মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডা. ভগদত্ত খীসা : চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও চাঙমা লিপি সংরক্ষণের এক অগ্রপথিক - ইনজেব চাঙমা

“মামা করত গুরিনেই, বাবা কানাত চুরিনেই নানু পিদিত বুগিনেই- যিয়োং ভারদত যিয়োং ওপারত।”

কয়েকটি পংক্তি- কিন্তু তার ভেতর যেন লুকিয়ে আছে একটি জাতির দীর্ঘশ্বাস। আছে উদ্বাস্তু জীবনের দুঃসহ স্মৃতি, হারিয়ে ফেলা ঘরবাড়ির বেদনা, স্বজন-বিচ্ছেদের হাহাকার এবং আপন মাটিতে ফিরে যাওয়ার এক গভীর আকুতি। ডা. ভগদত্ত খীসার জনপ্রিয় গানগুলো শুধু সুর ও কথার সমন্বয় নয়; সেগুলো পাহাড়ের মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও সমষ্টিগত অনুভূতির একেকটি মৌখিক দলিল।

“আয় আয় ও চানান”, “ভিন পারাল্যা বো চেলে বুক জ্বলে, মর মন জ্বলে”, “ধান খেলে মুরত যা”,  এ ধরনের জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা ডা. ভগদত্ত খীসা ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভা। চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করেছেন, সাহিত্যিক হিসেবে লিখেছেন কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক ও লিমেরিক; গীতিকার হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে তাঁর গান। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন নিজের ভাষা, লিপি, ঐতিহ্য ও জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণে সচেতন এক চিন্তাশীল মানুষ।

তাঁর জীবন তাই কেবল একজন চিকিৎসকের জীবনকথা নয়; এটি পাহাড়ের মানুষের জীবন, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক মননশীল মানুষের কর্মযাত্রার ইতিহাস।

১৯৩৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর (১৫ ভাদ্র) বর্তমান নান্যাচর উপজেলার সাবেক্ষ্যং গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত চাকমা পরিবারে ভগদত্ত খীসার জন্ম। তাঁর পিতা কৃষ্ণ মোহন খীসা এবং মাতা ষোড়শী বালা খীসা। পারিবারিকভাবে তিনি চাকমা সমাজের মুহলিমা গঝা ও কলাগুথি গোত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দত্ত’। সবিতা দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে তিন কন্যা ও দুই পুত্রের জন্ম।

সাবেক্ষ্যংয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে তিনি নান্যাচর মধ্য ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রামের জে. এম. সেন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আই.এস.সি. এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৫ সালে বি.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ষাটের দশকের শুরুতে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর অনেক সহপাঠী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ভগদত্ত খীসার সামনেও ছিল সেই সম্ভাবনা। কিন্তু বৃহত্তর পেশাগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে নিজের মানুষের কাছে থাকা এবং তাঁদের সেবা করাকেই তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন।

১৯৬৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটির রিজার্ভ বাজারে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। দরিদ্র ও অসহায় পাহাড়ি মানুষের জন্য তাঁর চেম্বার হয়ে উঠেছিল আস্থার ঠিকানা। চিকিৎসাকে তিনি নিছক পেশা হিসেবে দেখেননি; মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক বাস্তব অনুশীলন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু মানুষের শরীরের চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁর আরেকটি গভীর সাধনা ছিল, মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা। ছাত্রজীবন থেকেই ভগদত্ত খীসার লেখালেখির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা হলের বার্ষিকীতে তাঁর কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে চাকমা ও বাংলা ভাষায় তাঁর কবিতা, ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সাময়িকী, সংকলন ও লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি কোনো একটি সাহিত্যধারায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ, নাটক ও লিমেরিক, বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি নিজের ভাবনা প্রকাশ করেছেন। চাকমা ভাষায় লিমেরিক রচনার ক্ষেত্রেও তাঁর অগ্রণী ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

তবে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় অধ্যায় সম্ভবত তাঁর গান। তাঁর গান পাহাড়ের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষত উদ্বাস্তু জীবনের স্মৃতি, স্বদেশের জন্য আকুতি, প্রেম, বিরহ ও মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতি তাঁর গানে সহজ অথচ গভীর ভাষা পেয়েছে।

ফলে তাঁর গান কেবল ব্যক্তিগত সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মানুষের সমষ্টিগত স্মৃতি ও আবেগের অংশ হয়ে উঠেছে।

ডা. ভগদত্ত খীসার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল চাঙমা সমাজের নিজস্ব জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করার প্রয়াস।

চাঙমাদের ঔষধ ও চিকিৎসাবিষয়ক ঐতিহ্যগত জ্ঞান বা তাহ্লিক শাস্ত্র চাঙমা লিপিতে সংরক্ষিত ছিল। এই জ্ঞানকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, নিজস্ব চিকিৎসাজ্ঞানকে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হলে চাঙমা বর্ণমালা ও লিপির প্রশ্নটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

এই অনুসন্ধান থেকেই তাঁর মধ্যে চাঙমা লিপি নিয়ে নতুনভাবে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি যখন ‘চাঙমা তালিক চিকিৎসা’ গ্রন্থ প্রণয়নের কাজে যুক্ত হন, তখন চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও আরও গভীর হয়ে ওঠে। চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভাণ্ডার লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে তিনি আসলে ভাষা ও লিপি সংরক্ষণের বৃহত্তর প্রয়োজনটিকেই সামনে নিয়ে আসেন।

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘চাঙমা তালিক চিকিৎসা’ তাই কেবল চিকিৎসাবিষয়ক একটি গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল চাঙমা সমাজের নিজস্ব জ্ঞান, ভাষা ও লিপিকে লিখিত পরিসরে ধরে রাখার একটি সাংস্কৃতিক প্রয়াস।

চাঙমা বর্ণমালাকে ঘিরে তাঁর আগ্রহ পরবর্তীকালে আরও বিস্তৃত সামাজিক উদ্যোগে রূপ নেয়। লিপি যদি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার প্রাণশক্তি টিকে থাকে না; নতুন প্রজন্মের হাতে তাকে তুলে দিতে হয়। এই উপলব্ধি থেকেই শিশুশিক্ষার উপযোগী পাঠ্যসামগ্রী তৈরির প্রয়োজন সামনে আসে।

এই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে ডা. ভগদত্ত খীসা সম্পাদনা পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ‘চাঙমা পাত্থম পাত’ নামের একটি শিশুপাঠ্য গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেন। রাঙ্গামাটি উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত এই বইয়ের উদ্দেশ্য ছিল ছোটদের সহজভাবে চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত করে তোলা।

বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে চাঙমা লিপি শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক পরিসরে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ৪৫৮ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে চাঙমা বর্ণমালা শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। সংখ্যার বিচারে এটি হয়তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের একটি কার্যক্রম; কিন্তু সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের বিচারে এর গুরুত্ব অনেক গভীর।

কারণ, একটি লিপির অস্তিত্ব কেবল তার বর্ণমালার অস্তিত্বে নয়, তার পাঠক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যেই তার ভবিষ্যৎ নিহিত। ডা. ভগদত্ত খীসা সেই ভবিষ্যতের কথাই ভেবেছিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থ রচনার সূত্রে যে লিপির প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল, পরবর্তীকালে সেই লিপিকেই শিশুর হাতে তুলে দেওয়ার কাজে তিনি যুক্ত হন। এ এক তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিক্রমা।

সাহিত্যের পাশাপাশি নাট্যচর্চাতেও তাঁর অবদান ছিল। তিনি নাটক রচনা ও অনুবাদ করেছেন। তাঁর অনূদিত ‘অয় নয় বৈদ্য’ বিভিন্ন সময়ে মঞ্চস্থ হয়েছে। নাটকের মাধ্যমে চাকমা ভাষার সাহিত্যকে অভিনয় ও মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্যিক সত্তার পরিচয় বহন করে।

তাঁর গবেষণামনস্কতার আরেকটি দিক ছিল ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাজ্ঞান অনুসন্ধান। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত একজন চিকিৎসক হয়েও তিনি নিজের জনগোষ্ঠীর প্রাচীন জ্ঞান ও লোকজ চিকিৎসাপদ্ধতিকে অবহেলা করেননি। বরং তা সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও লিখিতভাবে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন।

জীবনের শেষ পর্যায়েও সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা অটুট ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের লেখকদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

২০০১ সালের ১৫ অক্টোবর গঠিত ‘জুম্ম লেখক ফোরাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নিজ নিজ পরিসরে বিচ্ছিন্ন সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডকে বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা।

ডা. ভগদত্ত খীসার জীবনকে কয়েকটি পরিচয়ে ভাগ করে দেখা যায়, তিনি চিকিৎসক, সাহিত্যিক, গীতিকার, গবেষক, অনুবাদক, সাংস্কৃতিক সংগঠক। কিন্তু এই পরিচয়গুলো আসলে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাঁর চিকিৎসা তাঁকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছে; সাহিত্য তাঁকে মানুষের মনের কাছে পৌঁছে দিয়েছে; আর ভাষা ও লিপি নিয়ে তাঁর কাজ তাঁকে একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতির কাছে দাঁড় করিয়েছে।

তাঁর ‘চাঙমা তালিক চিকিৎসা’ থেকে ‘চাঙমা পাত্থম পাত’ এই যাত্রাপথ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমটি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাজ্ঞানকে লিখিতভাবে সংরক্ষণের প্রয়াস, আর দ্বিতীয়টি নতুন প্রজন্মকে চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত করার প্রয়াস। অর্থাৎ একদিকে তিনি অতীতের জ্ঞানকে ধরে রাখতে চেয়েছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে সেই ভাষা ও লিপির চাবিকাঠি তুলে দিতে চেয়েছেন।

এই জায়গাতেই ডা. ভগদত্ত খীসার কাজ কেবল সাহিত্যিক বা ব্যক্তিগত সৃষ্টির সীমা অতিক্রম করে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে ওঠে।

দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ডা. ভগদত্ত খীসা ২০০২ সালের ২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবনের অবসান ঘটলেও তাঁর কর্মের উত্তরাধিকার রয়ে গেছে মানুষের স্মৃতিতে, জনপ্রিয় গানে, সাহিত্যকর্মে, গবেষণায় এবং চাঙমা ভাষা-লিপি সংরক্ষণের নানা প্রয়াসে।

২০১২ সালে রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত ‘ডা. ভগদত্ত খীসা রচনাস্মারক’ তাঁর জীবন ও কর্মকে স্মরণ করার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।

ডা. ভগদত্ত খীসা ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি মানুষের শরীরের অসুখ সারাতে চিকিৎসাবিদ্যা ব্যবহার করেছেন, আর মানুষের ইতিহাস, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়কে ধরে রাখতে ব্যবহার করেছেন তাঁর কলম। তাঁর গান উদ্বাস্তু মানুষের বেদনার ভাষা হয়েছে; তাঁর সাহিত্য পাহাড়ের মানুষের জীবনকে ধারণ করেছে; তাঁর গবেষণা ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে লিখিত রূপ দিয়েছে; আর চাঙমা লিপি শিক্ষার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে ভাষার উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

তাই তাঁকে শুধু একজন চিকিৎসক বা সাহিত্যিক হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি পূর্ণ সুবিচার হয় না। তিনি ছিলেন মানুষের চিকিৎসক, ভাষার সাধক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক নিবেদিত সংরক্ষক। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতির অস্তিত্ব কেবল তার ভূখণ্ডে নয়; তার ভাষা, লিপি, গান, সাহিত্য, স্মৃতি ও জ্ঞানভাণ্ডারের মধ্যেও তার গভীরতম পরিচয় নিহিত।

তথ্যসূত্র:
ডা. ভগদত্ত খীসা রচনাস্মারক, রাঙ্গামাটি, ২০১২ খ্রি.

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চুণীলাল দেওয়ান : পাহাড়ের শিল্প-সাহিত্যের এক অগ্রপথিক - ইনজেব চাঙমা

বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তখনও আধুনিক শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির মূল স্রোত থেকে অনেক দূরে। দুর্গম পাহাড়, অরণ্য, নদী আর বিচ্ছিন্ন জনপদের সেই সময়ে শিল্পচর্চা ছিল প্রায় অকল্পনীয় এক সাধনা। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার অপ্রতুলতা এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের সংকীর্ণতার মধ্যেও পাহাড়ের বুক থেকে উঠে এসেছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি তাঁর তুলির আঁচড়ে পাহাড়কে দেখেছিলেন নতুন চোখে, কবিতায় তাকে দিয়েছিলেন ভাষা, গানে দিয়েছিলেন সুর এবং ভাস্কর্যে দিয়েছিলেন অবয়ব। তিনি চুণীলাল দেওয়ান।

চুণীলাল দেওয়ান ছিলেন শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক ভাস্কর। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বহুমাত্রিক, কিন্তু তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটিইনিজের মাটি, নিজের মানুষ এবং নিজের চারপাশের প্রকৃতি। পাহাড়ের জীবন, নদী-নালা, অরণ্য, মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন, প্রেম, ধর্মীয় অনুভব এবং প্রকৃতির অনন্ত সৌন্দর্য তাঁর শিল্পীসত্তাকে বারবার আলোড়িত করেছে।

এই কারণেই চুণীলাল দেওয়ানের জীবনকে কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনী হিসেবে দেখলে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক শিল্প-সাহিত্যচর্চার এক অগ্রদূত এবং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

চুণীলাল দেওয়ানের পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। প্রচলিত বংশতথ্য অনুযায়ী তিনি চাকমা রাজপরিবারের ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং রাজা শের দৌলত খান তাঁর উত্তরসূরি রাজা জানবক্স খানের বংশধারার একজন উত্তরসূরি (১০ম)

এই বংশপরিচয় তাঁর জীবনের একটি ঐতিহাসিক পটভূমি হলেও চুণীলাল দেওয়ানের প্রকৃত পরিচয় শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে তাঁর নিজস্ব প্রতিভা সৃষ্টিকর্মে। উত্তরাধিকার তাঁকে একটি ইতিহাস দিয়েছিল; কিন্তু শিল্প তাঁকে দিয়েছিল নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়।

চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের পারিবারিক পরিচয়ও তাঁর জীবন কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর পিতা ছিলেন শশী কুমার দেওয়ান এবং মাতা নয়নতারা দেওয়ান। শশী কুমার দেওয়ানের প্রথম স্ত্রী নয়নতারা দেওয়ানের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন প্রতুল চন্দ্র দেওয়ান, পান্না লাল দেওয়ান চুণীলাল দেওয়ান। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর শশী কুমার দেওয়ান বিম্বলতা দেওয়ানকে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। এই দাম্পত্যে তাঁদের চার সন্তান- সরোজ কুমারী দেওয়ান, অমরাবতী দেওয়ান, হীরালাল দেওয়ান মানিক লাল দেওয়ান।

চুণীলাল দেওয়ানও পারিবারিক জীবনে দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন চারুবালা দেওয়ান। তাঁদের দাম্পত্যে জন্মগ্রহণ করেন রণজিৎ কুমার দেওয়ান তরিৎ কুমার দেওয়ান। চারুবালা দেওয়ানের মৃত্যুর পর চুণীলাল দেওয়ান গামারীঢালা নিবাসী ব্রুজমোহন দেওয়ানের সুযোগ্য কন্যা বসুন্ধরা দেওয়ানকে বিবাহ করেন।

বসুন্ধরা দেওয়ান ছিলেন কেবল চুণীলাল দেওয়ানের সহধর্মিণী নন; তিনি নিজেও ছিলেন চাঙমা সমাজের এক ব্যতিক্রমী প্রজ্ঞাবান নারী। সামাজিক নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রথম নারী হেডম্যান বাজার চৌধুরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সত্যনিষ্ঠা নির্ভীকতার জন্য পরিচিত ছিলেন। সমাজজীবনে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে চাঙমা সমাজের একজন বিদুষী সাহসী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আদিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে আদিবাসী ফোরাম, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা কর্তৃক তিনি মরণোত্তর সম্মাননা পদকে ভূষিত হন।

চুণীলাল দেওয়ান বসুন্ধরা দেওয়ানের দাম্পত্যে জন্মগ্রহণ করেন দেবী প্রসাদ দেওয়ান, সত্য প্রসাদ দেওয়ান, নীতি প্রসাদ দেওয়ান পৌরিকা দেওয়ান। ফলে চুণীলাল দেওয়ানের পারিবারিক উত্তরাধিকার একদিকে যেমন শিল্প সাহিত্যসাধনার স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে তেমনি তা পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত।

বসুন্ধরা দেওয়ানের জীবনের সঙ্গে চুণীলাল দেওয়ানের সৃষ্টিশীলতারও একটি বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে।কর্ণফুলী কন্নানামে পরিচিত বেদনামথিত সৃষ্টির মূল সূত্রধর হিসেবে বসুন্ধরা দেওয়ানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর জীবন, অভিজ্ঞতা অনুভব চুণীলাল দেওয়ানের সৃষ্টিশীল জগতে যে প্রভাব ফেলেছিল, তা তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ককে নিছক পারিবারিক পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তা শিল্প জীবনকে এক অভিন্ন অভিজ্ঞতায় যুক্ত করেছিল।

চুণীলাল দেওয়ানের জন্ম ফেব্রুয়ারি ১৯১১ সালে। তাঁর জন্ম হয়েছিল পিতার কর্মস্থল দিঘীনালায়; আর পৈতৃক নিবাস ছিল বর্তমান রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার চেঙ্গী বড়াদম গ্রামে। তাঁর পিতা শশী কুমার দেওয়ান তৎকালীন দিঘীনালা থানায় সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। মাতার নাম নয়নতারা দেওয়ান। শৈশবেই মাতৃহারা হন চুণীলাল। জীবনের সেই প্রারম্ভেই হয়তো নিঃসঙ্গতার সঙ্গে তাঁর যে পরিচয় তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী জীবনে সেটিই তাঁর স্বভাবের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। তিনি ছিলেন শান্ত, সংযমী, মিতব্যয়ী এবং অনেকটা নিভৃতচারী প্রকৃতির মানুষ।

শৈশব থেকেই তাঁর আকর্ষণ ছিল গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে। ছবি আঁকা, কবিতা লেখা, গান গাওয়া এবং বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রতি তাঁর সহজাত আগ্রহ ছিল। তাঁর ভেতরে যেন জন্ম থেকেই একজন শিল্পী নিঃশব্দে বেড়ে উঠছিলেন।

নানিয়ারচর এম.. স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষার গণ্ডি তাঁর সৃজনশীল মনকে ধরে রাখতে পারেনি। শিল্পের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় কলকাতায়।

১৯২৭ সালে তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস, চৌরঙ্গিতে প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে কলকাতা আর্টস স্কুলে অধ্যয়ন করেন। দীর্ঘ ছয় বছরের শিল্পশিক্ষা শেষে ১৯৩৪ সালে আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটসের কমার্শিয়াল বিভাগে ডিগ্রি লাভ করেন।

সেই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দুর্গম অঞ্চল থেকে কলকাতায় গিয়ে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল অসাধারণ সাহস সংকল্পের ব্যাপার। তাঁর সামনে ছিল না আজকের মতো সহজ যোগাযোগ, ছিল না আধুনিক শিক্ষার সুযোগ। তবু তিনি পাহাড় পেরিয়ে নগরে গিয়েছিলেন নিজের ভেতরের শিল্পীকে খুঁজে নিতে।

কলকাতার শিল্পপরিবেশ তাঁর শিল্পদৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি পাশ্চাত্যধর্মী চিত্রকলার প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট ছিলেন। প্রকৃতির দৃশ্য, মানুষের স্বাভাবিক অবয়ব, আলো-ছায়া বাস্তবতার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। একই সঙ্গে ভারতীয় শিল্পভাবনার সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটে।

এই সময়েই তাঁর সঙ্গে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই বন্ধুত্ব বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসেরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়ে পরিণত হয়।

চুণীলাল দেওয়ানের শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি তাঁর চারপাশের পৃথিবীকে ভালোবাসতেন। পাহাড় তাঁর কাছে শুধু ভৌগোলিক এলাকা ছিল না; ছিল এক জীবন্ত সত্তা।

তাঁর তুলিতে উঠে এসেছে পাহাড়ের ঢেউখেলানো রেখা, নদীর শান্ত প্রবাহ, অরণ্যের গভীরতা, মানুষের মুখ, পাহাড়ি জীবনের সরলতা এবং প্রকৃতির বিচিত্র রূপ। তিনি প্রকৃতিকে আঁকেননি শুধু চোখে দেখা দৃশ্য হিসেবে; বরং তার মধ্যে খুঁজেছেন মানুষের জীবন অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।

রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর ঢাকায় আয়োজিত বিভিন্ন চিত্রপ্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। তাঁর চিত্রকর্ম শিল্পরসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা তাঁর শিল্পকর্মের প্রশংসা করেছিলেন বলেও তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৫৫ সালের ঢাকার ফোক আর্টস প্রদর্শনীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনাটি তাঁর শিল্পজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। তাঁর আঁকা নকশা রেখাচিত্র দেখে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন কামরুল হাসান মুগ্ধ হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন জনে লেখা তাঁর জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই পরিচয়ের সূত্রেই জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়। তাঁদের যৌথভাবেজলপ্রপাতচিত্র অঙ্কনের কথাও বিভিন্ন জীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ আছে। এই ঘটনাটি শুধু দুই শিল্পীর বন্ধুত্বের স্মারক নয়; বরং পাহাড়ের শিল্পভাবনা বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সংযোগের প্রতীক।

চুণীলাল দেওয়ানের ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ দিক ছিল, তিনি চিত্রকলাকে মূলত অর্থ উপার্জনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে ছবি আঁকা ছিল আত্মপ্রকাশের একটি মাধ্যম।

তিনি পাহাড়ের সৌন্দর্যকে আঁকতেন কারণ পাহাড় তাঁর আপন পৃথিবী। তাঁর শিল্পে তাই কৃত্রিমতার চেয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি। তিনি নিজের সময়ের মানুষের জীবন, প্রকৃতি সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে চেয়েছেন। ফলে তাঁর শিল্পকর্ম এক অর্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও দৃশ্যমান দলিল।

শিল্পশিক্ষা শেষ করে তিনি নিজের অঞ্চলে ফিরে আসেন। ১৯৪৬ সালে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ড্রয়িং শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করেন।

শিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু নিজে ছবি আঁকেননি; নতুন প্রজন্মের কাছে চিত্রকলার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার কাজও করেছেন। তাঁর ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, আর বৃহত্তর সমাজের কাছে একজন শিল্পী।

পরবর্তী সময়ে তিনি দুটি মৌজার হেডম্যান এবং নানিয়ারচর বাজারের বাজার চৌধুরীর দায়িত্বও পালন করেন। ফলে তাঁর জীবন একদিকে শিল্পচর্চা, অন্যদিকে সামাজিক দায়িত্ব- এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছিল।

চুণীলালের প্রতিভা ক্যানভাসে থেমে থাকেনি। কলকাতায় শিল্পশিক্ষার সময়ই তিনি ভাস্কর্যচর্চায় দক্ষতা অর্জন করেন। মাটি, কাঠ সিমেন্টসহ বিভিন্ন উপাদানে তিনি ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন।

নানিয়ারচরের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে তাঁর নির্মিত বুদ্ধমূর্তির নিদর্শনের কথা জানা যায়। কাঠের ওপর খোদাই করা বুদ্ধ আনন্দের ভাস্কর্য এবং তাঁর নিজের প্রতিকৃতিও তাঁর ভাস্কর্যসত্তার স্মারক হয়ে আছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

একজন শিল্পীর জন্য এটি এক বিরল ক্ষমতা, একই সঙ্গে রেখা, রং ত্রিমাত্রিক অবয়বকে নিজের শিল্পভাষায় ধারণ করা।

চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যিক পরিচয় তাঁর শিল্পী পরিচয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম দিকের সাহিত্যপত্রগৈরিকাপ্রকাশিত হয় ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে, অর্থাৎ ১৯৩৬ সালে। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যার সুদৃশ্য প্রচ্ছদ চুণীলাল দেওয়ানের আঁকা ছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ‘গৈরিকা’- একাদশ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁরচাকমা কবিতাবাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম চাকমা আধুনিক কবিতা হিসেবে বিবেচিত।

এই একটি তথ্যই চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যিক গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট।

কারণ একটি ভাষার আধুনিক কবিতার সূচনা শুধু কয়েকটি পঙ্ক্তির জন্ম নয়; এটি একটি জাতিসত্তার নিজস্ব অনুভূতিকে নতুন সাহিত্যিক কাঠামো দেওয়ার ঘটনা। চুণীলাল দেওয়ান সেই কাজটিই করেছিলেন।

তাঁর কবিতায় প্রেম আছে, প্রকৃতি আছে, ধর্মীয় অনুভব আছে, আছে নির্মল সৌন্দর্যবোধ। পাহাড়ের প্রকৃতি তাঁর কাছে কখনো নিছক দৃশ্য নয়; তা হয়ে উঠেছে অনুভূতির ভাষা।

তাঁর প্রথম দিকের রচনাগুলোর মধ্যেফাল্গুনী পূর্ণিমাতে’- কথাও উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষায় রচিত এই দীর্ঘ কবিতাটিগৈরিকা’- প্রকাশিত হয়েছিল বলে আপনার সংগৃহীত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের বিস্তৃত অংশের একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন পরেনিবেদননামে প্রকাশিত হয়।

চুণীলাল ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যাঁর কাছে কবিতা গান ছিল একই অনুভূতির দুই রূপ। তিনি গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং নিজেই গেয়েছেন। হারমোনিয়াম, পিয়ানো, বাঁশি সেতার বাজাতে পারতেন। তাঁর গান কবিতার মধ্যে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা সৌন্দর্যের অনুভব মিশে আছে।

১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাপক নন্দলাল শর্মার সম্পাদনায়নিবেদননামে তাঁর গান কবিতার একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। সেখানে তাঁর ৩২টি গান কবিতা সংকলিত হয়েছিল বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরেও তাঁর সৃষ্টিকে সংগ্রহ করে প্রকাশ করার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। তাঁর আরও কিছু অপ্রকাশিত রচনা ছিল বলেও জানা যায়।

চুণীলাল দেওয়ান ছিলেন অন্তর্মুখী, সংযমী স্বাধীনচেতা মানুষ। তাঁর মধ্যে প্রচারের আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল না। নিজের কাজের মধ্যেই তিনি যেন নিজের অস্তিত্বের পূর্ণতা খুঁজে পেতেন।

কলকাতায় ছাত্রজীবনেও তিনি ছিলেন মিতব্যয়ী। শিল্পচর্চা প্রকৃতির প্রতি তাঁর টান ছিল গভীর। বন্ধুদের সঙ্গে প্রকৃতির দৃশ্য আঁকার জন্য দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু নিজের প্রচার বা খ্যাতি অর্জনের জন্য তিনি কখনো ব্যস্ত হয়ে ওঠেননি। এই নিভৃতচারিতাই হয়তো তাঁর শিল্পীজীবনের একদিকে সৌন্দর্য, অন্যদিকে দুর্ভাগ্য।

কারণ প্রতিভা থাকলেই ইতিহাসে জায়গা পাওয়া যায় না; প্রতিভার সংরক্ষণ, প্রচার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নও প্রয়োজন। চুণীলাল দেওয়ানের ক্ষেত্রে সেই কাজটি যথেষ্ট হয়নি। তাঁর অধিকাংশ চিত্রকর্ম সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। অল্প কিছু ছবি, ভাস্কর্য লেখা আজ তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

জীবনের শেষ পর্বেও তিনি শিল্পচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ আছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।

১৯৫৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর চুণীলাল দেওয়ান মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৪৪ বছরের জীবনে তিনি যে সৃষ্টির বিস্তার রেখে গেছেন, তা তাঁর আয়ুর তুলনায় বিস্ময়করভাবে দীর্ঘ।

চুণীলাল দেওয়ানের মৃত্যুর পর তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েছে, তাঁর ছবি বিভিন্ন সংগ্রহে সংরক্ষিত হয়েছে এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে। তাঁর স্মৃতি আজও নানিয়ারচর রাঙামাটির সাংস্কৃতিক পরিসরে জীবন্ত। এমনকি নানিয়ারচরের চেঙ্গী নদীর ওপর নির্মিত সেতুটিও তাঁর নামেচিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ান সেতুহিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।

নামকরণ কেবল একটি সেতুর নামকরণ নয়; এটি একটি অঞ্চলের স্মৃতির সঙ্গে একজন শিল্পীর নামকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার প্রয়াস।

চুণীলাল দেওয়ানকে কোনো একটি জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে দেখা তাঁর শিল্পীসত্তার প্রতি সুবিচার হবে না। তিনি যেমন চাকমা সমাজের গর্ব, তেমনি নানিয়ারচরের কৃতী সন্তান। তিনি যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ, তেমনি বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের বৃহত্তর ঐতিহ্যেরও অংশ।

একজন শিল্পীর জন্ম কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে হতে পারে, তাঁর ভাষা হতে পারে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাষা; কিন্তু তাঁর শিল্পের সৌন্দর্য মানুষের। তাঁর সৃষ্টির উত্তরাধিকার তাই বৃহত্তর সমাজের। চুণীলাল দেওয়ানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন চাকমা শিল্পীকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করা। তাঁকে সংরক্ষণ করা মানে একটি জাতির স্মৃতি সংরক্ষণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসের একটি হারিয়ে যেতে বসা অধ্যায়কে সংরক্ষণ করা।

চুণীলাল দেওয়ানের জীবন আমাদের একটি গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়প্রতিভা কখনো একা আসে না; তার সঙ্গে আসে সংগ্রাম, নিঃসঙ্গতা এবং অনেক সময় বিস্মৃতির দীর্ঘ ছায়া। তিনি এমন এক সময়ে শিল্পচর্চা করেছেন, যখন পাহাড় থেকে কলকাতায় গিয়ে শিল্পশিক্ষা নেওয়া ছিল দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত। এমন এক সময়ে কবিতা লিখেছেন, যখন চাকমা ভাষায় আধুনিক সাহিত্যিক প্রকাশের পরিসর ছিল অতি সীমিত। এমন এক সময়ে ছবি এঁকেছেন, যখন পাহাড়ের প্রকৃতি মানুষের জীবনকে জাতীয় শিল্পপরিসরে তুলে ধরার সুযোগ ছিল খুবই কম।

তবু তিনি থেমে থাকেননি। তাঁর হাতে পাহাড় পেয়েছিল রং। তাঁর কবিতায় পাহাড় পেয়েছিল শব্দ। তাঁর গানে পাহাড় পেয়েছিল সুর। তাঁর ভাস্কর্যে পেয়েছিল অবয়ব। আর তাঁর জীবন পাহাড়কে দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের এক নতুন শিল্পভাষা।

চুণীলাল দেওয়ান তাই কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধি। তিনি সেই সময়ের প্রতীক, যখন পাহাড়ের এক নিভৃত জনপদ থেকে উঠে এসে একজন মানুষ প্রমাণ করেছিলেন, সৃষ্টিশীলতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

আজ তাঁর অধিকাংশ ছবি নেই। অনেক লেখা হারিয়ে গেছে। অনেক গান হয়তো সময়ের অন্ধকারে বিলীন। তবু যে অল্প কিছু অবশিষ্ট আছে, তার মধ্যেই তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার দীপ্তি দেখা যায়। ইতিহাসের বিস্মৃত পাতায় তাই চুণীলাল দেওয়ানের নাম শুধু পুনরায় লেখা নয়, তাঁর শিল্পকর্ম, কবিতা, গান, ভাস্কর্য জীবনসংক্রান্ত দলিল সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ চুণীলাল দেওয়ান আর্কাইভ বা স্মৃতি-সংগ্রহশালা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

কারণ একটি জাতির ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়াদের ইতিহাস নয়; শুধু যুদ্ধ, রাজনীতি প্রশাসনের ইতিহাসও নয়। ইতিহাসের গভীরতম স্তরে থাকে এমন মানুষদের জীবন, যারা নীরবে একটি সমাজের সৌন্দর্যকে ভাষা দেন। চুণীলাল দেওয়ান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

তিনি পাহাড়ের রংকে ক্যানভাসে, পাহাড়ের নীরবতাকে কবিতায় এবং পাহাড়ের হৃদস্পন্দনকে গানে রূপ দিয়েছিলেন। তাই চুণীলাল দেওয়ানকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করা নয়,

নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে স্মরণ করা।

আর সেই কারণেই চুণীলাল দেওয়ান কোনো একক জাতি বা গোষ্ঠীর সীমাবদ্ধ সম্পদ নন; তিনি নানিয়ারচরের গর্ব, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অথচ দীর্ঘদিন অবহেলিত নাম।

চুণীলাল দেওয়ানের শিল্পপ্রতিভা তাঁর জীবদ্দশাতেই বিভিন্ন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার মে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর চিত্রকর্মের প্রশংসা করেন। পরবর্তীতে ১৫ মে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লার কমিশনার এবং নভেম্বর ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জে. . হিউম তাঁর শিল্পকর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, তাঁর শিল্পকর্ম সমকালীন সমাজের প্রচলিত গণ্ডি অতিক্রম করে বৃহত্তর পরিসরেও গুরুত্ব অর্জন করেছিল।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটিতে আয়োজিত একটি শিল্প প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে চুণীলাল দেওয়ান প্রথম পুরস্কার হিসেবে পদক লাভ করেন। অর্জন তাঁর শিল্পজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। পাহাড়ের প্রকৃতি, নদী, ঝরনা, জনজীবন, মানুষের সরলতা এবং পার্বত্য সমাজের বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র তাঁর তুলিতে যে রূপ পেয়েছিল, তা তাঁকে সমকালীন শিল্পচর্চায় স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয়।

তাঁর শিল্পপ্রতিভার স্বীকৃতি অবশ্য শুধু জীবদ্দশাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মৃত্যুর পরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর অবদানের যথার্থ মূল্যায়নের চেষ্টা করেছে। রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ কর্তৃক তিনি মরণোত্তর সম্মাননা সনদ পদকে ভূষিত হন (২০০১) পরবর্তীকালে নানিয়ারচর সংগীত একাডেমি মরণোত্তর সম্মাননা/২০১৯ ও নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ তাঁর চাঙমা ভাষা-সাহিত্য সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপনোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক’ (মরণোত্তর, ২০২৩) এবং সনদ প্রদান করে।

এই সম্মাননাগুলো কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি নয়; বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসে চুণীলাল দেওয়ানের অবস্থানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরায় প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। তিনি যে সময়ে শিল্পচর্চা করেছিলেন, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন, প্রকৃতি সংস্কৃতিকে শিল্পের ভাষায় বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে পাহাড়কে ক্যানভাসে, কবিতায় গানে ধারণ করেছিলেন।

চুণীলাল দেওয়ানের শিল্পজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা। চিত্রকলার পাশাপাশি কবিতা, গান, সুরসৃষ্টি, সংগীতচর্চা ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের সময়কে ধারণ করেছেন। তাঁর শিল্পে পাহাড় কেবল একটি ভূখণ্ড নয়- এটি মানুষের জীবন, স্মৃতি, প্রকৃতি, বেদনা ভালোবাসার সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। সেই কারণেই চুণীলাল দেওয়ানের উত্তরাধিকারকে শুধু কোনো একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়। চাকমা সমাজের গর্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়েও তিনি বৃহত্তর বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের স্মৃতি আজও নানিয়ারচর পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিসরে জীবন্ত। তাঁর নামে সেতুর নামকরণ, বিভিন্ন সময়ে তাঁর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী এবং মরণোত্তর সম্মাননা, সবকিছু মিলিয়ে প্রমাণিত হয় যে, সময়ের স্রোত তাঁর শিল্পস্মৃতিকে মুছে দিতে পারেনি। বরং যত সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে, ততই তাঁর শিল্প সাহিত্যকর্মের পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

তথ্যসূত্র:  

দেওয়ান, দেবী প্রসাদ ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.)। চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম। প্রকাশস্থান: রাঙ্গামটি, প্রকাশক: রেগা প্রকাশনী, প্রকাশকাল: এপ্রিল, ২০২১খ্রি

চাঙমা, সুগত। “চাকমা প্রথম চিত্রশিল্পী চুনীলাল দেওয়ান সর্ম্পকে ভারতীয় চিত্রশিল্পী অমরেন্দ্র নাথ রায়ের একটি পত্র ও কিছু কথা।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

খীসা, ডা. ভগদত্ত। “সেই এক চুণীবাবু।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

চাঙমা, সুগম। “চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

শর্মা, নন্দলাল। “নিবেদন নিয়ে কিছু কথা।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

রহমান, মো. মিজানুর। “চুনিলাল পার্বত্যাঞ্চলের এক অনন্য প্রতিভা।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

চাঙমা, ধনমনি। “শিল্পী চুনীলাল দেওয়ান।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

দেওয়ান, প্রীতম। “চুণীলাল দেওয়ান: আমাদের গর্ব ও প্রেরণা” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

কার্বারি, প্রমোদ বিকাশ। “চিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ান সংক্ষিপ্ত জীবনী।” ইন: দেবী প্রসাদ দেওয়ান ও ইন্টু মণি তালুকদার (সম্পা.), চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ানের জীবন ও কর্ম

 

ডা. ভগদত্ত খীসা : চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও চাঙমা লিপি সংরক্ষণের এক অগ্রপথিক - ইনজেব চাঙমা

“মামা করত গুরিনেই, বাবা কানাত চুরিনেই  নানু পিদিত  বুগিনেই- যিয়োং ভারদত যিয়োং ওপারত।” কয়েকটি পংক্তি- কিন্তু তার ভেতর যেন লুকিয়ে আছে একটি জাত...