যেদুন চাং মুই ত‘সমারে, মরে নেযানা।”
কর্ণফুলী বয়ে যায়। পাহাড়ের বুক চিরে, জনপদের স্মৃতি পেরিয়ে, কাপ্তাইয়ের জলরাশির ওপর দিয়ে তার নিরন্তর যাত্রা। অথচ এই প্রবহমানতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিস্মৃত ভূগোল, ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ি, হারিয়ে যাওয়া জনপদ, শৈশবের উঠোন আর অসংখ্য মানুষের স্মৃতি। নদী তার হিসাব রাখে না; কবি রাখেন। ইতিহাসের যে অংশ দলিলের ভাষায় ধরা পড়ে না, কবিতা কখনো কখনো তারই সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।
সলিল রায় ছিলেন সেই বিরল সাক্ষীদের একজন।
তাঁর আরেকটি গানের পঙ্ক্তি—
“মড়োত কি সং জাগাত
যিয়োত আমি থেদং সাত।”
এই উচ্চারণের মধ্যে যেন পাহাড়ি জীবনের গভীর কোনো সুর নিহিত, প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, মানুষ এবং অস্তিত্বের অনিবার্য টান। চাঙমা ভাষার গান ও কবিতায় তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতিকে বৃহত্তর জনজীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। চাঙমা আধুনিক কবিতার তৃতীয় পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য রচনা হিসেবে আলোচিত ‘দুরত ন যেইচ সোরি’ তাঁর কবিসত্তার আরেকটি স্বাক্ষর। রবীন্দ্রসংগীত চাঙমা ভাষায় অনুবাদের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ও চাঙমা ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যেও নির্মাণ করেছিলেন এক সৃজনশীল সেতু।
কবি হিসেবে তাঁর পরিচয়ই সবচেয়ে উজ্জ্বল হলেও সলিল রায় ছিলেন একই সঙ্গে গবেষক, অনুবাদক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম; কারণ ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, সময়ের ইতিহাস এবং পাহাড়ের মানুষের জীবন তাঁর সৃষ্টিতে পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।
সলিল রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৭ জুন ১৯২৮ সালে চাকমা রাজবাড়িতে। তিনি ছিলেন চাকমা রাজকুমার রমনীমোহন রায় ও সরসীবালা রায়ের কনিষ্ঠ সন্তান। রাজপরিবারের উত্তরাধিকার তাঁর জন্মপরিচয়কে মর্যাদা দিলেও জীবনযাপনে তিনি ছিলেন নিরহংকার ও অনাড়ম্বর। বিশেষ পরিচয়ের সুবিধার চেয়ে নিজের যোগ্যতা ও শ্রমের ওপর তাঁর আস্থা ছিল বেশি।
শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠেন। ১৯৩৫ সালে রাণী বিনিতা রায়ের পরিচালনায় চাকমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত গৈরিকা সাহিত্যপত্র সেই পরিবেশের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এই সাহিত্যিক পরিমণ্ডল কিশোর সলিলের মননে যে বীজ বপন করেছিল, পরবর্তী জীবনের সাহিত্যচর্চায় তারই বিকাশ দেখা যায়।
রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে নবম শ্রেণির ছাত্র সলিল রায়ের প্রথম কবিতা ‘রবীন্দ্র স্মৃতি’ প্রকাশিত হয় গৈরিকা-য়। ১৯৪৯ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং একই বছর সুনীতা রায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হলেও প্রায় এক বছর পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টেনে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত চাকমা রাজবাড়ির ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। ১৯৫২–৫৫ সালে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া-এর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক Accredited Correspondent হিসেবে কাজ করেন। পরে ইস্পাহানি কোম্পানি, ঠিকাদারি পেশা এবং ১৯৬২ সালের আগস্ট থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে ১৯৮১ সালের শুরুতে বাবু সুবিমল দেওয়ানের একান্ত সচিব নিযুক্ত হন।
১৫ জুন ১৯৮১ সালে রাঙ্গামাটির কালিন্দিপুরে নিজ বাসভবনে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
কর্মজীবনের পাশাপাশি সমাজ ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সভাপতি, প্রকল্পনা সাহিত্যাঙ্গনের সহ-সভাপতি এবং বিভিন্ন সাহিত্য, শিল্প ও ফোকলোর প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে তিনি কাজ করেছেন। রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ ও রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
সলিল রায়ের কবিতার শুরু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে, কিন্তু তাঁর কবিসত্তা ক্রমে নিজস্ব ভূগোলের দিকে ফিরে যায়। ‘রবীন্দ্র স্মৃতি’ ছিল কিশোর কবির প্রথম প্রকাশিত কবিতা—৩২ পঙ্ক্তির একটি শোকগাথা। আঠার মাত্রার পয়ার ছন্দে রচিত এই কবিতায় বয়সের আবেগের সঙ্গে ভাষা ও ছন্দের স্বাভাবিক দক্ষতার পরিচয় মেলে।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের তাঁর বহু কবিতা আজ আর সহজে সন্ধানযোগ্য নয়। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রচনাগুলো থেকে তাঁর সাহিত্যিক পরিসরের একটি ধারণা পাওয়া যায়। গৈরিকা, ঝরনা, পার্বত্য বাণী, সীমান্ত, উদয়ন, নতুন সাহিত্য, বিচিত্রা, বনভূমি ও সমতা প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
‘পার্বত্য বাণী’-তে তিনি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবন ও অনুভূতিকে কবিতার কেন্দ্রে এনেছেন। জুমিয়া মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জীবন, শ্রম ও অস্তিত্বের সঙ্গে তাঁর কবিসত্তার এক গভীর সংযোগ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে ‘দুঃস্বপ্ন’-এ ব্যঙ্গের আশ্রয়ে সামাজিক অসঙ্গতি উন্মোচিত হয়েছে এবং ‘বৌদ্ধ’ কবিতায় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নৈতিক অনুশীলনের গুরুত্ব সামনে এসেছে।
তবে তাঁর কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী উচ্চারণগুলোর একটি ‘অলিখিত কাহিনীর একটি নায়িকা’। কাপ্তাই বাঁধের ফলে বাস্তুচ্যুত এক পাহাড়ি নারীর বেদনা এখানে ব্যক্তিগত কাহিনি অতিক্রম করে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। ঘর হারানো, ভূমি হারানো, পরিচিত জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যে বেদনা, কবি তাকে দিয়েছেন মানবিক মর্যাদা। কাপ্তাই বিপর্যয়ের সাহিত্যিক স্মারক হিসেবে এ কবিতার গুরুত্ব এখানেই।
‘ঝরাপাতা’-য় প্রকৃতির রূপকের ভেতর দিয়ে শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র নির্মিত হয়েছে। আর ‘একটি শিক্ষকের কাহিনী’-তে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের এক মানবিক আখ্যান নির্মাণ করেছেন। নিকুঞ্জ মোহন সাহার জীবনের ঘটনাকে কাব্যে রূপ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন- ইতিহাসের বড় ঘটনাও শেষ পর্যন্ত মানুষের ছোট ছোট ত্যাগের মধ্য দিয়েই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সলিল রায়ের সৃষ্টিশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর চাঙমা ভাষার গান ও অনুবাদ। তাঁর গানে কর্ণফুলী, পাহাড় ও মানুষের জীবন কেবল প্রকৃতির উপাদান নয়; এগুলো হয়ে উঠেছে স্মৃতি ও পরিচয়ের প্রতীক।
রবীন্দ্রসংগীত চাঙমা ভাষায় অনুবাদের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা আলাদা হলেও অনুভূতির জগৎ অভিন্ন হতে পারে। অনুবাদ তাঁর কাছে নিছক ভাষান্তর ছিল না; ছিল এক সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির সংলাপ।
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ‘পালি অনুবাদ শিক্ষা’ তাঁর শিক্ষামূলক ও গবেষণামনস্কতার পরিচয় বহন করে। সাহিত্য ও প্রবন্ধ রচনার জন্য বিভিন্ন সময়ে তিনি পুরস্কৃতও হয়েছেন।
সলিল রায়ের সাহিত্যকে তাঁর প্রকাশিত রচনার সংখ্যায় মাপলে তাঁর গুরুত্বের পুরোটা ধরা যাবে না। কারণ তাঁর রচনায় সংরক্ষিত হয়েছে একটি সময়ের মানসিক ভূগোল—পাহাড়ের প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক অসঙ্গতি, ধর্মীয় আত্মজিজ্ঞাসা, দেশপ্রেম এবং কাপ্তাইয়ের জলতলে হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি।
রাজপরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি রাজবাড়ির গণ্ডিতে আটকে থাকেননি। তাঁর সাহিত্য পৌঁছেছে সাধারণ মানুষের জীবনে। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কখনো সৌন্দর্য, কখনো ইতিহাস; নদী কখনো প্রেমের প্রতীক, কখনো হারানোর সাক্ষী। এই দ্বৈত অনুভবই তাঁর কবিতাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।
১৯৮১ সালে তাঁর জীবন থেমে যায়। কিন্তু যে কবি একটি জনপদের স্মৃতি নিজের ভাষায় ধারণ করেন, তাঁর মৃত্যুতে সেই স্মৃতিরও মৃত্যু ঘটে না। কর্ণফুলী বয়ে যায়, কাপ্তাইয়ের জল নীরবে তার ইতিহাস বহন করে, পাহাড়ের বাতাসে পুরোনো গানের সুর ভেসে আসে।
তখন মনে হয়, সলিল রায় দূরে নন। তিনি আছেন সেইসব কবিতায়, যেগুলো হারিয়ে যাওয়া মানুষের কথা বলে; সেইসব গানে, যেখানে নদী ও মানুষের অনুভূতি একাকার; আর সেই স্মৃতিতে, যা কোনো জলরাশি ডুবিয়ে রাখতে পারে না।
সলিল রায় তাই চাঙমা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম, এক জন কবি, যিনি তাঁর সময়কে দেখেছেন, মানুষের বেদনা অনুভব করেছেন এবং হারিয়ে যেতে বসা এক ভূগোলকে শব্দের ভেতর বাঁচিয়ে রেখেছেন।
তথ্যসূত্র: দুঃস্বপ্ন ও আলোর পথ দেখালো যারা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন