমারী স্কুলে (তৎসময়ে পরিত্যক্ত)। যথারীতি কাউন্সিল শুরু হয় প্রথম দিনে ১৪২ জন প্রতিনিধি নিয়ে। দ্বিতীয় দিনে কোন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু তৃতীয় দিনে (শেষ দিন) কাউন্সিলার সংখ্যা বেড়ে ১৬৩ জনে উন্নীত হয়। কাউন্সিলে ঢাকা মহানগর, চট্টগ্রাম মহানগর ও বিশ্ববিদ্যালয়, রাবি এই শাখাসমূহের নেতৃবৃন্দকে আসামীর মতো চোখে চোখে রাখা হতো। কাউন্সিলে ঢোকার সময় ব্যাগগুলো নিয়ে যাওয়া হতো দপ্তরে জমা রাখার কথা বলে। প্রস্রাব করতে গেলেও কমপক্ষে একজন স্বেচ্ছাসেবক সাথে যাবেই যাতে অন্য কারো সাথে কথা বলা না যায়। কাউন্সিলের এক পর্যায়ে একজন স্বেচ্ছাসেবক এসে আমাদের ঢাকা মহানগর শাখার ফাইলসহ কাগজ-পত্রগুলি নিয়ে যাচ্ছে দেখে আমি সরাসরি বলি- 'এসব ফাইলপত্র আমাদের দেয়া সম্ভব নয়। এখানে অনেক মূল্যবান কাগজপত্র রয়েছে।' বক্তব্য রাখার জন্য যখন মঞ্চে গেছি তখন মঞ্চের পাশে বাইরে থেকে বেড়ায় আঘাত করা হয় এবং বক্তব্য শেষ করার জন্য বলা হয়। আমার মতো রাজশাহী ও চট্টগ্রাম শাখার নেতাদেরসহ বেশ কিছু শাখার নেতাদের এরকম করা হয়েছে। অর্থাৎ এমন একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি করেছে যাতে কাউন্সিলররা তাদের সুচিন্তিত মতামত দিতে না পারে। তারপরও তারা যখন দেখলো যে ভোটাভুটি হলে জিতবে না, সে কারণে তৃতীয় দিনে শাখা না থাকলেও বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখার নাম দিয়ে ২১ জন কাউন্সিলর বৃদ্ধি করেছে। কাউন্সিলের শেষ অধিবেশনে সাবজেক্ট কমিটি একটি নতুন কমিটি হাউসে উপস্থাপন করে। সাবজেক্ট কমিটির ঘোষিত পদের বিপরীতে কাউন্সিলরদের পক্ষ থেকে নতুন নাম প্রস্তাব করা হয়। ফলে হস্ত উত্তোলনের মাধ্যমে ভোটাভুটি সম্পন্ন হয়ে যায়। হস্ত উত্তোলনের সময় স্বেচ্ছাসেবকরাও নিরপেক্ষ ছিল না। তারা প্রসিত চক্রের পক্ষে হস্ত উত্তোলন করার জন্য কাউন্সিলরদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তাই কাউন্সিলে সাবজেক্ট কমিটির বিপরীতে প্রস্ত াবিত কোন পদে কেউ জয়ী হতে পারেনি। তবে সাবজেক্ট কমিটির ভোট যোগ করেও প্রসিত চক্রের সঞ্চয়সহ অন্যান্যরা কয়েক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যদি বিভিন্ন আঞ্চলিক শাখার নাম দিয়ে শেষ দিনে ২১ জন অবৈধ কাউন্সিলর বৃদ্ধি না করতো তাহলে সেদিনই পদ্ধতিগতভাবে প্রসিতচক্র পিসিপি থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হতো। তাছাড়াও তাদের সমর্থিত এলাকা থেকে আঞ্চলিক ও স্কুল শাখার নামে অনেক অবৈধ কাউন্সিলর নিয়ে এসেছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাঘাইছড়ি থেকে ১০ জন অতিরিক্ত অবৈধ কাউন্সিলর আনা হয়েছে আঞ্চলিক ও স্কুল শাখার নাম দিয়ে। এতকিছু করার পরও প্রসিত চক্র একতরফাভাবে নিজেদের লোক দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করতে পারেনি। '৯৬ এর কেন্দ্রীয় কাউেিন্সলে ভোটাভুটি হওয়ার বা পদ্ধতিগতভাবে প্রসিত চক্রকে পিসিপি থেকে হটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এ কারণে যে, প্রসিতের নেতৃত্বে আলাদা একটি পার্টি গঠনের প্রক্রিয়া নব্বই দশকের প্রথম দিকে শুরু হলেও '৯৫ সালের শেষের দিকে সেটা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। '৯৪ এর ১৫ জুন ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেয়ার পর প্রসিত গ্রুপিংএর মাধ্যমে গণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদটি দখল করে নেয় এবং পাহাড়ী গণ পরিষদের নাম পরিবর্তন করে "জুম্ম ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট" বা "ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট" করে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এফটি পূর্ণাঙ্গ পার্টিতে রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন প্রসিত। সেই সময়ে পাহাড়ী গণ পরিষদের অনেকেই বিরোধিতা করার কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে গঠনতন্ত্রে উপরেল্লেখিত দু'টি নাম সন্নিবেশিত করা হয়। তখন থেকে বাইরে গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলনরত তিন সংগঠনের (পিসিপি, পিজিপি, এইচডব্লিউএফ) সচেতন নেতাকর্মীরা প্রসিতের বিষয়ে আরো অধিকতর সতর্ক হয়ে যায়।

১৮-২০ জুন '৯৬ কাউন্সিলের মাধ্যমে পিসিপির নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২১ জুন '৯৬ খাগড়াছড়ির খবংপয্যায়। সেই মিটিংয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল ১১-১২ জুলাই '৯৬ কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে এবং ২৭ জুন '৯৬ কল্পনা চাকমা অপহরণের প্রতিবাদে তিন পার্বত্য জেলায় সড়ক অবরোধের ডাক দেয়া হয়। সেই কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে জনৈক অনুপ্রবেশকারী ভিডিপির কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে জনতার উপর গুলি চালালে বাঘাইছড়ির বাবু পাড়া এলাকায় স্কুল ছাত্র রূপন চাকমা ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন এবং অনুপ্রবেশকারীরা তাফে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। রূপনের শরীর টুকরো টুকরো করে ফেটে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় অনুপ্রবেশকারীয়া। একই দিনে তুলাবান থেকে আসার পথে মুসলিম ব্লক এলাকায় গুম করা হয় সুকেশ, মনোতোষ ও সমর বিজয় চাকমাকে। আজো পর্যন্ত তাদের খোঁজ মিলেনি। ধারণা করা হয় তাদেরকে নৃশংসভাবে খুন করেছে অনুপ্রবেশকারীরা। উল্লেখ্য যে, ১২ জুন '৯৬ ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৬ ঘন্টার পূর্বে ছিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদিকা কল্পনা চাকমাকে কুখ্যাত লেঃ ফেরদৌস এর নেতৃত্বে অপহরণ করা হয়। আজ অবধি আমাদের প্রিয় যোন কল্পনাকে পাওয়া যায়নি।

কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভা

১১ ও ১২ জুলাই কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা হবার কথা থাকলেও এফদিন আগে ঢাকায় জানানো হলো ১১ জুলাই '৯৬ তিন সংগঠনের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হবে। অথচ সেই সভার খবর পাহাড়ী গণ পরিষদের অনেকেই জানেন না। ব্যক্তিগত কাজে তখন ঢাকায় গিয়েছিলেন ভূবন ত্রিপুরা (বর্তমানে বিসিএস কর্মকর্তা)। যিনি তৎকালীন সময়ে পাহাড়ী গণ পরিষদের একজন কেন্দ্রীয় সদস্য। তিনিও এই সভার খবর জানতেন না। একদিন আগে শুনে মিটিংএ গিয়েছিলেন তিনি। সেই মিটিংএ তৎকালীন নবগঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে তিন সংগঠনের উদ্যোগে আমাদের দাবী দাওয়া সম্বলিত স্মারকলিপি প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যেহেতু ১২ জুলাই পিসিপি'র কেন্দ্রীয় সভা অনুষ্ঠিত হবে সেহেতু স্মারকলিপি লেখার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রসিতকে। প্রসিত স্মারকলিপিটি লিখে পিসিপির কেন্দ্রীয় সভা শেষ হওয়ার আগে পিসিপির নেতৃবৃন্দকে দিবেন। তিন সংগঠনের সেই মিটিংএ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রসিতের একটি প্রস্তাব। তিনি প্রস্তাব করেন যে, তিন সংগঠনের নামে একই রশিদ বই ছাপানো ও এক সাথে টাকা উত্তোলন করা এবং প্রতি তিন মাস অন্তর তিন সংগঠনের যৌথ মিটিং করা। এটাও তার আলাদা পার্টি গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নিয়ে প্রথমেই তৎকালীন পিসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক মৃগাঙ্ক খীসা সেই প্রস্তাবের বিরোধীতা করেন। তিনি বলেন এটা একটা মৌলিক বিষয়। তাই এই মুহুর্তে আমাদের এখতিয়ার নেই তিন সংগঠনের নামে একই রশিদ বই ছাপার। প্রতিটি সংগঠন তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে তারা তিন সংগঠনের নামে রশিদ বই ছাপাবে কি-না। আর গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হলে পিসিপিকে অবশ্যই কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠেয় সমর্থন আদায় করতে হবে। তার সাথে একমত হয়ে থোয়াই অং মারমা, জলিমং মারমা, ভূবন ত্রিপুরা ও পলাশ খীসাসহ অনেকেই বক্তব্য রাখেন। মৃগাঙ্কের বক্তব্যের বিরোধীতা করেও অনেকেই বক্তব্য রাখেন এমনকি সেদিন রবি শংকর চাকমা ও সচিব চাকমা তাকে বলেন বিরুদ্ধবাদী, সংকীর্ণমনা। উপরোক্ত শব্দদ্বয়ের (বিরুদ্ধবাদী, সংকীর্ণমনা) উপর আপত্তি জানানো হলে প্রসিত তাদের পক্ষ হয়ে ক্ষমা চান। সেদিন রণজিৎ দেওয়ান রাজু রবি শংকরের উদ্দেশ্যে বলেন- 'আলোচনা ব্যতীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক নয়। আলোচনা করতে না দিয়ে সংকীর্ণমনা বলা- এটাও এক ধরণের সংকীর্ণতা।' এভাবে সেদিন প্রসিতের ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া হয়।

পরের দিন ১২ জুলাই পিসিপির কেন্দ্রীয় সভার শেষ অধিবেশনে প্রসিতের লেখা দাবীদাওয়া সম্বলিত স্মারকলিপি পৌঁছে যায়। তখন সেটি একে একে পড়ে দেখার জন্য দেয়া হয়। এসময় প্রসিতের অনুসারীরা কোথাও কোন ভুল নেই বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু যখন মৃগাঙ্ক এর পড়ার দায়িত্ব পড়লে তখন তিনি সাথে সাথে আপত্তি জানান যে, দাবীগুলোর প্রথমেই ভুল রয়েছে। প্রথম দাবীটাতে লেখা হয়েছে, "পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারকে বৈঠকে বসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে এবং সেই বৈঠকে পিসিপি, পিজিপি, এইচডব্লিউএফ এই তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষক রাখতে হবে।" তিনি বলেন সরফার কার সাথে বৈঠকে বসে সামাধান করবে এটা স্পষ্ট নয়। এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের একমাত্র রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতির নাম উল্লেখ করতে হবে এবং তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষক দাবী করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, জনসংহতি সমিতির নাম না লিখলে অস্পষ্টতা থেকে যাবে। তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষক দাবী করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ জনসংহতি সমিতি জুম্ম জনগণের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল এবং আমরা তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিভাবক সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছি সংগঠনগুলোর জন্মের পর থেকে। অনেক যুক্তি, পাল্টা যুক্তি দেওয়ার পর প্রসিত চক্র জনসংহতি সমিতির নাম সংযোজনে রাজী হলেও পর্যবেক্ষকের বিষয়ে তারা রাজী হতে চাচ্ছিলেন না। যখন তাদেরকে বলা হলো আমরা যদি পর্যবেক্ষক এর দাবী করি তাহলে পার্বত্য বাঙালী পরিষদ জাতীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোও একই দাবী করতে পারে। ফলে একটা জটিলতা সৃষ্টি হবে। পরবর্তীতে তারা এই যুক্তিটি মেনে নিতে বাধ্য হয়। তখন থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তারা জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে পারছিলেন না বা জনসংহতি সমিতির অধীনে তারা থাকতে চাচ্ছিলেন না এবং তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। সেই কারণে তিন সংগঠনের নামে একই রশিদ বই ছাপিয়ে তারা পার্টি গঠনের প্রক্রিয়াকে একধাপ এগিয়ে নিতে চায়।

ঢাকা মহানগর কাউন্সিল ও কেন্দ্রীয় ৭ নেতার পদত্যাগ

৯ আগষ্ট '৯৬ ঢাকা মহানগর শাখার কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। দুই দিন আগে ঢাকা মহানগর শাখার কাউন্সিল পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে একটি ৫ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক হলেন ক্যাজরী মারমা (পিসিপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক) এবং সদস্য হিসেবে নেয়া হয় মৃগাঙ্ক খীসা (পিসিপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক), খুশীরায় ত্রিপুরা (পিসিপির তৎকালীন এজিএস)/ সমারী চাকমা (সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা), সদস্য-লয়েল ডেভিড বম ও মংএচিং চাক এমং-কে। সেই মিটিংএ আরো সিদ্ধান্ত হয় যে, ৮ আগষ্ট বিকেল ৫টার মধ্যে প্রতিনিধিদের তালিকা কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছে ঢাকা মহানগর শাখাকে অবশ্যই জমা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদের তালিকা দেয়া হলে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি তা যাচাই বাছাই করে চুড়ান্ত করে। ৯ আগষ্ট '৯৬ ঢাকা মহানগর শাখার কাউন্সিলে প্রথম অধিবেশন জগন্নাথ হলের দক্ষিণ বাড়ী টিভি কক্ষে শুরু হয়। কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন শাখার সভাপতি পলাশ খীসা। এক এক করে স্বাগত বক্তব্য, অর্থ সম্পাদকের রিপোর্ট, সাংগঠনিক সম্পাদকের রিপোর্ট পেশ করা হয়। তারপর প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে অর্থ ও সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টের উপর আলোচনা আরম্ভ হয়। এক পর্যায়ে জনৈক এঞ্চ বক্তা ঢাকা মহানগর শাখার মনোৎপল চাকমাকে মুখোশ বাহিনীর অধিকার পত্রিকায় মুখোশ বাহিনীর ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এবং তিনি জানতে চান বিষয়টা সত্য কি-না? এসময় এক প্রতিনিধি সুজ্ঞান চাকমা তার বক্তব্যে বলেন, মুখোশ বাহিনী তাদের পত্রিকায় ফেষল মনোৎপলের কথা লিখেনি তারা এটাও লিখেছে এবং প্রচার করেছে- কবিতার পেটে প্রসিতের বাচ্চা রয়েছে। সেটাও সত্য কি-না তা তিনি জানতে চান। তখন কবিতা মঞ্চে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনেক আলোচনা ও পর্যালোচনার পর দুপুরের আহারের ১ ঘন্টার বিরতি দিয়ে প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় অধিবেশনের শুরুতেই সাবজেক্ট কমিটির পক্ষ থেকে জিতেন চাকমাকে সভাপতি ও বিবিসুৎ ত্রিপুরাকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্যের একটি প্যানেল প্রতিনিধিদের নিকট উত্থাপন করা হয়। উল্লেখ্য যে, দুপুরের বিরতির সময়ে সাবজেক্ট কমিটি মিটিংএ বসে উক্ত প্যানেল প্রস্তুত করে। প্রসিত চক্র সেই প্যানেলের বিপরীতে দীপায়ন খীসাকে সভাপতি ও রূপক চাকমাকে (কিছুদিন আগে নিহত হন) সাধারণ সম্পাদক করে একটি পাল্টা প্যানেল প্রস্তাব করে। ফলে ভোটাভুটির প্রশ্ন এসে গেলে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির উপর দায়িত্ব বর্তায় সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার। কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে ব্যালট পেপার তৈরী করা হয় এভাবে-


ক্রমিক নং

সাবজেক্ট কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটি

পদবী

হাউস কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটি

 

1.     

জীতেন চাকমা

সভাপতি

দীপায়ন খীসা

2.     

বিবিসুৎ ত্রিপুরা

সাধারণ সম্পাদক

রুপক চাকমা

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে খুশীরায় ত্রিপুরা কিভাবে ভোট দিতে হবে তা প্রতিনিধিদের বুঝিয়ে দেন। তিনি বলেন বাম দিকে সাবজেক্ট কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটির নাম এবং ডানদিকে হাউস কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটির নাম রয়েছে। মাঝখানে পদবী লেখা হয়েছে। আপনারা সাবজেক্ট কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটির পক্ষে ভোট দিতে চাইলে বামে ঠিক চিহ্ন দিবেন এবং হাউস কর্তৃক প্রস্ত  াবিত কমিটির পক্ষে ভোট দিতে চাইলে ডানে ঠিক চিহ্ন দিবেন। তিনি বলেননি যে সর্ববামে ক্রমিক নং রয়েছে এবং সেখানে ঠিক চিহ্ন দেয়া যাবে না। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর ভোট গণনা শুরু হয়। গণনার সময় দীপায়ন খীসা ক্রমিক নম্বর ও নামের মাঝখানে ঠিক চিহ্ন দেয়া ভোটগুলো কি হবে এ প্রশ্ন করেন সঞ্চয় চাকমাকে। সঞ্চয় চাকমা উত্তরে বলেন যে, "এগুলো ঠিক আছে"। গণণা শেষ করে দেখা যায় যে, সাবেজেক্ট কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটি জয়যুক্ত হয়েছে। তখন দীপায়ন খীসা আপত্তি তুলেন ক্রমিক নম্বর ও নামে যাদের ঠিক চিহ্ন পড়েছে সে ব্যালটগুলো বাতিল করতে হবে। এধরনের ব্যালট পেপার বা ভোট ছিল মোট ৬৪টি। এই ৬৪টি ব্যালট বাতিল করলে হাউস কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটি জয়যুক্ত হয়। ভোট গণমা যখন শেষ হয় তখন রাত ১০টা বাজে। ৬৪টি ভোট বাতিল হবে কি হবে না এবিষয়টি সমাধা করার জন্য কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। ফলে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি মিটিংএ বসলে সেখানেও মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়। দুইজম বাতিল করার পক্ষে এবং দুইজন বিপক্ষে। ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির মধ্যে লয়েল ডেভিড বম-এর কাজ থাকার কারণে ভোট গ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর পরই তিনি চলে যান। যে ৪ জন উপস্থিত ছিলেন তার মধ্যে মৃগাঙ্ক খীসা ও মংএচিং চাক এমং বাতিল করার বিপক্ষে। তাদের যুক্তি হলো, "যে ৬৪ জন ভোট দিয়েছে তাদের কোন ভুল নেই। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে খুশীরায় সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দিতে পারেননি বলে ঠিক চিহ্ন নামের পাশে ক্রমিক নং এ এসে পড়েছে। তাছাড়া এটা স্পষ্ট বোঝা যায় সাবজেক্ট কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত কমিটিকে সমর্থন করে বাম পাশে ভোট দিয়েছে। কারণ দুটো কমিটির মধ্যে এফটা বাম পাশে আর একটা ডান পাশে। কাজেই এই গণতান্ত্রিক মতামতকে বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেই।" অপরপক্ষে  খুশীরায় ত্রিপুরা ও কাজরী মারমা সেই ভোটগুলো বাতিল করার পক্ষে। তাদের যুক্তি হলো, "তাদেরকে বাম পাশে নামের উপর ভোট দিতে বলা হয়েছে, ক্রমিক নম্বরের উপর নয়।"

এখানে উল্লেখ্য যে, ক্যজারী মারমা আহ্বায়ক হিসেবে শুরুতে ভোট দিতে পারেন না। যদি সমান সমান ভোট পড়ে তখন কাষ্টিং ভোট দিতে পারেন: কিন্তু তিনি আগে থেকেই একটা পক্ষ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি করেন। অমীমাংসিতভাবে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিটিং শেষ হয়। তখন রাত ১২টা বাজে। তখনো প্রায় ১৫০/১৬০ জন প্রতিনিধি রেজাল্টের অপেক্ষায় ছিল। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং শুরু হতে যাচ্ছে এমন সময় কাউন্সিল পরিচালনা কমিটির সদস্য মংএচিং চাক হল থেকে বের হয়ে গেলে উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে প্রদীপ চাকমা (সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর) কেন্দ্রীয় কমিটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আমরা আজকের মধ্যে রেজাল্ট চাই, আমাদের দ্রুত রেজাল্ট দিন।" তখন তৎকালীন সভাপতি সঞ্চয় চাকমা রাগতঃস্বরে প্রতিনিধিদের হল থেকে বের হয়ে যেতে বললে আরো বেশী উত্তেজিত হয় প্রতিনিধিরা। তখন ঢাকা মহানগরের সভাপতি পলাশ খীসা এবং থোয়াইঅং মারমা কেন্দ্রীয় মিটিংএর স্বার্থে প্রতিনিধিদের বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করলে তারা চলে যায়। সেই সময়ে প্রসিত চক্রের অনুসারীরা অক্টোবর স্মৃতি ভবনের দিকে গেলে স্বেচ্ছাসেবকরা নিরাপত্তার কারণে হলের গেইট ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। এরপর কেন্দ্রীয় মিটিং শুরু হলে অনুরূপ যুক্তি দিয়ে ৬৪টি ভোট বাতিল করার পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করা হয়। ফলে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছে না কেন্দ্রীয় কমিটি। এক পর্যায়ে সঞ্চয় ৬৪টি ভোট বাতিল না করলে তারা (প্রসিত চক্র) সংগঠন থেকে পদত্যাগ করবে বলে জানায়। সে মনে করেছিল তাদেরকে ছাড়া সংগঠন চলবে না। ফলে তাদের পদত্যাগের হুমকিতে কেন্দ্রীয় কমিটির বাকী সদস্যরা সবাই একমত হয়ে ভোটগুলো বাতিল করে দীপায়নের নেতৃত্বাধীন কমিটিকে জয়যুক্ত হিসেবে অনুমোদন করবে। কিন্তু ফল হয়ে যায় উল্টো, জলিমং মারমা (তৎকালীন সহ-সভাপতি) বলে ফেলেন যে, "ঠিক আছে পদত্যাগ করেন, আমরা সংগঠন চালাবো। তারপরও অযৌক্তিক দাবী মেনে নেব না।” ঐ সময় মৃগাংঙ্ক খীসা বলেন, "আপনারা পদত্যাগ করবেন কেন? আপনাদের উপর তো অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। প্রয়োজনে কাউন্সিল স্থগিত হবে কিংবা ৫ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আবারও বৈঠক হবে।" এক পর্যায়ে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে বসে রয়েছে সঞ্চয়। সমারী ও মিন্টু বিকাশ খীসা প্রকৃতির ডাকের অজুহাত দেখিয়ে বাইরে যেতে চাইলে গেইট বন্ধ থাকার কারণে যেতে পারেনি। স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে তালার চাবি না থাকায় স্বেচ্ছাসেবকরা তালা খুলে দিতে পারেনি। রাত বেশী হওয়ায় দারোয়ান তালা খুলে দিয়ে চলে গেছে যাতে যাওয়ার সময় রুমটি বন্ধ করে দিয়ে যেতে পারে। স্বেচ্ছাসেবকরা ভিতরে ছিল ফলে চাবি আসতে আসতে দেরী হয়ে যায়।

রাত বাড়তে থাকে। গেইট খোলা হলে সমারী, খুশীরায় ও মিন্টু বাইরে চলে যান। এর মধ্যে সৈকত দেওয়ান ও কালাবাবুকে টেলিফোন করতে দেখা যায় এবং সেখান থেকে এসে সঞ্চয়কে কানে কানে কি যেন বলে। কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে সমাধানের কোনো চেষ্টা করা হচ্ছে না দেখে আমি ক্যজরী মারমাকে বললাম পদত্যাগ করবো ঢাকা মহানগরী সভাপতির পদ থেকে (তৎসময়ে আমি একই সাথে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলাম)। ক্যজরী আমাকে ধৈর্য ধরতে বললেন। আমি তার কথায় বেশ কিছু সময় ধৈর্য ধরে ছিলাম। কিন্তু তারপরও সমাধানের যখন কোনো চেষ্টাই নেই বরং যে যার মতো করে ধুমপান করছে তখন আমি একটি পদত্যাগ পত্র লিখি। তাতে উল্লেখ করি যে, ঢাকা মহানগর শাখার পক্ষ থেকে সুষ্ঠুভাবে কাউন্সিলরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভুল ব্যাখ্যার কারণে কাউন্সিলে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর শাখার নেতৃবৃন্দ কিংবা প্রতিনিধিবৃন্দ কোনো অবস্থাতেই দায়ী হতে পারে না। এত রাতেও (রাত তখন প্রায় ৩টা) কেন্দ্রীয় কমিটি কাউন্সিলের রেজাল্ট দিতে না পারায় ঢাকা মহানগর শাখার পদ থেকে পদত্যাগ করলাম। আমি আমার পদত্যাগ পত্রটি তৎকালীন সভাপতি সঞ্চয় চাকমার হাতে দিলে তিনিও একটি পদত্যাগ পত্র লিখেন এবং স্বাক্ষর করার পর কাজরীকে দেন। এর পর পরই আরও তিনজন স্বাক্ষর করেন। তৎসময়ে সমারী ও মিন্টু বাইরে ছিলেন। তাদের দু'জনকে ডেকে এনে স্বাক্ষর করতে বলা হলে তারাও স্বাক্ষর করেন। ফলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ৭ জন পদত্যাগ করেন (৬ জন সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য)। তাদের পদত্যাগের পরও মৃগাঙ্ক খীসা বার বার অনুরোধ করেন "আপনারা যাবেন না, বসে পড়ুন। পদত্যাগ করা ঠিক হয়নি।" সঞ্চয় বসতে যাচ্ছে এমন সময় চম্পানন ধমক দিয়ে বলে-'সঞ্চয়'দা, আমরা পদত্যাগ করেছি কাজেই এখান থেকে চলে যাবো।' তারপর তারা যখন হল ত্যাগ করছে তখনই ঢাকা মহানগরের কর্মীরা হাততালি দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। এর পর পরই কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জলিমং মারমা নবনির্বাচিত ঢাকা মহানগর কমিটিকে অনুমোদন দেন। ৭ জন কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন সহ-সভাপতি থোয়াই অং মারমা।

১০ আগষ্ট '৯৬ ঢাকায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় কমিটির সকল নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একটি জরুরী মিটিং জগন্নাথ হলের উপাসনালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিটিংএ সভাপতিসহ ৭ জনের পদত্যাগকে হঠকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং পরবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা না হওয়া পর্যন্ত থোয়াই অং মারমা এবং পলাশ খীসাকে যথাক্রমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি সভাপতিসহ ৭ জন নেতার পদত্যাগ এবং ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব কারা পালন করবেন এসব বিষয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। মিটিং শেষ হওয়ার আগে (তখন রাত ৮টা) ট্রাইবেল হোষ্টেল থেকে ১০/১২ জন ছেলে মিটিংএর স্থলে আসে। তাদের কেউ কেউ হাফ প্যান্ট পরিহিত ছিল। তারা এসে সরাসরি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে কৈফিয়ত চায় যে, কেন ৭ জন নেতাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে? কাউন্সিলের রেজাল্ট কি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা ঠান্ডা মাথায় তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করি। ইতিমধ্যে জগন্নাথ হলের ছাত্ররা খবর পেয়ে ২০/৩০ জন

তাদের কাছাকাছি এসে গেলে অবস্থা বেগতিক দেখে হোস্টেলের উত্তেজিত ছাত্ররা চলে যায়। পরে জানা যায় সঞ্চয় হোষ্টেলে গিয়ে ছেলেদের ভুল বুঝিয়ে উত্তেজিত করে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে মারার জন্য পাঠিয়েছে। সেদিনের মিটিংএ ২২ ও ২৩ আগষ্ট তারিখে কেন্দ্রীয় কমিটির জরুরী বর্ধিত সভা আহ্বান করা হয়। সেই বর্ধিত সভার আগে ১৭ আগষ্ট দীপ্তি শংকর চাকমা ও খুশীরায় ত্রিপুরা তথাকথিত সম্পাদকমন্ডলীর নাম দিয়ে একটি সার্কুলারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভা আহ্বান করে এবং নিজেদেরকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা দেয়। কিন্তু সভাপতিসহ ৬ জন সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য পদত্যাগ করার পর বাস্ত বিক অর্থে সম্পাদকমন্ডলী অকার্যকর হয়ে যায়। কেননা সম্পাদকমণ্ডলীর মোট সদস্য হচ্ছে ১১ জন। সেখান থেকে ৬ জন পদত্যাগ করলে বাকী থাকে ৫ জন। এই ৫ জনের মধ্যে মৃগাঙ্ক খীসা ১০ আগস্টের মিটিংয়ে উপস্থিত থেকে তার মূল্যবান মতামত রেখেছিলেন। এছাড়াও গঠনতন্ত্র অনুসারে কোন সহ-সভাপতি এবং কোন সহ-সাধারণ সম্পাদক সম্পাদকমন্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত হবেন তা কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক তখনো পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল না। ফলে বাকী থাকে মাত্র ২ জন। এই ২ জন কোনদিন সম্পাদকমন্ডলীর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। ২২-২৩ আগষ্ট কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, রাঙ্গামাটিতে ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে ২ দিন ব্যাপী কেন্দ্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন করা হবে। অপরদিকে দীপ্তিশংকর ও খুশীরায় এক সার্কুলারের মাধ্যমে জানায় যে, কেন্দ্রীয় বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন ২২-২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে মহালছড়িতে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে স্পষ্টতঃ সংগঠন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এহেন অবস্থায় সমীরণ চাকমা ও শক্তিপদ ত্রিপুরা খবর নিয়ে আসেন যে, "উভয় প্রতিনিধি সম্মেলন স্থগিত ঘোষণা করতে হবে এবং ৫ জন করে (উভয় পক্ষ থেকে) প্রতিনিধি গিয়ে পার্টির (জেএসএস) নেতৃবৃন্দের সাথে ২ অক্টোবর '৯৬ দেখা করতে হবে।"

কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রাণনাশের চেষ্টা

আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিভাস দেওয়ানকে। আমরা জলিমং মারমা, মৃগাঙ্ক খীসা, লয়েল ডেভিড বম, জিতেন চাকমা, বিভাস দেওয়ান ও আমি ২৯ সেপ্টেম্বর'১৯৬ খাগড়াছড়িতে সৌখিন চাকমার বাসায় পৌঁছে যায়। ৩০ সেপ্টেম্বর খুব ভোরে রওয়ানা হয়ে ধুদুকছড়ার দিকে হারুবিলে গিয়ে আমরা শুনি, যে রাস্তা দিয়ে যাবো সে রাস্তায় আর্মীরা তল্লাসী অভিযান চালাচ্ছে। ফলে সারাদিন সে এলাকায় কাটালাম। দুপুরে খাবার হিসেবে জুটলো কলা আর পাউরুটি। বিকেল বেলায় জলি মংএর জ্বর আসে। ধুদুকছড়ায় কোন গাড়ী না থাকায় খাগড়াছড়ি ফিরে আসতে পারছিলাম না। তাছাড়া পাবলিক গাড়ীতে আসা সম্ভব নয় প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীদের কারণে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে একটা জীপের শব্দ শুনে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। গাড়ীটা ধুদুকছড়ায় যাচ্ছে। গাড়ী থামিয়ে দেখি সঞ্চয়রা যাচ্ছে। গাড়ীর ড্রাইভারকে ফিরে আসার জন্য বলে অপেক্ষায় থাকলাম। গাড়ী ফিরে আসলে আমরা খাগড়াছড়িতে সৌখিন দা'র বাসায় চলে আসি। খবর পাঠানোর জন্য বিভাস দেওয়ান চিঠি লিখে এলেন। কাজেই অপেক্ষায় থাকতে হলো। ১ অক্টোবর ৯৬ সারাদিন সৌখিন দা'র বাসায় কাটালাম। মৃগাঙ্ক খীসা

ও আমি আমার বোনের বাসা মধুপুরে গেলাম। বিভাস দেওয়ান, জিতেন চাকমা ও ডেভিড বম খাগড়াপুরে শক্তিপদ ত্রিপুরার বাসায় বেড়াতে যায়। সৌখিন চাকমার বাসায় কেবল জলিমং মারমা ছিলেন। তার শরীর খুব বেশী ভালো না থাকায় তিনি বের হননি।

আকাশের অবস্থা ভালো নয়, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যে কোন মুহুর্তে বৃষ্টি হতে পারে। এলিমং তখন হারমোনিয়াম নিয়ে ভূপেন হাজারিকার একটি গান গাইছে "মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটুখানি সহানুভূতি মানুষ কি পেতে পারে না....."। ঠিক সেই মুহুর্তে বাইরে থেকে মুখোশ পরিহিত একদল যুবক এসে একজন তাকে ডাকলো "জলিমং দা' আপনি একটু বাইরে আসুন, আপনার সাথে আমাদের কথা আছে।" বিদ্যুৎ চমকানিতে জলিমং মারমা দেখেছেন মুখোশ পরিহিত অবস্থায় একদল যুবক কিরিচ, হকিষ্টিক হাতে নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। সংখ্যায় ১৫/২০ জনের কম নয়। অবস্থা বুঝে তিনি বললেন "তোমাদেরকে তো চিনি না, কথা থাকলে একজন ভিতরে এসে বললে ভালো হবে।" যুবকরা তাতে ক্ষুব্দ হয়ে বলে "জলি মং বাইরে চলে আয়, না হলে অসুবিধা হবে।" তখন আর দাদা ডাকছে না। জলি মং মারমা উঠে যাওয়ার ভান করে দরজাটা বন্ধ করে দেয় এবং "সৌখিন দা, সৌখিন দা, এরা কারা" বলে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। তখন সৌখিন দা বাড়ীতে ছিলেন না। তার ডাকে সৌখিন দা'র স্ত্রী আর হ্যাপি এগিয়ে আসেন। মৃগাঙ্ক খীসা ও আমি মধুপুরের বোনের বাসা থেকে রওয়ানা হয়েছি। রিক্সা ষ্টেশনে পৌছার আগেই বৃষ্টি শুরু হলে নিপুলিকা চাকমার বাসায় উঠি। সেখানে প্রায় ঘন্টা খানেক ছিলাম। বৃষ্টি থামলে রিক্সা নিয়ে সৌখিন চাকমার বাসার দিকে যেতে থাকি। শাপলা চত্বর ফেলে গিয়ে ব্রিজটা পার হওয়ার সাথে সাথে আমার নাম ধরে একজন ডাকলেন। আমরা তারপরও যাচ্ছি। কারণ খাগড়াছড়িতে তখন একদিকে মুখোশ বাহিনী এবং অন্যদিকে প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীরা রয়েছে। তাই খুব সাবধানে না চললে বিপদের সম্ভাবনা অনেক বেশী থেকে যায়। কিছুদূর অগ্রসর হতেই একটা মোটর সাইকেলে করে বিভাস দেওয়ান আর রনি আমাদের রিক্সার গতিরোধ করেন এবং বলেন অবস্থা খারাপ, রিক্সা ঘুরাও। আমরা রিক্সা ঘুরিয়ে তাদের পিছু নিলাম। পানখাইয়া পাড়া রোডে বাজারের এক হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে যোগাযোগ কমিটির আহ্বায়ক বাবু হংসধ্বজ চাকমার বাসায় গেলাম রাত্রি যাপনের জন্যে। সেখানে বিষয়টা বিস্ত  ারিত শুনলাম যে, সৌখিন দা'র বাসা ঘেরাও করেছে প্রসিত চক্র। আমাদেরকে খুঁজছে। জলি মং মারমার অবস্থা কি হয়েছে রনি চাকমা জানে না। সে আমাদেরই এক শুভাকাঙ্ক্ষী। খবর পেয়ে সে মোটর সাইকেলে করে রাস্তায় আমাদের অপেক্ষায় ছিল। বিভাস দেওয়ানদের পেয়েছে খবংপয্যার ঢুকার রাস্তায়। তারপর আমাদেরকে বহু সময় অপেক্ষা করার পর আমাদের সাথে তাদের দেখা।

অনেক অনেক দিন পরে খবর পেলাম সেদিন ১ অক্টোবর'৯৬ পুলক চাকমা ও তাপস দেওয়ানের নেতৃত্বে ১৫/১৬ জনের একটা গ্রুপ সৌখিন দা'র বাসা ঘেরাও করেছে আমাদের হামলা করার জন্য। তাদের উপর নির্দেশ ছিল পলাশ খীসা, জিতেন চাকমা ও বিভাস

দেওয়ানকে হত্যা করা এবং অন্যদেরকে কিছু উত্তম-মধ্যম দেয়া। পুলক চাকমা ও তাপস দেওয়ান আমার স্কুলের জীবনের বন্ধু। ৮৪-৮৫ সাল পর্যন্ত তিন বছর আমরা সহপাঠী ছিলাম। কোনদিন তাদের কারোর সাথে ঝগড়া তো দূরের কথা, কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয়নি।

অথচ সেদিন তারা এসেছে প্রসিত চক্রের নির্দেশে নিজেদের বিবেক বৃদ্ধি বিসর্জন দিয়ে বন্ধুকে মেরে ফেলার জন্য। আমি জানি না সেদিন আমাকে পেলে মেরে ফেলতে পারতো কিনা। পুলক চাকমা  পরবর্তীতে ভুল বুঝতে পেরে প্রসিত চক্র ত্যাগ করে চলে এসে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। অন্যদিক তাপস দেওয়ানের কোন খবর আমি জানি না। সম্ভবতঃ সে এখনো প্রসিত চক্রের সাথে রয়েছে। পরের দিন সকালে আশীষ চাকমা (প্রভাষক, পানছড়ি কলেজ) হংসধ্বজ চাকমার বাসা থেকে আমাদেরকে সৌখিন চাকমার বাসায় নিয়ে যান। সেখানে আরেক বন্ধু দেবোত্তম চাকমার (পানছড়ি) সাথে দেখা হয়। সৌখিন চাকমার বাসা যখন সন্ত্রাসীরা ঘেরাও করে ঠিক সে সময়ে তারা রিক্সায় করে আসছিলেন। বাড়ীর কাছাকাছি পৌছতে না পৌঁছতে তাদেরকেও ঘিরে ফেলে সন্ত্রাসীরা। তাদের নাম, কোথায় যাচ্ছে ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে সেরে দেয় তাদেরকে। পার্টির পক্ষ থেকে দেবোত্তম চাকমাকে পাঠানো হয়েছে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

জেএসএস নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে সমঝোতা

সেদিন ২ অক্টোবর আমরা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু অবস্থায়। পরের দিন থেকে আলোচনা শুরু। প্রথম দিনে আমাদের উভয় পক্ষের কথা শুনলেন এবং কথা বললেন পার্টির নেতৃবৃন্দের মধ্যে সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্রশেখর চাকমা ও প্রধীর তালুকদার। শেষ দিনে আসলেন পার্টি লিডার জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমাসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। তিনি বেশ কিছু সময় ধরে আলোচনা করার পর বললেন যে, "সঞ্চয়দের পদত্যাগ করা ঠিক হয়নি। আন্দোলনে তাদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পার্টি মনে করে আন্দোলনের স্বার্থে তাদের স্ব স্ব পদে ফিরে আসা উচিৎ। কাজেই তারা যদি স্ব স্ব পদে ফিরে আসতে চায় তাহলে তোমরা (আমাদের পক্ষ) গ্রহণ করতে পারবে কিনা?" তিনি প্রথমে আমার মত জানতে চাইলেন। আমি বললাম- আমরা তো তাদেরকে পদত্যাগ করতে বলিনি। তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছে। এখন যদি স্বেচ্ছায় তারা আবার ফিরে আসতে চায়, আমরা গ্রহণ করবো না কেন? তখন তাদের কাছ থেকে লিডার জানতে চাইলেন তারা ফিরে আসতে চায় কিনা? সঞ্চয় হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালে লিডার বলেন এখান থেকে যাওয়ার পরপরই লিখিতভাবে ফিরে আসার জন্য সঞ্চয়রা আবেদন জানাবে। বর্তমানে যারা রয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে তারা তা গ্রহণ করবে। সকল প্রকার মতভেদ ভুলে গিয়ে একই সাথে দেশ-জাতির জন্য কাজ করার আহ্বান জানালেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর সঞ্চয় সুস্থ হয়ে উঠলেন। উল্লেখ্য যে, সেখানে যাওয়ার পরপরই সঞ্চয় নিজেকে অসুস্থ বলেছিলেন। অসুস্থতার কথা বলে মিটিংএ খুব বেশী কথা বলেনি সঞ্চয়। বেশীর ভাগ কথাগুলো বলেছিল খুশীরায় ত্রিপুরা। লিডার যখন রাজনৈতিক বিষয়ে আলাপ করছিলেন বিশেষ করে পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফ এর কথা তথা প্রসিতের হঠকারী কার্যকলাপের কথা তখন খুশীরায় জানতে চান যে, প্রসিতকে দিয়ে আন্দোলন বা জাতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কিনা? তখন লিডার বলেছিলেন, "হ্যাঁ, অনেক অনেক ক্ষতি করেেছ প্রসিত, অনেক গোপন তথ্য সে প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যতে আরো বেশী ক্ষতি করতে পারে।" লিডারের সেইদিনের সেই ভবিষ্যত বাণী আজ সত্যে পরিণত হয়েছে। প্রসিত একটি বিভেদ চক্র সৃষ্টি করে অপূরণীয় ক্ষতি করলো জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে।

সেদিন আরো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সঞ্চয়রা পদত্যাগের পর উভয় পক্ষ থেকে যে সমস্ত সার্কুলার শাখাসমূহে পাঠানো হয়েছে যৌথভাবে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করে সার্কুলারের মাধ্যমে সেগুলো বাতিল ও পুড়ে ফেলার নির্দেশ দিবে। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক যৌথ স্বাক্ষরে ৬ অক্টোবর '৯৬ একটা সার্কুলার শাখাসমূহের বরাবরে পাঠানো হয়। দুপুরে খাবারের বিরতির পর এবার ঢাকা মহানগর কাউন্সিলের ভোটের রেজাল্ট নিয়ে লিডার আলোচনা শুরু করেন। তিনি বলেন, "আমার হাতে যে কাগজগুলো (হাতে একগাদা কাগজ দেখিয়ে) দেখছেন, এগুলো সব ঢাকা মহানগর শাখার কাউন্সিলের উপর বিভিন্ন কর্নার থেকে পাওয়া রিপোর্ট। তা ছাড়া এ বিষয়ে আমাদের পার্টির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ আপনাদের সাথে আলাপ আলোচনা করে তাদের মতামতও দিয়েছেন। সব দিক আলোচনা পর্যালোচনা করে আমাদের পার্টি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ঢাকা মহানগর কাউন্সিলে অনুষ্ঠিত ভোটে জীতেন-বিবিসুৎ প্যানেল জয়যুক্ত হয়েছে। কাজেই গণতান্ত্রিক এই মতামতকে তোমাদের (সঞ্চয়দের উদ্দেশ্য করে) মেনে নেয়া উচিৎ হবে বলে আমরা মনে করি।" পার্টি লিডারের এই বক্তব্যের পরও সঞ্চয়রা মেনে নিতে চায় না। তারা আবারও তাদের যুক্তি উপস্থাপন করতে চেষ্টা করে। তখন লিডার আবারও বলেন, "আমি শুরুতেই বলেছি আমরা অনেক নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং তোমাদের সবার বক্তব্যও শুনেছি। সবকিছু জেনেই আমরা বলছি, তোমাদের এই মতামত মেনে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।" তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও সঞ্চয়রা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।

এরপরের কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংএ প্রসিত চক্রের দীপ্তি শংকররা আরো কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে। কথা ছিল সঞ্চয়সহ যারা পদত্যাগ করেছে তারা ফিরে আসার জন্য লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানাবে। কিন্তু মিটিংএ দীপ্তি শংকরদের দাবী হচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে পদত্যাগকারীদেরকে ফিরে আসার জন্য লিখিতভাবে আহ্বান জানাতে হবে। ঐক্যের স্বার্থে আমরা রাজী হলে লেখাটা কি রকম হবে তা নিয়ে দীপ্তি শংকর ও শুভাশীষ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। শেষে কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বানে সঞ্চয়রা ফিরে এসে তাদের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করে।

তথাকথিত পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের ডাক ১০ নভেম্বর '৮৩ জুম্ম জাতীয় ইতিহাসে একটি কলংকজনক দিন।

এই দিনে বিভেদপন্থী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্রের হাতে আটজন সহযোগীসহ নির্মমভাবে শহীদ হন আমাদের জুম্ম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মহান নেতা এম এন লারমা। ঠিক তেমনিভাবে ১০ মার্চ '৯৭ জুম্ম জাতীয় ইতিহাসে রচিত হয় আরও একটি কালো অধ্যায়। ১০ নভেম্বর '৮৩ মহান নেতা এম এন লারমাকে খুন করেছে বিভেদপন্থী চক্ররা। অনুরূপভাবে ১০ মার্চ '৯৭ পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের ডাক দেয়ার মধ্য দিয়ে প্রসিত-সঞ্চয় চক্র জনসংহতি সমিতি ও জুম্ম জনগণের যোগ্য নেতৃত্বকে ধ্বংস করতে অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ১০ মার্চ '৯৭ পিসিপি-পিজিপি-এইচডব্লিউএফ এর নাম ব্যবহার করা হয় এবং সেদিন একটি মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি'র সড়ক দ্বীপ থেকে শুরু হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বিলি করা হয় লিপলেটগুলো। সেই মিছিলে আমরা অনেকেই ছিলাম। সেই মিছিল থেকে এ ধরনের জুম্ম জাতীয় ঐক্য পরিপন্থী লিফলেট প্রচার করা হবে সেটা অনেকেই জানতাম না। অত্যন্ত সুকৌশলে প্রসিত চক্র এ কাজটি করেছে। এরপর এই লিফলেটটা নিয়ে প্রচন্ড সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয় প্রসিত চক্রকে। শুধু তাই  জনসংহতি সমিতি সরকারের সাথে চুক্তি করবে যে চুক্তিতে জুম্ম জনগণের কোন অধিকার সংরক্ষিত হবে না। কারণ জনসংহতি সমিতির বর্তমান নেতৃত্ব অচল, ঘরের নষ্ট হওয়া খুঁটির মতো নড়েবড়ে, যে কোন মুহুর্তে ভেঙ্গে পড়তে পারে। তারা আর আন্দোলন করতে চায় না। তাই কোন কিছু না পেলেও জনসংহতি সমিতি চুক্তি করতে বাধ্য সরকারের সাথে।"

সেই প্রতিনিধি সম্মেলনে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবী বাতিল করা হলো। তবে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি মনে করেন পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীটা যৌক্তিক তাহলে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সেটা চূড়ান্ত হবে। আরো সিদ্ধান্ত হয় যে, পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের পরিবর্তে ৪টি মৌলিক দাবী নিয়ে পিসিপি'র ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। দাবীগুলো হলো-

১. সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে।

২. ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৩. সেনাবাহিনী ও সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করতে হবে।

৪. বহিরাগত বাঙালীদের ফেরত নিতে হবে।

এই ৪টি দাবীতে ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ১৭-২০ জুন '৯৭ তারিখে ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হবে।

১১ মে '৯৭ খাগড়াছড়িতে নির্মাণাধীন ষ্টেডিয়ামে রাজশাহী মহানগর শাখার সাবেক সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক উষাময় খীসাকে (বর্তমানে আইনজীবি) প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীরা দীপ্তিশংকরের নির্দেশে মারধর করে। সেদিন উষাময় ও অমিয় চাকমা (বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার) নির্মাণাধীন স্টেডিয়ামে ছোট বোন স্বর্ণাশ্রী ও রূপাশ্রী (তটিনী ও এন্টনি) সহ বেড়াতে গিয়েছিল। বিকাল বেলায় ষ্টেডিয়ামের গ্যালারীতে বসে তারা যখন গল্প করছিল ঠিক সেই সময়ে একজন ছেলে এসে জিজ্ঞাসা করে- উষাময় কার নাম? উযাময় তখন নিজের পরিচয় দেয়। ছেলেটি বলে "আপনার সাথে কথা আছে। একটু আমার সাথে যেতে হবে।" উষাময় বিষয়টা সহজভাবে নিয়ে ছেলেটার সাথে যায়। ছেলেটা তাকে নিয়ে যায় ষ্টেডিয়ামের ভেতরের একটি রুমে। সেখানে গিয়ে দেখে অনেকগুলো ছেলে। তখন কোন কথা না বলে দরজা বন্ধ করে উষাময়কে মারতে শুরু করে সন্ত্রাসীরা। যে যেভাবে পারে মারছে আর উষাময় চিৎকার করছে। কিন্তু শব্দটা অমিয়দের কাছে পৌঁছে না। তারা অপেক্ষা করছে উষাময় কখন আসবে। প্রায় ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করেও যখন আসছে না তখন তারা খুঁজতে যায়। খুঁজতে খুঁজতে চিৎকার শুনতে পায়। দরজা খুলে দেখে উষাময়কে ১৫/২০ জন ছেলে মারছে। দরজা খোলার সাথে সাথে অমিয়কে দু'চারজন এসে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় এবং চলে যেতে বলে। তখন অমিয়রা হুয়াং বোইও বা'তে যায়। সেটি পিসিপির অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে দীপ্তিশংকর ছিল। তাকে ঘটনাটা বিস্তারিত বলা হয়। কিন্তু সে জবাব দেয় অপরাধ করলে তো মার খেতে হবে। তাদের করার কিছু নেই। তখন স্বনির্ভর বাজারে আসা লোকদের কাছে উষাময়কে বাঁচানোর জন্য আহ্বান করে অমিয়রা। বাজারের আসা লোকজন উদ্ধারের জন্য গেলে সন্ত্রাসীরা চলে যায় এবং উষাময়কে মুমুর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সে আপাততঃ ভালো হয়ে যায়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেই সময়ের আঘাতের

ব্যাথাগুলো জ্বালাতন করে। শুধু তাই নয় আমাদের পক্ষ থেকে খাগড়াছড়িতে দায়িত্ব পালনরত তনয় দেওয়ান ঊষাময় খীসাকে দেখাশুনা ও চিকিৎসা করার পর রাঙামাটি ফিরে আসার সময়ে ১৫ মে তারিখে তাকে খাগড়াছড়ি বাস ষ্টেশন থেকে প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীরা অপহরণের চেষ্টা চালায়।

কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায় বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বরখোলাপ

৬ জুন '৯৭ চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্রাবাসে কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মৃগাঙ্ক খীসা যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন তার বক্তব্যের উপর কথা বলতে থাকে চম্পানন, নিকোলাষ, মিন্টুসহ আরো দু'একজন। মৃগাঙ্ক বক্তব্য রাখতে পারছেন না কারণ প্রতিটি কথায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। তখন আমি সভাপতির অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করলাম- "এখানে কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং হবে নাকি মাছের বাজারের মতো তর্ক-বিতর্ক হবে? মাছের বাজারের মতো হলে আমিও শুরু করতে পারি কি-না? যদি না হয় তাহলে মৃগাঙ্ক বাবুকে তার বক্তব্য উপস্থাপন করার সুযোগ দেয়া হোক।" তখন সভাপতি হিসেবে সঞ্চয় হস্তক্ষেপ করে বলেন- একজনের বক্তব্য শেষ না হলে আরেকজন কথা বলতে পারবে না। তখনই মৃগাঙ্ক বাবু বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। তার বক্তব্যকে সমালোচনা করে প্রসিত চক্রের দু'একজন বলেছিল তিনি নাকি জনসংহতি সমিতির সদস্যের মতো বক্তব্য রাখছেন এবং তাদের দালালী করছেন। সেই মিটিংএ প্রসিত চক্রের দীপ্তি শংকর বাদে সবাই উপস্থিত ছিল। দীপ্তি শংকরও লিখিতভাবে কাগজ পাঠিয়েছে যে, সে আসতে পারবে না, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। সেদিনের মিটিংএর উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করা। সে কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রসিত চক্র সবাই মিটিংএ উপস্থিত হয়। সেই মিটিংএ প্রস্তাব করা হয় যে, প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিবর্তে খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত করা এবং যে ৪টি মৌলিক দাবী নিয়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত ছিল তা পরিবর্তন করে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবী অন্তর্ভূক্ত করা। কোন প্রকার যুক্তি দেয়ার সুযোগ সেখানে দেয়া হয়নি। প্রস্তাবের পক্ষে না বিপক্ষে শুধুমাত্র এই মতামত চাওয়া হয়। যেহেতু প্রসিত চক্রের সবাই উপস্থিত কাজেই সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হিসেবে সেটা চাপিয়ে দেয়া হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় কমিটির পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা হচ্ছে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল, এরপরে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলন, তারপর কেন্দ্রীয় কমিটি। কেন্দ্রীয় কমিটির যে কোন সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলন বা কেন্দ্রীয় কাউন্সিল বাতিল করে দিতে পারে, কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল করে দিতে পারে না।

শুধু তাই নয় সঞ্চয় চাকমা উদ্ধত কন্ঠে বলেন যে, আমি পার্টির (জেএসএস) সবকিছু দেখেছি। কোথাও কিছু নেই। তাদের পক্ষে আর আন্দোলন করা সম্ভব নয়। মূলতঃ প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত কে পাশ কাটিয়ে প্রসিতের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করার জন্য সঞ্চয় এসব বক্তব্য দিয়েছিল। 

৬ জুন '৯৭ মিটিংএর গঠনতন্ত্র পরিপন্থী সিদ্ধান্ত শাখাসমূহে প্রেরণ করলে বিভিন্ন শাখায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সর্বপ্রথমে রাঙ্গামাটি জেলা শাখার পক্ষ থেকে প্রতিবাদলিপি কেন্দ্রীয় কমিটির বরাবরে প্রেরণ করা হয়। এর পরপরই ঢাকা মহানগর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মহানগর ও রাজশাহী মহানগর শাখাসহ (সবগুলো জেলা শাখা মর্যাদা সম্পন্ন) বিভিন্ন থানা শাখা থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির গঠনতন্ত্র পরিপন্থী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো হয় এবং গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত করা ও ৪টি মৌলিক দাবী সমুন্নত রাখার আহ্বান জানানো হয়। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে থোয়াইঅং, জলি মং, পলাশ, মৃগাঙ্ক, ব্রজ কিশোর ও ডেভিড বমসহ ১২ জন কেন্দ্রীয় নেতা কর্তৃক শাখাসমূহের আবেদন গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ণ করার আহবান জানানো হয় কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বরাবরে। গঠনতন্ত্রের ১৯ নং ধারার (চ) উপধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির যে কোন সিদ্ধান্ত যদি দু'টি জেলা শাখা মর্যাদা সম্পন্ন শাখা লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের দ্বিমত অথবা অনাস্থা জ্ঞাপন করলে কেন্দ্রীয় কমিটিকে ২১ দিনের মধ্যে বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন আহ্বান করে জনমত যাচাই করতে হয় এবং এই মেয়াদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটি যেকোন বৃহত্তর ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যকলাপের বৈধতা হারায়। প্রতিনিধি সম্মেলনের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত দিলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়। অথচ ৫টি জেলা শাখা (৭টির মধ্যে)/ জেলা মর্যাদা সম্পন্ন শাখা দাবী জানানোর পরও কোন বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন আহ্বান করা হয়নি। উপরন্তু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লেখার জন্য রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি তনয় দেওয়ান ও সাধারণ সম্পাদক বোধিসত্ব চাকমাকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় সভাপতি সঞ্চয়। অন্যথায় তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে। এখানেও তিনি গঠনতন্ত্রকে উপেক্ষা করেন। গঠনতন্ত্র মোতাবেক কোন সদস্য অপরাধ করলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থণের জন্য ১৫ দিন সময় দিতে হয় এবং সংগঠনের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ দলিলে স্বাক্ষর করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। অথচ রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সময় দেয়া হয়েছে মাত্র ৩ দিন (৭২ ঘন্টা) এবং সেই গুরুত্বপূর্ণ সার্কুলারে সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষর না করে স্বাক্ষর করেছেন সভাপতি হিসেবে সঞ্চয়। ৫টি জেলা শাখা মর্যাদা সম্পন্ন শাখা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ১২ জন নেতৃবৃন্দের যৌক্তিক দাবীর পরও প্রসিত চত্রের অন্যতম সহযোগী সঞ্চয় গঠনতন্ত্রকে উপেক্ষা করে বীরদর্পে ঘোষণা করে যে, কেন্দ্রীয় কমিটিসহ শাখা সমূহ থেকে কেউ না গেলেও তিনি পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবী নিয়ে খাগড়াছড়িতে ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করবেন, এমনকি বোমা ফাটালে কিংবা তাকে গুলি করে মেরে ফেললেও তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না।

প্রসিতচক্রের মুখোশ উন্মোচিত

সবকিছুর মূলে রয়েছে প্রসিতের ষড়যন্ত্র ও কুপরামর্শ। পিসিপিসহ তিন সংগঠনকে দুর্বল করার জন্য দীর্ঘদিনের তিল তিল করে যে সংগ্রামী ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছিল তা খন্ডিত করার মধ্য দিয়ে তার ক্ষতিসাধন করা হয়। সমস্ত গণতান্ত্রিক ও গঠনতান্ত্রিক নিয়ম নীতিকে উপেক্ষা করে প্রসিত চক্রের সহযোগী সঞ্চয় সংগঠনের ক্ষুদ্র একটি অংশকে নিয়ে খাগড়াছড়িতে ১৭ জুন '৯৭ তারিখ ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করলে ১৮ জুন '৯৭ পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের প্রগতিশীল বৃহৎ অংশটি গঠনতন্ত্রকে সর্বোচ্চ মেনে চলার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্রাবাসে বিশেষ প্রতিনিধি সম্মেলন করতে বাধ্য হয়। সে প্রতিনিধি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেদিন বিকাল ৫ ঘটিকার সময় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ৩০ জুন '৯৭ ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ১-২ জুলাই '৯৭ ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার ঘোষণা দেয়া হয়। সেই সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান মৃগাঙ্ক খীসা এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তৎকালীন ছাত্র নেতা থোয়াই অং মারমা, জলি মং মারমা, পলাশ খীসা ও মৃগাঙ্ক খীসা প্রমুখ। এভাবে প্রিয় লড়াকু সংগঠন পিসিপি'র গৌরবময় ইতিহাসে প্রসিত চক্ররা কালিমা লেপন করে, সংগঠনের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির উপর মারাত্মকভাবে আঘাত হানে।

প্রসিত চক্রের মূল ভিত্তিটা খাগড়াছড়ি কেন্দ্রীক। ফলে ১৭-২০ জুন '৯৭ অষ্টম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির একাংশ, দীঘিনালা, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি সদর, রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর ও কুতুকছড়ি শাখা সমূহ থেকে যোগদান করে। অন্যান্য এলাকা থেকেও ছিটেফোটা দু'একজন বিপদগামী কর্মী যোগদান করে। অপরদিকে সংগঠনের মূল নীতি-আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং সংগঠনের গঠনতন্ত্রের অনুসারে অনুষ্ঠিত ৩০ জুন '৯৭ ৮ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে ঢাকা মহানগর, চট্টগ্রাম মহানগর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মহানগর, বান্দরবন জেলাধীন সকল শাখা, রাঙ্গামাটি জেলাধীন কুতুকছড়ি ও নানিয়ারচর ব্যতীত সকল শাখা, খাগড়াছড়ি জেলাধীন মাটিরাঙ্গা থানা শাখা, জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ত্রিপুরা সহ বিভিন্ন শাখা থেকে সক্রিয়, ত্যাগী ও আদর্শিক কর্মীরা অনেকেই যোগদান করে। তৎসময়ে মানিকছড়ি ও রামগড়ে সংগঠনের শাখা ছিল না। লক্ষীছড়ি ও গুইমারা শাখা ছিল নিষ্ক্রিয়। তারা কোন পক্ষে যোগদান করেনি।

সাংগঠনিক কাজে প্রসিতচক্রের প্রতিবন্ধকতা

পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের নামে প্রসিত চক্র পিসিপি'র মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর সংগঠনকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য এবং জনমনে যে সকল বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা দূরীভূত করার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে গোটা পার্বত্য অঞ্চলে সাংগঠনিক সফর করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি টীম জলি মং মারমা, মৃগাঙ্ক খীসা, ব্রজ কিশোর ত্রিপুরা, মনিন্দ্র চাকমা ও আমি প্রসিতের ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত খাগড়াছড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে সফর করি। আগষ্ট মাসের শুরুতেই দীঘিনালার বাবুছড়া, বড়াদমসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় মতবিনিময় করি এলাকার মুরুব্বী ও ছাত্র যুবকদের সাথে। মতবিনিময় করার পর বিশেষ করে এলাকার ছাত্র-যুবকদের অনুরোধে এবং মুরুব্বীদের পরামর্শে ৪ আগষ্ট ১৯৭বড়াদমে পিসিপি, দীঘিনালা থানা শাখার কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত হয়। ৩ আগষ্ট '৯৭ সবাই বসে একটি খসড়া কমিটিও প্রস্তুত করি। কিন্তু ৪ আগষ্ট সকালে খবর পেলাম প্রসিত চক্র আমাদের মনোনীত সভাপতিসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে, হুমকি দিয়েছে কাউন্সিলে না আসার জন্য এবং তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে কাউন্সিল স্থলে হামলা করার জন্য। 

আমাদের অনুষ্ঠান শুরু করার কথা ছিল সকাল ১০টায়। তার আগে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা বড়াদমসহ অন্যান্য জায়গার উপস্থিত ছাত্র-যুবক ও অভিভাবকদের সাথে প্রসিত চক্রের কর্মকান্ডের বিষয়ে আলাপ করালাম। বড়াদমের ছাত্র-যুবক বন্ধুরা আমাদের আশ্বস্ত করলো বড়াদমে এসে হামলা করার দুঃসাহস প্রসিত চক্রের নেই। যদি হামলা করে তাহলে একজনকেও সুস্থ শরীরে ফেরৎ দেওয়া হবে না। বড়াদমের সেই সাহসী বৃদ্ধদের যে অপরিসীম সাহস ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কাউন্সিল করার জন্য সমস্ত প্রস্তুতি চলতে থাকলো। আমরা যখন অনুষ্ঠান শুরু করতে যাচ্ছি ঠিক সেই সময়ে ধর্মজ্যোতির নেতৃত্বে প্রসিত চক্র আমাদের কাউন্সিল স্থলে এসে যায় এবং আমাদেরকে কাউন্সিল না করার জন্য চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। ধর্মজ্যোতির বক্তব্য হলো পিসিপি-র থানা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে সে রয়েছে। তাকে না জানিয়ে আমরা কাউন্সিল করতে যাচ্ছি কেন? অথচ আমরা যখন বাবুছড়ায় মিটিং করেছি সেই সময়ে ধর্মজ্যোতির সাথে আলাপ হয়েছে। তারপরও তাদেরকে আমি বুঝিয়ে বললাম যে, পিসিপি থেকে একটি ক্ষুদ্র অংশ পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের নাম দিয়ে বের হয়ে গেছে। আমরা মৌলিক দাবীগুলি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কাজেই এটা স্পষ্ট যে এখন পিসিপি-তে দুটো ধারা সৃষ্টি হয়েছে। তোমরা যদি আমাদেরকে বিশ্বাস করে থাক এবং আমাদের দাবীর সাথে একাত্ম হতে পার তাহলে কাউন্সিলে ঢুকে পড়। আর যদি পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনে বিশ্বাস কর তাহলে কোন প্রকার ঝামেলা করার চেষ্টা না করে এখান থেকে চলে যাও। আমরা কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ করেছি, কাউন্সিল অবশ্যই হবে। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রসিত চক্র সেদিন পিছু হতে যায়। আমরা সুশৃঙ্খলভাবে দীঘিনালা থানা শাখার কাউন্সিল সুসম্পন্ন করি।

সেদিনই সন্ধ্যায় আমরা পানছড়ি পৌঁছে যায়। ৫ আগষ্ট'৯৭ পিসিপি পানছড়ি থানা শাখার কর্মী সমাবেশ পূর্ব নির্ধারিত ছিল। পানছড়ি কর্মী সমাবেশ হওয়ার কথা সকাল ১০টায় বাজারের পাশে একটি ক্লাবে। কিন্তু সেদিন ৯টার আগে প্রসিত চক্রের অনিমেষ চাকমার (পরবর্তীতে ভুল বুঝতে পেরে প্রসিত চক্র ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে) নেতৃত্বে ৮/১০ জন সন্ত্রাসী ক্লাবে অবস্থান গ্রহণ করে। আমাদের কর্মীরা তাদেরকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য বললে তারা অপারগতা প্রকাশ করে এবং বলে যে পলাশ, জলিমং, মৃগাঙ্ক কাউকে ক্লাবে ঢুকতে দেবে না। তখন আমাদের ছাত্র সংখ্যা খুব বেশী ছিল না। পরবর্তীতে আমাদের ব্যাপক কর্মীর সমাগম ঘটলে প্রসিত চক্র সুর পাল্টায়। তখন বলে- তারা আসতে পারবে কিন্তু প্রসিত বিরোধী কোন বক্তব্য দিতে পারবে না। তখন আমাদের কর্মীরা তাদেরকে উত্তম-মধ্যম দিয়ে বের করে দেওয়ার অনুমতি চায়। আমরা অনেক কিছু ভেবে তা অনুমোদন করিনি। প্রথমতঃ আমরা কারও সাথে সংঘাত হোক সেটা চায় না। তাছাড়া তাদেরকে মারধর করলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ সেদিন ছিল বাজারের দিন। প্রসিত চক্র মার খেয়ে যদি বাজারে গিয়ে কোন বাঙ্গালীকে মারধর করে তাহলে পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নেবে। তাই সবকিছু বিবেচনা করে পূর্ব নির্ধারিত স্থানের পরিবর্তে বৌদ্ধ বিহারের পাশে কর্মী সমাবেশ শুরু করি। এমন সময় খবর এলো প্রসিত চক্র পেরাছড়াস্থ গিরিফুল শিশু সদন এলাকায় গাড়ী থামিয়ে তল্লাসী চালাচ্ছে আমাদেরকে অপহরণ, হত্যা বা গুম করার জন্য। কাজেই আমরা যেন পানছড়িতে অবস্থান করি। আমাদের কর্মী সমাবেশ যখন শেষ পর্যায়ে তখন খাগড়াছড়ি থেকে একটা চাঁদের গাড়ী (জীপ) নিয়ে আমাদের সমর্থিত ২০/২৫ জন ছাত্র পৌঁছে যায় আমাদেরকে নিয়ে আসার জন্য। আসার পথে গিরিফুল এলাকায় কিরিচ, হকিষ্টিক নিয়ে ১০/১৫ জন প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীকে দেখা যায়। আমাদের ছাত্র সংখ্যা বেশী হওয়ায় তারা হামলা করার সাহস পায়নি।

৪ সেপ্টেম্বর ৯৭ খাগড়াছড়ি জেলার মাইচছড়ির বলিপাড়া বৌদ্ধ বিহারে পিসিপি এক জনসভা আয়োজন করলে চুক্তি বিরোধী সন্ত্রাসী প্রসিত চক্র সমাবেশ শুরুর আগে হামলা চালায়। সেখানে ছাত্র নেতা নয়ন জ্যোতি চাকমাকে মারধর করে মারাত্মকভাবে আহত করে। ইসলামী ছাত্র শিবিরের কায়দায় তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দেওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয় ছাত্র জনতা সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে চলে যাওয়ার সময় তৎকালীন পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জলিমং মারমার ব্যবহৃত ব্যাগ ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাবেশ ভন্ডুল করে উপস্থিত নেতৃবৃন্দকে আঘাত করা। সে সময় টার্গেট করা নেতৃবৃন্দ না থাকায় তারা নয়ন জ্যোতির উপর হামলা চালায়। তাদের সে দিনের উদ্দেশ্য সফল করতে দেয়নি মাইচছড়ির সচেতন ছাত্র-জনতা।

শুধু তাই নয়, ঘাগড়াতে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের বর্তমান বিভেদের কারণ ও সঠিক পথটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করার জন্য ঘাগড়ার ইউপি কার্যালয়ে আয়োজিত কর্মী সভায় প্রসিতের পকেটকর্মী ও স্থানীয় সন্ত্রাসী বাবুর্শে মারমার (পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে স্বপক্ষ ত্যাগ করেন) নেতৃত্বে কয়েকজন কর্মী তনয় দেওয়ান ও বোধিসত্ব চাকমার উপস্থিতিতে কর্মী সভা আয়োজনে বাঁধা প্রদানের চেষ্টা করে। এসময় ঘাগড়ার দোদুল্যমান কর্মীরা বাবুর্শের এহেন আচরণ দেখলে নিজেরাই প্রতিহত করার জন্য এগিয়ে আসে এবং বাবুর্শে মারমাকে তার সাঙ্গপাঙ্গসহ হলরুম থেকে বের করে দেয়। অনুরূপভাবে নান্যাচর থানা সদরে সন্তোষ বিকাশ খীসা, বোধিসত্ব চাকমা ও সুদীর্ঘ চাকমার নেতৃত্বে একদল কর্মী সাংগঠনিক সফরে গেলে নান্যাচর বাজারে প্রসিত চক্রের পকেট কর্মী তপনজ্যোতি ও উথোয়াইচিং মারমা তাদেরকে বাঁধা প্রদান করেন। পরে সেখানে খুল্যাং পাড়ায় আয়োজিত জনসভায় তারা আবার বাঁধা প্রদানের চেষ্টা করে। কিন্তু জনগণের তরফ থেকে তখন তাদের বলা হয় যে, এভাবে বাঁধা না দিয়ে তোমাদের যা বলার আছে তা মিটিংএ এসে বলো। তখন উথোয়াইচিং মারমা জনতার রোষ দেখে সুর পাল্টিয়ে জনসভায় বলে যে, আমরা জনসংহতি সমিতির বিপক্ষে নই। জনসংহতি সমিতি যা বলবে তাই আমরা মেনে নেবো। তখন আমাদের নেতৃবৃন্দ বলেন যে, তাহলে তোমরা কার ইঙ্গিতে বাঁধা দিচ্ছো? তখন তারা কোন যুক্তি দেখাতে না পেরে জনসভার স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এভাবে প্রতিটি এলাকায় যেখানে প্রসিত চক্রের লোকজন রয়েছে সেখানে তারা মরণপণ বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের দুর্বলতা ছিল যে, তাদের সমর্থিত এলাকায় যদি আমরা প্রসিতের কুকীর্তিগুলো তুলে ধরি তাহলে তারা জনসমর্থন হারাবে। ফলে কোন অবস্থায় তাদের সমর্থিত এলাকায় বিনা বাঁধায় সমাবেশ বা মত বিনিময় সভা করতে দেয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর

২ ডিসেম্বর '৯৭ প্রসিত চক্রের সমস্ত বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত করে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রসিত চক্রের সমস্ত বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত হলেও তাদের অন্ধ সমর্থকদের আরো অন্ধ করে রাখার জন্য সেদিনই বিকালে ঢাবি'র সড়ক দ্বীপে একটি মিছিল শেষে সমাবেশের মধ্য দিয়ে প্রসিত চক্র চুক্তির কপি নাম দিয়ে একগাদা কাগজ পুড়িয়ে ফেলে এবং বলে সরকার ও জনসংহতি সমিতির স্বাক্ষরিত চুক্তিতে জুম্ম জনগণের কোন অধিকার অর্জিত হয়নি। এটা ছিল কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতা। কারণ প্রসিত চক্র নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ১০ মার্চ '৯৭ থেকে বৈঠক প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে আসছিল। তখন থেকে তারা বিশ্বাস করতো জনসংহতি সমিতি সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যেমে চুক্তি করতে যাচ্ছে '৯৭ সালের জুন মাসের মধ্যে, যে চুক্তিতে জুন্ম জনগণের অধিকার যা স্বার্থ অর্জিত হবে না। তারা এটাও বিশ্বাস করতো যে, জনসংহতি সমিতির বিরাট একটা অংশ চুক্তির বিরোধিতা করবে, অস্ত্র জমা দেবে না এবং সেই অংশটির সাথে তারা একাত্ম হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। তাদের সেই আশা ও বিশ্বাস মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, জুম্ম জনগণের ন্যূনতম বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে। আমরা যারা পিসিপির মূল ধারায় কাজ করে চলেছি অর্থাৎ সংগঠনের গৌরবোজ্জ্বল ভাবমুর্তিকে সমুন্নত রেখে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত শপথ নিয়ে কাজ করে চলেছি চুক্তি হওয়ার সাথে সাথে আমরা চুক্তিকে সমর্থন করিনি। চুক্তির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে এবং পাশাপাশি জেলা পরিষদের আইনগুলো (১৯৮৯) দেখে সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, এই চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে জুম্ম জনগণের ন্যূনতম বেঁচে থাকার অধিকার থাকবে। আমরা এই চুক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমন্যা সমাধানের অগ্রগতির একটি উল্লেখ্যযোগ্য ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করে ৬ ডিসেম্বর '৯৭খাগড়াছড়িতে ও ১৫ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটিতে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল ও সমাবেশ করি।

জেএসএস সদস্যদের অস্ত্র জমা দেওয়ার আগ পর্যন্ত পত্রপত্রিকার লেখা ও বক্তব্যে প্রসিত চক্রের আক্রমণের টার্গেট ছিলেন জনসংহতি সমিতির সভাপতি সয় লারমা ও তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য অস্ত্র জমা দেয়ায় প্রসিত চক্রের নেতৃত্ব কর্মীদের ক্ষোভের মধ্যে পড়েন। কেননা প্রসিত চক্র বলেছিল জনসংহতি সমিতির একটা বিরাট অংশ অস্ত্র জমা দেবে না। অথচ তারা সবাই অস্ত্র জমা দিলেন কেন- কর্মীদের এই প্রশ্নের মুখোমুখী হতে হলো। সেদিন প্রসিত চক্র কর্মীদের এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, কিছু দিনের মধ্যে আমাদের অটোমেটিক হাতিয়ার আসবে। কাজেই চিন্তার কোন কারণ নেই। কিন্তু পরে অটোমেটিক হাতিয়ার দেখতে না পেয়ে কর্মীরা আরো ক্ষুব্দ হয়। ফলে প্রসিত চক্র তুলনার আশ্রয় নেয়। বিশ্বস্থ কর্মীদের দিয়ে নকল অটোমেটিক হাতিয়ার সাধারণ কর্মীদের দেখায়। প্রসিত চক্রের এ ধরনের ভন্ডামী দেখে অনেকেই স্বপক্ষ ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। অবশ্যই জনসংহতি সমিতির একটা অংশকে নিজেদের পক্ষে রাখার কম চেষ্টা করেনি তারা। চুক্তির পর পরই তাদের এক পকেট সাংবাদিককে দিয়ে আজকের কাগজে একটি রিপোর্ট লিখে দেয় যে, মেজর বাতায়ন তার গ্রুপ নিয়ে বিদ্রোহ করেছে। সে অস্ত্র জমা দিতে চায় না। কিন্তু সন্তু লারমার অনুগত বাহিনী তাকে নিরস্ত্র ও গ্রেপ্তার করেছে। এভাবে তারা পার্টির অভ্যন্তরে ভাঙ্গন সৃষ্টি করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে প্রসিত চক্রের টার্গেট হয়ে যায় পুরো পার্টি, অস্ত্র জমাদানকারী সকল সদস্য ও তিন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

প্রসিতচক্রের হত্যার রাজনীতি শুরু

চুক্তির পর পরই প্রসিত চক্র হত্যার রাজনীতি শুরু করে। সর্ব প্রথমে তারা খুন করে কুতুকছড়ির অশ্বিনী কুমার চাকমাকে। অশ্বিনী কুমার চাকমা ছিলেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মরত কুমার চাকমার ছোট ভাই। মরত কুমার ছিলেন চুক্তির একজন সমর্থক। তার দু'ছেলেও চুক্তি পক্ষের পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাথে যুক্ত ছিল। ১৬ জানুয়ারী '৯৮ চুক্তির সমর্থনে কুতুকছড়ি বাজারে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রসিত চক্রের বাঁধা সত্ত্বেও অনেক লোক জমায়েত হয় সেখানে। সেই সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে মরত কুমারের ভূমিকা ছিল নজরে পড়ার মতো। অশ্বিনী কুমারও সেই সমাবেশে যোগ দেন। দু'দিন পর ১৮ জানুয়ারী '৯৮ প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীরা মরত কুমারকে মারার জন্য যায়। তাকে না পেয়ে তার ছোট ভাই অশ্বিনী কুমার চাকমার উপর আক্রমণ চালায়। কিছু সময় মার খাওয়ার পর অশ্বিনী কুমার আত্মরক্ষার জন্য কোদাল হাতে নিলে প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীরা চারদিকে ঘিরে পাথর ছুড়ে মারতে থাকে। অশ্বিনী বাঁচার জন্য আর্মী ক্যাম্পের দিকে যেতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এতগুলো সন্ত্রাসীর সাথে একজনের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। একটার পর একটা পাথর দিয়ে বার বার আঘাত করতে থাকে সন্ত্রাসীরা। ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। এভাবেই চুক্তি বিরোধীদের হাতে প্রথম জীবন দিলেন অশ্বিনী কুমার চাকমা। রেখে গেলেন ছেলেমেয়েসহ অসহায়ভাবে নিজের স্ত্রীকে। অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে কেটে যেতে থাকে অশ্বিনীর বিধবা স্ত্রীর দিনকাল। কিছুদিন আগে প্রসিত চক্রের তথাকথিত এক নেতা তার প্রতি দরদ দেখিয়ে মদ বিক্রির অনুমতি দেয়। মদ বিক্রি করে কোন মতে চলছে বিধবার অভাবী সংসার।

অশ্বিনীর মৃত্যুর পর দাহত্রিয়ার যাওয়ার জন্য যখন আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মিটিং চলছিল তখনই ছাত্রনেতা বোধিসত্ব চাকমা সরেজমিনে ঘুরে এসে রিপোর্ট দেয় যে, প্রসিত চক্র রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছে। তারা চুক্তির যে কোন সমর্থককে খুন করতে পারে। যদি অশ্বিনীর দাহক্রিয়ায় যাওয়া হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের আঘাত করবে তারা। স্থল বা নৌ পথ কোনটাই নিরাপদ নয়। তারপরও আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম উপস্থিত সকল কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দাহক্রিয়ায় যাবো। একটা বাস ও একটা মাইক্রো নিয়ে ৬০/৭০ জনের একটা দল তৎকালীন সভাপতি থোয়াই অং মারমার নেতৃত্বে দাহ অনুষ্ঠানে যায়। যাবার পথে প্রসিত চত্রের অন্যতম সহযোগী অভিলাষসহ ৪/৫ জনকে দেখতে পেয়ে আমাদের কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে তাদেরকে গাড়ীতে তুলে নিয়ে আসার প্রস্তাব করে। আমরা গাড়ী না থামিয়ে কর্মীদের বলি আমরা অশ্বিনীর দাহক্রিয়ায় যাচ্ছি। তাই প্রধান হচ্ছে দাহক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা, কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়া নয়। আমরা অশ্বিনীর বাড়ীতে পৌঁছলে শত শত জনতা আমাদের স্বাগত জানান। তাদের চোখেমুখে ছিল শোকের ছায়া আর আতংকের প্রতিচ্ছবি। আমরা তাদের সাথে মত বিনিময় করি। তারা আমাদের জানান যে, তারা খুবই অসহায়, সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি।

ফলে তারা চান না অশ্বিনীকে রাজনৈতিক মর্যাদায় দাহ করা হোক। এরমধ্যে আমরা খবর পেলাম সন্ত্রাসীরা আমাদেরকে হামলা করার জন্য অপেক্ষা করছে। দাহক্রিয়া ঘন্টা দু'য়েক দেরী হতে পারে জেনে আমরা সেখান হতে শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে এলাম।  

বাজারে হামলা করার কথা শোনা গেলেও কেউ কিছু করেনি। আমরা আসতে থাকলাম। কিছুদূর এসে দেখা গেল অভিলাষসহ কয়েকজন রাস্তার কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ করছে।

আমাদের কর্মীরা তাদেরকে ধাওয়া করতে চাইলেও আমরা দিইনি। কিছু দূর এসে দেখি আবাসিক স্কুলের কাছে ধর্মঘরের পাশে সন্ত্রাসীরা ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে এবং তিন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হামলার জন্য অবস্থান করছে। তখন আর কোন উপায় না দেখে আমাদের কর্মীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। মুহুর্তেই মধ্যে সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে ব্যারিকেড ভেঙ্গে ফেলে আমাদের কর্মীরা। সেদিন দেখেছি প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীদের ভীরুতা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের উপর হামলা করা। কিন্তু আমাদের কর্মীরা গাড়ী থেকে হুংকার দিয়ে নামার সাথে সাথে তারা পালিয়ে যায়। আমরাও নিরাপদে চলে আসি।

সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ৫০ হাজার টাকা। এমন পরিস্থিতিতে জনসংহতি সমিতির সদস্যরা অস্ত্র জমা দেয়ার পর পরই প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীরা শুরু করে সমিতির সদস্যদের আপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়। সমিতির যে কোন সদস্যকে পেলেই সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মুক্তি দেয়। তাদের ক্ষোভের কারণ হলো সমিতির সদস্যরা তাদের পক্ষ না নিয়ে কেন সন্তু লারমার স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী অস্ত্র জমা দিয়ে সরকাবের কাছ থেকে এককালীন ৫০ হাজার টাকা অনুদান নিয়েছেন। ৫০ হাজার টাকা একটা পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য খুবই নগণ্য। সেই টাকায় জায়গা ক্রয় করা তো দূরের কথা চলনসই একটা বাড়ী বানানোর জন্যও যথেষ্ট নয়। ফলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সাথে সাথে নিত্য প্রযোজনীয় প্রবাদি ক্রয় করার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে ৫০ হাজার টাকার দাবী মেটাতে সমিতির সদস্যদেরকে বাপ-দাদার ভিটেমাটি বিক্রি করে দেয়া ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না। এভাবে প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীদের অপহরণের টাকা যোগাড় করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় পার্টির অনেক অনেক সদস্য-পরিবার।

জনসংহতি সমিতির সদস্যদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মধ্য দিয়ে খুব বেশীদিন সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি প্রসিত চক্র। কিছুদিনের মধ্যে তারা শুরু করে হত্যার রাজনীতি। দু' যুগের অধিক সশস্ত্র আন্দোলনে যারা সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি লাভকরেছে, যারা বিভিন্ন যুদ্ধে শত্রু সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে অস্ত্র গোলাবারুদ ছিনিয়ে এনেছেন তারাই ছিল সন্ত্রাসীদের সবচেয়ে টার্গেট। ফলে বীর যোদ্ধা শহীদ তার্জেন, অর্জিন, অরুণ, স্বাধীন, লাব্বেসহ মোট ৪১ জন জনসংহতি সমিতির সদস্যকে প্রসিত চক্র খুন করেছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। যারা দীর্ঘ দু' যুগ ধরে শত্রুর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত হননি, আর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধে জয়ী হয়েছে সেই সকল বীব যোদ্ধারা অস্ত্র জমা দেয়ার পর নিজের জাতির বিপথগামী ও বেঈমানদের নগ্ন হাতে জীবন দিচ্ছেন এটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও মর্মান্তিক।

অস্ত্র জমা দেয়ার পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করতে থাকে জনসংহতি সমিতির সদস্যরা। কোনো কোনো এলাকার গ্রামের বাড়ীতে থাকতে পারে না কখন সন্ত্রাসীরা এসে অপহরণ করে, খুন করে। রাঙ্গামাটি থেকে খাগড়াছড়ি, খাগড়াছড়ি থেকে

রাঙ্গামাটি আসা-যাওয়া করা যায় না নিরাপত্তার অভাবে। কুতুকছড়িসহ দু'একটি জায়গায় সন্ত্রাসীরা গাড়ী তল্লাসী চালিয়ে অপহরণ করে নিয়ে যায়। নিয়ে গেলে আর ফেরৎ আসে না। ফেরৎ আসলেও হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে নিজের পরিবারকে নিঃস্ব করে। পানছড়ি থেকে খাগড়াছড়ি কিংবা খাগড়াছড়ি থেকে পানছড়ি যাওয়া যায় না পেরাছড়াস্থ গিরিফুল এলাকায় অস্ত্রের মুখে সন্ত্রাসীরা বাস থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। উঠিয়ে নিয়ে গেলে পরিণতি যা হবার তা হয়ে যায়।

সমঝোতার পরও প্রসিতচক্রের তাণ্ডব

নিজের জাতির ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যারা বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠিত বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছে, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে প্রতিরোধ করেছে তাদের পক্ষে এধরনের একটা জীবন মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি, হতে পারে না। ফলে প্রসিত চক্রের বিরুদ্ধেও তারা রুখে দাঁড়ায় নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য। আর তখনই প্রসিত চক্র বুঝতে পারে তাদের সন্ত্রাসীদের শক্তি সাহস কতটুকু। তাদের কেউ কেউ পালিয়ে যায় ইপিজেড-এ, কেউ যায় ঢাকায়। যাদের কোথাও যাবার জায়গা নেই তারা চাপ সৃষ্টি করে প্রসিতকে সমঝোতা করার জন্য। সমঝোতা প্রস্তাব দিতে বাধ্য হয় প্রসিত। জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকেও তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়া হয়। কারণ জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক নীতি হচ্ছে- 'শত্রুকে নিরপেক্ষ করা, নিরপেক্ষকে সক্রিয় করা এবং সক্রিয়কে আরো অধিকতর সক্রিয় করা।' পার্টির সাংগঠনিক এই নীতি অনুযায়ী প্রসিত চক্রের সাথে সমঝোতার জন্য বৈঠক করে ২০ ফেব্রুয়ারী ২০০০ তারিখে খাগড়াছড়ির নারারখাইয়ার অনন্ত বিহারী খীসার বাড়ীতে। সেখানে জেএসএস এর পক্ষে নেতৃত্ব দেন তাতিন্দ্র লাল চাকমা (মেজর পেলে)। প্রসিত চক্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দীপ্তি শংকর চাকমা। উভয় পক্ষ একমত হয়ে সমঝোতা চুক্তি করেন যে,

১. ইতিমধ্যে যারা অপহৃত হয়েছেন তাদের উদ্ধারকল্পে উভয় পক্ষ পারষ্পরিক সগযোগিতা প্রদান করবে।

২. উভয় পক্ষ চলাফেরা কালীন কোন প্রকার বাধা, ধর-পাকড় করবে না এবং মিটিং মিছিলে কোন পক্ষ প্রতিপক্ষকে কোন বাধা প্রদান করবে না।

৩. যোগাযোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আলোচনায় বসার দিন, তারিখ ও জায়গা ঠিক করা হবে।

কিন্তু সমঝোতা চুক্তির ১২ ঘন্টার পর প্রসিত চক্র সমিতির একজন সদস্য সুখেন্দু বিকাশ চাকমাকে খাগড়াছড়ির দাঁতকুপ্যা এলাকায় গুলি করে হত্যা করে। ফলে চুক্তি কাগজে লেখা ছাড়া বাস্তবে আর কিছুই হয়নি। প্রসিত চক্রের সমঝোতা চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল সমঝোতার নামে পার্টির সদস্যদের খুন করা এবং সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করা। যেভাবে করেছিল আশির দশকে বিভেদপন্থী গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্ররা। তারাও সমঝোতার কথা বলে জুম্ম জাতীয় চেতনার অগ্রদূত এম এন লারমাকে '৮৩ সালের ১০ নভেম্বরে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর প্রসিত চক্র আবারো সমঝোতার প্রস্তাব দেয় যখন পার্টির সদস্য জীবন প্রদীপ দেওয়ানকে অপহরণ করেও স্থানীয় জনগণের চাপের মুখে হত্যা করতে পারেনি কিংবা টাকার বিনিময়ে তার আত্মীয়-স্বজনরা তাকে ছাড়িয়ে আনেননি। তিন পার্বত্য জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের কাছে প্রস্তাব দেয় যে, জনসংহতি সমিতি যদি সমঝোতা বৈঠকে বসতে রাজী হয় তাহলে তারা জীবন প্রদীপ দেওয়ানকে নিঃশর্ত মুক্তি দেবে। তিন পার্বত্য জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের আহ্বানে জনসংহতি সমিতি সাড়া দিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০০ সমঝোতা বৈঠকে বসতে রাজী হয়। সেই বৈঠকে জেএসএস এর পক্ষে ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক লক্ষ্মী প্রসাদ চাকমা ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদক সত্যবীর দেওয়ান। অপরপক্ষে প্রসিত চক্রের পক্ষে ছিলেন সঞ্চয় চাকমা, অভিলাষ চাকমা ও অনিমেষ চাকমা। তিন পার্বত্য জেলা থেকে গৌতম দেওয়ান, মুধুরা লাল চাকমা, উপেন্দ্র লাল চাকমাসহ অনেকেই ছিলেন। প্রসিত চক্রের পক্ষ থেকে সেই বৈঠকে আবারও প্রস্তাব দেয়া হয় যে, উভয়ের মধ্যে আক্রমণ না করা ও ন্যূনতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে আন্দোলন করা। সেই বৈঠকে জেএসএস এর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, প্রসিত চক্র যে সকল অস্ত্র দিয়ে চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ইত্যাদি করে থাকে সে সকল অস্ত্র তৃতীয় কোন পক্ষের হাতে জমা দিতে হবে এবং জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে সকল সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া জনসংহতি সমিতি যেহেতু চুক্তি করেছে চুক্তি বাস্তবায়নই হচ্ছে আমাদের আপাততঃ কর্মসূচী। কাজেই চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসলে সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু প্রসিত চক্র কোন প্রস্তাবেই সাড়া দেয়নি। ফলে কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেই বৈঠকের অপমৃত্যু ঘটে।

প্রসিতের অনেক অগুণের মধ্যেও কিছু কিছু গুণ আছে। তার মধ্যে একটি হলো মানুষের দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করা। তিনি এটা প্রয়োগ করে চলেছেন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জন্মের পর থেকে আজ অবধি। যে কথা আমি শুরুর দিকে বলেছি পিসিপি'র প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবে প্রসিতকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে চবি'র অনেক ছাত্রনেতৃবৃন্দের দ্বিমত ছিল। তারপরও বৃহত্তর ঐক্যের কথা ভেবে ধীরাজ চাকমা ও ধীমান চাকমারা তাকে অন্তর্ভুক্ত করে সদস্য হিসেবে। দ্বিতীয় কমিটিতে সে যখন ভালো কোন পদে যেতে পারলো না তখন দ্বিতীয় কমিটির অনেক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে গ্রুপিং করতে থাকলো। সে সময় কাজে লাগালো এডভোকেট শক্তিমান চাকমাসহ বেশ কয়েকজনকে। বিশেষ করে কাজে লাগিয়েছে জনসংহতি সমিতির ভাবমূর্তিকে। জনসংহতি সমিতির পৃষ্ঠপোষকতায় ও এডভোকেট শক্তিমান চাকমাদের সহযোগিতায় তৃতীয় কমিটিতে প্রসিত সভাপতির পদটি দখল করে নেয়। তৃতীয় কমিটির মেয়াদ যখন শেষ প্রান্তে তার কিছু পকেট কর্মী দিয়ে প্রচার করলো সে আর কমিটিতে থাকছে না। এমনি কি গলায় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখলেও থাকবে না। অথচ ভিতরে ভিতরে করলো লবিং ও গ্রুপিং। ফলে কাউন্সিলে এসে সে আবার দখল করে নিলো সভাপতির পদটি। সে যখন বিদায় নিয়ে যাচ্ছে তখন সভাপতি হওয়ার কথা ছিল এডভোকেট শক্তিমান চাকমার। কিন্তু কাউন্সিলের ৩/৪ মাস আগে কোন একটা ব্যক্তিগত বিষয়ে শক্তিমান চাকমার সাথে বিরোধ লেগে যায় তার। তখন তিনি কে এস মং মারমাকে সভাপতি করার প্রস্তাব দেয়। কে এস মং মারমা যেহেতু মারমা সমম্প্রদায়ের সেহেতু বৃহত্তর স্বার্থে শক্তিমান চাকমা তার জন্য সভাপতির পদটি ছেড়ে দেন। কে এস মং কমিটির সভাপতি হলেও খুব বেশী দিন কাজ করতে পারেননি। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে অসহযোগিতা করা হয়েছে। ফলে তিনি দায়িত্ব নেয়ার কয়েক মাস

পর পরই বান্দরবানে চলে যান। কেন্দ্রীয় দপ্তর ছেড়ে কেন বান্দরবানে অবস্থান করছেন-এই প্রশ্ন কে এস মং মারমাকে প্রতিনিধি সম্মেলনে করা হলে তিনি জবাব দেন, 'আমি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হয়েও আমি জানি না কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তগুলো কখন-কোথায় হয়, কিভাবে আসে?' অপরদিকে প্রসিত পিসিপি থেকে বিদায় নেয়ার পর পাহাড়ী গণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রধীর তালুকদারকে কৌশলে সরিয়ে ঐ পদটি দখল করে নেয়। প্রসিতের রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় বিষয় ছিল প্রসিত যখনই সর্বোচ্চ পদে আসীন হন তখন অর্থ সম্পাদক পদটি দেবাশীষ চাকমা বাবলুকে দেন। ইউপিডিএফ গঠনের আগ পর্যন্ত প্রসিত পাহাড়ী গণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদটি দখল করে রাখে এবং দেবাশীষ চাকমা আমেরিকা যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রসিতের অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

জনসংহতি সমিতির ঢাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সমীরণ চাকমা প্রসিতের খপ্পরে পড়ে পাহাড়ী গণ পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকাকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের দিন প্রসিতের নির্দেশে তিনি বিবিসিতে এক স্বাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারে বলেন, চুক্তি করে আমরা কিছুই পাইনি। অথচ '৯৮ এর ২৬ ডিসেম্বর যখন ৫ সদস্য বিশিষ্ট ইউপিডিএফ এর আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হলো সেই কমিটিতে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হলো না। প্রয়োজন শেষে এক পর্যায়ে তাকে সংগঠন থেকে দূরে সরে রাখা হলো। ফলে তিনি পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে পার্টির সাথে হাত মেলায়। এভাবে অসংখ্য মানুষকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য প্রসিত ব্যবহার করেছে এবং প্রয়োজন শেষে দূরে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমানে যারা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে তাদেরকেও একদিন প্রসিত দূরে ছুড়ে ফেলে দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

প্রসিত বিকাশ খীসা একেবারে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক নয়

একথা ঠিক নয়। তিনিও একসময় জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক এবং জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পথিক ছিলেন। অনুরূপভাবে '৮৩ সালে গৃহযুদ্ধের মূল হোতা জুম্ম জাতির মহান নেতা এমএন লারমার হত্যাকারীরাও দেশপ্রেমিক ছিলেন তারাও জুম্ম জাতির মুক্তির জন্যে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম সে সময়ে শাসকগোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পড়ে দেশ ও জাতির ক্ষতি সাধন করেছিল একথা কারো অজানা নয়। প্রসিত খীসার রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে বিশেষ করে ৯৭ থেকে আজ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক কার্যকলাপগুলি বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তার জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম জুম্ম জাতিকে প্রতিনিয়ত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জুম্ম জনগণ তিল তিল করে বহু রক্ত, শ্রম ও মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে সংগ্রামী ঐতিহ্য গড়ে তুলেছিল প্রসিতের হঠকারী কার্যকলাপের জন্য তা আজ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তার সেই জাতীয় মুক্তির আকাঙ্খা জাতিকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করতে চলেছে। প্রসিত খীসার এই বিষয়গুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করে সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অনুরূপভাবে প্রসিতের পক্ষ হয়ে যারা জাতিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে তাদেরও বিষয়টা গভীরভাবে উপলব্ধি করার সময় এসেছে বলে মনে করি। 

অনেক অনেক নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্খীদের অপহরণ করতে, রাতের অন্ধকারে খুন হতে। তাদের এই বিবৃতির পর অনেকগুলোর ঘটনার মধ্যে দু'টো ঘটনার বিবরণ দেবো।

এক.

গত ১৮ অক্টোবর ২০০১ তারিখে প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীরা মহালছড়ি থানার মুবাছড়ির খুলারাম পাড়ায় যায়। সেখান থেকে তারা ৫ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তিনজনকে ছেড়ে দিলেও বাকী ২ জনের মধ্যে আইনষ্টাইন চাকমার কোন হদিশ পাওয়া যায়নি। সম্ভবতঃ তাকে খুন করা হয়েছে। অপর একজন হলেন প্রসিতের আপন চাচাতো ও খালাতো ভাই বাপ্পী খীসা অর্থাৎ প্রসিত ও বাপ্পীর বাবারা আপন ভাই এবং উভয়ের মা আপন বোন। অথচ বাপ্পীকে প্রসিত চক্রের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনতে মুক্তিপণ দিতে হয়েছে ৪ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা। সন্ত্রাসীদের নেতা অভিলাষ চাকমা খাগড়াছড়ির পেরাছড়া এলাকায় সেই টাকা গ্রহণ করে বাপ্পী খীসাকে মুক্তি দেয়। বাপ্পী জনসংহতি সমিতির কোন নেতা বা কর্মী ছিলেন না। তারপরও তাকে কেন অপহরণ করার পর মুক্তিপণ আদায় করা হলো এই প্রশ্ন সবার, ব্যক্তিগতভাবে আমারও। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি পারিবারিক শত্রুতাকে কাজে লাগিয়েছে প্রসিত। প্রসিতের দাদী খুলারাম পাড়ায় মৃত্যুবরণ করেন কয়েক বছর আগে প্রসিতের এক চাচার বাসায়। সেই সময়ে প্রসিতের সেই চাচা ছিলেন সমাজচ্যুত। সামাজিক অপরাধ করার কারণে গ্রামের কেউ তার বাসায় যেতো না। মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে প্রসিতের বাবা গ্রামের বাড়ী গিয়ে দেখতে পান তার মায়ের মৃতদেহ ছোট ভাইয়ের বাসায় গ্রামের লোকজন ছাড়া পড়ে রয়েছে। গ্রামের কেউ সেখানে নেই। দাহ করারও কোন আয়োজন নেই। প্রসিতের বাবা অনন্ত বিহারী গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বীকে ডেকে পাঠালেন তার কাছে যাওয়ার জন্য। তারপরও কেউ গেলো না। পরে তিনি গ্রামের প্রতিটি বাড়ীতে গিয়ে সবার কাছ থেকে ক্ষমা চাইলেন এবং অনুরোধ করলেন অন্ততঃ মায়ের মৃতদেহটা যেন সৎকার করা হয়। তখন গ্রামবাসী সবাই মিলে মৃতদেহকে সৎকার করলো। অনন্ত বিহারী খীসা নিজেকে অনেক পন্ডিত এবং সম্মানী মানুষ হিসেবে ভাবতেন। গ্রামবাসীদের কাছে ক্ষমা চাওয়াটা অপমান হিসেবে ধরে নিয়ে তিনি কোন মতেই তা মেনে নিতে পারেননি। সেই ঘটনার জন্য তার আরেক ভাইয়ের ছেলে প্রজ্ঞান খীসা ও বাপ্পী খীসাকে দায়ী করতেন। তাদের কারণে গ্রামবাসীদের কাছে মাথানত করতে হয়েছে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। অনুরূপভাবে প্রসিতও তার বাবার সেই অপমানিত হওয়ার ঘটনা সহজেই মানতে পারেনি। তাই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এই অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়। উল্লেখ্য যে, বাপ্পীকে অপহরণ করার পর তার মা অনন্ত বিহারী খীসার বাসায় যান ছেলের মুক্তির ব্যাপারে। তখন অনন্ত বিহারী খীসা তাকে বলেন 'এটা ছেলেদের ব্যাপার, আমি কিছুই জানি না এবং কিছুই করতে পারবো না'। অথচ খাগড়াছড়ির সবাই জানে অনন্ত বিহারী খীসা প্রসিত চক্রের সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতা এবং অন্যতম উপদেষ্টা। সেই সময় প্রসিত চক্র অনন্ত বিহারী খীসার বাড়ীতে ইউপিডিএফের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা গড়েছে।

দুই.

গত ২৩ ডিসেম্বর ২০০১ তারিখে একদল চুক্তি বিরোধী সন্ত্রাসী রাঙ্গামাটি জেলাধীন লংগদু থানার তিনটিলা গ্রামে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে দেব বিকাশ চাকমাকে (সুবীর ওস্তাদ) দরজা ভেঙ্গে বাড়ীতে ঢুকে গুলি করে হত্যা করে। শহীদ দেব বিকাশ চাকমা জনসংহতি সমিতির লংগদু থানা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সালে তাঁর বয়স যখন পনর কি যোল বছর তখন জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেন। দীর্ঘ দুই দশকের বেশী সময় ধরে সশস্ত্র সংগ্রামে অমূল্য অবদান রেখেছেন। তিনি জীবন বাজী রেখে শত্রুবাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়ে শত্রুবাহিনীকে পরাস্ত করে অনেক অনেক অস্ত্র-গোলাবারুদ ছিনিয়ে এনেছেন এবং শত্রু শিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করেছেন। সেই সময়ে তাঁর নাম শুনলেই শত্রু শিবিরে আতঙ্ক সৃষ্টি হতো। অপরদিকে নতুন ভর্তি হওয়া সদস্যদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেক সুনাম অর্জন করেছেন। অথচ সেদিন সন্ত্রাসীরা রাতের অন্ধকারে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে। সেদিন সন্ত্রাসীদের বুলেটের আঘাতে দেব বিকাশ চাকমা শহীদ হলেন। অসময়ে অসহায়ভাবে ফেলে যেতে বাধ্য হলেন নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী ও অবুঝ চার সন্ত ানকে। তাঁর চার সন্তানের মধ্যে তিনজনই মেয়ে, একটি মাত্র ছেলে যার বয়স এখনো দুই মাস। বড় মেয়ে মঞ্জু অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে, দ্বিতীয় মেয়ে মহতী চতুর্থ শ্রেণীতে, তৃতীয় মেয়ের বয়স চার বছর। ২৫ ডিসেম্বর ২০০১ ইং দেব বিকাশ চাকমার অন্তোষ্টিক্রিয়ায় রাঙ্গামাটি থেকে জেএসএস এর সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে উষাতন তালুকদার ও চন্দ্রশেখর চাকমাসহ ১৬ জনের একটি প্রতিনিধিদল লংগদুতে যান। তাদের সাথে আমিও ছিলাম বীর শহীদ সুবীর ওস্তাদকে সর্বশেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। দেব বিকাশ চাকমার মৃতদেহ শশানে নেয়ার সাথে সাথে আমরাও তার স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম, শ্বাশান থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটি ফিরে আসবো বলে। শহীদ দেব বিকাশের স্ত্রী উষাতন তালুকদার, চন্দ্রশেখর চাকমাদের প্রণাম করার পর আমাকে প্রণাম করতে চাইলেন। আমি বাঁধা দিয়ে বললাম আমাকে নয়। তিনি স্বামী হারানোর শোকে এতটা চোখের জল ফেলে চলেছেন যে বুঝতে পারছেন না, কাকে কাকে প্রণাম করতে হবে। ভবিষ্যত অন্ধকার দেখছিলেন তিনি এই দুনিয়ায় চার অবুঝ সন্তানকে নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকবেন, কিভাবে চলবে তার সংসার? ছেলেমেয়েদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ পাবেন কোথায়? দুই মাস বয়সের ছেলে কথা বলতে শিখে যখন বাবাকে খুঁজবে কি জবাব দেবেন তিনি। কেন তার বাবাকে হত্যা করা হলো? তিনি নিশ্চয় জবাব দেবেন তোমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দীর্ঘ দুই দশকের বেশী সময় ধবে মাতৃভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষার জন্য তিনি যুদ্ধ করেছেন, যুদ্ধের কৌশল শিখিয়েছেন অনেককে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তির মাধ্যমে অধিকার নিয়ে ফিরে এসেছেন বলে একদল সন্ত্রাসী হায়েনার মতো হিংস্র হয়ে রাতের অন্ধকারে তোমার বাবাকে খুন করেছে।

ছেলেটি যখন বড় হয়ে সমাজের কাছে জানতে চাইবে তার বাবার কি অপরাধ ছিল? কি জবাব দেবে সমাজ? প্রসিত খীসা ও সঞ্চয় গংরাই বা কি জবাব দেবে?

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা